হ্রদ নয় যেন বাঁকা চাঁদ

হ্রদ নয় যেন বাঁকা চাঁদ September 13, 2015 0 comments

রঙিন ডেস্ক: চীনের পশ্চিমে গোবি মরুভূমির প্রান্তে মরুদ্যান শহর দুনহুয়াং। এ শহরে বাস করে প্রায় লাখ দুয়েকের মতো মানুষ। বর্তমানে এ বালিয়াড়ি অঞ্চলে চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটন। এ অঞ্চলের মূল সমস্যা পানির, কেননা হ্রদ ও নদীনালা শুকিয়ে যাচ্ছে। এ বালিয়াড়ির নাম মিংশা।

মিংশা- মানে বালির গান। পশ্চিম চীনের মরুদ্যান শহর দুনহুয়াং-এর দক্ষিণের বালিয়াড়িগুলোকে ওই নামেই ডাকা হয়।

শহরের প্রান্তে বালিয়াড়িগুলো পর্যটকদের খুব প্রিয়। উটে চড়া আর স্লেজে চড়ে বালির উপর দিয়ে নিচে নামা ছাড়া এখানে আরও একটি দেখার জায়গা আছে।

বালিয়াড়ি এলাকার ঠিক মাঝখানে বাঁকা চাঁদের মতো একটি হ্রদ। এ হ্রদ প্রায় দু’হাজার বছর ধরে মাটির নিচে কোনো অদৃশ্য উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে আসছে। এ হ্রদটির ছবি তোলা পর্যটকদের কাছে একটি বিশেষ আকর্ষণ। তবে বহুদিন ধরে এ হ্রদের ছবি তুলছেন আলোকচিত্রী সুন কুয়ানহুয়া। এ হ্রদই এখন তার ছবির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, ‘আগে হ্রদটা আরও অনেক বড় এবং গভীর ছিল। প্রবীণেরা বলেন, দশ মিটার অবধি গভীর, কোনো মানুষ তার তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। ইতিমধ্যে হ্রদটা অনেক ছোট হয়ে এসেছে। হারিয়েছে আগের গভীরতা। পানির উচ্চতা এখন মাত্র তিন মিটার।’

দুনহুয়াং-এ রয়েছে পিচ ফলের বাগান। যদিও চাষবাসের ওপর কিছু বাধা-নিষেধ আছে সরকারিভাবে। হ্রদের পানি কমে এলেও খামারিরা ফলের চাষ করছেন । এমনই একজন খামারচাষী চিন জিয়ান। তার পিচ ফলের বাগান এখনও সবুজ। কিন্তু মাত্রাধিক কৃষিকাজ আর পর্যটকদের ভিড়ের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রা ক্রমেই কমে আসছে। চিন জিয়ান জানান, ‘সাধারণত আমরা মাসে একবার কিংবা দু’বার পানি পাই। পানির সরবরাহে সরকারি নিয়ন্ত্র রয়েছে। আমরা পানির ব্যবহার এমনভাবে করি যাতে গাছগুলো বড় বেশি না বাড়ে আর বেশি পানি না খায়। সেজন্য বসন্তে গাছগুলো ছেঁটে দিই। রাসায়নিক সারেও কাজ হয়।’

প্রতি কিলো শুকনো পিচের জন্যে চিন জিয়ান পান প্রায় ছয় ইউরো মতন। অর্থাৎ বছরে তার আয় মোট ৫০ হাজার ইউয়ান, বা চার হাজার ইউরো।

যতই দিন যাচ্ছে মরুভূমি আরও কাছে চলে আসছে- বছরে চার মিটার করে বাড়ছে মরুভূমি। তা সত্ত্বেও যে কেন চাষবাসের কাজে ক্রমেই আরও বাধা আরোপ করা হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারেন না চিন জিয়ান। তার অভিযোগ- ‘সরকার আমাদের বাধা দিচ্ছে। বালিয়াড়ির কাছে আমার আরও জমি আছে, কিন্তু তা আমি চাষবাস কিংবা পশুপালনের জন্য ব্যবহার করতে পারব না। কেননা আমাদের অতি কম পানি দেয়া হয়।’

কাজেই চিন জিয়ান এবার পর্যটন শিল্পের দিকে নজর ফিরিয়েছেন। একটি উট কিনেছেন। চিন জিয়ান ও তার পরিবারের লোকজন মিলে খামারের প্রাঙ্গণে দশটি গোল তাঁবু খাড়া করেছেন। এগুলো টুরিস্টদের ভাড়া দেয়া হয়। দুনহুয়াং-এর প্রায় দু’লাখ বাসিন্দাদের অনেকে সপ্তাহান্তে মরুভূমির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। পিচফলের বাগানে পিকনিকের পর টুরিস্টরা যান বালিয়াড়িতে হাঁটাচলা করতে। অবশ্য মরুদ্যানে আরও বেশি মানুষ আসার অর্থ আরও পানি খরচ- এ সমস্যার বস্তুত কোনো সমাধান নেই। একটা সমস্যা সমাধান করার মানে আরেকটি সমস্যা সৃষ্টি।

দুনহুয়াং-এর লানঝু-র গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন প্রফেসর কুইজান জুন। তার গবেষণার বিষয় মানুষ আর মরুভূমির পারস্পরিক প্রভাব। জুন বলেন, ‘মূল সমস্যাটা হল পানি সরবরাহ। আগে শুলে আর দাংহে, এই দুটি নদী ছিল। আজ দুটিই উধাও হয়েছে। দুনহুয়াং-এর মানুষজন শত শত বছর ধরে কৃষিকাজ চালিয়েছেন, কাজেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেকটা নিচে নেমে গেছে। আর এই নিচে নেমে যাওয়াটাই হবে আগামীতে মূল মাথাব্যথা।’

প্রফেসর কুইজান জুন-এর ছাত্রছাত্রীরা মাটির বিভিন্ন নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে দেখছেন। বালিতে পানির অনুপাত চার শতাংশের কম হলে বাতাসে বালিয়াড়ির ক্ষয় হতে থাকবে। এর অর্থ, বালিয়াড়িগুলো স্থিতি হারাবে এবং সরতে শুরু করবে।

বাতাস চলার করিডর মরুভূমির অগ্রগতি রুখবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রথমে খড়ের গাদা দিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু মরুদ্যান শহরের কাছে খড় এখন দুষ্প্রাপ্য। কাজেই নতুন বেড়াগুলো প্লাস্টিকের। বেড়াগুলোর মধ্যে আবার ঘাস বা ঝোপঝাড় গজালে মাটির ক্ষয় কিছুটা রোখা যাবে।

কিংবদন্তি বলে, ৭০ কিলোমিটার দূরের ইয়াং-গুয়ান শহরটি নাকি একটি বালির ঝড়ে লুপ্ত হয়েছিল। দুনহুয়াং-এরও যাতে সেই দশা না ঘটে সে জন্য সরকার ৬৫ কোটি ইউরো মূল্যের দশ বছরের এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

আরপি/ এএইচ

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

Your data will be safe!Your e-mail address will not be published. Also other data will not be shared with third person.