বিজয়োৎসবে দৈন্য-বিজয়ী সৈন্য

বিজয়োৎসবে দৈন্য-বিজয়ী সৈন্য September 21, 2015 0 comments

-শরৎচন্দ্র পণ্ডিত

এক রাজার প্রাসাদে অতি নিকটে রামদয়াল মণ্ডল নামক দরিদ্রের উলুখড়ের বসত বাড়ি। রামদয়াল দিন মজুরের কাজ করিয়া জীবিকা নির্বাহ করে। বৃদ্ধা মাতা, পত্নী, একটি পুত্র ও এক মাতৃপিতৃহীন ভাগিনেয় এ চারিটি মহাপ্রাণীর উদরান্ন ও লজ্জা নিবারণের বস্ত্র মুক্তকণ্ঠে তার প্রশংসা না করিয়া পারে না। খলামি কাহাকে বলে সে তা জানে না। লোকে তার কাজে এত সন্তষ্ট যে তাকে পেলে অন্য মজুর চায়। অনেক বলে যে সে একা দুইজন লোকের কাজ সাবাড় করিতে পারে।
যে দিন যার কাজে যায় অতি প্রত্যুষে সূর্য উঠিবার পূর্বেই ঘরে যা থাকে ্তাই মুখে দিয়ে গান করিতে করিতে কর্মস্থলে উপস্থিত হয়। হাড়ভাঙা খাটুনি খাটিয়েও সে আনন্দে দিন কাটায়। তার সঙ্গে যারা খাটে তারাও তার গান শোনে খুব আনন্দ উপভোগস করে। প্রত্যুষে রামদয়াল যখন বাঁ- হাতে রৌদ্র-বৃষ্টি-নিবারক মাখালী এবং ডান হতে কাস্তে বা হাঁসুয়া লইয়া রাস্তায় বহির্গত  হয় মনে হয়-তখন মনে হয়- যেন দীন বীর পুরুষ ভগবদ্দত্ত দৈন্য বিজয়ার্থ এক হাতে ঢাল এবং অন্য হতে তরবারি লইয়া যুদ্ধযাত্রা করিতেছে।
যত বড় পদস্থ বা শিক্ষিত লোকই হউন না কেন যাঁহাকে মজুরি লইয়া পেটের ভাত করিতে হয়, রামদায়াল, তাঁহাকেই নিজের পার্যায়ভুক্ত বলিয়া মনে করে। সে বলে-যে ভাত হাতে সয় না, তাই মুখে সইয়ে গিলে, জাআর বোতাম লাগাতে লাগাতে তাকে ছুটতে হয় সে যত টাকাই রোজগার করুক না কেন, সেও রামদয়ালের চেয়ে একটু ও আরামে থাকে না। যাকে পরের টাকা হিসাব-নিকাশ দিতে হয়, দিতে হয়, রামদয়াল তার থেকে ঢের সুখী।
রামদয়াল লেখাপড়া জানে না তবু ও মুখে মুখে গান তৈরি কওে সেই গান গেয়ে লোককে আনন্দ পরিবেশন করে নিজেও আননাদ উপভোগ করে।তার প্রাতঃকালে কর্মে বহির্গত হইবার সময় প্রভাতী সুরের গান শুনুন।
প্রভাত হইল ,ভুবন গাহিল
টাকা টাকা বুলি ।
ঝাকেঁ ঝাঁকে ঝাঁকে
থাকে থাকে থাকে
আয় কেরানি-কুলি।
প্রভাত হইল……
টাকা তুমি সবার শ্রেষ্ট,
তোমারে পাইতে সবে সচেষ্ট
ধনীরা খুলেছে আয়রন -চেস্ট
ভিখারি খুলছে ঝুলি।
ক্ষুধা রাক্ষসী ভীষন ভয়াল,
হতে নিয়ে তাই ঢাল তরোয়াল,
যুদ্ধে জিনিয়া রামদয়াল
আনিবে টাকা আধুলি।
সন্ধ্যার পর যখন মুজুরির পয়সা ট্যাঁকস্থ করিয়া এক আটিঁ উলুখড় মাথায় লইয়া বাটীতে প্রবেশ করিতে তখন গাইত নীল কন্ঠ মুখোপাধ্যায় এই গান টি,
মন পয়সার জন্য ভোবে কেনে ?
(পয়সা)অসতে যেতেও নিজে জানে।
পয়সার জন্য ভাবো কেনে।
জান না কি মন পয়সা এক নাম অর্থ,
যেখানে সে থাকে ,সেখানে অনর্থ,
তার সাক্ষী মন রাজা দুর্যোধনে
গবংশে নিধন ঐ পয়সা  ধনে।
পয়সার জন্য ভাবো কেন ।
পয়সা দিলে যদি ভাগবান কে মিলে,
নীল কন্ঠ কি কাঁদিতে সদাই হরি বোলে,
পয়সা নয় সে ধনে ,শ্রীনন্দের নন্দন
সচন্দন তুলনী বিনে।
পয়সার জন্য ভেবো কেন।
রামদয়াল গানের আওয়াজ তার স্ত্রী- এর কানে যাওয়া মাত্র সে এক ঘাটি জল , শীতকাল হলে গরম জল নিয়ে স্বামীর পা দু-খানি ধুয়ে গমছা দিয়ে মুছে,জল,কলকী তামাক সেজে ফুঁ দিয়ে ধরিয়ে স্বামীর হতে দেয়। রামদয়াল ধূমপান করিতে করিতে পতœীকে জিজ্ঞিসা করে –ধার শোধ করেছে?ধার দিয়েছে? জলে ফেলে দিয়েছে ?স্ত্রী প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর দেয় হ্যাঁ।তখন বেশ বীরত্বব্যজ্ঞক স্বওে রামদয়াল স্ত্রীকে আদেশ করে –
“জ্বালাও সহস্্র বাতি
ভোজনে বসুক নরপতি”।
এই সব অহস্কার পূর্ন প্রশ্ন ও আদেশ রাজ প্রসাদেও তোষাখানা ্হইতে বেশ শোনা যায় । অন্য দিন রাজা এত বড় একটা গুরুত্ব দেয় না ।আজ বিজয়ার দিনে তাঁর জন্মদিন। তোষাখানায় বহু মান্যগন্য ব্যক্তি উপস্থিত ।তাদেরঁ অনেকে রাজার নিজেকে খুব অপমানিত বোধ কওে দ্বারেয়ান কে হুুকুম দিলেন দয়াল বেটা এখনি ধওে আনো।
একে হনুমান তাতে রাম আজ্ঞা।ভোজপুরী বীরপুঈব রামদয়াল কে তখনই বন্ধুবান্ধাব পরিবেষ্টিত রাজ –সন্নিধানে হাজির করিল। রামদয়াল করজোড়ে প্রমান করিবামাত্র রাজা জিজ্ঞিসা করিলেন- রোজ কত আকা উপাজর্ন হয়?
দয়াল-কোন দিন বারো আনা সেদিন খুব বেশী হয় এক টাকা।
রাজা- এর মধ্যে ধার শোধ করিস্ কি?ধারইদস্ কি?জলে ফেলেও দিস্ কত?
দয়াল- হুজুর –বুড়ো মা আছেন, স্ত্রীকে ইঙ্গিতে জিজ্ঞিসা করি মাকে খেতে দিয়েছ?
ঐার বুকের রক্ত খেয়ে এই দেহ খান তার ধার শোধ হবার নয় তবুও রোজ দুটি খেতে দিয়ে কিঞ্ঝিৎ শোধ করা। একটি ছেলে আছে হুজুর তাকে যা দেই, সে যখন উপার্জন করতে পারবে হয় তো আমার দেওয়াকে ধার মনে করে আমরা বুড়ো হলে দু-মুঠো দিবে এই আশা। কাজেই সেটা ধার দেওয়া। আর হুজুর একটা মা-বাপ মরা ভাগনে আছে, তাকে যা দেই, জলে ফেলা ভিন্ন আর কি মহারাজ? সে যখন বড় হবে –জন জামাই, ভাগনা তিন হয় না আপনা। আমাদের তো খেতে দিতেই না বরং বলবেÑ বাবা মরবার সময় হাজার টাকা রেখে গিয়েছিল মামার কাছে। মামা সে টাকা মেরে দিয়েছে।
রাজা- সহস্র বাতি জ্বালিয়ে ভোজনে বস। হাজার বাতির ঝাড় পেল কোথা? আমার পৈতৃক ৪০০ বাতির একটা ঝাড় আছে আর তোর সহস্র বাতির ঝাড়?
দয়লÑ –হুজুর রাত্রে বাড়ি ফিরে রোজ খাই। আধঁনে খেতে হয় বলে, রোজ এক আটিঁ উলুখড় কেটে আনি, তাই শুকিয়ে আমার স্ত্রী এক মুঠো কনে জ্বালায় ,আমি সেই আলো তে ভাথ কয়টি খেয়ে নিই।
রাজা ও তাহাঁর বন্ধুবর্গ রাজার জন্মদিন উপলক্ষে এই স্বাধীন দৈন্যবিজয় জন্ম-দীনকে দেখিয়া হতবাক হইয়া। কবির কথা –
সন্তোষামৃত-তৃপ্তানাং
যৎ সুখাং শান্ত চেতসাম্
কুতস্তদ্ধন লুক্কানাং
ইতশ্চেতশ্চ ধাবতাম্ ।
রাজবাড়ি হইতে ছাড়ান পাইয়া রামদয়াল সহস্র বাতি জ্বালিয়া ভাত খাইয়া হুঁকা টানিতে টানিতে গান ধরিলÑ
পাপ না হলে,
পূণ্যেও কি মান্য হতো।
সবাই যদি রাজা হতো
রাজস্ব বা কে দিত।
তোমাদের বিচার কি সূক্ষ্্র,
দেখে মনে হয় দুঃখ,
দেশের যারা অন্নদাতা
তারাই সব মূর্খÑ
এ সব  মূর্খ নইলে পন্ডিতেরা
পাজ্ঞিকা চুষে খেতো।
পাপ না হলে পূণ্যেও কি মান্য হতো।

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

Your data will be safe!Your e-mail address will not be published. Also other data will not be shared with third person.