দুর্ঘটনা

দুর্ঘটনা 0 comments

দুর্ঘটনা
গজেন্দ্র কুমার মিত্র

সেভেন্ আপ দিল্লী এক্সপ্রেস্-ডাক নাম যার তুফান মেল-তাহারই এখানা থার্ডক্লাস কামরায় আমাদের নাটকের আরম্ভ এবং সেইখানেই যবনিকা।

গাড়িতে সেদিন কি কারণে জানি না, অসম্ভব ভিড় হয়েছিল। ভারতবর্ষের প্রায় সব প্রদেশেরই কিছু কিছু লোক হরেক রকমের মোটঘাট লইয়া কামরাগুলিকে একেবারে ভরিয়া তুলিয়াছিলেন এবং প্রবেশপথের অবস্থা চক্রব্যূহের অপেক্ষাও দুর্ভেদ্য হইয়া উঠিয়াছিল। সেই অবস্থার মধ্যেও শেষ মুহূর্তে একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোক যখন সকলকে ঠেলিয়া-ঠুলিয়া সকলের তারস্বর প্রতিবাদে কর্ণপাত-মাত্র না করিয়া উঠিয়া পড়িলেন, তখন যে আমরা সকলেই বিরক্ত হইয়াছিলাম তাহা বলা বাহুল্য।

সুবিধার মধ্যে ভদ্রলোকের সঙ্গে মোটঘাট বিশেষ ছিল না, একটি স্যুটকেস মাত্র হাতে করিয়া তিনি উঠিলেন। কিন্তু বাঙ্ক বা মেঝে কোথাও ব্যাগটি রাখিবার তিলমাত্র স্থান না দেখিয়া হাতে করিয়াই দাঁড়াইয়া চাদরের খুঁটে ঘাম মুছিতে লাগিলাম।

ট্রেন ছাড়িবার অল্প কিছুক্ষণ পরেই সহসা তাঁহার নজরে পড়িল ওধারে একটি ভদ্রলোক জানালার ওপর হাত রাখিয়া কানুইটি বাহির করিয়া বসিয়া আছেন। তিনি যেন ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন, ও মশাই! শুনচ্ছেন, ও দাদা-দয়া করে কানুইটা ভেতরে টেনে নিন, আমি হাত জোড় করছি।

কানুই-এর মালিক হাত ভিতরে টানিয়া লইলেন বটে কিন্তু অতিমাত্রায় বিস্মিত হইয়া ভদ্রলোকের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। উপস্থিত অন্য সকলেরও প্রায় সেই অবস্থা। তাঁহার ব্যাকুলতা কিন্তু হাত টানিয়া লওয়ার সঙ্গে সঙ্গই চলিয়া গিয়াছিল। তিনি অতঃপর ধীরে-সুস্থে আমাদের দিকে চাহিয়া কারণটা বিবৃত করিলেন, এখনও পাঁচটি দিন হয়নি মশাই, ওয়ালটেয়ার থেকে আসছিলুম মাদ্রাজ মেলে, এক ভদ্রলোক অমনি কনুই বার ক’রে বসে ছিলেন। দেখতে দেখতে মশাই আমার চোখের সামনে-হাতখানি তিন টুকরো! কানুইটা রইল বাহিরে, বগল আর হাত ভেতওে চ’লে এল।

চারিদিক হইতে একটা বিস্ময়ের গুঞ্জন উঠিল। যিনি কনুই বাহির ইরয়া বসিয়া ছিলেন, তাঁহারও রীতিমত মুখ শুকাইয়া গেল।

-বলেন কি মশাই!

-আজ্ঞে, তবে আর অত ব্যস্ত হলুম কেন বলুন!

ওধারের বেঞ্চ হইতে একটি মাড়োয়ারী যুবক বলিয়া উঠিল, লেকিন ক্যায়সে কাটা বাবুজী?

ভদ্রলোক একটু যেন উষ্ণভাবেই কহিলেন,এটা আর সমঝা নেহি? পাথর! পাথর! পাহাড়কা উপরসে পাথর গিরা!

ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করিলাম, বলেন কি মশাই!…পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর প’ড়ে বেচারার হাতটা কেটে গেল?

-যাবে না? সে কি যা তা পাথর? অন্তত আট-ন’মন ওজন হবে!

একজন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, ট্রেনে জার্নি বরা প্রাণ হাতে ক’রে।

-কিছু বিশ্বাস নেই মশাই, বুঝলেন? যতক্ষণ না ফিরে আসছেন ততক্ষণ বিশ্বাস নেই। …এই ত মাস-খনেকের কথা, দানাপুর স্টেশনে গাড়ি থেমেছে, আমাদের ম্যাকলীন কোম্পানীর হরেনবাবু স্টলে গেছেন চা খেতে; ফিরে আসছেন, আসতে আসতেই গাড়িটা দিয়েছে ছেড়ে। ও মশাই, সামান্য স্পীড, কিন্তু ভদ্রলোক একটুখানি পা পিছলে যেমন গ’লে পড়ে গেলেন আর অমনি দু’টুকরো।

আবারও সেই অস্ফুট গুঞ্জন। অনেকেরই মুখ শুকাইয়া উঠিল, বোধ হয় নিজেদের ইতি পূর্বেকার চলন্ত ট্রেনে উঠিবার ইতিহাস স্মরণ করিয়া বলিলেন, হাতরাস থেকে মথুরার ট্রেন ধরে কাজ নেই, বরং বাসে গেলেই হবে।

আমাদের নবাগত ভদ্রলোকটি আরও যেন তাতিয়া উঠিলেন, বাস? ও আরও ডেঞ্জারাস। শুনবেন তা’হলে বাসের কথা? আমার এক মাস্টারমশাই আসছিলেন তমলুক থেকে বাসে ক’রে-পাঁশকুড়োর ট্রেন ধরবার জন্য। হঠাৎ মোড় ঘুরেই দেখা গেল, রাস্তার ওপর গোটাতিনেক ছাগল-ছানা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের বাঁচাবার জন্য ড্রাইভার যেমন পাশ কাটাতে গেছে, একেবারে উঁচু রাস্তার ওপর থেকে গড়াতে গড়াতে বাসসযদ্ধ চলে গেল নিচের জমিতে। সতেরো জন প্যাসেঞ্জারের মধ্যে তিনজন তখনই মারা গেল; বাকি সকলে মাস-ছয়েক ক’রে ঝোল ভাত খেতে হ’ল। শুধু ড্রাইভার ভাল ছিল, তার কিছু হয়নি।

শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেরই এই বর্ণনায় গা-মাথা ঝিম্ ঝিম্ করিতে লাগিল। আমার ত রীতিমত পেট ব্যথা করিতে শুরু করিয়াছে। কিছুক্ষণ পরে প্রথম ভয়ের ব্যাপারটা কাটিতে আমাদের বিরাজবাবু সেই মথুরাযাত্রী বৃদ্ধাটিকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ও বাসে-ফাসে কখনও চড়তে নেই মশাই, বিপজ্জক! যদি নিজের মোটর থাকে, কিম্বা ট্যাক্সি-

-তাতেই বা কি সুবিধে মশাই? সেদিন কাগজে পড়েন নি, বড়বাজারের এক মহাজনের কি দুর্গতি? উপযুক্ত ছেলে এক ছেলে, নিজের মোটর চালিয়ে ডায়মন্ডহারবার বেড়াতে গেল আর ফিরল না। খোঁজ খোঁজ-অনেক খুঁজে দেখা গেল যে, গড়ের হাটের কাছে এক বিরাট বটগাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মোটরখানা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়ে রয়েছে, আর তার সঙ্গে মোটরের মালিকও।…নিজের মোটরের ত ঐ হাল, আর ট্যাক্সির ত কথাই নেই, রোজ অন্তত চারটি করে অ্যাকসিডেন্ট এই কলকাতা শহরেই হচ্ছে। এই ত গত বুধবারের আগের বুধবাওে আমাদের চোখের সামনে একখানা ট্যাক্সি-

ভদ্রলোকের কথায় একটা আকস্মিক বাধা পড়িল। ওধারের বেঞ্চ হইতে একটা ভদ্র মহিলা সহসা হাউ-মাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। আমরা ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া সেই দিকে মনোযোগ দিলাম; ‘কি হ’ল-কাঁদছেন কেন’- ‘কি হয়েছে মশাই?’ ইত্যাদিতে অন্য সব প্রসঙ্গ চাপা পড়িয়া গেল।

অনেক প্রশ্ন করিবার পর তাহাদের সঙ্গিদের কাছে জানা গেল যে, ভদ্রমহিলার একমাত্র জামাতা ট্যাক্সি ও বাসে ধাক্কা লাগিয়া স¤প্রতি প্রাণ হারায়েছেন। মোটর দুর্ঘটনার এই প্রতক্ষ স্বরূপে আমরা সকলেই অভিভূত হইয়া পড়িলাম। বিরাজবাবু নিজে অনেকখানি সরিয়া বসিয়া নবাগত ভদ্রলোককে বসিবার স্থান করিয়া দিলেন।

ওধারের ভদ্রমহিলার কান্না কমিয়া আসিলে প্রায় সমস্ত গাড়ি জুড়িয়া শুরু হইল বিবিধ, বিচিত্র দুর্ঘটনার আলোচনা। নিজের জীবনে যিনি যত রকমের দুর্ঘটন দেখিয়াছেন, তাহাই মহা উৎসাহে বর্ণনা করিতে বসিলেন। যাঁহারা দেখেন নাই, তাঁহারা শোনা কথাকে অলঙ্কার দিয়া বর্ণনা করিতে বসিলেন এবং খবরের কাগজের আদ্যশ্রাদ্ধ হইতে লাগিল।

ইতিমধ্যে আমাদের নবাগত ভদ্রলোকটির বিড়ি টানা শেষ হইয়া আসিয়াছে। তাঁহার তীক্ষè কণ্ঠস্বরে আর সকলের কথা ডুবাইয়া পুনশ্চ কহিলেন, কোন্ যানবাহনটা নিরপদ? সাইকেল? শহওে সাইকেল চালানো ত প্রাণ হাতে ক,রে, এই বুঝি ট্রামের সঙ্গে ধাক্কা লাগল, ঐ বুঝি বাস চাপা পড়লুম, সর্বদা এই ভয়। ঘোড়ার গাড়ি ত কথাই নেই, ঘোড়া ক্ষেপে উঠলেই চোখ অন্ধকার। প্রভাত মুখুজ্জে, কি অনুরূপা দেবীর গল্পের নায়ক যদি কাছাকাছি থাকে তবেই রক্ষে, রাশ টেনে ঘোড়াকে আটকাবে (যদি গাড়িতে নায়িকা হবার উপযুক্ত কেউ থাকে), নইলে সটান নিমতলার ঘাটে।

এক অর্বাচীন বালক বলিয়া ফেলল, আগেকার হেঁটে যাওয়াই ছিল ভাল।

-ওরে বাবা! ডবংশ শতাব্দীর সভ্যতায় ত পদচারীদের স্থান নেই। ট্রাম-বাস-মোটর ঘোড়া এসব ত আছেই, মায় রিক্সা চাপা পড়া পর্যন্ত, আর যেখানেই গাড়ি-ঘোড়া নেই সেখানে সাপ-খোপ আছে।

সম্মুখের বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি ফোঁস করিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, বাইরে বেরোলেই অপঘাত মৃতুর আশঙ্কা, তার চেয়ে ঘরে বসেই থাকাই ভাল।

কিছু না ,কিছু না , দেখলেন ত বিহারের ভূমিক্ম্পর সময়? যারা বাইরে টাইরে ছিল তারা বরং এক রকম র্ক রে বেঁচেছে , যারা ঘরের মধ্যে ছিল ,তাদের ত আর চিহ্ন রইল না। আমাদের এক আলাপী ভদ্রলোকের কি হ’ল -তিনি আর নাতনী বাইরের রাস্তায় পায়চারি করছিলেন , আর বাড়ি প্রায় সবাই ছিল ভেতরে। মাশাই-সেই একুশ জন লোকের মধ্যে একজনও বাচঁল না। শুধু বুড়ো আর নাতনি! বুড়ো ত পাগল হয়ে গেছে

মথুরাযাএী ভদ্রলোক আর সহ্য করতে পারিল না ,ভ্যাঁক্ করিয়া কাঁদিয়া ফেলিয়া কহিলন, মশাই আর কি কোন উপায় নেই?

নবাগত ভদ্রলোকটি চিন্তিত মুখে কহিলেন, নাঃ-অ্যাকসিডেন্টে হাত এড়াবার কোন উপায় নেই।তবে যদি অল্প স্বল্প কিছু হয় কিম্বা পরিবারদের কোনও ব্যবস্তা করতে চান তাহলে উপায় আছে বটে।

চারিদিক হইতে ব্যগ্র-ব্যাকুল কণ্ঠে প্রশ্ন আসিতে লাগিল, কি রকম ,কি রকম? কি বলেন মশাই? ইত্যাদি।

ভদ্র লোক কহিলেন, আজকাল সব বিলিতি ইনসিওরেন্স কোম্পানিই অ্যাকসিডেন্টে ইন্সিওরেন্স করছে ,সেগুলো মন্দ নয়। যদি হাত -পা ভাঙে কিম্বা একেবারে মারা যান তাহলে মোটা টাকা দেবে, আর যদি অসুখ-বিসুখ হয় করে তাহলে মাসোহারা দেবে-ভারি চমৎকার পলিসি। আমার কাছেও আছে একটা প্রসপ্কেটাস দেখবেন? স্কট্স্ ইউনিয়নের অ্যাকিসিডেন্ট পলিসি, নামকরা কোম্পানি, প্রায় একশ বছরের দেখবেন ?

ভয়ের পরিবর্তে অনেকেরই মুখে-চোখে ক্রোধের চিহ্ন ফুটিয়া উঠিল। একজন ত স্পষ্টই বলিয়া ফেলিল, ও ; আপনি এজেন্ট বুঝি? তাইত এত ভয় দেখাচ্ছিলেন?

ভদ্রলোক এই দোষারোপে বিন্দুমাএ বিচলিত হইলেন না। ধীরে সুস্তে স্যূটকেস খুলিয়া কতকগুলি কাগজ-পত্র বাহির করিয়া কহিলেন,আজ্ঞে ভয়ত আর আমি মিথ্যে করে দেখাইনি। কোন্ কথাটা ওর মধ্যে বাজে?… হাত পা ভেঙে যখন বাড়িতে এসে বসবেন, তখন যদি টাকাটা পান সেটা ভাল, না ভিক্ষে করা ভাল? নাকি আপনি টাকাটা পেলে আমায় দেবেন?

তরপ প্রশান্তভাবে মথুরাযাত্রী ভদ্রলোকের হাতে একখানা প্রসপেকটাস্ দিয়া কহিলেন, দেখুন, ভাল করে পড়ে দেখুন, বুঝতে না পারলে বরং আমায় বলবেন, বুঝিয়ে দেব-

যে ভদলোক কনুই টানিয়া লইয়া ছিলেন, তিনি পুনরায় জানালায় হাত বাহির করিয়া বসিলেন।

Related সাহিত্য Articles

Similar Posts From সাহিত্য Category

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

Your data will be safe!Your e-mail address will not be published. Also other data will not be shared with third person.