তৃতীয় পক্ষ

তৃতীয় পক্ষ September 20, 2015 0 comments

তৃতীয় পক্ষ
-হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

বিয়ের পরের মাসেই স্ত্রী মারা গেল। ভুবনমোহন তখন জোয়ান বয়স, তার উপর মা বেঁচে। মাস চারেকর মধ্যে আবার নতুন বউ ঘরে এল।
কিন্তু বরাত ভুবনমোহনের। একটি মেয়ে ভুবনমোহননের কোলে তুলে দিয়ে এ-বৌও চোখ বুজল। তিন দিন তিন রাত ভুবনবাবু বিছানা ছাড়ল না। কেঁদে কেঁদে চোখ লাল। মা আর ছিলেন না। দূর সম্পর্কেও এক পিসি সান্ত্বনা দিতে এসে কেঁদেই আকুল। অনেক বোঝানোর পর ভুবনবাবু বিছানা ছেড়ে ডিসপেনসিরিতে এসে বসল, কিন্তু ওই বসাই সার। রোগীদের ভাল করে দেখলও না, ওষুধপত্রও হাতের কাছে যা পেল, তাই বিলিয়ে কাজ সারল।
দিন কয়েক পরে তাল বুঝে পিসি একবার চেষ্টা করল।
তোর আর এমন বয়স কি ভুবন। এ বয়সে অনেকে বিয়েই হয় না। আর একটা বিয়ে কর। মেয়েটাকে দেখার একটা লোক দরকার, তাছাড়া তোকেও ত এভাবে অযত্নে অবহেলায় ফেলে রাখা যায় না।
কম্বলের উপরে বসে ভুবনমোহন গীতা পাট করছিল। এক মুখ গোঁফদাড়ি। শীর্ণ দুইটি চোখ।
মুখ তুলে পিসি দিকে চেয়ে বলল, বিয়ে করব পিসি, আপত্তি করব না। খাটিয়ার চার ধারে ফুল সাজিয়ে ভাল লগ্ন দেখে যাত্রা শুরু করব। সঙ্গে নাম সংকীর্তন, খই ছড়ান, সব হবে।
বালাই ষাট, অলুক্ষুণে কথা শোন ছেলের। ভুবনমোহনের কথা শেষ হবার আগেই চোখে আঁচল চাপা দিয়ে পিসি উঠে গিয়েছিল। ভুবনমোহনের পেশা ডাক্তারি। অ্যালোপ্যাথি নয় হোমওপাথিক। শুধু বাপের রোগীরগুলোই নয়, তাঁর নাড়ীজ্ঞানও পেয়েছিল। আশপাশের গোটাচারেক গায়েতে আর কেউ পাত্তা পায় না। সর্দি থেকে সান্নিপাতিক, হাঁপানি থেকে হার্নিয়া, সব ব্যাপারে ভুবনমোহন ডাক পড়ে। ইদানীং অবশ্য হাসপাতালে কোট প্যান্ট পড়া দু’একজন ছোকরা ডাক্তার ঘোরাফেরা করে। শিরা ফুঁড়ে ওষুধ দেয়, দাঁত ভাঙা সব দাওয়াইয়ের নাম বলে, কিন্তু এত করেও জমাতে পারিনি। ভুবনমোহন প্র্যাকটিসের শক্ত বুনিয়াদে একটু ফাটল ধরেনি।
ভুবনমোহন অবস্থা, দেখে রোগীরা প্রমাদ শুনল। সর্বনাশ, স্বয়ং ধন্বন্তরি হাত গুটিয়ে থাকলে পৃথিবীতে মড়ক লাগবে যে। বাড়ি বাড়ি কান্নার রোল উঠবে।
গাঁয়ের দু’একজন মাতব্বর ধর্না দিল।
ভুবনমোহন কিন্তু অটল। হাত জোড় করে বলল, আমাকে মাপ করেন আপনারা। ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। উঠে দাঁড়াবার  কোন জোড় পাচ্ছি না। নিজের ওপরই বিশ্বাস হারিয়েছি, কাজে আপনাদের চিকিৎসা করব কোন ভরসায়।
লোকেরা ছাড়বে না। তা কি হয়। উঠে বসতে হবে মোহনবাবুকে। এর চেয়ে কত শোক পায় মানুষ কত বড় আঘাত। এই বিপদে মধ্য দিয়েই ত মানুষের পরীক্ষা, মনুষ্যত্বে পরীক্ষা। পুরুষ-মানুষ এত অল্পতে কাহিল হলে কি চলে।
দু’একজন মোহমুদগর আওড়াল, কেউ কেউ গীতার মোক্ষম অংশ।
একটু বুঝি টলল ভুবনমোহন। কাঁচাপাকা দড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, আমি দিনকতকরে জন্য বাইরে যেতে চাই। তীর্থে তীর্থে ঘুরে যদি মনটা ঠিক করতে পারি। গয়া, প্রয়াগ, মথুরা, বৃন্দাবন।
দিন কয়েক নয়, ভুবমোহন ফিরল মাস দুয়েক পর। গোফঁদাড়ি চিহ্ন নেই, বপু কিজ্ঞিৎ স্ফীত, মুখে সলজ্জ হাসি। পেছনে অবগুণ্ঠনবতী তরুণী।
দ্বিতীয় পক্ষেও মেয়েটি পিসির কাছে ছিল। খবর পেয়ে পিসি এসে দাঁড়াল মেয়ে কোলে নিয়ে।
নতুন বৌ মলতী। ঘোমটা টেনে এগিয়ে গিয়ে পিসিকে প্রণাম করেই ছোট মেয়েটাকে কোলে তুলে নিল।
পড়শীরা অবাক। পাড়ার দু’একজন জিজ্ঞাসাও করে ফেলল।
ডিসপেনসরির টেবিলে-চেয়ার  মুছতে মুছতে ভুবনমোহন মুখে অমায়িক হাসি ফোটাল।
মিছেই আমার লাফালাফি করে মরি। আমরা কেউ নই, ভাই, অন্তরাল থেকে আর-একজন সুতো টেনে চলছেন। তিনি নাচাচ্ছে, আমরা নাচ্ছি।
অব্যশ এই নাচানাচির ব্যাপারটা ভুবনবাবু এক সময় পরিষ্কার করেও বলল। প্রয়াগ ছাড়বার মুখে। সাত কুলে কেউ কোথাও নেই। বুড়ে রুগ্ন বাপ সম্বল। তাকে নিয়ে তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আলাপ ধর্মশালায়। বাপ হাপাঁনিতে কাত।
মালতী ভুবনমো নের কমরায় ঢুকছিল সাহায্যের আশায়। বিদেশ, বিভূঁই, একলা মেয়ে ছেলে। যদি দয়া করে  একটা  ডাক্তার ডেকে দেন ভুবনমোহন।
ওষুধের বাক্স ভুবনমোহনে ও কাছেই ছিল। নিজের যদি চিকিৎসায় দরকার হয়, সেই ভেবে সঙ্গে নিয়েছিল। কাজে লেগে গেল। মিনিট পনেরোর মধ্যেই মালতী বাপের চিকিৎসায় ভার নিল ভুবনমোহন, আর ভুবনমোহনের ভার নিল মালতী। মালতীর বাপের শরীর খুব না সরলেও যন্ত-আত্তিতে ভুবনমোহনের চেহেরা ফিরে গেল। দাড়ি গোঁফের ঝোপ নিমল হল। ময়লা কাপড়-চোপড় বদলে বদলে ফর্সা পরিচ্ছদ অঙ্গে উঠল। মুখে বিষাদেও আমেজ কেটে গিয়ে হাসির আভাস।
বিয়ের কথা টা মালতী বাপ পাড়ল বৃন্দবনে। ভুবনমোহন অবস্থা তখন ভিজে ভিজে। যন্ত তোয়াদে কাদাকাদা ভাব। জোর গলায় আপত্তি করতে পারল না। কেবল নিজের ব সের উল্লেখ করে মৃদু প্রতিবাদ করল।
আপত্তি টিকল না। বাপ উমা-মহেশ্বরের বয়সের ব্যবধানে নজির বাতলে ভুবনমোহনকে আর হাঁ করে দিল  না। বিয়ে হয়ে গেল।
আমি ভবলাম পিসির বয়স হয়েছে, মেয়েটাকে দেখবার একটা লোকও ত দরকার, তাই-
কোন রকম ঢোঁকে গিলে ভুবনমোহন কথাটা শেষ করল।
ভুবনমোহন হালচাল বদলাল। এমনিতে মাথার চুল কম। পাসেরের সঙ্গে সঙ্গে টাকের ও পসার, কিন্তু পাড়ার নাপিত গদাধরকে ডেকে বিরল কেশে যন্ত নিতে শুরু করল।রোগীরা ওষুধের মৃদু গন্ধপেতে লাগল। আতরে গন্ধ।
পথে-ঘাটে ভুবনমোহন ধরা পড়ে গেল। হাট ফেরত একেবারে লোকের মুখোমুখি ।
হাটে এসেছিলেন বুঝি, হাতে কী ওটা? কী কিনলেন?
বিব্রত ভুবনমোহন হাতের মোড়টা পিছনে সরাতে সরাতে বলে ও একটা ইয়ে। লোকেরা নাছোড়বান্দা। বলতেই হয় ভুবনমোহনকে। রঙিন তাঁতের শাড়ি। ব্লাউজের ছিটও খনিকটে।
শুধু শাড়ি নয়, মাঝে মাঝে বিপিনের দোখান থেকে স্নো, পাউডার, কাচের চুড়িও কেনে ভুবনমোহন।
বন্ধুবান্ধব দু’একজন হালখা ঠাট্টা করে ।
এও একটা রোগ ভুবন ক্যালেগুুলা থার্টি কিংবা ইপিকাক খেয়ে একবার দেখ না।
বেশিরভাগ লোকে অবশ্য এ নিয়ে মাথা ঘামায় না নতুন আর কি করেছ ভুবনমোহন। বৃদ্বস্য না হোক প্রৌঢ়স্য তরুণী ভার্যা হলে এই রকমই হয়।
রোগীরা কিন্তুু মুশকিলে পড়ল।
আগে ভুবনমোহন কোন গোলমাল ছিল না। দিনে রাতে যখন রোগী এসে দাঁড়িয়েছে, ভুবনমোহন এক পায়ে খাড়া। শুধু হাতের মুঠোয় দর্শনী পেলেই হল। বাক্স বগলতাবা করে, স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ত। আজকাল কিন্তু সন্ধ্যার পরে তাকে বাড়ি বার করাই মুশকিল। নানা ওজর আপত্তি তুলে পাশ কাটাবার চেষ্টা। রাত্রে ভাল চোখে দেখতে পাই না, কিংবা বাড়িতে ওর শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। আর একেবারে পা জড়িয়ে ধরলে সাকরেদ বিশ্বনাথকে এগিয়ে দিয়েছে।
বেশ, বিশুই না হয় যাচ্ছে। ও দেখে আসুক, দরকার হলে সকালে আমি না হয় যাব।

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

Your data will be safe!Your e-mail address will not be published. Also other data will not be shared with third person.