দুই মাসের ব্যবধানে রিজার্ভে ছয়বার রেকর্ড

সেপ্টেম্বর ২, ২০২০ ০ comments

রিজার্ভ থেকে ঋণ নিতে চায় সরকার, হচ্ছে নীতিমালা

রঙিন ডেস্ক : করোনা মহামারিতে আবারও বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে। এবার রিজার্ভ ছাড়িয়েছে ৩৯ বিলিয়ন বা তিন হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এ নিয়ে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে রিজার্ভে ছয়বার রেকর্ড হলো। গতকাল মঙ্গলবার দিনের শুরুতে রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ দশমিক ৪০ বিলিয়ন বা তিন হাজার ৯৪০ কোটি ডলারে।

রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক ঋণ সহায়তার ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন এ উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। মাসে চার বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় হিসেবে এই রিজার্ভ দিয়ে দেশের প্রায় ১০ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী সাধারণত কোনো দেশের তিন মাসের বৈদেশিক মুদ্রার দায় মেটানোর মতো মজুদ থাকতে হয়। এর কম থাকলে ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে যাওয়া অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক মাত্রায় থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা পান, বিনিয়োগ বাড়ে। তবে এই রিজার্ভ যদি কোনো কাজে না লাগে সেটাকে খুব একটা ভালো বলা যাবে না। বরং রিজার্ভ যত বাড়বে ডলারের দাম তত নিম্নমুখী হবে। এতে রপ্তানিকারকরাও নিরুৎসাহ হবেন। বিনিয়োগ স্থবির অর্থনীতিতে শুধু রিজার্ভ বাড়িয়ে তেমন লাভ নেই।

মূলত রপ্তানি ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ চাঙ্গা থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। কিন্তু আমদানি ব্যয় কমাও রিজার্ভ বাড়ার অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। সে পরিস্থিতিতে যদি রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ও বিদেশি ঋণ এখনকার মতো না আসে তখন কিন্তু রিজার্ভে চাপ পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে রিজার্ভ ছয়বার রেকর্ড গড়েছে। গত ৩ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ২৪ জুন সেই রিজার্ভ আরো বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই ৩০ জুন রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। প্রায় এক মাস পর ২৮ জুলাই রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। এর তিন সপ্তাহ পর ১৮ আগস্ট রিজার্ভ ৩৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। এর দুই সপ্তাহ পর গতকাল রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়নের ঘর অতিক্রম করল।

করোনা মহামারিতে বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ায় জনশক্তিনির্ভর দেশগুলোর রেমিট্যান্স আয় ব্যাপকভাবে কমেছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতন হবে রেমিট্যান্সে। ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২০ শতাংশ কমে হবে ৪৪৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু দক্ষিণ এশিয়ায়ই রেমিট্যান্স প্রবাহ কমবে ২২ শতাংশ। কিন্তু সরকারের নীতি সহায়তার ফলে করোনার মাঝেও রেমিট্যান্সে দারুণ সাফল্য অর্জন করল বাংলাদেশ।

গত বছরের ১ জুলাই থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রণোদনা দেওয়ার ফলে ২০১৯-২০ অর্থবছরের শুরু থেকে প্রতি মাসেই রেমিট্যান্স বাড়তে থাকে। তবে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির প্রভাবে গত অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিলে রেমিট্যান্সের গতি নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। রোজার ঈদের মাস মে থেকে আবার ঊর্ধ্বগতির ধারায় ফেরে রেমিট্যান্স এবং কোরবানির ঈদের পরও এই ঊর্ধ্বগতির ধারা বজায় রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্যঃসমাপ্ত আগস্ট মাসে ১৯৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত বছরের পুরো আগস্ট মাসে ১৪৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। এ ছাড়া অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই এক মাসে এত বেশি রেমিট্যান্স আসেনি। এর আগে এক মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল গত জুনে, ১৮৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এই হিসাবে চলতি বছরের অগাস্টে আসা ১৯৬ কোটি ডলার একক মাসের হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। এ ছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট এক হাজার ৮২০ কোটি ৩০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ওই অঙ্ক ছিল আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ১০.৮৭ শতাংশ বেশি।

করোনা মহামারির ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার জনশক্তি রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য উপসাগরীয় দেশগুলো অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। এ অবস্থায় নিজেদের নাগরিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দেশগুলো প্রবাসীদের চাকরিচ্যুত করে নিজ নিজ দেশে পাঠাতে থাকে। বিশেষ করে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার—এই দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী নিজ দেশে ফিরতে বাধ্য হন। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যায় ব্যাপকভাবে।

আরো পড়ুন:- দেশের যেসব অঞ্চলে আজ ঝড়বৃষ্টির আভাস

বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে রেমিট্যান্স। বিশ্বের ৬৬ দেশে জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি আসে প্রবাসীদের আয় থেকে। নেপালের জিডিপির প্রায় ২৮ শতাংশ আসে রেমিট্যান্স থেকে এবং পাকিস্তানের জিডিপির ৮ শতাংশ আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় রিজার্ভে টান পড়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর। জুলাই মাসে শ্রীলঙ্কা রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার কাছ থেকে মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যমে ৫০০ মিলিয়ন ডলার নিলে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে হয় ৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। জুলাই মাসে নেপালের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ১০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। জুন মাস শেষে মালদ্বীপের রিজার্ভ দাঁড়ায় ১৫২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার এবং ভুটানের রিজার্ভ দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার।

আরপি/ এএইচ

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

<