বিশ্ব ঐতিহ্যের ষাট গম্বুজ মসজিদ

বিশ্ব ঐতিহ্যের ষাট গম্বুজ মসজিদ July 10, 2017 0 comments

সরদার জাহিদুল কবীর: বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ। ১৫ শতকের প্রথমার্ধে ইসলামধর্মীয় সাধক হযরত খাজা খানজাহান আলী (রঃ) কর্তৃক নির্মিত, বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের সর্ববৃহৎ মসজিদ এটি।

s4সূত্রমতে ১৫ শতকের প্রথমদিকে খানজাহান আলী (রঃ) দিল্লীর সম্রাট সম্ভবত সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-৫৯) আমলে উচ্চপদস্ত রাজকর্মচারী ছিলেন। ইসলাম প্রচার এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্যে তিনি ৬০ হাজার সৈন্যসহ পূর্ববাংলার যশোর অঞ্চলের বারাকপুরে আসেন। এখান থেকে যোগাযোগের জন্যে রাস্তা নির্মাণ, পানীয় পানির জন্যে দিঘী খনন এবং ইসলাম প্রচারের জন্যে মসজিদ নির্মাণ করতে করতে বাগেরহাটের দিকে অগ্রসর হন।যশোর থেকে খুলনা অতিক্রম করে ৭২ মাইল রাস্তা নির্মাণ করে বাগেরহাটে পৌছান এবং সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে খলিফাবাদ রাজ্য গড়ে তোলেন।

s2১৪৩৩ থেকে ১৪৫৯ সালে তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে তিনি বাগেরহাট শহরের গোড়াপত্তন করেন। শহর এবং শহরের সন্নিকটে খনন করেন দিঘী। গড়ে তোলেন একাধীক মসজিদ। বাগেরহাট শহর থেকে ৩ কি.মি. পশ্চিমে, বাগেরহাট-খুলনা মহাসড়কের পাশে গড়ে তোলেন ষাট গম্বুজ মসজিদ। এ মসজিদের গম্বুজ সংখ্যা ৭৭টি, চারপাশের কর্ণারে অপেক্ষাকৃত উচু আরো চারটি গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের পিলারের সংখ্যা ৬০টি। ‘পিলার’ শব্দটি ফারসিতে ‘গুম্বাত’এবং উর্দুতে ‘গম্বুজ’ হওয়ায়, পিলারের সংখ্যা থেকে নামকৃত মসজিদটি কালক্রমে গম্বুজের নামে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’ নাম ধারণ করেছে।

 s6মসজিদটি প্রায় পৌঁনে ৬শ’ বছরের পূরাতন হলেও ইট, পাথর এবং নির্মাণ শৈলীতে রয়েছে নান্দনিকতার ছাপ।মসজিদটি বহু বছর ধরে বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল। পাথরগুলো আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। তুঘলকি ও জৌনপুরী নির্মাণশৈলী সুস্পষ্ট ভাবে ফুটে রয়েছে এর অবয়বে।মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো প্রায় ৮•৫ ফুট পুরু।

s3মসজিদটির পূর্ব দেয়ালে ১১টি বিরাট আকারের খিলানযুক্ত দরজা আছে। মাঝের দরজাটি অন্যগুলোর চেয়ে বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে ৭টি করে দরজা। মসজিদের ৪ কোণে ৪টি মিনার আছে। এগুলোর নকশা গোলাকার এবং এরা উপরের দিকে সরু হয়ে গেছে। এদের কার্ণিশের কাছে বলয়াকার ব্যান্ড ও চূঁড়ায় গোলাকার গম্বুজ আছে। মিনারগুলোর উচ্চতা, ছাদের কার্নিশের চেয়ে বেশি। সামনের দুটি মিনারে প্যাঁচানো সিঁড়ি আছে এবং এখান থেকে আজান দেবার ব্যবস্থা ছিল। এদের একটির নাম রওশন কোঠা, অপরটির নাম আন্ধার কোঠা। মসজিদের ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ উত্তর থেকে দক্ষিণে ৬ সারিতে অবস্থিত এবং প্রত্যেক সারিতে ১০টি করে স্তম্ভ আছে। প্রতিটি স্তম্ভই পাথর কেটে বানানো, শুধু ৫টি স্তম্ভ বাইরে থেকে ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এই ৬০টি স্তম্ভ ও চারপাশের দেয়ালের ওপর তৈরি করা হয়েছে গম্বুজ।

s5মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মিহরাব আছে। মাঝের মিহরাবটি আকারে বড় এবং কারুকার্যমন্ডিত। এ মিহরাবের দক্ষিণে ৫টি ও উত্তরে ৪টি মিহরাব আছে। শুধু মাঝের মিহরাবের ঠিক পরের জায়গাটিতে উত্তর পাশে যেখানে ১টি মিহরাব থাকার কথা সেখানে আছে ১টি ছোট দরজা। কারো কারো মতে, খানজাহান এই মসজিদটিকে নামাজের কাজ ছাড়াও দরবার ঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন, আর এই দরজাটি ছিল দরবার ঘরের প্রবেশ পথ। আবার কেউ কেউ বলেন, মসজিদটি মাদরাসা হিসেবেও ব্যবহৃত হত।ইমাম সাহেবের বসার জায়গা হিসেবে রয়েছে মিম্বার।

s7মসজিদের পাশে রয়েছে ঘোড়াদিঘী।বায়েতুল মোকাররম জামে মসজিদ নির্মাণের পূর্বে ষাট গম্বুজ মসজিদ ছিল বাংলাদেশের বৃহত্তম মসজিদ।ষাট গম্বুজ মসজিদসহ, ঠাকুরদিঘী বা দরগাদিঘীর পাড়ে নির্মিত হযরত খাজা খানজাহান আলী (রঃ)-এর মাজার, অন্যান্য মসজিদ, মাজার, দিঘী, বৌদ্ধমূর্তি এবং প্রাচীন সভ্যতার জন্যে ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে এ অঞ্চলকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। আজো বাগেরহাট শহরের ঈদের বড় জামাত হয় এখানে।

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

Your data will be safe!Your e-mail address will not be published. Also other data will not be shared with third person.