বটবৃক্ষের সালতামামি: পার্ট-১১,১২

বটবৃক্ষের সালতামামি: পার্ট-১১,১২ নভেম্বর ৩০, ২০১৭ ০ comments

-প্রকৌশলী এম. এ. মান্নান-

:একাদশ অধ্যায়:
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দুই বছর
প্র্রথম সেমেস্টারের ফলাফল আসন্ন, মেকানিক্স ছাড়া অন্য সকল বিষয়ে খুবই ভালো পরীক্ষা হলো, প্রথম চল্লিশের ভিতরে প্লেস থাকতে পারে, কিন্তু মেকানিক্স পরীক্ষা নিয়ে স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। মেকানিক্স বিষয়টি, মেকানিকাল বিভাগের বিষয়, আমি ভর্তি পরীক্ষার ভাইভা বোর্ডে ভবিষ্যতে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ব বলে জবাব দিয়েছিলাম, সেই মতো ভাইভা বোর্ডের সদস্যরাও মেকানিকাল বিভাগের যত প্রশ্ন করেছিলো, যথাযথ উত্তর দিতে পেরেছিলাম। এখন কেন জানি মেকানিকাল বিভাগ নিয়ে খটকা লাগছে, যদিও ফারুক ভাইয়ের দুই বন্ধু আমিন ভাই ও অসীমদা উভয়েই মেকানিকাল বিভাগের ছাত্র, তারাই আমাকে মেকানিকাল পড়ার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিলো। কিন্তু এখন দেখি মেকানিকাল ড্রয়িং ও মেকানিক্স বিষয়টি আমার কাছে ভালো ঠেকছে না, যাহোক পরবর্তী সিন্ধান্ত ভবিষতের হাতেই ছেড়ে দিলাম। ইতিমধ্যে প্রথম সেমেস্টারের পরীক্ষার ফলাফল বের হয়েছে, আমার পজিশন চল্লিশতম, তবে প্লেস একচল্লিশ, কারন দুজন উনচল্লিশতম পজিশনে ছিলো। ফলে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কতৃক প্রদত্ত, প্রথম ৪০জন ছাত্রের জন্য দেওয়া মেরিট স্কলারসিপ তালিকা হতে বাদ পড়লাম, মাত্র মুল্যবান এক নম্বরের জন্য । আমার জীবনটি এরকমই, অতীতেও দেখেছি সবগুলো সুবর্ন সুযোগ কানের কাছে দিয়ে চলে যায়, মেট্রিক পরীক্ষায় অঙ্কে প্রথম হয়ে পুরস্কার পাওয়ার সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত হলাম, আই. এস .সি তে ৪৯তম হয়ে, কোন রকমে ফাস্ট ডিভিশন পেলাম, এবারও ফাস্ট সেমেস্টারের পরীক্ষায় ১ নম্বর মার্কের জন্য, মেরিট স্কীমের আর্থিক সুবিধা পাওয়া হতে বাদ পড়লাম, দুর্ভাগ্য যেনো আমার পিছু ছাড়ছে না।
ইতিমধ্যে ঢাকায় আসার পর, আমার পড়াশুনার খরচ চালাতে, বাবা রীতিমত হিমসিম খাচ্ছেন, পাবনা কলেজে ৫৫ টাকায় মাস চলে যেত, কিন্তু ঢাকার খরচ বেশি, যেমন হোস্টেলের মাসিক খাবার খরচ ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন ২৪ টাকা, তাছাড়া নাস্তা ও যাতায়তের খরচতো আছেই , মোটের উপর ৮০ থেকে ১০০ টাকা না হলে মাস চলে না। বাড়ি থেকে প্রথমত বাবা ৭০ টাকা করে পাঠাতেন, কিন্তু আমার ৭০ টাকায় মাস চলতো না, কোন রকমে সকালে ঘরে রুটি মাখন এনে চিনি দিয়ে নাস্তা করেও টাকার সংকুলন হচ্ছিল না । ক্যান্টিনে নাস্তা করলেতো কথায় নেই, খরচ অনেক বেড়ে যেত, কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আশা করছিলাম মেরিট স্কলারসিপ পাব. মাসিক খরচের একটা সুরহা হবে, কিন্তু এখন সে গুড়ে, বালি । মনটা খারাপ হয়ে গেল, কি করে যে ৪ টা বছর কাটাবো ভেবে অস্থির হয়ে পড়লাম। মা আমাকে বলেননি তবু জানতে পারলাম যে আমার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার খরচ চালানোর জন্য গত ছয়মাসে মায়ের দুই একটি গহনা ইতিমধ্যেই বিক্রি করতে হয়েছে। খুবই অসহায় ও অস্থিরতা মধ্যে দিন কাটতে লাগলাম, সরকারের ডি.পি. আই থেকে ট্যালন্টেপুল স্কলারসিপের নাম ঘোষনা এখন পর্যন্তু হলো না, দুর্ভাগ্য যখন আমার পিছে লেগে আছে, তখন ভরসা পাচ্ছিলাম না যে ট্যালেন্টপুল স্কলারসিপ পাব, খুব কাছে থেকে যখন মেরিট স্কলারসিপ হাতছাড়া হয়ে গেলো, তখন আমার অবস্থা ডুবান্ত টাইটানিক এর মতো । নানা ভাবে, নানা জায়গায়, যেমন ডিস্টিক বোর্ড , বিভিন্ন অনুদান সংস্থাতে আর্থিক সহায়তার জন্য একটার পর একটা দরখাস্ত করে যেতে লাগলাম, বড় খালাও খালুর পরিচিত বিভিন্ন ধন্যাঢ্য ব্যক্তির কাছে আমার জন্য অনুদান পাওয়ার চেস্টা করে যাচ্ছিলেন । অবশেষে দ্বিতীয় সেমেস্টারের মাঝামাঝি, চট্টগ্রামের এক ধন্যাঢ্য ইসমাইলিয়া ব্যবসায়ী জনাব শাকুর সাহেব মাসিক ১৫টাকা হিসাবে ১ বছরের জন্য আর্থিক সাহায্য দিতে রাজি হলেন। আমার আর্থিক অনটনের মরুভুমিতে ১ বিন্দু পানির মতো সুরহা হলো । অবশেষে সুসময় এসে গেল, ১৯৬৩ সালের এপ্রিল মাসের দিকে ডি.পি .আইয়ের ট্যালেন্টপুলের স্কলারসিপের নাম ঘোষনা করা হলো। করুনাময়ের অশেষ রহমতে আমার নাম প্রথম গ্রেড স্কলারসিপের তালিকায় উঠে এলো, মাসিক ৬৫ টাকা করে বৃত্তি ও বছরে ২৫০ টাকার বইপত্র কেনার জন্য অনুদান, মোট ৪ বছরের জন্য এই স্কলারসিপ চালু থাকবে। কি যে খুশি লাগলো খবরটা পেয়ে, যেন আকাশের চাঁদ আমার হাতে এসে পড়ল ।
স্কলারসিপের ঘোষনায় মনে প্রশান্তি এলো, আশায় আশায় দিন গুনতে লাগলাম, কবে টাকা পাব,সরকারি টাকা, ফরমালিটি করতে অনেক সময় চলে যায়, যাহোক দ্বিতীয় সেমেস্টারের ফাইনাল পরীক্ষার আগে, এরিয়ার সহ অনেকগুলো টাকা একসাথে হাতে পেলাম, বাবাকে জানিয়ে দিলাম যে এখন কয়েকমাস টাকা না পাঠানের জন্য, ইতিমধ্যে বাবার বেশ কিছু দেনা হয়ে গিয়েছিলো, সেগুলো পরিশোধ করতে বলে দিলাম । আমার আর্থিক সংকটের কারনে পড়াশুনা একটু ঘাটতি পড়েছিলো, দ্বিতীয় সেমেস্টারের বিষয় ফিজিক্স, অরগেনিক কেমিস্ট্রি, অঙ্ক, ইকনোমিক্স, বেসিক ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল বিভাগের স্ট্রেংথ অব ম্যাটারিয়ালস, হাইড্রলিকস, মেকানিকাল বিভাগের, কাইনেমেটিক্স ইত্যাদি, থিওরেটিকাল বিষয়, তাছাড়া সেশনাল বিষয় ছিলো সিভিল ড্রয়িং ইলেকট্রিকাল ওয়্যাররিং ল্যাব, মেশিনসপ, টিন স্মিত সপ ইত্যাদি । সববিষয়ে মোটামুটি চালিয়ে যাচ্ছিলাম, সিভিলের বিষয়গুলি ও মেকানিকালের কাইনেমেটিক্স ভালোই লাগতে লাগল । দেখতে দেখতে প্রিলিমিনারি বি. এস. সি ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষা এসে গেলো, ফিজিক্স,কেমিস্ট্র অঙ্কের সারা বছরের কোর্স, আর বিভাগীয় বিষয়গুলির দ্বিতীয় সেমেস্টার কোর্স, হিউমেনিটিস বিভাগের দ্বিতীয় সেমেস্টারের কোর্স নিয়ে, প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল পরীক্ষা । শুধু প্রয়োজনিয় মার্ক পেয়ে পাস করতে হবে, কোন ক্লাস দেওয়া হবে না এবং তৃতীয় সেমেস্টারে উঠা যাবে । দ্বিতীয় সেমেস্টারের, ফাস্ট টারমিনাল ও সেকেন্ড টারমিনালের কোন মার্ক যোগ হবে না, ফাইনাল পরীক্ষার মার্কই উপরের সেমেস্টারের উঠার সোপান । প্রিলিমিনারি পরীক্ষায়, ২ বিষযে ফেল করলে, সমুহ বিপদ, অটোমেশন, চিরতরে প্রকৌশল শিক্ষার শেষ।
পুর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা তখন সুবিধার নয়, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ থাকায় কাযক্রম বন্ধ থাকলেও ভিতরে ভিতরে অস্থিরতার আগুন চেপে থেকে উশকে উঠছে, জেনারেল আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রাট বা মৌলিক গনতন্ত্র দেশে চালু থাকলেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছিলো না, ধুমিয়ে ধুমিয়ে তুষের আগুনেরর মতো আন্দোলনের আগুন বেড়েই চলছিল । পুর্ব পাকিস্তানে সব সময় যে কোন রাজনৈতিক আন্দোলনের শুরুতে থাকে ছাত্র সমাজ । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য কলেজে, ছাত্র আন্দোলন দানা বেধে উঠছে, হামিদুর রহমানের শিক্ষা কমিশনের রির্পোট, ৩ বছরের ডিগ্রী কোর্স ইতিমধ্যে জনপ্রিয়তা পায়নি । বিভিন্ন কলেজে ও ইউনিভার্সিটিগুলিতে, ছাত্র অসন্তোষ বেড়েই চলেছে, মিটিং, মিছিল, স্ট্রাইক থেমে থেমে বিভিন্ন স্থানে চলছে । আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরে শুনেছি, ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনে, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষের প্রায় ১২০ জনের উপরের ছাত্রদের বিশেষ ক্ষতি হয়েছিলো। ১৯৬২ সালের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার সময় ছাত্র অসন্তোষের কারনে, মিটিং, মিছিল, স্ট্রাইক চলতেই ছিলো, ঐ সময় ছাত্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পুর্ব পাকিস্তান সরকারের পুলিশি দমন নীতিতে ঐ ছাত্ররা এরেস্ট হয়ে জেলে যেতে হয়েছিলো । পরীক্ষার সময় নিরপরাধ, প্রকৌশল ছাত্ররা, পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রমিছিলে পুলিশের লাঠিপেটায় অনেক ছাত্র ,প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন হোস্টেলে আশ্রায় নিয়েছিলো, পুলিশের রোষ তখন প্রকৌশল ছাত্রদের উপর পড়ে এবং মেইন হোস্টেল ও নিউ হোস্টেলে ২য় সেমেস্টারের অনেক ছাত্র পুলিশি অত্যাচারের শিকার হয় এবং জেলে যেতে হয় । পরে অবশ্য তারা মুসলেকা দিয়ে, জেল থেকে বেরিয়ে আসে কিন্তু ২টা পরীক্ষায় অংশগ্রহন না করার জন্য, তাদের জীবনে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায় । প্রায় ১২০জনের মতো ছাত্র অটোমেসন পায় এবং তাদের স্কলারসিপ কাটা যায় ।
ডঃ আব্দুর রশিদ সাহেব তখন পুর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সলর, প্রচন্ড নীতিবাগিশ ও কঠোর প্রকৃতির ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন, উনার প্রশাসন ছিলো কঠোর থেকে কঠোরতর, যেমন সরল প্রকৃতির, তেমনি আইন ও নিয়ম মেনে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতেন । ছোটখাট দাড়িওয়ালা মানুষটি স্যুট কোট পরে জিন্নাহ ক্যাপ মাথায় দিয়ে অফিস করতেন, মাঝে মাঝে হঠাৎ করে কোন ক্লাসের পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে, পিছনের বেঞ্চে বসে, শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়া পর্যবেক্ষন করতেন । না জানতে পেরে, পেছনের বেঞ্চের কোন ছাত্র যদি কোন রকমের দুষ্টমি করতো বা গন্ডগোল করার চেস্টা করতো তবে তার আর রক্ষা ছিলো না। সরাসরি রাস্টিকেট বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার, এমন কঠোর প্রকৃতির না হলে, বিনা অপরাধে উনার বিশ্ববিদ্যলয়ের ১২০ জন ছাত্র অটোমেসন পায় এও কি হতে পারে, উনি কি পারতেন না ঐ ২দিনের পরীক্ষা বাতিল করে, পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা নিতে । কিন্তু উনার চারিত্রিক বৈশিষ্ঠের কারনে তিনি তা করেন নাই, তা না হলে ঐ ১২০ জন ছাত্রের জীবন থেকে ১টি বছর ঝরে পড়ত না ।
প্রথম সেমেস্টার পরীক্ষার পর, প্রায় ২০ দিনের মতো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিলো, এই স্বল্প সময়ের ছুটিতে আমি বাড়ি না যেয়ে, ছুটির সময়টা খালার বাসাতে কাটালাম। সেমেস্টার ফাইনাল হয়ে গেছে, তাই পড়াশুনার কোন চাপ নাই, সুতারং সময়টা অনেকটা হেসে খেলে কাটাতে পারলাম । এই সময় টা খালার বাসায় তখন বিকাল ব্যাডমিন্টন খেলা ছাড়াও দিনে বা রাতে আমরা লুডু বা তাস খেলতাম, তাস খেলা বলতে টুয়েনটি নাইন, ফকির ফকির, অথবা ব্রে খেলা । বড় খালা, বুড়ি খালা, মিনু বুবু , নিনা বুবু , ফারুক ভাই, পিলু, নার্গিস ইত্যাদি আমরা সবাই মেলে খেরতাম। ঐ সময় নতুন চিত্রনায়িকা কবরী আমাদের পাড়ায় ধানমন্ডিতে বাসা ভাড়া নিলেন, উনার স্বামী চিত্ত চৌধুরী একটু বয়স্ক, তবে জাদরেল পরিচালক, অল্প বয়সী নায়িকা পাড়ায় থাকতে নিনা বুবুর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেলো, নায়িকা মাঝে মাঝে আমাদের খেলার সাথী হতেন । সকালের নাস্তার পর থেকে দুপুরের খাওয়ার আগ পর্যন্ত এক নাগাড়ে আমাদের খেলা চলত, ইতিমধ্যে খালা, চিড়াভাজা মরিচ পেয়াজ দিয়ে মুড়ি মাখানো নাস্তা, আমাদের জন্য পাঠাতেন,,কোন কোন দিন নায়িকা কবরী খালার বাসায় লাঞ্চ করে যেতেন।এমনি ভাবে কিছুদিন পর আমি যখন হোস্টেলে চলে গেছি, হঠাৎ একদিন দেখি চিত্ত চৌধুরী ছোট ভাই, কররীর দেবর, যার সাথে আমার আলাপ ছিলো, তিনি আমার হোস্টেলে এসে হাজির । আমার কাছে বিস্তারিত ঘটনা বললেন যে, চিত্রনায়িকা কবরী, স্বামীর ঘর ছেড়ে, ছোট বাচ্চা অনিককে ছেড়ে, তিনদিন যাবৎ নিখোঁজ । দেবর সাহেব আমার কাছে জানতে চাইলো, আমি তার বউদির কোনো খবর জানি কিনা । মহা ফাঁপরে পড়লাম, কয়েকদিনের পরিচয় কয়েকদিন এক সাথে লুডু খেলেছি তার মানে এই নয় যে আমি তার পলায়নের বিস্তারিত বিবরন জানবো, যা হোক দেবর সাহেবকে বলে কয়ে বিদায় করলাম, কিন্তু আমার বন্ধু বান্ধাবরা এ নিয়ে রসালো আলোচনা শুরু করে দিলো ।
ছুটি থেকে হোস্টেলে ফিরে দেখি, আমাদের টিনসেডের পলাশী হোস্টেল সর্ম্পুন ভেঙ্গে ফেলা হযেছে, চারদিকে ফাকা ধু ধু প্রান্তর, তার কাটার বেড়া দিয়ে ঘেরা, নতুন ভবন নির্মানের ঠিকাদার বি. ডি .সি কাজকর্মে ব্যস্ত । আমাদের থাকার জন্য নির্ধারন করা হয়েছে, নিউ হোস্টেলের পশ্চিম ব্লকে। আবার নতুন করে ঘরের পজেশন নিতে হবে, নিউ হোস্টেলের সব ঘর তিন সিটের, দুই সিটের অল্প কয়েকটা আছে, আমার পুর্বের রুমমেটরা কেউ তখনও ঢাকায় এসে পৌছায়নি । সন্ধ্যার পর দেখলাম, ঘরের পজেশন নেওয়ার জন্য ছেলেরা লাইন দিয়ে দাড়িয়েছে, আমিও লাইন দিলাম কিন্তু বিপদে পড়লাম কাকে কাকে রুমমেট করবো, সমমনা না হলে রুমে একসাথে বাস করা মুশকিল। লাইন দাড়িয়ে সবাই আমার পরিচিত, আমার সহপাঠি কিন্তু বিভিন্ন সেকশনের, কাকে নিযে ঘর বাধব দিশা পাচ্চিলাম না । অনেকে ৩ জন করে জোট বেধে ফেলেছে, আমি কাউকেই মেনে নিতে পারছিলমা না, হঠাৎ করে সিন্ধান্ত, কোনো কিছু ঠিক করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সিলেটের ছেলে জামিলের সাথে ২ সিটের ঘর নিলাম । মনোঃপুত হলো না, তবুও করবার কিছু ছিলো না । দুই এক দিন পর মোজাম্মেল দেশ থেকে ফিরে এসে মহা ক্ষেপে গেলো আমার উপর, আমি কেন তাকে ছাড়া ঘর নিলাম, শেষ পর্যন্ত মোজাম্মেল চেস্টা তদবির করে, ঘর পরিবর্তন করে আমি মোজাম্মেল ও রওশনকে নিয়ে নতুন ঘরের পজেশন পেলাম, রুম নম্বর ২১১, নিউ হোস্টেল । দ্বিতীয় সেমেস্টারের বাকি সময়টা আমরা এই ঘরে কাটিয়েছি, একটু অসুবিধা হতো পশ্চিম ব্লক বলে, বেলা ৩ টার পরে জানলা দিয়ে প্রচুর রোদ আসত, যদিও কাচের জানলা রং দিয়ে ঢাকা ছিলো তবুও বেশ গরমে ভুগতে হতো আমাদের । তখনকার দিনে হোস্টেলে সিলিং ফ্যান চালু ছিলো না, আমাদের ঐ অবস্থাতে, প্রচন্ড গরমে থাকতে হয়েছে, পড়াশুনা করতে হয়েছে ।
সেমেস্টারের মাঝামাঝি এমনি সময় একটা ঘটনা ঘটল, থার্ড ইয়ার সিভিলের ছাত্র এই হোস্টেলের বাসিন্দা. রওশন বসন্তে আক্রান্ত হলো । তার জন্য নির্ধারিত ৩ সিটের ঘর থেকে, খালি থাকা রুম নম্বর ২২৪ তাকে স্থানান্তরিত করা হলো । প্রতিদিনেই ক্লাসে যাওয়ার সময় ও আসার সময় ঐ রুমে পাশের সিড়ি দিয়ে নেমে, আমাদের ক্লাসে যেতো হতো, একটু ভয় ভয় লাগতো, কিন্তুু মেনে নিতে হয়েছিলো । কিছুদিন পর দেখলাম, বসন্তের রোগী রওশনকে ২২৪ রুম থেকে সরিয়ে হোস্টেলের বাহিরে পশ্চিম দিকের লনে তাবু টাঙ্গিয়ে তাকে রাখা হয়েছে, হোস্টেলের বেয়ারা বাচ্চু মিয়া ও ইসমাইল তার দেখভাল করে, আমাদের ডাইনিং রুম থেকে তার তাবু দেখা যায় । একদিন দুপুরে টিফিন পিরিয়ডে খাওয়ার জন্য হোস্টেলে ফিরেছি, শুনি রওশন মারা গেছে, সারা হোস্টেলে উত্তেজনা, সবাই স্ত¡ব্ধ হয়ে গেছে। হঠাৎ করে এমনি ঘটনার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলো না, হোস্টেল সুপার জি. এম. খান স্যার, এসিস্টেন্ট সুপার, কেরানি সাহেব সবাই চিন্তিত মুখে কি করবে সিন্ধান্ত নিতে পারছে না । কিছুক্ষন পর ভাইসচান্সেলর,ডি .এস. ডব্লিউ এবং অন্যান্য সিনিয়র স্যারেরা এসে কি জানি সিন্ধান্ত নিলেন । ইতিমধ্যে সারা বিশ্ববিদ্যালেয়র ছাত্রদের ভিতর একটা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে, রাগে দুঃখে সবাই ফুঁসছে, এইভাবে অবহেলায়, বিনা চিকিৎসায় একজন ভবিষতের ইঞ্জিনিয়ারের কেন অপমৃত্যু হলো, কেন তাকে কোন হাসপাতালে নেওয়া হলো না । তার সহপাঠি, বন্ধুরা, ডুকরে ডুকরে কাঁদছে, বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষকে দুষছে। যাহোক সন্ধ্যার পর আজিমপুর গোরস্থানে তাকে দাফন করার ব্যবস্থা করা হলো, আমরা সবাই কবরস্থানে গেলাম । দাফন করার পর ছাত্রদের অনুভুতিকে আর মানানো গেলো না, সবাই মিছিল করে, শ্লোগান দিতে দিতে ভিসি স্যারের বাংলো ঘেরাও করলো, ভিসি স্যার গদি ছাড়ো, ছাত্রদের জন্য হাসঁপাতাল করো, রওশনের মৃত্যু বৃথা যেতে দিবো না ইত্যাদি নানান শ্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রকম্পিত হলো । আমরা ঘরে ফিরে আসলাম, কিছুই ভালো লাগছিলো না, ডাইনিং রুমে রাতে খেলাম না, এই ভাবে রাত কেটে গেলো । পরদিন অন্যমনস্কভাবে ভাবতে ভাবতে ক্যাম্পাসে গেলাম, দেখি স্থানে স্থানে ছাত্রদের জটলা, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে, ২৪ ঘন্টার মধ্যে হোস্টেল ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে হবে । আপাতত পড়াশুনা বন্ধ হলো, ছেলেরা যে যার মতো বাড়ি চলে যেতে লাগলো মোজাম্মেলও বাড়ির পথ ধরলো, আমি আবার খালার বাসায় চলে আসলাম ।
১৯৬৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস, সারা দেশের ছাত্র সমাজ আন্দোলনের পথ ধরেছে, কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ক্লাস হচ্ছে না, শুধু মিটিং, মিছিল নিয়েই সবাই ব্যস্ত, ইতিমধ্যে সরকার , ৩ বছরের ডিগ্রী কোর্স বাতিল করেছে, যারা ফোর্থ ইয়ারে পড়ত, তারা সবাই রাতারাতি একবছর আগেই গ্রাজুয়েট হয়ে গেছে, তবু ছাত্রসমাজকে মানানো দায় । একদিন ক্যাম্পাসে গিয়ে শুনি আজ ক্লাস হবে না, ছাত্র সংসদের নির্দেশে, মিছিল করে ঢাকা ইউনিভার্সিটি যেতে হবে, সহ-সভাপতি, ফজলে হোসেন সাহেব নেতৃত্বে দিচ্ছে, সাধারন সম্পাদক ,আনিস ভাই সবাইকে লাইনে দাড় করাচ্ছে, আমরা লাইন করে মিছিল করে ঢাকা ইউনিভার্সিটির অভিমুখে রওনা হলাম। সবাই শৃঙ্খলবদ্ধ, মুখে শ্লোগান, শিক্ষা কমিশনের রির্পোট বাতিল করো, পুরাতন র্কোস চালু করো, মার্শাল ল নিপাত যাক, গনতন্ত্র চালু করো, আইয়ুব শাহির পতন চাই, ছাত্র সমাজ এক হও । মেডিক্যাল কলেজ গেট পর্যন্ত গেলে, হঠাৎ পুলিশ মিছিলের উপর আক্রমন করলো, লাঠিপেঠা শুরু করলো, মিছিল বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লো, পিছন থেকে কয়েকজনকে এরেস্ট করা হলো, আমরা যারা সামনে ছিলাম দৌড়ে যেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আশ্রায় নিলাম । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন উত্তাল, ছাত্ররা রোষে ফেটে পড়ছে, ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়, ১৪৪ ধারা জারি করা হলো । আমতলায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতারা জ্বালাময়ী ভাষায় বক্তৃতা দিলো , বলা হলো আমরা ১৪৪ ধারা মানবো না, ৫জন, ৫জন করে দলে দলে আমরা পুরাতন এসেম্বলী হাউজের দিকে প্রতিবাদ জানাতে যাব । ৫জনের দল ,এক এক করে ১৫/ ২০টা দল বাহির হবার পর, আবার পুলিশি আক্রমন, গরম পানির গাড়ি নিয়ে দাবড়ানি, টিয়ার্স গ্যাস ছোড়া, কোনদিকে পালাবার পথ না পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠের দিকে ছুটলাম, সঙ্গে তখনও মোজাম্মেল । কোন রকমে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ পার হতে দু বার ময়লা পানির ড্রেনে ভিতরে দিয়ে যেতে হলো, গায়ে, হাতে, পায়ে, ড্রেনের মায়লা পানি লাগলো, কোন রকমে হামগুড়ি দিয়ে প্রাচীরের নিচ দিয়ে, ড্রেন পার হয়ে ,কোন রকমে কার্জন হলে পৌছলাম, সেখানে সাংবাদিকে সাংবাদিকে ভরে গেছে, কার্জন হল। মেয়েরা তাদের পরিধেয় ব্লাউজ তুলে পুলিশি নির্যাতনের চিহ্ন দেখাচ্ছে, আর সাংবাদিক তার মুর্হুমুহু ছবি তুলছে । অনেক কষ্টে, পরে চাংখারপুল হয়ে, বকশিবাজার হয়ে, রেললাইন ধরে হোস্টেল পৌছলাম। সারা গায়ে, ড্রেনের কাঁদা ও পানিতে ভরপুর, তবুও গর্ব হতে লাগলো যে ৬৩ এর ছাত্র আন্দালনের শরিক হতে পেরেছি।
পলাশী হোস্টেলে থাকা অবস্থায় আমাদের হল ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়ে যায়, প্রথম বর্ষে ২৫৫ জন ছাত্রের মধ্যে প্রায় ১৮০ জনেই হোস্টেলে থাকে, তার ভিতরে ১৫০ জনই পলাশী হোস্টেলে, বাকী ৩০ জনের মতো থাকে মেইন হোস্টেলে, সুতারং ১৫০ জনের প্রতিনিধি হিসাবে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়ে গেলো, আগেই বলেছি আমাদের হোস্টেলের ছাত্রদের নেতৃত্বে সব সময়, ঢাকা কলেজ, কুমিল্লা কলেজ এবং চট্টগ্রাম কলেজ প্রাধান্য ছিলো, নটেরডেম কলেজের ছাত্ররা বেশিরভাগ বাসায় থাকতো । ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সময় কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম এক হয়ে গেলো এবং মুল প্রতিদ্বন্দিতা হলো চট্টগ্রাম- কুমিল্লা গ্র“প ও ঢাকা সহ অন্যান্য মফস্বল ছাত্রদের নিয়ে এক গ্র“প। নানা রকম মিটিং সিটিং করে দেখা গেলা আমার রুমমেট মোজাম্মেল দাড়িয়েছে, সাধারন সম্পাদক পদে, কাশেম দাড়িয়েছে ,কমনরুম সম্পাদক পদে ও রওশনকে দাড় করানো হয়েছে সাহিত্য সম্পাদক পদে আমাকে দাড় করিয়েছে ডিবেট সম্পাদক পদে । আমি ছাত্র সংসদ, নির্বাচন, নেতাগিরি কিছুই বুঝি না, কিভাবে জানি ওরা পুরা প্যানেল হিসাবে দাড় করানোর সময়, আমার নামও ঢুকিয়ে দিয়েছে। তেমন সিরিয়াছ না হলেও মোটামুটি প্রতিদ্বন্দিতা হলো, আমাদের প্যানেলের সবাই জয়ী হলো, লক্ষ্য করার বিষয় যে, আমাদের ঘর থেকে ৪ জন সম্পাদক, আমাদের প্যানেলে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হয়েছিলো বর্তমান বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব আবুল হায়াত । ছাত্র সংসদের এমন কোন দায়িত্ব বা কাজ ছিলো না, শুধু মাত্র ছাত্রদের সুবিধা অসুবিধা, দাবিদাওয়া, এই সব দেখভাল করা, আর কমনরুম সম্পাদক দেখতো ক্যারম বোর্ডের জন্য যথেষ্ঠ পাউডার আছে কিনা, টেবিল টেনিসের ব্যাট, বল আছে কিনা, তাসের জন্য বোনাস ব্র্যান্ডের তাস আছে কিনা। সাহিত্য সম্পাদকের কাজ ছিলো কমনরুমে, সবকটি জাতীয় দৈনিক ও কিছু মাসিক সাময়িক সরাবরাহ করা । সাংস্কৃতিক সম্পাদকের কাজ ছিলো, বাৎসরিক একটা নাটক অথবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা । আর আমার ডিবেট সম্পাদকের কাজ ছিলো, বছরে কয়েকবার ডিবেট প্রতিযোগীতা আহবান করা আর সর্বশেষে বার্ষিক ডিবেট প্রতিযোগিতার আয়োজন করা ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রকৌশল ছাত্রদের এমন পড়াশুনার চাপ থাকে যে, তার বাহিরে কোন কিছু করার সময় থাকে না, বিকাল ৫ টার সময় ক্লাস থেকে এসে, ক্লান্ত ছাত্ররা হয়তো কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, নাস্তা খেয়ে, সন্ধ্যার সময় কমনরুমে উকিঝুকি মারতো, সেখানে মনোরঞ্জনের জন্য ক্যারাম, টেবিল টেনিস ও তাস খেলা ছাড়া, একটা রেডিও ও ছিলো, অনেকে সেখানে রেডিওতে রেডিও সিলেনের গান শুনে সময় কাটাতো, উল্লেখ করার বিষয় যে তখনো ঢাকায় টেলিভিশনের প্রচলন হয় নাই । যা হোক পলাশী হোস্টেল ভেঙ্গে ফেলার পর, নিউ হোস্টেল স্থানান্তরিত হয়ে, ফাস্ট সেমেস্টার ও প্রিলিমিনারী ইঞ্জিরিয়ারিং পরীক্ষার পাঠ শেষ করলাম, তখনও বিশ্ববিদ্যালয় খোল, কয়েকদিনের ভিতরে ফল ঘোষনা করা হবে ও তারপর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হবে । তড়িঘড়ি করে কমনরুম সম্পাদক, ইনডোর গেম প্রতিযোগিতা আয়োজন করলেন , সাহিত্য সম্পাদক, সাহিত্য প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করলেন, আমি আর বসে থাকি কি করে ,একটি বার্ষিক ডিবেট প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ফেললাম, বিষয় “দেশ গড়ার জন্য প্রকৌশল শিক্ষা অপরিহার্য” । যথাসময়ে সব প্রতিযোগিতা শেষ হলো, বিচারক মন্ডলী ছিলেন হোস্টেলের সুপার স্যার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু প্রবীন শিক্ষক। শেষমেশ পুরস্কার বিতরনীর অনুষ্ঠান করা হলো, প্রধান অতিথি করা হলো বাংলা সাহিত্যর দিকপাল, অসাধারন পন্ডিত, বিখ্যাত মনিষী, ডক্টর মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ সাহেব কে। যথাসময়ে এই প্রখ্যাত মনিষীর আগমন হলো হোস্টেল কমনরুমের অস্থায়ী স্টেজে, তার সেই চিরপরিচিত পায়জামা, লম্বা কোর্তা,গায়ে কোট, মাথায় কালো টার্কিস টুপি, তাকে আমন্ত্রন জানাতে পেরে আমাদের হল সংসদ গর্বিত । কিছু উপস্থাপনা, কিছু বক্তৃতা মালা, কিছু প্রর্দশনীর পর পুরস্কার বিতরনীর পালা শুরু হলো, আমার জন্য এক মহা আনন্দ, অবিস্মরনীয় মুর্হুত, বাংলা আবৃত্তিতে প্রথম, ইংরেজি আবৃত্তিতে দ্বিতীয়, নির্বাচিত বক্তৃতায় প্রথম, অনবরত গল্প বলায় প্রথম, এমন কি ডিবেট প্রতিযোগিতায় ও প্রথম। এও কি সম্ভব, ইহা কি অলীক কল্পনা বা স্বপ্ন, আমার মতো মুখচোরা, লাজুক, আনস্মাট, এতোগুলো প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া, আমার নিজেরই সন্ধেহ হতে লাগলো। সম্পাদক আমরা থাকলেও সম্পুর্ন প্রতিযোগিতা উপস্থাপনা, পরিচালনা ও বিচারকের ভুমিকায় ছিলেন সম্পুর্ন নিরপেক্ষ, অপরিচিত ও প্রবীন শিক্ষক মন্ডলী । পুরস্কার প্রাপ্ত একগাদা বই ঘরে আসল, যার সবগুলি নেওয়া হয়েছিলো বিশ্বনন্দিত পন্ডিত ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর হাত থেকে, এ স্মৃতি মনে হলে এখনও পুলকিত হই, ভাবি, সত্যিই কি আমার এমন প্রতিভা ছিলো।
যা হোক সপ্তাহখানেক এর মধ্যে পরীক্ষার ফল বাহির হলো, মার্ক জানা যায় নাই, কোন ক্লাস দেয় নাই, শুধুমাত্র প্রিলিমিনারী পরীক্ষা পাস আর তৃতীয় সেমেস্টারের প্রমোশন, আমার প্রকৌশল শিক্ষার এক বছরের সমাপ্তি। মফস্বল থেকে আগত একজন সাধারন, সরল প্রকৃতির ছেলের রাজধানীতে একটা বছর কাটানোর পর, ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সিন্ধান্ত নিলাম। আমার চামড়ার সুটকেস ভর্তি শুধু বই আর বই, পরিধেয় জামা কাপড় বলতে কয়েক সেট পায়জামা জামা, আর ঢাকা আসার সময় মিয়া ভাইয়ের নাটক করার সময় ব্যবহৃত, পরিত্যক্ত, একটি পুরাতন প্যান্ট। তখন আমি পুরাপুরি প্যান্ট পরা শুরু করি নাই, অল্টার করা একটি মাত্র প্যান্ট পরে বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে যাই,তখনো নিজের জন্য কোন নতুন প্যান্ট বানানো হয়ে উঠেনি । একবার আমার রুমমেট কাশেম, নতুন একটা প্যান্ট বানালো, ঐদিন শুক্রবার বিশেষ কোন জায়গায় প্রয়োজন হওয়ায়, ওর প্যান্টটি চেয়ে নিয়ে পরে গেলাম, ফিরে এসে দেখি কাশেম মুখ কালো করে বসে আছে, শুধু বলল রুমমেট প্যান্টটা তাড়াতাড়ি দেন, আমি বের হবো। সম্পুর্ন ঘটনাটি আমার কাছে খুবেই লজ্জাষ্কর লাগলো, অপরাধী মনে হলো, কি দরকার ছিলো পরের প্যান্ট চেয়ে পরার । যা হোক পায়জামা জামা পরেই একটা বছর কেটে গেল, শীতের সময় ব্যবহারের জন্য আমার কোন ভালো শীতের পোশাক ছিলো না, ফারুক ভাইয়ের একটা পুলহাতা বুকখোলা সোয়েটার আমাকে ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলো, ওটা পরেই ১ বছর কাটিয়ে দিলাম।
বাড়ি যাওয়ার দিনক্ষন ঠিক, কি জানি কি ভেবে ঠিক করলাম, এবার স্টীমারে গোয়ালন্দ হয়ে না যেয়ে, বাহাদুরাবাদ হয়ে ট্রেনে যাব, তখনকার দিনে ছাত্রদের জন্য, ৪জনের গ্র“পে কনসেসনে শতকরা ২৫ ভাগ ভাড়ায় বিশেষ আবেদনে টিকিট পাওয়া যেত। আমার পাবনার বন্ধুরা আগে ভাগেই এই ব্যবস্থা করে রেখেছিলো, আমি ওদের সাথে সাথী হলাম, মোখলেছ, শফি ইমাম, সুলতান ও আমি একসঙ্গে টিকিট কাটলাম, ওরা যাবে ঈশ্বরদি পর্যন্ত আর আমি চুয়াডাঙ্গা। যথাদিনে আমি ধানমন্ডি বড় খালার বাসা থেকে একটা ছোট বেডিং ও আমার বিখ্যাত সুটকেসটি নিয়ে ট্রেন ছাড়ার অনেক আগে ফুলাবাড়িয়া স্টেশনে পৌঁছলাম। কুলির মাথায় মাল দিয়ে একটা নিদিস্ট স্থানে কুলি মাল রেখে আমাক দাড়িয়ে রেখে চলে গেলো, ট্রেন তখন প্লাটফরমে আসে নাই, এদিকে আমার বন্ধুদেরও কোন খোঁজ নাই। অবশেষে বন্ধুদের পাত্তা পেলাম, ওরা বাহাদুরবাদে বগি যেখানে থামবে, সেই বরাবর দাড়িয়ে আছে, যেহেতু আমরা একসঙ্গে যাব, সেজন্য আমাদের একই বগীতে উঠতে হবে । সাত পাঁচ না ভেবে ওদের অবস্থান দেখে আসার জন্য, আমার মালমাল অরক্ষিত রেখেই, ওদের সঙ্গে চললাম। ইতিমধ্যে হুস হুস করে ট্রেন প্লাটফরমে ঢুকলো, আমি তাড়াতাড়ি নিজের মালমালের কাছে আসতে যেয়ে বিপরীতমুখী স্রোতের মতো ভীষন বাধার মধ্যে পড়লাম । অকুস্থলে পৌছে দেখি, আমার মালমাল নাই শুধু বেডিংটা পড়ে আছে সুটকেসটি নাই, কাছাকাছি ব্যস্ত সমস্ত যাত্রীদের কাছে জিজ্ঞেস করেও কোন সদউত্তর পেলাম না, ভীষন বিপদে পড়ে গেলাম, ট্রেন বেশিক্ষন স্টেশন থাকবে না । ছুটলাম আমার বন্ধুদের কম্পার্টমেন্টে, ওদেরকে বিপদের কথা বললাম, ওরা সহানুভুতি দেখালো, কেই আমার সাহায্য এগিয়ে আসলো না, সবাই যার যার সিট ও মালমাল নিযে ব্যস্ত । আমি কর্ম্পাটমেন্টে, কর্ম্পাটমেন্টে খোজাখুজি করলাম, যদি কুলি কোন কর্ম্পাটমেন্টে তুলে দিয়ে থাকে, কোন হদিস পেলাম না । কি বোকা ছিলাম আমি, কুলির মনে যদি ভালো ইচ্ছায় থাকবে, তবে সুটকেস শুধু নিবে কেন, বেডিং সহ নিতে পারতো, আসলে আমার সুটকেসটি কুলি অথবা অন্য যে কেউ চুরি করেছে। কিছুক্ষন পর ট্রেন ছেড়ে দিলো, আমার চোখের সামনে থেকে আমার বাড়ি যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাকে নিষপেশিত করে ট্রেন চলে গেলো, আমি অসহায় এর মতো চেয়ে থাকলাম । এখন আর আমার কি করার আছে, মনের দুঃখে চোখ ফেটে পানি আসতে চাইলো, তবুও কোন কিছু স্থির করতে না পেরে, উদভ্রান্তের মতো একটা রিকসা নিয়ে রওনা হলাম ।
রাত প্রায় ১২টার দিকে খালার বাসায় পৌঁছলাম, নিরব নিস্তব্ধ, অন্ধকারের ঢাকার রাজপথ পেরিয়ে। খালাদেরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বিস্তারিত সব জানালাম, খালা, ফারুক ভাই, নিনা বুবু আমার বোকামির জন্য, আমার অবিবেচক সিন্ধান্তের জন্য, বকাবকি করতে লাগলো, আর আমার চোখ বেয়ে টপটপ করে, পানি পড়তে লাগলো । নিজের জন্য অনুশোচনা হলো, একাকি পথ চলায় নিজের অপারগতার জন্য, নিজের প্রতি ধিক্কার জানাতে ইচ্ছা করলো, দুঃখ হলো আমার পুরস্কার প্রাপ্ত বইগুলো জন্য, আর অনেক কষ্টে রোজগার করা টাকায় কেনা সুটকেসটির জন্য । সারারাত ঘুম হলো না দুঃশ্চিন্তায়, লজ্জায় । পরদিন সকাল উঠেই, বড় খালা আমাকে নিয়ে গেলো মেজে খালার ধানমন্ডির ১ নম্বর রোডের বাসায়, ওখানে মেজে খালুকে বিস্তারিত বলা হলো, তিনি ছিলেন জনাব এম.আর.হক, ই.পি. সি.এস, ঢাকার ডেপুটি ম্যাজিস্টেট। বিরাট লম্বা, চওড়া, দেহের অধিকারী, দারুন রাশভারি, উনাকে দেখলে আমার ভয় পেত । তারপর মরার উপর খাঁড়ার ঘার মতো, এই নাটকীয় কাহিনী শুনে উনি আমাকে খুব গালমন্দ করলেন, বললেন উনার অফিসে যাওয়ার সময়, আমাকে সঙ্গে নিয়ে ফুলাবাড়িয়া স্টেশনে যাবেন । বেলা ১০টা নাগাদ, মেজে খালুর সঙ্গে ফুলবাড়িয়ার জি .আর. পি থানায় পৌঁছলাম, ম্যাজিস্টেট হিসাবে থানার লোকজন উনাকে যথেষ্ঠ সমিহ করলো এবং আস্বস্ত করলো যে, বেলা ১২ দিকে সমস্ত কুলিদের লাইন দেওয়ানো হবে, তার ভিতর থেকে আমার কুলিকে সনাক্ত করতে হবে, কিন্তু আমি জানি, সেটা আমি কোনদিনেই পারবো না । খালু অফিস চলে গেলেন বেলা ১টার সময় কুলিদের লাইন দেওয়া হলো, অফিসার আমাকে নিয়ে লাইনের কুলিদের ভিতর থেকে আমাকে সনাক্ত করতে বললেন, সমস্ত ব্যাপারটা একটা হটকারী মনে হলো, কুলিরা ধুতি পরা, লাল হাফ হাতা জামা গায়ে, মাথায় গামছা বাধা, হাতে কবজির উপর পিতলের চাকতির উপরে লেখা নাম্বর বাধা । অফিসার আমাকে জিজ্ঞাসা করলো কুলির নম্বর নিয়েছিলাম কিনা, না বলাতে তিনিও অসন্তোস প্রকাশ করলেন এবং আমাকে কুলি চিনিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। এ এক বিব্রতকর অবস্থা, সকল কুলিরা মুখ নিচু করে দাড়িয়ে আছে, কারো বড় বড় গোঁপ, কারো মাথায় ছোট করে ছাটা চুল, কেউ পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে দাড়ানো, কারো মুখে বসন্তের দাগ কুৎসিত, কারো কি¤ু¢তকিমাকার চেহারা। ৩০০ জন রেজির্স্টাড কুলির ভিতরে ১৪০ জনের মতো উপস্থিত হয়েছে, আমি কাউকে সনাক্ত করতে পারলাম না। আমি যে এই অবস্থায় পড়ব, তা তো আগে থেকে ভাবিনি ও আমি কুলি চিনে রাখিনি, আমি কুলির নাম্বারোও চেয়ে নেয়নি । মনে হতো লাগলো সব দোষে দোষী আমি, কেন বেচারা কুলিদেরকে অহেতুক বিড়ম্বনায় ফেলা, অফিসার নিরাশ হলো, যে ম্যাজিস্টেট সাহেবের কাছে কি জবাব দিবে, গোজ গোজ করতে করতে অফিসে ফিরে এলো এবং আমাকে বিদায় জানালো । যা হোক পরবর্তীতে আমি এ নিয়ে আর কোন উচ্চবাচ্চ করি নাই, নিজের ক্ষতি, নিজের কস্ট, নিজের ভিতরে চেপে রাখলাম ।
ঢাকায় আসার এক বছর পরেও আমার বাড়ি যাওয়া হলো না, মা বাবা সম্পুর্ন ব্যাপারটা জেনে দুঃখ পেলেন । বিশ্ববিদ্যালয় খুললে যথারীতি ক্লাস শুরু করলাম তৃতীয় সেমেস্টারের ক্লাস, তখনকার দিনে তৃতীয় সেমেস্টারের পর ডির্পাটমেন্ট ভাগ হতো । তৃতীয় সেমেস্টারে, সিভিল বিভাগের ফ্লুইড মেকানিক্স, মেকানিকাল বিভাগের হিট ইঞ্জিন, ইলেকট্রিকালের বেসিক ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারং, অঙ্ক , হিউমেনিটিজ বিভাগের সোশোলজি ইত্যাদি বিষয়গুলো থিউওরিটিকাল বিষয় ও সেশনালের হিট ইঞ্জিন, মেশিনসপ, সিভিল ড্রয়িং ও ইলেকট্রিকাল ল্যাব -২ পড়তে হবে । যথারীতি ক্লাস চলতে লাগলো, র্থাড সেমেস্টার উঠার পর আমাদের ঘর ও পরিবর্তন হলো, পশ্চিম ব্লকে ৩ তলায় রুম নম্বর ৩১৬, রুমমেট মোজাম্মেল, আফতাব ও আমি । নর্থ ব্লকে, থার্ড ইয়ারের বড় ভাইয়েরা থাকেন , ডাইনিং হল এবং কমন রুম একসঙ্গে, অনেক ছাত্র, প্রায় ৩৫০ জন, অতবড় ডাইনিং রুমেও খাবারের সময় লাইন দিতো হতো, কমনরুম সবসময় গমগম করতো। এই সময়ে নিউ হোস্টেলকে হলে উন্নিত করা হলো, নাম দেওয়া হলো আহসানউল্লাহ হল, এ উপলক্ষে একটা অনুষ্ঠান হলো, আর্কিটেকাচারের ছেলেরা, রাত জেগে বাংলার আহসানউল্লাহ হল শব্দটি বিশেষ কায়দা করে লিখল, ২দিন ব্যাপি নানা আনন্দের উৎসব, হলকে নতুন সাজে সজ্জিত করা হলো, বিশেষ ফিস্টের ব্যবস্থা হলো, আমরা তখন হলের বাসিন্দা হিসাবে গর্বিত হলাম । ঐ সময় অন্যান্য হোস্টেল গুলোর নতুন করে নামকরন করা হলো, সাউথ হোস্টেলের নাম দেওয়া হলো নজরুল হল, আর নতুন নির্মিয়মান হলগুলোর নাম দেওয়া হলো কায়দে আজম হল যা বর্তমানে তিতুমির হল, সোরওয়ার্দী হল ও শেরেবাংলা হল ।
থার্ড সেমেস্টারের, ফাস্ট টারমিনাল ও সেকেন্ড টারমিনাল হয়ে গেছে, আমাদের জীবনে গতানুগতিক ভাবে কেটে যাচ্ছে, ছুটির দিনগুলোতে সাধারনত আমি খালার বাসায় কাটাতে যাই, অন্যান্য দিন বিকালে, হয় ঢাকা ইউনিভার্টির্র কোন হলে বেড়াতে যাওয়া অথবা নিউমার্কেটে ঘুরতে যাওয়া, বেশিরভাগ সময় পায়ে হেঁটে যাওয়া আসা, আরাম করতে হলে রিকসায় মাত্র ৮আনা ভাড়া । স্কলারসিপ পাওয়ার পর বাড়ি থেকে ৪০ টাকা করে পাঠাতো আর আমার স্কলারসিপের ৬৫ টাকা নিয়ে মোট ১০৫টাকায় ভালো ভাবে মাস কেটে যেত । ঘরে রুটি মাখন এর নাস্তা ছাড়াও মাঝে মাঝে ক্যান্টিনেও নাস্তা করতে যাই, খরচ পড়ে ২আনা করে ২টি পরোটা ৪ আনা, ভাজি অথবা সুজির হালুয়া ২আনা করে, আর ডিম পোছ/মামলেট ৪ আনা, তার সাথে চা ১আনা । ইতিমধ্যে আমার পোষাকেরও পরিবর্তন হয়েছে, ফারুক ভাইয়ের বা বড় খালুর পুরাতন প্যান্ট অল্টার করে, মাঝে মাঝে পরা শুরু করেছি, তবে সম্পুর্ন নতুন প্যান্ট এখনও তৈরী করা হয়নি । এমনি সময় একটা ঘটনা ঘটল, আমার ছোট বোন, আরা, ঢাকায় বেড়াতে এসেছে, বড় খালার ওখানে আছে, আমি একদিন ওকে ঢাকা দেখানোর উদ্দেশে নিয়ে, দেখালাম সদরঘাট, বুড়িগঙ্গায় কিছুক্ষন নৌকায় করে ঘুরালাম, তারপর জিন্নাহ এভিনিউ আসব বলে রিকসা নিয়েছি, সঙ্গে মোজাম্মেল ও আছে, হঠাৎ করে কালো হয়ে আকাশে মেঘ জমলো, স্টেডিয়াম পর্যন্ত পৌঁছতেই কাল বৈশাখি ঝড় শুরু হয়ে গেলো, প্রায় ২ ঘন্টা ধরে প্রচন্ড ঝড় বৃস্টি, কোথাও কোথাও গাছ ভেঙ্গে পড়েছে, আমরা বৃস্টি থামার জন্য, স্টেডিয়ামের বারন্দায় অপেক্ষা করছি, এর মধ্যে আরার টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলো, কিন্তু রাস্তা ঘাটে টয়লেট পাব কোথায়, তবু চেস্টা তদবীর করে স্টেডিয়ামের টয়লেটে নেওয়া হলো, কিন্তু সেখানে এক নারকীয় পরিবেশ। রাত ৯টার দিকে বৃস্টি ছাড়লে আমরা রিকসা নিয়ে আসতে চেস্টা করলাম, কিন্তু রিকসার কোন দিশা নেই, শেষ পর্যন্ত ৯ বছরের আরাকে কোলে নিয়ে হল পর্যন্ত পৌঁছলাম, টয়লেটের কাজ শেষ করে, যখন ধানমন্ডি যাবার জন্য প্রস্তুত হলাম তখন রাত ১১টা । এত রাতে কিভাবে ধানমন্ডি যাব ভেবে, রাতের জন্য আরাকে আমার হোস্টেলে রেখে ঘুম পাড়ানো চেস্টা করলাম, ইতিমধ্যে রাত ১২টার দিকে ফারুক ভাই এক বেবিট্যাক্সি করে হোস্টেলে এসে হাজির, আমার উপর নানান হম্বি তম্বি করে রাগ করলো, কেন আরাকে হলে রেখেছি, খালা খুবই চিন্তা করতেন আমাদের জন্য, তাই ফারুক ভাইকে এত রাতে খোঁজ নিতে পাঠিয়েছে যা, হোক ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে আরাকে পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিত হলাম। এরপর এক মাসের ভিতরে আমি আর খালার বাসায় যাই নাই ।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে, প্রথম বারের মতো আর্কিটেকচারাল ডির্পাটমেন্ট চালু হলো ১৯৬১ সালে, আমেরিকান শিক্ষক রিচার্ড ব্রুমেন ও পি. ডানহাম, এই দুজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধায়নে এবং একমাত্র দেশিয় শিক্ষক জনাব জহিরউদ্দিন ও মাত্র ৫ জন ছাত্র নিয়ে, বিভাগীয় কার্যকলাপ শুরু হয় । আমরা দেখেছি আমেরিকার শিক্ষকদ্বয় খুবই একাগ্রতা নিয়ে পুর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদেরকে স্থপতি শিক্ষা দিতেন, তখন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পুরাতন ভবনের সাথে লাগোয়া করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম তিনতলা ভবন নির্মিত হয়, ঐ ভবনের দোতলায় লাইব্রেরীর পাশে, বিশাল বিশাল দুটি হল ঘর নিয়ে, স্থপতি বিভাগের কার্যক্রম চালু ছিলো । তারপরে বড় বড় দুটি হল ঘরে, আমাদের ড্রয়িং ক্লাস হতো, আমাদের ড্রয়িং ক্লাসে যেতে আসতে, তাই স্থপতি বিভাগের কার্যকলাপ চোখে পড়ত, কি সব কাগজ নিয়ে নকশা করা, হার্ডবোর্ড কেটে মডেল বানানো আবার আঠা দিয়ে জোড়ানো ইত্যাদি কার্যকলাপ আমরা বিস্ময়ের সাথে অবলোকন করতাম । এর পরের ব্যচে স্থপতি বিভাগে, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে, প্রথম বারের মতো তিন জন মহিলা ছাত্রী ভর্তি হন, তাদের নাম, ওয়াজেদা জাফর, নাজমা হাবিব ও শাহীন চৌধুরী, চিরকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্মরনীয় হয়ে থাকবে। ওরা ছিলো স্থপতি বিভাগের মধ্যমনি আর সারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শর্নীয় বস্তুু, তবে সকল ছাত্ররাই তাদেরকে সমিহ করে চলত, তাদের ভিতর শাহীন চৌধরী বেশ মোটাসোটা, পুরুষালি চেহারা, সব সব মুখ কাপড়ের আচল দিয়ে ঢেকে চলাফেরা করত, দুষ্ট লোকেরা বলত শাহীন চৌধুরীর দাড়ি ও মোঁছ আছে,তাই মুখ ঢেকে চলা ফেরা করে, পরবর্তীতে শুনেছি যে হরমনের সম্যসার জন্য কিছু একটা ছিলো, পরে আমেরিকা গিয়ে চিকিৎসার পরে স্বাভাবিক হয়ে উঠেন।
র্থাড সেমেস্টার ফাইনাল এসে গেলো, পরীক্ষা চলছে, এমন সময় সাংঘাতিক একটা ব্যাপার ঘটে গেলো, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কতো কঠিন,কতো কঠোর, তার আর একবার প্রমানিত হলো। শুনেছিলাম ১৯৬২ সালের ছাত্র অটোমেশনের ঘটনা, এবার নিজের চোখে, নিজের সামনে, দেখতে পেলাম অনুরুপ একটি বাস্তবতা । পুরাতন ভবনের আধাঁ অন্ধকার ঘরে অঙ্ক পরীক্ষা চলছে, অঙ্কের বিশাল র্কোস, অসংখ্য ফর্মুলা মনে রাখা দায়, এমনি একটি ফর্মুলা আমার দুই সহপাঠি, রাজ্জাক ও নিশাতুর রহমান খান হাতের তালুতে ও সেট স্কয়ারের উপর আগে ভাগে লিখে রেখেছিলো। পরীক্ষা হলের ইনভিজিলেটর, অঙ্কের হেড, জহির উদ্দিন স্যার, পরীক্ষার মাঝামাঝি সময়ে এই লেখা দুটি দেখে ফেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে ধরে ফেলেন, যতই আকুতি মিনতি করে আমার বন্ধুরা নিজেদেরকে নির্দোষ দাবি করে বলে যে ঐ লেখা র্ফমুলা তাদের কোন কাজে লাগে নি, তবুও স্যার নাছোড় বান্দা, কোন ভাবে ছাড় দিবেন না । ওদের খাতা কেড়ে নিলেন এবং হল থেকে বাহির করে দিলেন । পরীক্ষা হল থমথমে, আমরা আতঙ্কগ্রস্ত, ভীত, যা হোক কোন রকমে কাঁপতে কাঁপতে পরীক্ষা শেষ করলাম। ভেবেছিলাম, ওদেরকে এই বিষয়ে ফেল করানো হবে, তার মানে এক বিষয়ে রেফার্ড পরীক্ষা দিয়ে পাস করে যাবে । কিন্তু আমাদের ভুল ভাঙ্গলো, পরদিনে নোটিশ দেওয়া হলো, ঐ ছাত্র দুজনকে, দুবছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হতে বহিস্কার করা হয়েছে । কি মর্মান্তিক শাস্তি, লঘু পাপে গুরু দন্ড, আমার বন্ধুদের জীবন থেকে দুটি বছর ঝরে পড়বে, কল্পনা করা যায়। আমাদের খুব খারাপ লাগতে লাগলো, একই হলে থাকি, একই ডাইনিং হলে খাই, একই ক্যান্টিনে নাস্তা করি, তাদের কে আমরা দুবছরের জন্য হারিয়ে ফেলব,কি অমানবিক। কিন্তু ওদের জীবন এখানে থেমে নেই, দুজনেই ভালো ছাত্র ছিলো, দুজনেই এই দুবছরে বি এস সি পাস করে এবং দুবছর পরে এসে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শুরু করে এবং দু বছর পর প্রকৌশল হিসাবে স্বীকৃতি পায় । তাদের পরবর্তী জীবনে তারা দারুন সফল, একজন বি পি ডি পির এর প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে রিটয়ার্ড করেন, অন্যজন আমেরিকায় নাসার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে খ্যাতি লাভ করে।
থার্ড সেমেস্টারের পরীক্ষা শেষ, ফলাফল দিয়েছে, আমরা ফোর্থ সেমেস্টারে উঠলাম । এই সেমেস্টার হতে আমাদের বিভাগ পছন্দ করে নিতে হবে, আমার পছন্দের বিভাগ মেকানিক্যাল থাকলেও পরবর্তীতে মেকানিকালের বিষয়গুলি বড়ই বিদঘুটে ও কঠিন লেগেছে, তাই মেকানিকাল বিভাগ ছেড়ে অন্য বিভাগ নেবার চিন্তা ভাবনা করেছি । বন্ধুরা, সব দল বেধে সিভিল বিভাগে নাম লেখাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত আমি ইলেকট্রিকাল নিয়ে পড়াশুনা করব ঠিক করে ঐ বিভাগে নাম লেখালাম । বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলো, আমিও দেড় বছর পর প্রথম বারের মতো ছুটিতে বাড়ি গেলাম । মাস খানেক পরে ফিরে এসে, শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো সিভিল বিভাগে ১৭০ জন, ইলেকট্রিকালে ৩০ জন, মেকানিকালে ৩০জন, কেমিকেলে ১০জন, ও মেটালারজিকালে ৫ জন, এরপরেও একমাসের ভিতর, বিভাগ বদলিয়ে অনেকই চুড়ান্তভাবে বিভাগ পছন্দ করে নিয়েছে। এখন থেকেই আমার জীবনের মোড় নির্ধারিত হয়ে গেলো, জীবনে একজন ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে হয়তো পরিচিতি পাব ।
ফোর্থ সেমেস্টারের বিভাগীয় বিষয়গুলি প্রধান, যেমন এসি সার্কিট, ট্রান্সফরমার ও ডিসি মেশিনস অঙ্ক, মেকানিক্যালের হাইড্রোলিকস ও থার্মোডায়নামিক্স, তার সঙ্গে প্রতোকে বিভাগের সেশনাল ক্লাস । এখন আর সেকশন হিসাবে ক্লাস হয় না, বিভাগ হিসাবে ক্লাস হয় , আমাদের পরিচয় সেকেন্ড ইয়ার ইলেকট্রিকাল, পুরাতন ভবনের অন্ধকারময় ছোট ক্লাসঘরে আমাদের ৩০ জনকে নিয়ে ক্লাস হয়, পাশের ক্লাস ঘরে, থার্ড ইয়ার ইলেকট্রিকাল এবং তার পাশে, ফোর্থ ইয়ার ইলেকট্রিকাল, করিডরের বিপরীত পাশে, আমাদের বন্ধুদের সিভিল দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস। সিভিল বিভাগে দুটি সেকশন হয়েছে, আমার দুই রুমমেট মোজাম্মেল ও আফতাব সিভিল বিভাগে, ওদের ক্লাসে এক সেকশনে ৭০/৭৫ জন ছাত্রের ক্লাস,সুতারং হইচই লেগেই থাকে, আমাদের ক্লাস নিরিবিলি শান্ত এক সুন্দর পরিবেশ । গতানুগতিক ভাবে ফোর্থ সেমেস্টার কেটে গেলো, পরীক্ষা আসন্ন, আবার সেই মেকানিকালের থার্মোডায়নামিক্স, বিষয়টি কঠিন লাগতে লাগলো, প্রথম দিকে পড়াতেন, ড. এম এইস খান, মেকানিক্যালের জাদরেল প্রফেসর, কালো রঙ্গের চেহেরার ভিতরের রাশভারি, মুখে কোন হাসির চিহ্ন নাই, ছেলেরা তাকে বয়লার খান বলে ডাকত, কোন ভাবেই বিষয়টিকে, আমার কাছে আনন্দের ও সহজবোধ্য বিষয় হিসাবে পরিচিত করাতে পারেনি, শেষের দিকে আবার উনার বদলে ওয়াহিদুল হক স্যার পড়াতেন । যাহোক পরীক্ষায় প্রশ্ন করলেন এম এইস খান স্যার, দারুন কঠিন হলো, পরীক্ষা ভালো করলাম না, খুব ভয় হতে লাগলো, কি জানি কি হয় । এই সেমেস্টারে আর কোন গুরুত্বপুর্ন বা উলেখযোগ্য ঘটনা ঘটল না, তবে আমার জীবনে আরো গুরুত্বপুর্ন একটি ঘটনা ঘটল, ফোর্থ সেমেস্টারের ফল প্রকাশ ফেল, আমি থার্মোডায়নামিক্স পরীক্ষায় রেফার্ড পেলাম, জীবনে এই প্রথম পরীক্ষায় ফেল করলাম, কি লজ্জাস্কর ব্যাপার, ভয়ে, বাবা মা বা কাউকে জানালাম না । নিজের দুঃখ, নিজের কষ্ট, নিজেই চেপে রাখলাম, যদিও জানি কিছুই হবে না, রেফার্ড পরীক্ষায় নির্ঘাত পার পেয়ে যাব কিন্তু এক অজানা আসংখা মন থেকে দুর হলো না ।

দ্বাদশ অধ্যায়
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষের দ্ইু বছর
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ঘটনাবহুল দুই বছর পার হয়ে এসে, আমি এখন থার্ড ইয়ার ইলেকট্রিকাল ছাত্র, পঞ্চম সেমেস্টারের ক্লাস শুরু হলো । এই সেমেস্টারেও বিভাগীয় বিষয়ের প্রধান্য যেমন, এসি সার্কিট- ২, এসি মেশিনস, ইলেকট্রনিক্স, হায়ার ম্যাথমেটিক্স ও ইলেকট্রিকাল মেজারমেন্ট । বেশ মজাদার বিষয়গুলি, ক্লাস চলছে আর সঙ্গে রেফার্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে । এক মাস পর পরীক্ষা, জীবনের প্রথম অকৃতকার্যতার কালিমা নিয়ে পরীক্ষা দিলাম এবং পরম করুনাময়ের ইচ্ছায় পাস করলাম, এরপর আর ফিরে পিছে দেখি নাই । ইতি মধ্যে হলে আবার আমাদের ঘর পরিবর্তন হলো এবারও তিনতলা, রুম নম্বর ৩৪৬, আহাসানাউল্লাহ হলের নর্থ ব্লক , দক্ষিনের খোলা বারান্দায় প্রচন্ড বাতাস, বেশ আরাম দায়ক ঘর, রুম মেট আগের মতোই মোজাম্মেল ও আফতাব । স্বাভাবিক ভাবেই আমরা এখন উচ্চতর শ্রেনীর ছাত্র, বিভাগীয় সকল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করি ।
সময়টা ১৯৬৪ সালের মাঝামাঝি, পঞ্চম সেমেস্টারের ক্লাস প্রায় শেষ হলো, ফাস্ট টারমিনাল, সেকেন্ড টারমিনাল, এমনি করে একদিন সেমেস্টার ফাইনাল ও শেষ হলো । পড়াশুনায় এখন অনেক সিরিয়াস, উপরের শ্রেনীর ছাত্র, কোন রকম ফাঁকি দেওয়া চলে না । একই ভাবে হলে কাটানো, সকালে নতুন ক্যান্টিনে নাস্তা করা, ক্লাসে যাওয়া, দুপুরে তাড়াহুড়া করে এসে,দুপুরের খানা খাওয়া ,আবার বিকালের সেশনাল ক্লাস ধরা, গতানুগতিক জীবন, সঙ্গে বয়সে বাড়ছে, জীবনে যৌবনের ছাপ পড়েছে, অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা, অনেক শিহরন, অনেক বাস্তবতা। ইতিমধ্যে মোজাম্মেলের সাথে আমার দহরম মহরম অনেক বেড়ে গেছে, আমরা অকৃত্রিম বন্ধুত্বে পরিনত হয়েছি । ক্লাসের সময় ছাড়া বাকি সময়টা, একসাথেই ঘুরি, একসাথেই সময় কাটাই, ক্যান্টিনে নাস্তা খাওয়া, বিকালে নিউমার্কেটে ঘোরা, রাতের ডিনার খাওয়া, এক সঙ্গেই সময় কেটে যায় । বন্ধুরা, আমাদের এই জোড়ের জন্য নানান কটুক্তি করে, উপহাস করে, আবার নতুন বছরের খেতাবও দেয় । কিন্তু জীবন থেমে থাকে না, পঞ্চম সেমেস্টার পরীক্ষার পর আমি ঠিক করলাম রাঙ্গামাটি যাব, মেজে খালুর পোস্টিং তখন রাঙ্গামাটি, আমার ভাই,আমার বন্ধ,ু পিলু তখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র । ও আই.এস. সি পরীক্ষা খারাপ করায়, কোন বিষয়ে অনার্স পড়তে পারে নাই, জগন্নাথ কলেজের হল আরমানিটোলার এ .আর হলে তখন সে থাকে । ওর তখন বন্ধ, তাই আমরা দুজনেই চট্টগ্রাম হয়ে রাঙ্গামাটি গেলাম।
ঠিক ঘুরতে যাওয়া বা বেড়াতে যাওয়া আমার জীবনে এ পর্যন্ত ঘটেনি, এর আগে যখন যেখানে গিয়েছি, হয় কাজের জন্য নচেৎ প্রয়োজনের তাড়নায়, চট্টগ্রাম থেকে রাঙ্গামাটির দুরত্ব ৪৮ মাইল, তার ভিতর রাউজান পর্যন্ত প্রায় সমভুমি, এরপর থেকে শুরু হয় পাহাড়ি রাস্তা, মাঝেমাঝে গভীর ঢাল ও বিপদজনক ভাবে রাস্তার বাঁক, সমস্ত রাস্তাটাই পাহাড়ের গা বেয়ে, জঙ্গলের ভিতর দিয়ে, চড়াই উৎরাই পেরিয়ে । প্রকৃতির এক অপরুপ সৌর্ন্দয, বিধাতার অপার সৃস্টি , না দেখলে বিশ্বাস হয় না, যেমন পাহাড়ের উচ্চতার শৃঙ্গ, তার গা ঘেষে পিচ ঢালা মসৃন রাস্তা, তার নিচে গভীর খাঁদ, একটু অসাবধান হলেই সমুহ বিপদ । সেই সময় কার মুড়ির টিন মার্কা বাসে চেপে, ঘন্টা তিনেক পর, আমরা রাঙ্গামাটির বাসস্ট্যান্ডে পৌছলাম, বাসস্ট্যন্ডটি কোটকাচারির কাছে, তবে মেজে খালুর সরকারি বাসস্থান, আরো মাইল তিনেক দুরে, তবলছড়ি বাজারের কাছে। পিলু তার বাবা মাকে হঠাৎ করে চমকে দেবার জন্য, না জানিয়েই রাঙ্গামাটি এসেছে, তাই ঐ পথটুকু আমাদের হেটেই পাড়ি দিতে হলো । বিকাল নাগাদ পৌছলাম,মেজে খালু তখন রাঙ্গামাটির ডেপুটি ম্যাজিস্টেট, অঢেল ক্ষমতা উনার, সরকারি বাসস্থানটি বাংলো টাইপের, টিনের চাল ইটের দেয়াল, ছিম ছাম বাড়ি, অনেকগুলো ঘর, খালা দেখে খুব খুশি হলেন । পাহাড় ঘেরা রাঙ্গামাটির অপরুপ সৌর্ন্দযে আমিও বিমোহিত, খাবার ঘরের জানলা দিয়ে দেখা যায়, দুরের মানিক ছড়ির পাহাড়, চা খেতে খেতে বলেই ফেললাম, কাল সকালে দাঁত মাঁজতে ওখান থেকে ঘুরে আসব। কিন্তু পিলু আমার ভুল শুধরে দিলো, যে চোখে দেখে পাহাড়ে দুরত্ব বোঝা যায় না, অনেক কাছের মনে হলেও পাহাড়টি ৭ /৮ মাইলে দুরে, শরৎচন্দ্রের কোন একটা বইয়ের ভাষায় রেফাসন্স দিলো।
কদিন আমোদেই কাটল ওখানে, কাজের ভিতরে খাওয়া দাওয়া, আর আশেপাশে ঘুরা ফেরা, ড্রয়িং রুমের খাটের তলায় ছড়িয়ে রাখা অসংখ্য কমলা লেবু খাওয়া, তবে শর্ত একটাই, কমলা লেবু খেয়ে বিঁচিগুলো সংরক্ষন করা, কে জানি এই সমস্ত কমলালেবু,ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে, দিয়েছে বিনা মুল্যে, পরিবর্তে উনাকে বিঁচিগুলো ফেরত দিতে হবে । আমার খালাতো বোন বিলকিস ৫/৬ বছরের হবে, ফর্সা, লিকলিকে, ২ মিনিট পর পর খাটের তলায় যায়, আর কমলা লেবু এনে খায়, তার সাথে আমরাও খাই, এ যেন মজাদার খেলা। খালুর বাসার বিপরীত দিকে সি.এন্ড. বি. র ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাসা, উনি একদিন, উনার সরকারি উইলী জিপে করে আমাদেরকে কাপ্তাই ও বান্দরবন ঘুরিয়ে আনলেন, দুপুরে রেস্ট হাউসে খাওয়ালেন । বিকালে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেলো, গভীর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পাহাড়ী রাস্তায় একে বেকে জীপ চলছে, চারিদিকে গভীর অন্ধকার, এক সময় ড্রাইভার সবাইকে সাবধান হতে বলল, কেন বলল বুঝলাম না । জীপের পিছনের সিটে আমি, পিলু আর একজন আরদালী বসে, সামনের সিটে ড্রাইভার ও ইঞ্জিনিয়ার সাহেব। হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটল, গাড়িটা র্হাড ব্রেক করে থেমে গেলো, মনে হলো চাকার নিচে কিছু একটা পড়েছে, ড্রাইভার গাড়িটা ব্যাক করে এনে, হেড লাইটে দেখলো, একটা কালো মতো জন্তু জীপের তলায় পড়ে সদ্য মারা গেছে, ড্রাইভার জীপ থেকে নেমে দেখে, চিৎকার করে বলল, বাচ্চাটা মারা গেছে স্যার, জন্তুটাকে জীপের পিছনে তুলে আনা হলো । সবাই চুপচাপ কেউ কোন কথা বলছে না, কি হলো, না হলো। জঙ্গল পার হলে ড্রাইভার বলল জন্তুটি একটি বাঘের বাচ্চা, রাস্তা পার হতে যেয়ে জীপের তলায় প্রান হারিয়েছে, আরো বলল মা বাঘটি কাছেই ছিলো, অন্ধকার জঙ্গলের ভিতর তার জল জল করা চোখ, ড্রাইভার দেখতে পেয়েছে । কি সাংঘাতিক ব্যাপার, সারা গায়ের লোম, শিউরিয়ে উঠল। পরের দিন সকালে সত্যি সত্যি দেখলাম, ডোরাকাটা গায়ে ২ ফিট লম্বা একটা বড় বিড়ালের মতো জল জ্যান্ত একটা বাঘের বাচ্চা।
রাঙ্গামাটি যাওয়ার দু তিন দিন পর, পিলু হঠাৎ প্রস্তাব করল যে একদিন আমরা ঘাগরা ঘুরে আসি, রাঙ্গামাটি থেকে ১৮ মাইল দুরে ঘাগরা জায়গাটি, পাহাড়ের উপর একটা সি. এন্ড. বির রেস্ট হাউস আছে, রাস্তা থেকে ১৮০টি সিড়ি বেয়ে ওখানে উঠা যায় । জায়গাটা মনোরম পরিবেশে, চারিদিকে পাহাড় ঘেরা, নির্জন একটি আবাস স্থল, আর আমাদের প্রধান লক্ষ্য ১৮০ টি সিড়ি বেয়ে রেস্ট হাউজে পৌছানো । আর একটা মজার ব্যাপার, তখন পুর্ব পাকিস্তানে সংগ্রাম বলে একটা নতুন রঙ্গিন উর্দু সিনেমা হিট করছে, ঐ সিনেমার একটি দৃশ্যে, তাৎকালিন নায়িকা সুমিতা দেবী ভিলেনকে মেরে, রক্তাত্ত করে, তার হাত থেকে বাঁচার জন্য ঐ সিড়ি বেয়ে দৌড়িয়ে পালাচ্ছে, এই দৃশ্যটি আমাদেরও মনে দাগ কেটে ছিলো । সুতারং পিলু যখন প্রস্তাব করলো, তখন আমার আপত্তি করার কোন কারন থাকতে পারে না, যথা দিনে সকালে নাস্তা সেরে, চিটাগাং গামী বাসে চেপে বসলাম । ড্রাইভারের পাশে সামনে যে দুটি সিট থাকে, সেটাই আমরা দখল করলাম, দুজনে গল্প করতে করতে ঘন্টা খানেক পর ঘাগরায় এসে পৌছলাম । বাস কন্ডাকটরকে বাস থামানোর জন্য অনুরোধ করলে বাস থামলো, কিন্তু ভাড়া দিতে যেয়ে বিপত্তি, কন্ডাকটর আমাদের কাছে স্পেশাল সিট বলে চিটাগায়ের সম্পুর্ন ভাড়াই দাবি করলো, তখন কার দিনে প্রতি মাইলের ভাড়া ছিলো মাইল প্রতি ১ আনা, সুতারং ১৮ মাইলে ১৮ আনা, দুজনের জন্য ৩৬ আনা, প্রায় আড়াই টাকার সমান, আমরা যতোই আড়াই টাকা দিতে চাই, কন্ডাকটর কিছুতেই নিবে না, শেষ পর্যন্ত পুরা ৭ টাকা ভাড়া দিয়ে রফা পেলাম, কিন্তু আমাদের পকেট প্রায় শুন্য হয়ে গেলো, ছাত্র মানুষ, আমরা কতো টাকা নিয়েই বা পথ চলি । ফিরব কি করে ভাবনায়, মনটায় খারাপ হয়ে গেলো, যাহোক পরে গল্প করতে করতে আমরা দুজন ১৮০ টি সিড়ি বেয়ে, সি. এন্ড. বি র রেস্ট হাউস পর্যন্ত পৌছলাম, জন মানব হীন রেস্ট হাউস তালা বন্ধ, আমরা কিছুক্ষন ঘুরাঘুরির পর একজন আদিবাসী চাক্মার দেখা পাওয়া গেলো ,সে রেস্ট হাউজের দারোয়ান কাম বাবুর্চি, সেই দেখ ভাল করে । আমাদেরকে কোন সাহেব ভেবে, আপ্যায়ন করতে চাইলো, দুপুরে কি খাব জানতে চাইলো, কিন্তু আমরা নিরব থাকলাম, কারন আমাদের পকেট তখন গড়ের মাঠ, যাহোক সেটা তাকে না বুঝতে দিয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলাম, কিছুক্ষন পাহাড়ের চুড়ায় এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করে, কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে, পাহাড় থেকে আবার সিড়ে বেয়ে নামার চিন্তা করলাম এবং এবার কয়টা সিড়ি গুনতে গুনতে নামলাম, মোট ১৭৬ টি ধাপ আমরা পেলাম । বাসায় ফেরার চিন্তায়, পকেট শুন্য থাকায়, বেড়ানোর সমস্ত আনন্দটা মাটি হয়ে গেলো । তবুও নিচে নেমে কাছেই একটা ছড়া ছিলো অর্থাৎ পানির আধার, চমৎকার টলটলে পরিস্কার পানি, পানির নিচ পর্যন্ত দেখা যায়, আমরা সেখানে ঐ সচ্ছ পানি দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ক্লান্তি দুর করলাম।
আমাদের মনে মনে তখন একটা চিন্তা পকেটে পয়সা নাই, বাড়ি ফিরব কি করে, পিলু আবারও কঠিন একটা প্রস্তাব করে বসল, যে আমরা পায়ে হেটে রাঙ্গামাটি যাব । ভয়ে আতঙ্কে উঠলাম আমি, এতোটা পথ আর আমার হাটার তেমন অভ্যাস নাই, কি আর করার, পিলু ইতিমধ্যে হাটতে শুরু করে দিয়েছে । তাকে অনুসরন করা ছাড়া আমার আর কোন উপায় নাই, মাথার উপরে মে মাসের প্রচন্ড রোদ, শখ করে পায়ে আবার বুট জুতা পরে এসেছি, পাহাড়ি উচু নিচু রাস্তা আমার হাটতে খুবই কস্ট হচ্ছে, কিন্তু পিলু তরতর করে হেটে চলেছে । পিলু আমার থেকে সবল, শক্ত ও সমর্থ আমি পাতলা, দুর্বল এবং মনের ইচ্ছা শক্তি খুব কম, তবুও দুজনে হাটছি, বিভিন্ন কালভাটের উপরে বসে কিছুটা বিশ্রাম নিচ্ছি, গল্প করছি, কালভাটের পিলারের উপরে লাল ইট দিয়ে লিখছি টুলু ও পিলু, ১৪ই মে ১৯৬৪ । প্রায় ৫/৭ মাইল চলার পর অপারগ হয়ে, রাঙ্গামাটি গামী এক বাসকে থামিয়ে ,বিনা ভাড়ায় আমাদেরকে রাঙ্গামাটি পৌছানোর অনুরোধ করি, বলি আমরা ছাত্র, আমাদের কাছে জোর করে ভাড়া আদায়ের কাহিনী ইত্যাদি বলি, কিন্তুু কন্ডাকটরের মন গলে না । ইতিমধ্যে টাইট জুতা পরে হাটতে, আমার পায়েল গোড়ালীতে ফোসকা পড়ে গেছে তবুও খুড়িয়ে খুড়িযে হাটছি ,কিন্ত পিলু নির্বাক, নিলিপ্ত আর আমাকে সাহস জোগাচ্ছে এই তো আর অল্প বাকি । শেষ পর্যন্ত আর না পেরে আবার একটা বাসকে দাড় করালাম, অনুরোধ করলাম যে আমার কাছে আটআনা পয়সা আছে, আমাদের দুজন কে রাঙ্গামাটি পৌছানোর ব্যবস্থা করেন, এবার কন্ডাকটর রাজি হলো, কিন্ত পিলু রাজি হলো না । ও গো ধরে বসল যে ও হেটেই যাবে, বলল তুমি গেলে যাও ,বাসে আমি যাব না । তাই কি হয় ওকে ফেলে আমি যাই কি করে, শেষ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি ও বাসা পর্যন্ত পৌছানো গেলো, সব শুনে খালা পিলুর উপর খুব রাগ করলো, আর আমার দুই পায়ে তেল মালিশ করতে লাগলো, পিলু তখন মিটিমিটি হাসছে । মেজে খালা খুবই কস্ট পেলো, আমাদের এই অপ্রত্যাশিত কস্টের জন্য, বিকালে খালু অফিস থেকে আসলে বিস্তারিত সব বলল এবং বাস ড্রাইবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলল । খালু কোন উত্তর করলো না । দুদিন পর খালুর ক্ষমতার দাপট দেখা গেলো, ঐ বাসের চিটাগং- রাঙ্গামাটি রুট পারমিট বাতিল করা হয়েছে, ফলে ড্রাইভার, কন্ডাকটর ও মালিক সহ বাসায় এসে হাজির, খালু তো দেখা করবে না, খালা যেয়ে উত্তম মধ্যম ওদেরকে উদ্ধার করলো,তবুও ওরা হাত জোড় করে আমাদের কাছে মাফ চাইতে লাগলো । কিন্তু আমাদের করার কি আছে, সরকারি ম্যাজিস্টেট সাহেব তার ক্ষমতার বলে যা করার করেছে, পরে জানি না আর কি হয়েছে । সপ্তাহখানেক আমোদে ফুর্তিতে কাটিয়ে আমরা ঢাকায় ফিরে আসলাম ।
ইতিমধ্যে ছুটি শেষে, বিশ্ববিদ্যালয় খুলে গেছে, পঞ্চম সেমেস্টারের ফাইনাল পরীক্ষার ফল বাহির হয়েছে, আমি স্বাচ্ছন্দে ৬ষ্ঠ সেমেস্টারে উঠেছি, নতুন করে নতুন বিষয়ে অভিজ্ঞ স্যারেরা ক্লাস করাচ্ছেন, ৬ষ্ঠ সেমেস্টারের বেশির ভাগই বিভাগীয় বিষয়, বাড়তি শুধু মেকানিক্যাল বিভাগের বিষয় ম্যানেজমেন্ট, হায়ার ম্যাথ ও বিভগীয় বিষয় ইলেকট্রনিক্স , ইলেকট্রিকাল মেজোরমেন্ট ও ইলেকট্রিকাল ফিল্ডস। বিভাগীয় বিষয়গুলি বিখ্যাত সব স্যারেরা পড়াতেন, সহজ করে বুঝাতেন, বিষয়ের উপর একটা আগ্রহের সৃস্টি করতে পারতেন। আজ এতদিন পরেও মনে পড়ে, ডিসি মেশিনস ও ট্রান্সফরমার পড়াতেন অবাঙ্গালি আরিফুর রহমান স্যার, ্এসি মেশিনস পড়াতেন ড. নজরুল ইসলাম, ইলেকট্রনিক্স পড়াতেন ড.শামশুদ্দিন ও ড.নুরুল্লাহ, মেজরমেন্ট পড়াতেন অবাঙ্গালি ড.নাসের, তাদের সাবলীল ভাষায় পড়ানো, আমাদেরকে আপন করে নেওয়া, আবার নিয়ম শৃঙ্খলা মোতাবেক কঠোরভাবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রন করা, সবেই তাদের নখোদর্পনে ছিলো । কিন্তু রেজাউল করিম স্যার ও মেহেদিজ্জমান স্যার, এসি সার্কিট পড়াতে যেয়ে বিষয়টিকে,বোরিং করে ফেলেছিলেন, ইলেকট্রিকাল ফিল্ডস পড়াতে গিয়ে ড. আজিজুল ইসলাম, আমাদেরকে আনন্দ দিতে পারেননি, কিন্তু অসাধারন ভালো ছাত্র মতিন পাটোয়ারি স্যার আমাদেরকে, বিষয়টির উপর দখল রাখতে সাহায্য করেছেন, তাছাড়া পড়াশুনার ফাকে ফাকে বিভাগীয় পিকনিক, বিভাগীয় সেমিনারে আমরা স্যারদের আরো কাছে আসতে পেরেছি ।
৬ষ্ঠ সেমেস্টার পার হতে চলল, আমার দিনগুলি কেটে যাচ্ছে আনন্দ বেদনায়, সুখে দুঃখে, মিশ্রিত অনুভুতিতে, হলে যখন থাকি বন্ধু বান্ধাদের সাহচার্যে, হেসে খেলে, সময় কোথা থেকে পার হয়ে যায় হিসাব পাই না, বন্ধু মোজাম্মেল ধীরে ধীরে আমাকে আরো অকৃত্রিম বন্ধত্বে পরিনতে করেছে এর সবটুকু দায় দায়িত্ব তারই প্রাপ্য, বন্ধুত্ব করা ও বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার সবটুকু অবদান তারেই, সে আমার সব বিষয়ে খেয়াল রাখতো এবং আমাকে আপন করে নিতো । খালার বাসায় ইতিমধ্যে ফারুক ভাই, ডাক্তারি পাস করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চাকুরীতে জয়েন্ট করেছেন, নিনা বুবু ইসলামি হিস্টরি এন্ড কালচার বিভাগে অর্নাস শেষ করে মার্স্টাস শুরু করেছে, মিনু বুবুর বিয়ে হয়ে গেছে বদি ভাইয়ের সঙ্গে, বদি ভাই এখন চা বাগানের ম্যানেজার, বুবু সহ সেখানে থাকেন, ইতিমধ্যে উনাদের প্রথম সন্তান বাবুর ও জন্ম হয়েছে । খালা বাড়ির জন্য এখনও আমার আগের মতোই আকর্ষন, সেই ব্যাডমিন্ডন খেলা, লুডু খেলা, তাস খেলা, মাঝে মাঝে পি. আই. এর ইঞ্জিনিয়ার, শরীফ সাহেব বেবি আইসক্রিমে নিয়ে যেয়ে, আইসক্রিম খাওয়ানো, ফারুক ভাইয়ের বন্ধু ,আমিন ভাই আসলে চা খেতে খেতে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করা, মিনু বুুবু ঢাকায় আসলে উনার বন্ধু, অটবির প্রবাদ পুরুষ, নিতুন কুন্ডু চায়ের টেবিলে দীর্ঘ সময় কাটানো, সবই আজ মনের ক্যানভাসে আকাঁ হয়ে আছে । তখন ইউ. এস .আই. এস এর অফিস ছিলো বর্তমান প্রেস ক্লাবের বিপরীতে দোতলা ভবনে, তখন নিতুন কুন্ডু, ইউ. এস .আই. এস এর কর্মাসিয়াল আর্টিস্ট হিসাবে চাকুরী করেন,ইউ. এস .আই. এস অডিটিরয়াম ড্রামা সার্কেলের ব্যানারে নানা ধরনের আমেরিকান মুভি, সায়েন্স ফিকসন এর ছবি দেখানো হতো, নিতুন দা মাঝে মাঝে আমাকে ঐ সমস্ত অনুষ্ঠান দেখার জন্য ,ফ্রি পাস জোগাড় করে দিতেন । তখন গুলিস্তান সিনেমা হলের দোতালায় নাজ নামে ছোট একটা সিনেমা হল ছিলো, সেখানে শুধ ইংরেজি ছবি হতে, আর রবিবার মনিং শো হতো, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির দিনে ওখানে কতো যে মনিং শো দেখেছি তার কিছু হিসাব এখনো মনে আছে, যেমন রোমান হলিডে, গানস অব নাভারন, টু উরম্যান, সাইকো এবং জেমস বন্ডের ০০৭ নামের বিখ্যাত ইংরেজি সিনেমা ।
৬ষ্ঠ সেমেস্টার ফাইনাল পরীক্ষার পর সিন্ধান্ত নিলাম, মোজাম্মেলের বাড়ি যাওয়ার, ওর বাড়ি ছিলো নোয়াখালির, রায়পুরের, রাখালিয়া থানার বামনি ভুঁইয়া বাড়ি । যাবার সময় ঢাকা থেকে লঞ্চে চাঁদপুর, সেখানে গুলিস্তান হোটেলে রাত কাটানেরা পরদিন ডাকাতিয়া নদী নৌকায় পার হয়ে রিকসায় করে ফরিদগঞ্জ, তারপর আবার রিকসায় রায়পুর, তারপর ওদের বাড়ি । তখনকার দিনে ঐ অঞ্চলে রাস্তা ঘাাট সরু ,কোথাও ইট বিছানো, কোথায় কাচা রাস্তা, মোট কথা সমস্ত রাস্তাটি ফুর্তি করেই যাওয়া গেলো । ওদের গ্রামটি ছিলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে, রায়পুর-ফেনী মেইন রাস্তা থেকে মাইল তিনেক দুরে, কাঁচা রাস্তায়, ক্ষেতের পাশ দিয়ে বেশ কয়েকটি কালভার্ট পেরিয়ে, ওদের ছয় ছালা টিনের বাড়ি, নোয়াখালির প্রত্যন্ত গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশে, মেয়েরা খুবই পর্দানোশীন, প্রথম ২ দিন কেমন যেনো ঘোরের মধ্যে কেটে গেলো, সকালে উঠে বিভিন্ন রকমের পিঠা পায়েশ দিয়ে নাস্তা, দুপুরে ওদের নিজস্ব পুকুরে ধরা রুই মাছ দিয়ে ভাত, আর রাতে মুরগীর ঝোল । ওর বাবা আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীন সাহেব ইতিমধ্যে ১৭ বার হ্জ্ব করেছেন, দারুন আলাপী এবং প্রানচাঞ্চল ব্যাক্তিত্ব, মেহমান হিসাবে আমাকে সাদর আপ্যায়ন, আর ওর মা বেড়ার ওপাশ থেকে পর্দা করে আমার নানান, খাওয়া দাওয়া ও সুবিধা অসুবিধা কথা জিজ্ঞাসা করা । ২/৩ দিন পর মোজাম্মেলের ছোট বোন শাহেদার বিয়ের জন্য ছেলে দেখতে আমাদেরকে চট্টগ্রাম যেতে হলো, সারাদিন ঘুরাঘুরি করে, রাতে ছেলের আগ্রাবাদের বাসায় আমরা মেহমান হলাম, ছেলে এক্সপোর্ট ইমর্পোট কমিশনারের পি এস , গুলজার সাহেব, সদআলাপি, বিনয়ী, আমাদেরকে যথেষ্ট আপ্যায়ন করলেন । পুরোদিন ওখানে থেকে ছেলেটিকে মোটামোটি বুঝতে চাইলো মোজাম্মেল, তারপর আবার ওদের গ্রাম বামনিতে ফিরে আসা, ২/১ দিনের ভিতরে শাহেদার বিবাহর সিন্ধান্ত এবং বিবাহের দিনক্ষন ঠিক হয়ে গেলো । জীবনে প্রথম বারের মতো নোয়াখালিতে ভ্রমন, সম্পুর্ন অপরিচিত এক পরিবেশে অবস্থান, বন্ধুর ছোট বোনের বিবাহের আয়োজন করা ইত্যাদি, স্বল্প সময়ে করা হলো, আমি যেখানে নিরব সাক্ষি এবং আমার উপস্থিতি সেখানে ওদের পরিবারের জন্য একান্ত আপনজন হিসাবে গ্রহন। বিয়ে ঠিক হবে জেনে, চিটাগং থেকে আসার সময় মোজাম্মেল একটা কাচেঁর, চা ও পানির সেট আমার পক্ষ থেকে দেওয়ার জন্য কিনেছিলো। ওদের ওখানে বিয়ের আসরে দেখলাম, পাত্র আাসার পর পাত্রীপক্ষ থেকে যা কিছু দেওয়ার, সোনা ,দানা, কাপড়, জামা এমন কি আতœীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধাব থেকে প্রাপ্ত উপহার সামগ্রী সবকিছুই বিয়ের আগে হাজেরানে মজলিসের সামনে উপস্থিত করা । যা হোক গুলাজার সাহেবের সাথে শাহেদার বিয়ে হয়ে গেলো, সন্ধ্যার ভিতর কনে বিদায় হয়ে গেলো, ওদের বাড়িতে তখন বিরহের বেদনা, মেয়ে বিদায়ের পর হারাবার যন্ত্রনা, সব মিলে এক নিরব, নিস্তব্দ পরিবেশ । দুদিন পর শাহেদা গুলাজার আবার মোজাম্মেলদের বাড়িতে ফিরে আসলো বিবাহের রেওয়াজ অনুযায়ী, তখনি ওর বোনদেরকে প্রথম বারের মতো আমি দেখতে পেলাম, মোজাম্মেলের ক্যামেরায় কিছু ছবিও তোলা হলো । এবার আমার বিদায়ের পালা, ৮/১০ দিন ওদের বাড়িতে থেকে গ্রাম্য পরিবেশে, পুকুরে গোসল করে, গ্রামময়, মাঠে মাঠে ঘুরে, গ্রামে গঞ্জে বেড়িয়ে, অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকায় ফিরলাম । গতানুগতিক জীবনের ফাঁকে এ এক অনাস্বাদিত অধ্যায়ের চরম পাওয়া ।
৬ষ্ঠ সেমেস্টারের ফল বাহির হয়েছে, ভালোভাবেই সপ্তম সেমেস্টারের উঠেছি ,আমি এখন ফোর্থ ইয়ার ইলেকট্রিকালের ছাত্র , প্রকৌশল শিক্ষার শেষ বছর । পুর্ব পাকিস্তানে তখনো আইয়ুব খানের শাসন চলছে, ধুমায়িত আন্দোলনের প্রচেস্টা চলছে, ১৯৬৫ সাল, ছাত্র অসন্তোষ চাপা পড়লেও একবারে থেমে যায়নি, তুষের আগুনের মতো নিরবে চলছে । এমনি সময় হঠাৎ করে পাক ভারত যুদ্ধে বেধে গেলো, সেপ্টেম্বর মাস, পুর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক চর্চা একে বারেই বন্ধ,কায়দে আজমের মুষলিম লীগ, সোরওয়ার্দীর আওয়ামী লীগ, আর মওদুদি সাহেবের জামাতে ইসলাম এর কার্যকলাপ প্রকাশ্যে বন্ধ, তবু ভিতরে ভিতরে কাজ চলছে। হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মতোপার্থক্য হওয়ায়, মাওলানা ভাষানী আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে ন্যাপ গঠন করলেন, ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিজামে ইসলাম পাঠি তৈরী হলো, পুর্ব পাকিস্তানে নুরুল আমিনের নেতৃত্বে এন. ডি .এফ গঠিত হলো । এ সবেই হতে পারলো আইয়ুব খানের স্বল্প পরিমান রাজনৈতিক অনুমতি প্রদানে, এমনি যখন পুর্ব পাকিস্তানে প্রাথমিক রাজনীতির বিকাশ ঘটছে, তখনি হঠাৎ পাক ভারত যুদ্ধ বেধে গেলো ,কে আগে শুরু করলো এখনো পরিস্কার নয তবে পশ্চিম
পাকিস্তানের খেমকারান সেক্টরে প্রচন্ড ট্যাঙ্ক যুদ্ধ সংগটিত হলো, ভারতীয় বাহিনী লাহোর শহরের উপকন্ঠে উপস্থিতি হলো, দেশে তখন তুমুল উত্তেজনা, পুর্ব পাকিস্তানেও যুদ্ধ শুরু হলো, ভারতীয় বাহিনী সিলেট সীমান্ত আক্রমন করে বসল, ঢাকার উপক›েঠ কয়েকটি বোমা ফেলা হলো । সারা দেশে তখন যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব সর্বত্র আতঙ্ক, ভয় ,ভাবনা, স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা সিভিল ডিফেন্সে ট্রেনিং দিতে লাগলো, যুদ্ধ কালিন পরিবেশে, দেশ বাসির কার কি করনীয় রেডিও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে শিক্ষা দেওয়া শুরু হলো । বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র রা সামরিক ট্রেনিং নিতে শুরু করলো, আমি ইউ. ও. টি .সিতে নাম লেখালাম । বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশুনায় একটু ঢিলেমী ভাব পরিলক্ষিত হলো , বিকাল হলে খেলার মাঠে ইউ .ও . টি. সির ট্রেনিং নেওয়া শুরু করলাম, লেফট রাইট , এটেনশন, কুইকমার্চ ইত্যাদি বুলিতে অভ্যস্থ হতে লাগলাম । সত্যিকার রাইফেলের অভাবে কাঠের তৈরী রাইফেল দিয়ে যুদ্ধে মহড়া,শেখানো হলো ।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রি তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো, অক্সোফোর্ড শিক্ষিত তুখোর ডিবেটার, জাতিসংঘে জ্বালাময়ী ভাষায় বক্তৃতা দিতে লাগলো । যুদ্ধ যখন পুরা মাত্রায়, তখন যুদ্ধ থামাবার প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেলো, সোভিয়েট ইউনিয়ন ও চীনের প্রস্তাবে, আমেরিকা জাতিসংঘে ভেটো দিলো, ফলে যুদ্ধ থামার প্রকিৃয়া থেমে গেলো, দেশ ব্যাপি প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠল, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ও থেমে থাকলো না, প্রতিবাদের জন্য আবার মিটিং মিছিল শুরু হলো । মহল্লায় মহল্লায় বাঙ্কার খোড়ার কাজ চলতে লাগলো, এর মধ্যে ব্লাক আউটের অনুশীলনও দেশব্যাপি চলতে লাগলো। একদিন এমনি ব্লাক আউটের সময়, সারা ঢাকা শহর যখন অন্ধকারে আচ্ছন্ন, রাত প্রায় ১১টা, আকাশে একটা প্লেনের গর্জন শোনা গেলো, হঠাৎ আহসানাউল্লাহ হলের হিন্দু ব্লক হতে কে যেনো টর্চ লাইটের আলো আকাশে সিগনাল দিতে লাগলো । তেমনি একটা উত্তেজনাকর মুহুর্তে সারা আহসানাউল্লাহ হলের ছাত্ররা প্রতিবাদে ফেটে পড়ল, সবাই দৌড়ে হিন্দু ব্লকের ছাদের উপর থেকে টর্চলাইট সমেত কালিপদ নামের চর্তুথ বর্ষ সিভিল এর ছাত্রকে ধরে আনা হলো । শুরু হয়ে গেলো কিল, ঘুষি, মারপিট, মুহুর্তের মধ্যে হিন্দু মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে তুমুল মারামারি শুরু হয়ে গেলো, হই চই, চেচাঁমেচি অন্ধকার বিদির্ন করে, সাইরেন বাজিয়ে পুলিশ এসে গেলো, মুহুর্তের মধ্যে দুই ধর্মের ছাত্রদের মধ্যে দাঙ্গা বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হলো। ছুটে আসলো ডি. এস .ডাবলু কবিরউদ্দিন স্যার , এম .এইস. খান প্রভোস্ট স্যার ও আরো অনেকে, তুমুল হট্টগোলের ভিতর, স্যারদের চেস্টায় বড় ধরনের একটা রক্তারক্তি থেকে আহসাউল্লাহ হলো রক্ষা পেলো । কি আশ্চর্য্য মানুষের মন, কিছুক্ষন আগেই যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিলো ক্যান্টিনে বসে চা, সিগারেট খাওয়া চলছিলো মুহুর্তের মধ্যে একে অপরের শত্র“তে পরিনত হলো, আদিম হিংস্্র ও প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠল ।
ভারতীয় আগ্রাশনের বিরুদ্ধে যখন দেশব্যাপি প্রতিবাদ চলছে, তখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কেন বসে থাকবে, জল্পনা কল্পনা চলতে লাগলো, ছাত্র সংসদের ভি.পি তখন ফজলে এলাহি আর জি.এস সেরাজুল মজিদ মামুন, সিন্ধান্ত হলো আমরা মিছিল করে তাৎকালিন গর্ভনর হাউস বর্তমানে বঙ্গভবনে, প্রতিবাদ স্মারকলিপি পেশ করতে যাব। আবার সেই মিছিল, মিটিং, ভয় হতে লাগলো, মনে পড়তে লাগলো, দু বছর আগের ছাত্র আন্দোলনের সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। তবু যথাদিনে, যথাসময়ে, সারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মিলে সারিবদ্ধ ভাবে মিছিল করে, গর্ভনর হাউস অভিমুখে রওনা হলাম, মুখে শ্লোগান “পাকিস্তান, জিন্দাবাদ, ভারতের, আগ্রাশন বন্ধ হউক, কুইট, ইউ.এন.ও কুইট, কুইট” । অবশেষে গর্ভনর হাউসে পৌঁছানো গেলো, বিশাল মিছিল, ৭০০/৮০০ ছাত্রের, এতো ছাত্রকে গর্ভনর হাউসে জায়গা দেবে কোথায়, আমরা তখন ঘেমে নেয়ে গেছি, মুল ভবনের কাছে আম গাছ তলায় আমাদেরকে বসতে বলা হলো, শোনা গেল গর্ভনর,মোনেম খাঁন আমাদের সামনে বক্তৃতা দিবেন। আধ ঘন্টা হয়ে গেলো, কাহাতক এভাবে বসা থাকা যায়, ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে, কিছুক্ষন পর দেখা গেলো উর্দি পরা বেয়ারা, শবরতের পাত্র নিয়ে হাজির, লাল রঙ্গের রুহ-এ-আফজার শরবত খাওয়ানো হলো । ৫ মিনিটের ভিতরে গর্ভনর মোনেম খাঁন আসল, চোস্ত পায়জামা পরা, সাদা পাঞ্জাবী পরে, মাথায় সাদা কিস্তি টুপি, উনি বক্তৃতা দিলেন, সদর আইয়ুব, সদর আইয়ুব আর যেন কি কি বললেন, কিছু বোঝা গেলো না, আমরা হাত তালি দিয়ে, হই হই করে চলে আসলাম। এ এক দারুন অভিজ্ঞতা, এদিকে যুদ্ধের ডামাডোলে ক্লাসে ঠিকমতো হচ্ছে না, কেমন যেন অস্বস্তিকর পরিবেশ, হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলো, আমি ও কদিনের জন্য ছুটিতে বাড়ি গেলাম।
চুয়াডাঙ্গায় এসে পুরনো বন্ধু বান্ধাবের সাথে দেখাশুনা, পাড়ার ছেলেদের সাথে কয়েকদিন মেলামেশা চলল, কোন কিছু করার নেই, শুধু আলস্য সময় কাটানো ছাড়া, সারা দিন ঘোরাফেরা করি, আর সন্ধ্যা হলে রেডিও পাকিস্তানের খবর শুনি । দেশে, তখন টেলিভিশন চ্যানেল শুরু হয়ে গেছে, প্রায় বছর খানেক আগে থেকেই, কিন্তু সব ঢাকা কেন্দ্রিক, ঐ টেলিভিশনের ছবি ঢাকার বাহিরে দেখা যায় না । তখন ১৯৬৪ সাল, দেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো টেলিভিশন চালু হলো, ডি.আই.টি ভবনে, বর্তমান রাজউক, এর উপর টেলিভিশনের এ্যান্টেনা স্থাপিত হলো, ডি.আই.টি ভবনের কিছু ঘর নিয়ে স্টুডিও বানানো হলো, টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হলো, এক ঐতিহাসিক মুহুর্ত । যে দিন টেলিভিশন চালু হয়, তখন আমি ঢাকায় হলে, সরকার কতৃক প্রত্যেক হলে, একটি করে ১৯” সাদা কালো এন.ই.সি টেলিভিশন সরাবরাহ করা হয়েছে, তার আগেই হলের তিন তলার ছাদে এ্যান্টেনা বাধা হয়েছে, কমন রুম ছাত্রে ছাত্রে ভর্তি, পা ফেলার জায়গা নেই, বেলা তিনটায় উদ্বোধন হলো । তাজ্জব হয়ে চেয়ে থাকলাম, এতদিন শুধু গান শুনেছি, এখন গান শোনার সাথে সাথেও যিনি গাচ্ছেন তাকেও দেখা যাচ্ছে, তাৎকালিন লব্ধপ্রতিষ্ট গায়িকা ফেরদৌসী বেগম গান গাইলেন, মোস্তফা মনোয়ার ছবি আকাঁ শিখালেন, আর কে জানি কি কি অনুষ্ঠান করতে লাগলো, বিজ্ঞানের এক আশ্চর্র্য্য উপহার মানব সমাজের জন্য । প্রাথমিক অবস্থায় ঢাকা ও আশেপাশে দশ মাইলে ব্যাসের ভিতরে টেলিভিশনের ছবি দেখা যেত ।
চুয়াডাঙ্গায় এসে টেলিভিশন দেখা বন্ধ, কি করি ভেবে না পেয়ে আবার সেই পুরনো নেশাটা মাথায় জাগলো, নাটক, পাড়ায় আবার নাটক মঞ্চস্থ করা হবে, বদন মামু স্ক্রীপ্ট লেখা শুরু করলো, জোরসোর রির্হাসেল শুরু হয়ে গেলো, পাক ভারত যুদ্ধের পটভুমিকায় লেখা নাটক, দৃশ্য পশ্চিম পাকিস্তানের লাহারের খেমকারান সেক্টর। বাঙ্গালী বীর সেনানীরা, সেদিন যে বীরত্বের সঙ্গে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে ছিলো, বুকে ডিনামাইন্ড বেধেঁ চলন্ত ট্যাঙ্কের সামনে ঝাপিয়ে ট্যাঙ্ক স্তব্ধ করে দিয়েছিলো, এমনি এক কোম্পানির সৈন্যদের যুদ্ধের ভয়াবহ বিবরন । চরিত্রে মেজর হায়দার, ক্যাপ্টেন শামিম, লেফটেনেন্ট সোহেল এমনি অনেক নাম না জানা সৈনিক অফিসারদের বীরত্ব গাঁথা, দেশের জন্য শহীদ হওয়া, যুদ্ধস্থান থেকে বহুদুরে গ্রাম বাঙ্গলায়, অপেক্ষারত লেফটেনেন্ট সোহলের বাবা, মা, ও সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর অনুভুতি ইত্যাদি নাটকটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো । কদিন খুব ব্যাস্ততার মধ্যে সময় কাটলো, আমাদের বাড়ির সামনেই অস্থায়ী স্টেজ বানানো হলো, মা চাচীদের শাড়ি চেয়ে এনে স্টেজের উইংস, ড্রপসিন ইত্যাদি তৈরী করা হলো, তখনও চুয়াডাঙ্গা শহরে বিদুৎ না থাকার জন্য কতগুলো হ্যাজাগ লাইট ঝোলানো হলো । নাটক শুরু হওয়ার আগে সামনের মাঠ দর্শকে ভরে গেলো, নাটকটি জমে উঠেছিলো, সত্যিকার ভাবে যুদ্ধের দৃশ্যগুলো, ডালপালার আড়াল দিয়ে ক্রলিং করে রাইফেল হাতে নিয়ে স্টেজের এপার থেকে ওপারে যাওয়া, ছুটাছুটি, দৌড়াদোড়ি, মেজরের রনহুঙ্কার, কমান্ড করা, বোমা পটকার বিকট শব্দ, স্টেজময় ধোয়া ধোয়া, সত্যি নাটকটিকে প্রানবন্ত করে তুলেছিলো । শেষ দৃশ্যে লেফটেনেন্ট সোহেলের শহীদ হওয়ার খবর, বাবা রুপি বদন মামু ও মায়ের ভুমিকায় বজলূ এবং বিধবা স্ত্রীর ভুমিকা বেল্টু, দারুন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলো, তাছাড়া মেজর হায়দারের ভুমিকায় সদন মামু ,অন্যান্য ভুমিকায় মন্টু, টুটু ,ইত্যাদি ছেলেরা এবং লেফটেনেন্ট সোহেলের ভুমিকায় আমার অভিনয় সত্যিই প্রশংসিত হয়েছিলো ।
ইতি মধ্যে বিশ্ববিদ্যলয় খুলে গেলে, আবার ঢাকায় নিজের ভুবনে বিলিন হয়ে গেলাম, ফোরথ ইয়ারের প্রথম ভাগেই প্রজেক্ট/ থিসিস বিতরন পর্ব শেষ হলো। তখন ইলেকট্রিকাল ডির্পাটমেন্টের হেড, ড. এম.এন. আজম, উনি ম্যানেজমেন্ট, হাই ভোল্টেজ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ান, বর্শীয়ান অধ্যাপক ডঃ জহুরুল হক পড়ান, পাওয়ার সিস্টেম ও সুইচ গিয়ার, রেজাউল করিম স্যার পড়ান, ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিসট্রিবিউশন, ইলেকট্রিকাল ফিল্ড পড়ান ডঃ আজিজুল হক, মতিন পাটোয়ারি স্যার পড়ান, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং, সব স্যারেরাই দারুন পন্ডিত, স্ব স্ব বিষযে অভিজ্ঞ এবং পারদর্শী, অন্তর দিয়ে পড়ান, জ্ঞানের সবটুকু বিলিয়ে দিতে চান, আমরাও যতটুকু পারি জ্ঞান আহরন করতে চেস্টা করি । প্রজেক্ট/ থিসিস বিতরনের দিন বিভাগীয় হেড সহ, সকল সিনিয়ার শিক্ষদের সামনে লটারির মতো করে টোকেন টানা হতে লাগলো, যার ভাগ্য যে থিসিস পড়ে তাকেই সেটা মেনে নিতে হয় । অনেকেরই ভাগ্য ভালো প্রজেক্ট/ থিসিস পছন্দ মতো পড়ল, আর আমার ভাগ্য পড়ল “ইলেকট্রিকাল হারমনিক্স এন্ড ট্রানজিয়েন্ট এনালাইসিস”,ভালো থিসিস এর জন্য এটা ভালো বিষয় নয়, থিওরেটিকাল এবং সামান্য এক্সেপেরিমেন্ট সহ কিছু লিখন । তবু ভাগ্যর বিষয় কি আর করা যাবে, আমার বিষয়ের সুপারভাইজার ডঃ আজিজুল হক স্যার, সপ্তাহে তিন দিন, প্রতিদিন ৩ ঘন্টা করে থিসিসের কাজ করতে হয়, সুপারভাইজার স্যার খুব একটা গাইড করেন না, সময় দেন না, বলেন, নিজো চেস্টা করো। দিনের পর দিন অসিলস্কোপ নিয়ে এক্সেপেরিমেন্ট সাজিয়ে বসে থাকি, স্যার সময় দেন না, ল্যাবরেটরি ট্যাকনিশিয়ানরা যা পারেন সাহায্য করেন । অথচ আমার বন্ধুদের থিসিস এর বিষয়ে স্যারেরা নানান ভাবে সাহায্য, সহযোগিতা করেন, বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য, আমাদের সেকেন্ড বয় শহীদুল হাছানকে সাহায্য করেন, ডঃ নুরুল্লাহ, কম্পিউটার বানাতে, রহিমকে সাহায্য করেন, বিভাগীয় প্রধান, আজম স্যার নিজে, পাওয়ার সিস্টেম প্রজেক্ট এর সাহায্য করেন জহুরুল হক স্যার । থিসিস এর কাজ মাস ৬ চলার পর সুপারভাইজার স্যার কিছুটা গাইড করলেন, এক্সেপেরিমেন্ট এর রেজাল্ট দেখলেন, লাইব্রেরী থেকে কিছু কিছু বই পড়ার নির্দেশ দিলেন। সময়তো বসে থাকে না, ফাইনাল পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসলো, ইতিমধ্যে ৬ষ্ঠ সেমিস্টারের পরীক্ষা হয়ে গেছে, ফলাফল বাহির হয়ে গেছে, সম্মানের সাথে সপ্তম সেমেস্টার বা ফাইনাল সেমেস্টার উঠেছি। ফোরথ ইয়ারের সময়টা, নানান ঘটনা প্রতি ঘটনার ভিতর দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি শেষ হতে চায়, শেষ হয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশুনা চলার ফাঁকে ফাঁকে রুটিন মোতাবক অনেক ঘটনা অনুষ্ঠিত হয়, তার ভিতর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা নাটকগুলোর কথা মনে দাগ কেটে থাক । উল্লেখ করতে পর পর দুটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নাটকের কথা, একটা আহসানউল্লাহ হলের বার্ষিক নাটক, আর একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় বার্ষিক নাটক । হলের নাটকে অংশগ্রহন করলো বর্তমান নাট্য জগতের জাদরেল অভিনেতা জামালউদ্দিন, আবুল কাসেম ও আবুল হায়াত, সে সময় মহিলা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বাহির থেকে অভিনেত্রীদের ভাড়া করে আনা হতো, সুদর্শন জামালউদ্দিনের বিপরীতে অভিনয় করার জন্য আনা হলো তাৎকালিন অভিনেত্রী সীমা খানকে, পর পর দুবছর অভিনয় করার পর, দুজনের প্রেম, পরে পরিচয়, ও সব শেষে পরিনয়, বর্তমান আসল সংসার জীবনে জামালউদ্দিন ভাইয়ের স্ত্রী হিসাবে সীমা খান দীঘদিন ধরে ঘর সংসার করছেন। আমার এখনও মনে পড়ে নাটক শুরু হওয়ার প্রথমে একটি কথক নৃত্য পরিবেশিত হলো, বর্তমান চিত্র জগতের সুবিখ্যাত সাড়া জাগানো, অঞ্জনা সাহা, তখন খুব ছোট ছিলো, ১৫মিনিটের কথক নৃত্য হলভর্তি দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিলো । কেন্দ্রের নাটক আরো বিখ্যাত, আরো হৃদয় স্পশী, দর্শকদের কাছে আরো গ্রহনযোগ্য হয়ে থাকে, সত্যেশ মজুমদারের সাড়া জাগানো অভিনয়, সেরাজুল মজিদ মামুননের বিশেষ বিশেস চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস, জামালউদ্দিন ভাইয়ের নায়কোচিত চেহেরা ও অভিনয় আর লাস্যময়ি নায়িকা নাজনীন এর প্রানবন্ত অভিনয় তাৎকালিন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অপার সৃস্টি, দর্শকদের মনে চির অম্লান হয়ে থাকবে । আমরাও ঐ সমস্ত নাটকের চরিত্রাভিনেতা অভিনেত্রীদের এবং অন্যান্য কুশিলবদের চিত্রজগতের আগাম আগমন হিসাবে চিরদিন মনে রাখব।
৬ষ্ঠ সেমেস্টার ফাইনালের পরের ছুটিতে, আবার আমরা গেলাম রাঙ্গামাটিতে মেজে খালার বাসায়, এবার আমরা ৪ জন, আমি, পিলু, নিনাবুবু এবং পিলুর বন্ধু সিরাজ, ছাত্র কনসেশন নিয়মে ৪ জনের ঢাকা – চট্টগ্রামের ট্রেনের টিকিট স্বল্প খরচে কেনা হলো, নির্দিস্ট সময়ে রাতের ট্রেনে, চিটাগং মেইলে আমরা রওনা হলাম, সারা রাত ট্রেনে খুব মজা হলো, তাসে, ব্রে খেলে, অর্ধরাত্রি কাভার পরের অধাংশ ঢুলু ঢুলু চোখে, ঝিমুতে ঝিমুতে, চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌছানো গেলো, সেখান থেকে বাসে চেপে রাঙ্গামাটি, তারপর খালুর সরকারি জীপে করে বাসায় । কদিন খুুবে আনন্দ কাটলো, খালু , রাঙ্গামাটি লেকে স্পীড বোর্ডে ঘোরা, চাকমা পল্লীতে পিকনিক, চন্দ্রঘোনায় কর্নফুলী পেপার মিল দেখা, কাপ্তাই জলবিদুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন, সবকিছুর ব্যবস্থা করলেন । তবে এবার ১৮ মাইল হাঁটার মতো কোন কষ্টের পোগ্রাম হলো না, তবে বিভিন্ন কালভার্টে, লাল ইট দিয়ে লেখা টুলু ও পিলু ১৯৬৪, এখনও জলজল করে দেখা যায় ।
গতবার রাঙ্গামাটি ভ্রমনের পর, পিলুর জেদাজেদিতে আমার যে কষ্ট হয়েছিলো তার পরবর্তী আর একটি দুঃখময় স্মৃতি চিরদিন আমার মনে থাকবে । ঢাকায় ফিরে বড় খালার বাসায় ২/৩ দিন থাকার পর, আমার ভীষন জ্বর এলো, এতো জ্বর যে আমি জ্বরের ঘোরে ভুল বকতে লাগলাম, ফারুক ভাই তখন ডাক্তার হয়ে গেছে, ইন্টার্নি করছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজে । উনার ডিউটি ওর্য়াড নং ৩এ, ঐ সময় ফারুক ভাই আমাকে দিয়ে মেইন ওয়ার্ডের ৩০টি সিট নাম্বার এবং বারান্দায় আরো ১০টি সিট নাম্বার আলদা আলদা করে লিখিয়ে নিয়েছিলো । আমি খুব যতেœর সাথে সম্পুর্ন লেটারিং এর নিয়মে, ৭ঃ৪ মাপে, কোন রকম লাইট ট্রেসিং ছাড়া, ইংকিং করে কেন্ট পেপারে লিখে দিয়ে ছিলাম, লেখাগুলি নিম্নরুপ ছিলো MU-111, WARD NO-1, BED NO-1 ….. 30, V- I………10 । আমার একদিনের জ্বর ও সামগ্রিক অবস্থা বুঝে ফারুক ভাই আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিলো, আমার সিট হলো ওর্য়াড নম্বর ১, বেড নম্বর ১, অদৃস্টের কি নির্মম পরিহাস, যে সিট নম্বর গুলো রুগিদের জন্য আমি লিখে দিলাম, সেই সিটেরই আমি এখন পেশেন্ট । হাসপাতালে প্রথম দিন ঘোরের মধ্যে কেটে গেছে টের পাইনি, পরদিন সকালে অনুভাব করতে লাগলাম বিশাল হল ঘর,ওর্য়াড নম্বর ১, সারি সারি বেড বিছানো ,প্রতি সারিতে ১০টি করে বেড, মোট ৩০ বেডের ওর্য়াড, অতিরিক্ত রোগীদের জন্য বারন্দায় ভি- ১ থেকে ভি -১০ পর্যন্ত । আমার সিটটি একবারে দেওয়ালের ধারে, আমার পায়ের দিকে বিশাল এক টেবিল নিয়ে আর ঔষধ নিয়ে বসে স্টাপ নার্স ,খিটে খিটে তার মেজাজ, রোগীদের সাথে একটা না একটা কিছু নিয়ে রাগ করেই চলেছে, তার ডিউটির ৮ ঘন্টার সম্পুর্ন টাই । দুপুর ২ টার সময় অন্য স্টাফ নার্স আসে, একই রকম কুচি দেওয়া সাদা শাড়ি, তার উপর সাদা ব্লাউজ, কোমরে কালো বেল্ট, মাথায় সাদা বিশেষ টুপি, রাত ১০টায় আবার স্টাফ নার্সের পরিবর্তন । নার্সদের কাজ ঘড়ি দেখে প্রত্যেকটি রোগীকে ঔষধ খাওয়ানো, মুখে থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মেপে, চার্টে লেখা, ডিউটি ডাক্তারের নির্দেশ পালন করা আর প্রফেসর আসলে তটস্ত থাকা ।
দেখতাম, স্টাফ নার্স সার্বক্ষন ব্যাস্ত থাকে, কারো ইনজেকশন দেওয়া, কারো রক্ত নেওয়া, রোগীকে ডিসচার্জ করা, নতুন রোগীকে এডমিট করা, আর ডিউটি ডাক্তার এর ফুট ফরমায়েশ খাটা। স্টাফ নার্সদের টেবিলের পিছনে একটা ছোট ঘর, ডাক্তারের ঘর, সব সময় পর্দা দিয়ে ঘেরা, রাতে ডিউটিতে ডাক্তার সাহেব সেখানে বিশ্রাম নেন আর স্টাফ নার্সদের সাথে গল্প করেন, হয়তবা প্রেমও করেন । ঠিক সকাল ৮টায় আসত ছাত্রী নার্সরা, অল্প বয়েসী মেয়েরা, ফিটফাট পোষাক, বেশ সুশ্রি দেখতে, ওদের কোমরে সবুজ রঙ্গের বেল্ট, মাথায় সবুজ টুপি, দেখলে বোঝা যায় এরা শিক্ষানবিশ, আসল রোগীদের সেবা এরাই করতো, দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে রোগীদের কাছে পানি নিয়ে যাওয়া,ঔষধ খাওয়ানো, আর স্টাফ নার্সদের হুকুম পালান করা । সকালের নাস্তায় এলো দুই স্লাইস পাউরুটি, এক টুকরো মাখন, একটা সিদ্ধ ডিম ও এক গ্লাস দুধ, একবারের রাজকীয় খাবার, কিন্তু আমার তো জ্বর, মুখ বিস্বাদ, নোন্তা, খাওয়ার কোন ইচ্ছাই নাই। কিন্তু ঐ ছাত্রী নার্সদের ভিতরে একজন শ্যামলা, নমনীয় চেহেরা, আমাকে খাওয়ানোর জন্য নানান ভাবে চেস্টা তদবির করতে লাগলো অবশেষে এক স্লাইস রুটি ও সিদ্ধ ডিমটি খেলাম, দুধ খেতে পারলাম না । পরে বুঝলাম আমি ডাক্তার ফারুকের ভাই, এটা জানা জানি হয়ে গিয়েছিলো তাই সবাই মিলে আমার একটু অতিরিক্ত খাতির যতœ করছে । ছাত্রী নার্সটির নাম বেলা, প্রতিদিন ডিউটিতে এসে অনেকটা সময় আমার সাথে গল্প করার ছুতো খোজে, নিজের পরিবারের কথা বলে, নানান গল্প করে, দুতিন দিনের পরিচয়ে মেয়েটিকে ভালো লাগতে লাগলো, একদিন ঐ মেয়েটি না আসাতে, জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম অন্য ওয়ার্ডে তার ডিউটি দেওয়া হয়েছে, আর হয়ত কোন দিনই ঐ মেয়েটি আসবে না, আমার ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করবে না, হয়ত আর কোনদিন দেখাই হবে না
ইতিমধ্যে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আমার আরও একটি উপসর্গ দেখা দিলো, দুই পায়ের উরুদ্বয়ের জয়েন্ট প্রচন্ড ব্যাথা, রেকটাম বা মলদ্বারে অসম্ভব ব্যাথা, চলাচল করতে অসুবিধা, টয়লেটে যাওয়ার সময় প্রান বাহির হয়ে যাওয়ার উপক্রম । তখন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া হলো, কেউ বলতে লাগলে পাইলস বা ভগন্দর, যা একটা খারাপ ধরনের অসুখ । বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, বিশেষ যন্ত্র দ্বারা পরীক্ষা করে বুঝতে পারলো ওসব কিছু নয়, রেকটামের দু ওয়ালে এ্যাবসিস হয়েছে, যা হোক বিশেষ, নানাবিধ ঔষধ খেয়ে, সাতদিন হাসপাতালে থেকে, সুস্থ হয়ে হলে ফিরে আসলাম । আসার সময় বার বার বেলার কথা মনে হচ্ছিল, ওর করুন চাহনি আর সাবলীল কথা বার্তা, মনে হতে লাগলো যদি আর এক বার দেখা হতো । রাত ১০ টার পর ওর্য়াডের দৃশ্য অন্যরকম, রাতের খাবার সন্ধ্যা লাগার সাথে সাথে দিয়ে দেওয়া হয়, রাত ১০টায় লাইট বন্ধ, রোগীরা হয় ঘুমাচ্ছে, নয় যন্ত্রনায় কাতারাচ্ছে, কেউ না ঘুমাতে পেরে কড়িকাঠ গুনচ্ছে,আর ডাক্তার ও স্টাফ নার্স, মনের সুখে গল্প করছে, হাসপাতালের সকল ওয়ার্ডেই এই একই রকমের দৃশ্য সর্বত্র।
ট্যালেন্টপুলে স্কলারসিপ পাওয়ার পর, আমার মাস চলাতে বেশ সচ্ছলতা এসে ছিলো বরং প্রতি মাসে কিছু কিছু সাশ্রয় হতো, আর বার্ষিক বই কেনার টাকাতো হাতে থেকেই যেত। এর মধ্যে ১৯৬৪ সালে, চুয়াডাঙ্গা শহরে প্রথম বারের মতো বিদুৎ ব্যবস্থা চালু হলো, ঘরে ঘরে আনন্দের ঢেউ, সবাই এখন থেকে বিজলি বাতি জ্বালাবে, সিলিং ফ্যান ঘুরাবে ইত্যাদি, এক অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেলো । আমাদের চুয়াডাঙ্গার বাড়িতে বিদুৎ নেওয়া দরকার, কিন্তু বাবার হাতে হয়তো যথেস্ট খরচের টাকা নাই, আমাকে মুখ ফুটে কিছু বলছেও না, তবে আমি বেশ বুঝতে পারছি। বাবার বড় ছেলে হিসাবে, এখন থেকে অনেক দায়িত্ব, আমার উপর বর্তাবে, আর তাছাড়া তিনটা ভাই বোনের পড়াশুনা ও সংসার চালাতে বাবাকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়, তারপর আমার জন্য মাসিক ৪০ টাকা তো আছেই । সব ভেবে চিন্তে সিন্ধান্ত নিলাম, বাড়িতে বিদুৎ আনার খরচ আমি বহন করব, বাড়ির জন্য ওয়্যারিংয়ের বৈদ্যতিক ডিজাইন ও নকশা বানালাম, লিষ্ট করে সমস্ত মালামাল নবাবপুর মার্কেট থেকে কিনলাম এবং একদিন সবকিছু কার্টুনে ভরে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম, আমার সর্বসাকুলে খরচ হলো ৬৮০ টাকার মতো । বাবা মা খুশি হলো এই ব্যবস্থায়, বাড়িতে বিদুৎ সংযোগ হলো । এই ভাবে প্রথম থেকেই আমাকে সংসারের কিছু কিছু দায় দায়িত্ব নিতে হতো ।
তখনকার দিনে পাকিস্তান বিমান বাহিনির রিক্রুটিং সেন্টার ছিলো পুরারতন যাদুুঘরের পাশে, বর্তমান চাংখারপুলের কাছে, টিবি হাসপাতালের বিপরীতে, বর্তমান এশিয়াটিক সোসাইটি প্রাঙ্গনে ।
পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জন্য জি.ডি পাইলট বা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর এর জন্য তারা কারিগরি জ্ঞান ও মেধা সম্পন্ন লোক নির্বাচনের চেষ্টা চালাচ্ছে । ঐ অফিসের প্রধান স্কোয়াড্রন লিডার সাইদ আহমেদ সাহেব বাঙ্গালি, উনি কয়েকবার আমাদের বিশ্বাবিদ্যালয়ে এসে, ভাইস চ্যন্সলর সাহেব ও ডি .এস. ডাবলু এর সঙ্গে দেখা করে মেধা আহরনের প্রয়াস নিয়েছে । অনেক কাঠখড়ি পোড়ানের পর তিনি একটি সেমিনার করার অনুমতি পেলেন, ১৯৬৬ সালের জুন মাসের দিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে একটি সেমিনার হলো, থার্ড ইয়ার এবং ফোরথ ইয়ার ইলেকট্রিকাল এবং মেকানিকাল ছাত্র দের নিয়ে, উনি বিশদভাবে বক্তৃতা করলেন, বিমান বাহিনির অতিত, ভবিষৎ নিয়ে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা বিমান বাহিনীতে গেলে কি ধরনের মর্যদা পাবে, কি ধরনের, কিভাবে কমিশনড হবে ইত্যাদি বিস্তারিত ফিরিস্তি । তিনি এও বললেন যে কমিশন প্রাপ্তির পর প্রথম যে পরিচিতি পার্টি হবে, সেখানে ১৭৫ টাকা দামের জুতা পরিযে উপস্থিত করা হবে, ইত্যাদি নানা ধরনের প্রলোভন, বেতনের ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার বর্ননা দিয়ে আমাদেরকে উৎসাহিত করলেন । আমরাও মোটামুটি উৎসাহিত হয়ে, ওদের খাতায় নাম লেখালাম, রিক্রুটিং সেন্টারে প্রাথমিক পরীক্ষায়, মেডিকেল ফিট হলে, আমাদেরকে আই. এস. এস. বি পরীক্ষার জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো । আমরা তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষ মিলে ৩০ জনের একটা দল, ৪ দিনের জন্য আই. এস. এস.বি পরীক্ষার অবতীর্ন হতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গেলাম । প্রথম দিনেই বিকালে আমাদের কিছু সাইকোলজিকাল টেস্ট হলো, যেমন কোন শব্দ নিয়ে ইংরেজ বাক্য রচনা, কোন এক ছবি নিয়ে বর্ননা, ইংরেজিতে কথপোকথন, বিভিন্ন রঙ্গের ভিতর রং চিনে নেওয়া বা কালার ব্লাইন্ড পরীক্ষা, এসব পরীক্ষার পর রাতে, রাজকীয় ডিনার পরিবেশিত হলো এবং পরের দিনের প্রোগাম জানিয়ে দেওয়া হলো । পরদিন মুলত ফিজিক্যাল পরীক্ষা বা আউডডোর শারিরিক কসরত, যেমন বিভিন্ন ধরনের বাধা অতিক্রম করা, ঝুলন্ত গাড়ির টায়ারের ভিতর দিয়ে লাফ দেওয়া, একধরনের হার্ডল রেস, রোপ রেস বা বানর ঝোলার রেস, ইত্যাদি নানা ধরনের শারিরিক কসরত আমাদেরকে করতে হলো । আমাদের তো এসবের অভ্যাস ছিলো না, তবুও কমান্ডো পরীক্ষার জন্য এগুলো করতে হলো, বানর ঝোলার রেস করতে গিয়ে আমাদের বন্ধু মিজান, বিশ ফুট উপর থেকে পড়ে হাত ভেঙ্গে ফেলল ইত্যাদি নানা ঘটনা দুঘটনার ইতিহাস। দুপুরের লাঞ্চ এর পর, আবার শুরু হলো ডিবেট কম্পিটিশন, স্ট্রেটেজিক ডিসিশন,মেকিং এবং গ্র“প ডিসকাশন, তারপর সেদিনের মতো শেষ । পরদিন ভাইভা পরীক্ষা, বোর্ডের ডাইরেক্টর একজন পাঞ্জাবী কর্নেল, ৬ ফিট লম্বা, প্রায় আধঘন্টা ধরে আমাকে প্রশ্ন বানে জর্জরিত করলো, যেমন কি পত্রিকা পড়ে গেছি, জবার দিলাম ইত্তেফাক । প্রশ্নে করা হলো, কেন ইত্তেফাক পড়ি, তখনকার দিনে পুর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার এর উপর নানান প্রশ্ন, শেখ মজিবুর রহমানের ছয় দফা দাবি কি কি , আমি সার্পোট করি কিনা, করলে কেন করি, কথায় কথায় নানা রাজনৈতিক প্রশ্ন এসে গেলো । তখন এমনিতেই উত্তাল পুর্ব পাকিস্তান, আন্দোলনের জোয়ার চেপে থেকে মাঝে মাঝে ফুসে উঠছে, শেখ মজিবুর রহমানের, পুর্ব পাকিস্তানের জন্য ৬ পয়েন্টর দাবির উত্থাপন, পুর্ব পাকিস্তানের অর্থ , বানিজ্য, আমদানি, রপ্তানির অটোনমি, ইত্যাদি আমি দারুনভাবে সার্পোট করি । কর্নেল সাহেব আমার ভিতর থেকে, মনের খবর জেনে নিচ্ছে ,আর মিটি মিটি হাসছে, তখনকার দিনে পুর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভিতরে যেয়ে অসামঞ্জস্য বা অসমতা আছে, তা অকপটে আমার জবানিতে, কর্নেল সাহেবকে জানিয়ে দিলাম । প্রাথমিক সিলেক্টশনের সময স্কোয়াড্রন লিডার সাইদ সাহেব বলেছিলেন মনের যা মত বা ইচ্ছা অকপটে বলবেন, কোন কিছু লুকাবেন না, কোন অসুবিধা হবে না , আপনি যে একজন স্পস্টবাদি বা সত্যবাদি তা প্রমান হয়ে যাবে । এদিনে ভাইভা পরীক্ষার পর আর কোন প্রোগাম ছিলো না। পরের দিন বৃহস্পতিবার ফলাফল ঘোষনা করা হবে, বোর্ডে টাঙ্গিয়ে বা নোটিশের মারফতে নয়, একেক জন কে রোল নম্বর ধরে ডাকছে, আর সিলেক্টশন বোর্ডের ফলাফল ব্যাক্তিগত ভাবে জানিয়ে দিচ্ছে। একসময় আমার ডাক পড়লো, বোর্ডের ডাইরেক্টর কর্নেল সাহেব আমাকে বললেন, The board is very sorry to say, that Roll no, 9 is not selected, because you are very much political minded, you take your  T.A & D.A and go back to your Studies”. মাথা নিচু করে বোর্ডের রেজাল্ট জেনে বেরিয়ে আসলাম। T.A & D.A বাবদ তিন টাকা পচাত্তর পয়সা বুঝে নিয়ে, ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে একটা বেবী ট্যাক্সি করে হলে ফিরে আসলাম । আমার পাকিস্তানের এয়ারফোর্সে যোগদানের ইচ্ছা বা সাধ আপাততঃ শেষ হলো, হলে এসে, বিস্তারিত অভিজ্ঞতা সবাইকে জানালাম, কেউ হাসল, কেই সমালোচনা করলো, আবার কেউ পরামর্শ দিলো, আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এ এক বিরাট অধ্যায় হয়ে থাকলো।
১৯৬৬ সাল, শেষ সেমেস্টারের শেষ ভাগ, পড়াশুনার চাপ বেড়েছে, সামনে ফাইনাল পরীক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডির্পাটমেন্টের ছাত্র বিষয়ক অনেক কাজই, শেষ বর্ষের ছাত্র হিসাবে আমাদের করতে হতো । এ বছরে পুর্ব পাকিস্তান কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রথম বারের মতো ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এম.এস ডিগ্রী দেওয়া হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটা বড় খবর, আর ইলেকট্রিকাল ডির্পাটমেন্ট এর জন্য একটা বড় প্রাপ্তি । আমরা এম. এস ডিগ্রী প্রাপ্ত তিন জন বড় ভাইকে সম্বার্ধনা দেওয়ার সিন্ধান্ত নিলাম, বিভাগীয় প্রধানও আমাদেরকে উৎসাহিত করলেন । ঐ অনুষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র স্যারেরা, ভাইস চ্যান্সলর সাহেব আমন্ত্রিত হলেন, বিশেষ অতিথি হিসাবে আমন্ত্রন জানানো হলো বিখ্যাত বিজ্ঞানী, বর্ষিয়ান পন্ডিত, ডঃ খুদরদ-ই-খুদা সাহেব কে । অনুষ্ঠান বিকাল ৪ টায়, স্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার হল, আমাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষ, হঠাৎ করে আকাশ ভেঙ্গে ঝম ঝম করে বৃষ্টি আসলো, সে কি বৃষ্টি, এক ঘন্টার তুমুল বৃষ্টিতে মনে হলো ঢাকার রাস্তা ঘাট সব ডুবে গেছে । প্রধান অতিথি কিন্তু বৃষ্টির আগেই পৌঁছে গেছেন, আর উদ্দোক্তারা, আমরা তো আছিই, স্যারেরা, হেড স্যার, ভাইস চ্যন্সেলর স্যার, এমনকি যাদেরকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে তারাও তখন এসে পৌছায় নি । অবশেষে বৃস্টি ছাড়লে আস্তে আস্তে সবাই এসে পড়ল কিন্তু প্রধান অতিথি মহোদয় বড়ই বিরক্ত হলেন । এরপর অনুষ্ঠান, ফুলের মালা দেওয়া, বক্তৃতামালা, প্রধান অতিথি ভাষন, সবই সুচারু রুপে সম্পুর্ন হলো, সার্থক একটি অনুষ্ঠান সেদিন আমরা উপহার দিতে পেরেছিলাম । সেদিনের কথা, প্রথম এম.এস ডিগ্রী প্রাপ্ত হাসিবুর রহমান ভাই, কাজী ভাই এবং আর একজন ভাই যার নাম মনে নাই তাদের জীবনেও নিশ্চয়ই স্মরনীয় হযে থাকবে।
দেখতে দেখতে ফাইনাল বি. এস. সি ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষা এসে গেলো একদিন হয়েও গেলো, প্রস্তুতি মোতাবেক পরীক্ষা মোটামুটি ভালো হলো, জোর দিয়ে বলতে পারবো না ফাস্ট ক্লাস পাব, পেলেও পেতে পারি । সমস্যা ছিলো আমাদের ইলেকট্রিকাল ডিপাটমেন্টে ৫০০ মার্কের থিওরোটিকাল পরীক্ষা, আর ৩০০ মাকের্র থিসিস, থিসিসে ভালো করতে পারলে নির্ঘাত ফাস্ট ক্লাস । কিন্তু প্রথম থেকেই থিসিসের বিষয়টি ভালো না পাওয়ায়, মনে শঙ্কা রয়ে গেছে ফাস্ট ক্লাস পাওয়া নিয়ে, থিসিসে ভালো মার্ক পেলে, মোটামুটি ৭০% পেলেও ফাস্ট ক্লাস কনফার্ম । কিন্তু ভয় একটাই থিসিসের বিষয় এবং সুপারভাইজার স্যার ড.আজিজুল হক, কি হয় কি জানি । পরীক্ষা শেষে থিসিস জমা দেওয়ার পালা তখনকার দিনে কম্পিউটার ছিলো না, প্রিন্টার ছিলো না, বাহির থেকে ভাড়া করে নিয়ে এসে, দিন রাত টাইপ করে, পরে বই আকারে, নিউ মার্কেট থেকে বাঁধিয়ে, পরে ডির্পাটমেন্টে জমা দিতে হতো । যেহেতু আমার প্রজেক্ট থিওরটিকাল এবং অল্প কিছু পরীক্ষামুলক তাই লেখালেখির অংশটা বেশি । ঐ সময় ২৫০ জন ছাত্রের সকলেরই থিসিস জমা দেওয়ার সময়, টাইপিস্ট পাওয়া দুঃস্কর, তখন ভাড়ায় পাওয়া যেতো, এ সমস্ত টাইপিস্টরা বর্তমান উসমানি উদ্যানের দক্ষিন দিকে, নগর ভবনের বিপরীতে, গাছ তলায় অথবা খুপড়ি ঘরের নিচে, প্রত্যেকে একটি করে টাইপ মেশিন নিয়ে, লাইন করে বসে থাকতো । ওখান থেকে তাদের সাথে কথাবার্তা বলে ধরে আনতে হতো, তখন এমন অবস্থা যে, টাইপিস্ট নিয়ে কাড়াকাড়ি, যা হোক অনেক ঘুরে ঘুরে ৩০০ টাকার বিনিময়ে ৩ দিনের জন্য একজন টাইপিস্ট পেলাম, জোর কাজে লেগে গেলাম । টাইপিস্ট সাহেব দিনে রাতে ৭/৮ ঘন্টা টাইপ করেন, বাকি সময়টা আমি বিভিন্ন ছক আঁিক, ড্রয়িং করি, বিভিন্ন রঙ্গের কালি দিয়ে নকশা আকিঁ । সপ্তাহ খানেক এর ভিতরে প্রায় ১৮০ পৃষ্ঠার থিসিস রেডি হযে গেলো, সবুজ রেক্সিন দিয়ে সুন্দর করে বাঁধাই ও সোনালি হরফে থিসিসের নাম লিখে, আল্লাহর কথা স্মরন করে দুরু দুরু বক্ষে জমা দিলাম । এই থিসিসের মার্কই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, যদি ফাস্ট ক্লাস পাই, তবে শিক্ষকতা পেশা হিসাবে বেছে নেবো, নচেৎ যে কোনে প্রতিষ্টানের গতবাধা সহকারী প্রকৌশল হিসাবে চাকুরী নিতে হবে ।
ফাইনাল পরীক্ষার আগে থেকেই আমার বন্ধুরা চাকুরীর চেষ্টা করে যাচ্ছিল যেমন ই.পি.আই.ডি.সি, ই.পি.এ. ডি.সি, ই.পি. ওয়াবদা, রোডস এন্ড হাই ওয়েস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে, দেন দরবার চালিযে যাচ্ছিল । আমি মন থেকে চাকুরীর চেষ্টার সাড়া পাচ্ছিলাম না, আমার কাছে রেজাল্টই বড়, রেজাল্টের পরেই চাকুরীর গতি প্রকৃতি নির্ধারন করা যাবে, তাই সাগ্রহে শঙ্কার ভিতর দিয়ে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিলাম । বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, হলও বন্ধ, আমি তাই স্বাভাবিক ভাবেই বড় খালার বাসায় অবস্থান করছি । একটা কথা এতোদিন বলা হয়নি, বড় খালার ছোট মেয়ে সন্তু বুবু আমার থেকে বড়, কিন্তু মানসিক প্রতিবন্দি, তাই খালার বাসায় বিশেষ করে খালা, সব সময় সন্তু বুবুর দিকে নজর রাখতে হয়, কারন কখন কি করে বসে বলা যায় না । এমনি এক সময়ে খুব সম্ভব ২২শে ডিসেম্বর, ১৯৬৬, রাতে আমি আর ফারুক ভাই এক খাটে শুয়ে আছি, হঠাৎ রাত ৩টার দিকে খালার ডাকে ধড়ফর করে উঠে পড়লাম, সন্তুবুবুর অবস্থা খুবই খারাপ, ফারুক ভাই ডাক্তার মানুষ, বিপদ কালিন সব ঔষধ ও ইনজেকশন ঘরেই থাকে, অবস্থা বিবেচনা করে ফারুক ভাই প্রথমে সন্তুবুবুর হাতে একটা ইনজেকশন দিলেন, ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাক, পালস পাওয়া যাচ্ছে না, খুবই জরুরী অবস্থা, ফারুক ভাই সব শেষ চিকিৎসা হিসাবে, সরাসরি হার্টে কোরামিন ইনজেকশন দেওয়ার চেস্টা করলেন। বিপদ কখনও একা আসে না, ইনজেকশন প্রস্তুত করতে যেয়ে, এম্পুল ভাঙ্গতে যেয়ে, ফারুক ভাইয়ের হাত কেটে রক্তারক্তি। ফারুক ভাই, হার্টে ইনজেকশন দিলেন, সন্তু বুবুর এলিয়ে পড়া দেহেটি আমার বুকের উপর, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না । শেষ পর্যন্ত হার্ট পাম্প করা হলো, হার্ট রেসপ›ড করছে না, মাউথ টু মাউথ রেসপিরেশন দেওয়ার চেস্টা করা হলো কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না । ফারুক ভাই যখন হাল ছেড়ে দিয়ে বারন্দায় যেয়ে বসেছে, খালা পাগলের মতো কান্না কাটি করছে, নিনাবুবু চিৎকার দিয়ে কাদঁছে, আর আমি তখন কিছু করতে না পেরে ৩ নম্বর রোডে ড. লস্কর সাহেবের বাসায় ডাকাডাকি করছি, আবার ২ নম্বর রোডে গিয়ে ড. খালেক সাহেব কে ডাকছি । কিন্তু গভীর রাত, কাউকে আমি জাগাতে পারলাম না, অবশেষে বহু ডাকাডাকির পর ড.খালেক ছুটে এলেন, পরীক্ষা করে দেখলেন, তখন সব শেষ, সন্তু বুবু আর বেঁচে নেই। কি এক মর্মান্তিক ঘটনা, পুরা পরিবারের উপর গভীর শোকের ছায়া পড়ল, পরদিন যথারীতি দাফনের কাজ চলতে লাগলো, আমি যেন মেশিনের মতো একটা পর একটা কাজ করে চলেছি, আমার কোন বিকার নেই, ক্লান্তি নেই, বিশ্রাম নেই, নেই কোনে অনুভুতি। সন্ধ্যার পর যখন দাফন করে ফিরে আসলাম, তখন সারা বাড়িটার উপর অন্ধকার গ্রাস করে ফেলেছে,আতœীয় স্বজনের কারো মুখে কোন কথা নেই, থেকে থেকে বড় খালা ডুকরে ডুকরে কাদঁছে। গতো ২৩টা বছর ধরে যে সন্তানটিকে আগলে রেখেছেন, গভীর শোকে, দুঃখে, বেদনায় মানুষ করেছেন, নানান ঘাত প্রতিঘাতের ভিতরে সব কিছু সামলে নিয়েছেন,আজ যেনো বাধ ভাঙ্গা জোয়ারের মতো খালাও ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাচ্ছে। আমার কথা, এতো কাছ থেকে কখন মৃত্যু দেখিনি, ছোটবেলায দাদীর মৃত্যু ও পরবর্তীতে ছোট বোনের মৃত্যু দেখেছি , সব শেষে জ্ঞান হয়ে সমপ্রতি সন্তু বুবুর মৃত্যু, আমি একটা বিরাট ধাক্কা খেলাম ।
সন্তুবুবুর মৃত্যুর পর কদিন সব কিছু ভুলে গেছিলাম, আমার পরীক্ষা, পরীক্ষার ফল, অজানা আশঙ্খা , সব কিছু বেমালুম ভুুলেই ছিলাম । ২৬ শে ডিসেম্বর সকালে মোজাম্মেল এসে খবর দিলো আজ রেজাল্ট বাহির হতে পারে, কিছুক্ষনের জন্য হলেও খালা বাড়ির এই আবদ্ধ আবহাওয়া, শোর্কাত পরিবেশ হতে বাচাঁর জন্য, বিশ্ববিদ্যালয় গেলাম, কিছুক্ষন ঘুরাঘুরি করে হলে গেলাম, হলে তো এখন আমাদের সিট নাই, সেই আহসানউল্লাহ হল,যেখানে আমার জীবনের সাড়ে তিনটি বছর কেটেছে, যাকে বড় আপন করে পেয়েছিলাম, সেই হল, যেন কেমন পর পর, অচেনা লাগছে, কত সুখ দুঃখের স্মৃতি বিজড়িত আহসানাউল্লাহ হল, কিছুতেই কিছু ভালো লাগছে না । দুপুরে মেডিকেল হোস্টেলের সামনে বকশি বাজারের পপুলার হোটেল থেকে কিছু খেয়ে নিলাম, মোজাম্মেল অবশ্য আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে সকাল থেকে সাথে সাথেই আছে,,বেলা ৩ টার দিকে আবার বিশ্ববিদ্যালয় গেলাম ফলাফল দেখার জন্য । নোটিশ বোর্ডে রেজাল্ট টাঙ্গিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভয়ে ভয়ে রেজাল্ট শিটের দিকে আগাতে পারছিলাম না, এমনি একটা সময়, জীবনের চরম জয় পরাজয়ের মুর্হুতে, মোজাম্মেল এসে খবর দিলো যে আমি সেকেন্ড ক্লাস ফাস্ট হযেছি, ফাস্ট ক্লাস পাইনি, ৮ জন ছাত্র ফাস্ট ক্লাস পেয়েছে, আমার পজিশন নবম । আমার জীবনের স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলো, যেন এক অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় ,অমানবিক উপহাস । ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হলো নিজেকে, নিজের ২২বছরে জীবনকে, সস্নেহে প্রতিপালিত নিধারুন আশাকে, মুহুর্তের জন্য মনে হলো জীবন একটি কষ্ট, একটি গ্লানি, একটি আশা ভঙ্গের ইতিহাস, একটা সংঘাতময় পরিনতি এবং শেষ পরাজয় ।
মোজাম্মেল ও সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে ও কিন্তু একটুও দুঃখ পায়নি, তাই সে আশাহত নয়, কিন্তু আমি, আমার কাছে এটা জীবন মৃত্যু সন্ধিক্ষন। উদভ্রান্তের মতো বাসায় ফিরে আসলাম, নিনাবুবুকে জানালাম ফলাফল, মুহুর্তেই সারা বাড়ি রটে গেলো ফলাফলের কথা, খালা শোকের উপর আর একটা বড় শক পেয়ে পাথর হয়ে গেলেন । কদিন এভাবে কেটে গেলো, মোজাম্মেল রোজই আসে, আমাকে সান্তনা দিতে চায়, বাড়ি থেকে মাও এসেছে শোকের বাড়িতে, মাকে দেখে যেন আমার দুঃখ,আমার বেদনা, আরো উদ্বেলিত হয়ে উঠল, মায়ের বুকের ভিতর মাথা রেখে অনেকক্ষন কাদঁলাম, মনে হলো কিছুটা শান্তি পেলাম । মাও নানা ভাবে আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করলো, যে জীবনের এইতো শেষ নয়, সারা জীবনতো পড়ে আছে, এই ভাবে কত ঘাত প্রতিঘাত আসবে, এইভাবে ভেঙ্গে পড়লে শক্তভাবে দাড়াবি কি করে । মায়ের কথায় শান্তি পেলাম, সান্তনা পেলাম, শক্তি পেলাম, পেলাম দীর্ঘ জীবনের পথে পাড়ি দেওয়ার সাহস, অনুপ্রেরেনা, এবং একান্ত মায়ের দোয়া । [চলবে]

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

<