বটবৃক্ষের সালতামামি: পার্ট-৯,১০

বটবৃক্ষের সালতামামি: পার্ট-৯,১০ নভেম্বর ১৬, ২০১৭ ০ comments

-প্রকৌশলী এম. এ. মান্নান-

:নবম অধ্যায়:
পরীক্ষার ফলাফল ও ভবিষতের প্রথম সুচনা:
পাবনা কলেজের পাঠ শেষ করে, চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসলাম, দুমাসের আগে ফলাফল বেরোবে না । নিরবচ্ছিন্ন অবসরে সময় কাটলো না, কারন এরপরেই আসছে ভবিষত জীবনের নিদিষ্ট পথ, দুশ্চিন্তা লেগেই থাকল, পরীক্ষার ফলাফলের জন্য, নিদিষ্ট করে বলতে পারছিলাম না যে ফাস্ট ডিভিশন পাবই, আর পেলেও কত মার্ক পেয়ে, প্লেস পাওয়ার চিন্তা ছেড়েই দিয়েছিলাম । যা হোক এই দুমাসে, অনেকগুলো বিছিন্ন, বিবিধ কাজের সাথে জড়িয়ে পড়লাম । আমার থেকে দু বছরের জুনিয়র, চুয়াডাঙ্গার ছেলে হারুন, ও মেট্রিক পরীক্ষার আগে আমার কাছে অঙ্ক পড়বে বলে ধরে বসল, আমি রাজি হলাম, সত্যি সত্যি মাসিক ১৫ টাকা বেতনে হারুনকে দু মাসের জন্য প্রাইভেট পড়ালাম । সে এক আলদা অভিজ্ঞতা, এতোদিন ছিলাম ছাত্র, এখন হয়ে গেলাম শিক্ষক, খুব যতœ করে আমার কাছে অঙ্কের যা কিছু ছিলো সব উজাড় করে হারুনকে শিখালাম । পরবর্তী কালে আমার ছাত্র হারুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্সে এম এস সি পাস করে পরবর্তী চুয়াডাঙ্গা কলেজের ফিজিক্সের শিক্ষক হয়েছিলো । প্রাইভেট পড়িয়ে হারুনের কাছ থেকে পাওয়া ৩০ টাকায় একটা চামড়ার সুটকেস কিনলাম, যা আমার পরবর্তী জীবনে অনেক কাজে লেগেছে।
এই কয়েকদিন বাড়িতে ছুটিতে থাকা অবস্থায়, সাংস্কৃতিক কাজের সাথে জড়িত হযে পড়লাম । ঈদ উপলক্ষে আমাদের পাড়ায়, একটি নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার ব্যবস্থা চলছে। পরিচালনা করবেন হালু খালা, আমি বাড়িতে আছি জেনে হালু খালা আমাকে খবর দিলেন, ইতিপুর্বে আমার অভিনয়ের (মেয়ে চরিত্রে) কিছুটা অভিজ্ঞতা ছিলো বলে, হালু খালা আমাকে মনোনিত করলেন। মঞ্চস্থ হবে বিনায়ক ভট্টাচার্যের ”মামা ভাগ্নে” নাটকটি । এই নাটকে ৫০ উর্ধে মামার চরিত্রে অভিনয় করতে হবে, ছিলো রমজান মাস, মাসব্যাপি চলল রির্হাসেল । ঈদের পরের সন্ধ্যায় আমাদের পাড়ার মন্টুদের বাড়ির লেবু গাছতলায় অস্থায়ী মঞ্চ স্থাপিত হলো, হাসির নাটক, আমি ধুতি পরে ও গেঞ্জি গায়ে মামার চরিত্রে অভিনয় করলাম, পাড়া প্রতিবেশিরা যথেস্ট আনন্দ পেল নাটকটি দেখে, বহুল প্রংশসিত হলো আমাদের অভিনয় ।
সবচেয়ে বেশি যে কাজে আমি নিয়োজিত থাকতাম তা হলো ভবিষত পরীক্ষার রেজাল্টের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষার দেওয়ার প্রস্তুতিতে। পাবনা থেকে আসার সময় ওখানকার বিপিন বিহারী লাইব্রেরী থেকে ইঞ্জিনিয়রিং এ ভর্তি পরীক্ষার জন্য জিওমেট্রিকাল ড্রইয়ের বই নিয়ে এসেছিলাম । কিছু না বুঝলেও বইটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম এবং আকাঁআঁকির চেস্টা করতাম। দেখতে দেখতে পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় হয়ে এল, জুলাই মাসের মাঝামাঝি একদিন হঠাৎ করে আই, এস. সি পরীক্ষার ফলও প্রকাশ হলো । মেট্রিক পরীক্ষা ফল প্রকাশের মতো, সেখানে ছিলো না কোন টানটান উত্তেজনা, ছিল না কোন বন্ধু বান্ধব নিয়ে টেলিফোন এক্সেচেঞ্জে যাওয়া, তবে আশঙ্কা ছিলো শতভাগ । ফিলই প্রথম জানালো রেজাল্ট প্রকাশিত হওয়ার কথা, দুজনে মিলে খবরের কাগজে রোল নম্বর খুজতে লাগলাম, আমার রোল ছিল বিজ্ঞান -৬২৬৪, মনের আবেগে প্রথম বিভাগে খুঁজতে লাগলাম এবং পেলাম প্রথম বিভাগের সর্বশেষ রোল নম্বরটি । রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগে মাত্র ৪৯ জন প্রথম বিভাগ পেয়েছে, কাজেই আমার পজিশন ৪৯তম, তবুও মন্দের ভালো । ফিল, হামিদুল, আনিস ইত্যাদি বন্ধু বান্ধাবরা দ্বিতীয় বিভাগ পেয়েছে, মোটামোটি ভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবনা কলেজের ফল আশানুরুপ হয়নি, আমি একাই শুধু প্রথম বিভাগ আর বাকী সব দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে। বাবা মায়ের কাছে, আত্মীয় স্বজনের সামনে, পাবনা কলেজের শিক্ষদের মনে, যদিও আমার এই ফলাফল কোনদিনই দাগ কাটবে না, তবু আমার সান্তনা যে আমার যোগ্যতা অনুযায়ী,আমার সামর্থ্য অনুযায়ী এর বেশি বোধ হয় আমার করার ছিলো না ।
এরপর আমার ব্যস্ততা বেড়ে গেলো, কোথায় কোথায় ভতির্র দরখাস্ত করবো, কোথায় কোথায় ভতির্র পরীক্ষা দিবো, এই নিয়ে উৎকন্টা ও দুঃশচিন্তা নিয়ে আমার সময় কাটতে লাগলো । আমার বাবা, আমার কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে কেমন যেন নিরানন্দ হয়ে পড়েছিলেন, আগের মতো উৎসাহ ভরে কিছু জিঙ্গাসা করতো না, কি করবো, না করবো তারও উপদেশ দিতেন না, কোন শাসনের বালাইতো নেই, যেন সবটাই আমার উপরে ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন । উনি গল্প করে বলতেন যে ছেলেমেয়েদের বয়স ১৮ বছর হলে তাদের কে আর শাসন করতে নেই, তখন তাদের সাথে বন্ধুর মতো ব্যবহার করতে হয় । এই জন্যই কি বাবা আমার সবকিছুতেই আগ্রাহ হারিয়েছেন। সপ্তাহ খানেক পর, রাজশাহী ছুটলাম মার্কশিট আনার জন্য, খুব ভোরে ট্রেনে চেপে রাজশাহী পৌছালাম ১০টার দিকে, ছুটলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার অফিস, লালকুঠিতে, মার্কশিট নেওয়ার জন্য আবেদন, টাকা পয়সা পরিশোধ করা ইত্যাদি ফরমালিটি শেষ করতে প্রায় বেলা ১ টা বেজে গেলো, কিন্তু অফিস জানাল যে আজ মার্কশিট দেওয়া হবে না । তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার ছিলেন চুয়াডাঙ্গার এ. আর. জোয়ারদার সাহেব, সবার কাছে তিনি মস্ত বড় ব্যক্তিত্ব, আমার দুঃসম্পর্কে আত্মীয় । উনার কথা বলাতে, অফিসে কিছুটা ফল হলো বলে মনে হয়, আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না যে আমি আর এখন বালিয়াকান্দি নামে অঁজ পাড়া গায়ের, টুলূ মিয়া নই, চুয়াডাঙ্গা স্কুলের খারাপ ছাত্র থেকে রুপান্তরিত মান্নান নই, পাবনার কলেজ জীবনে, অনেক ঘাত প্রতিঘাত খাওয়া এক আশ্চর্য মান্নান । মনে হলো অনেক চালাক হতে পেরেছি, আর আমি গোবেচারা নই, যাহোক বেলা তিনটার দিকে মার্কশিট পাওয়া গেলো । ফল প্রকাশের অল্পদিনের মধ্যে আবেদন করেছি বলে এতো তাড়াতাড়ি পাওয়া গেল, পরে শুনেছি বন্ধু বান্ধবদের মার্কশিট পেতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লেগেছে।
মার্কশিট পাওয়ার পর খুঁজতে লাগলাম রাজশাহীর সাগর পাড়ায় থাকেন, সেজে খালা, বাসা পেয়েও গেলাম, অনেকদিন পর দেখা হলো, নিলু ,মারু ও কেয়াদের সাথে, আমার ছেলেবেলার খেলার সাথী । খেতে খেতে বিকাল ৪টা হয়ে গেলো, তারপরে কিছুটা বিশ্রাম নিতে চোখে নেমে আসল রাজ্যর ঘুম, ততোক্ষনে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ৮টা বেজে গেছে, দুড়মুড় করে উঠেই দৌড়ালাম স্টেশনের দিকে, রাতের ট্রেনে রাজশাহী থেকে চুয়াডাঙ্গায় পৌছলাম। কদিন ভেবেচিন্তে, বন্ধু বান্ধবের সাথে আলোচনা করে,সর্বোপরি আমার শিক্ষক, আমার গাইড, ইসমাইল স্যারের সাথে আলাপ করে ঠিক করলাম, প্রথমে ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষা দিবো, তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সবশেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেমিস্ট্রিতে অর্নাস। আই. এস. সি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পেলেও মার্কশিটে মোট মার্ক ছিলো ৫২৪, কেমিস্ট্রিতে লেটার হয়েছে, ১৭৪ মার্ক, সব মিলে মোটামুটি একটা ফল । সিন্ধান্ত হলো আর দেরি না করে ঢাকায় চলে যাওয়ার ।
দিনক্ষন দেখে, আমার একমাত্র মামা, কবু মামার সঙ্গে ঢাকায় রওনা হলাম, জীবনের প্রথম ঢাকা গমন । তখন কার দিনে যাতায়াতের এমন সুবিধা ছিলো না, রাত ৯টায় ট্রেন, ঢাকা মেইলে চেপে গোয়ালন্দ পৌছাতে হলো রাত ১২ টার কিছুটা পরে, তারপর হইচই, তড়িঘড়ি করে নেমে, বেডিং সুটকেস নিয়ে ছুটতে হতো স্টীমারের সিট দখল করার জন্য । আমাদের ইন্টার ক্লাসের টিকিট, স্টীমারে, ইন্টার ক্লাসের স্বল্প পরিসর জায়গায় জোর জবর দস্তি করে বেঞ্চে তিন ফিট মতো জায়গায় বেডিং বিছাতে পারলাম, মামা শত হম্বিতম্বি তে কোন লাভ হলো না । যাহোক স্টীমার ছাড়ার পর মামা আমাকে বাঙ্কারে তুলে দিয়ে বলল, ”তুই ওখানে ঘুমা ” আর মামা নিচের তিন ফিট জায়গাতে উনার মোটাসোটা দেহ নিয়ে অকাতরে ঘুমাতে লাগলেন । বাবা ঢাকায় আসার আগে ঢাকা সমন্ধে অনেক নচিহত করে দিয়েছেন, যেমন রাস্তা ঘাটে চলার সময় মালামালের প্রতি খেয়াল রাখা, ঢাকায় গিয়ে রাস্তা হারিয়ে না ফেলা, ঢাকায় বড় খালার বাসা, ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোডের ১৩২ নম্বর বাসা চিনে রাখার নিদিস্ট চিহ্নগুলো কথা, ইত্যাদি নানা উপদেশ । প্রথম বারের মতো রাতে স্টীমারে চেপে আমি কি করব দিশা পাচ্ছিলাম না, পাশে রয়েছে ট্রাঙ্কের বদলে আমার সদ্য কিনা ২২ ইঞ্চি চামড়ার সুটকেস, ওটা পাহারা দেব, না ঘুমাব। যা হোক কোন সময় যেন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নাই, হঠাৎ লোকজনের কোলাহল, কুলিদের চেচাঁমেচি, শব্দে জেগে দেখি আরো কিছু লোক আমাদের কম্পার্টমেন্টে জায়গা নেওয়ার চেস্টা করছে । রাত তখন প্রায় ৩ টা, জানা গেল এটা চাঁদপুর, স্টীমারের একটা স্টপেজ, ঘন্টা খানেক পর স্টীমার চাঁদপুর থেকে ছাড়ল। ভোরের আলোয় দেখতে পেলাম স্টীমার এখন পদ্মা নদীতে, ঘোলা পানি, বেশ স্রোত,বি¯ৃ‘ন জলরাশি, কোন একটা তীর ঘেষে স্টীমারটি চলছে , মাঝে মাঝে মাছ ধরার নৌকা, লোকালয় থেকে গ্রামের মেয়েদের কলসি করে পানি নেওয়ার দৃশ্য, বড়দের দল বেধে গোসল করা ইত্যাদি নানা মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ।
বেলা ৮ টা বেজে গেল, মামা তখনও ঘুমাচ্ছে, আমি সুটকেস ফেলে তখন কোথায় যেতেও পারছিনা আবার বাঙ্কার থেকে নামতেও পারছি না । যা হোক হঠাৎ মামা জেগে উঠে আমাকে বলল ”যা হাত মুখ ধুয়ে আয়, নাস্তা করব ” । কিন্তু কোথায় যাব, আমি তো কিছুই চিনি না, তবু বাঙ্কার থেকে নেমে স্টীমার ঘুরে দেখতে লাগলাম, একটা সিড়ি বেড়ে নিচে নেমে দেখতে পেলাম, মোটামোটা গরম পাইপ, ধোয়া বেরুচ্ছে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম এটাই স্টীমারের বয়লার, এটাই স্টীমারকে চালায়, পরে দেখোিছ স্টীমারটি বিশাল লম্বা, দোতলা একটা জাহাজ, যার সামনে এবং পিছনে আস্তে আস্তে সরু হয়ে যাওয়া নৌকার মতো গঠন, স্টীমারের মাঝামাঝি, দুপাশে বড় বড় চাকার মতো দেখতে দুটা প্রোপেলার যা স্টীমারকে চালিত করে, স্টীমারের মাঝ বরাবর দোতলার উপরে বিশালকায় গোলাকার চিমনি । স্টীমারের দোতলায় সামনের দিকে প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেনীদের জন্য আরামদায়ক সিট এবং কেবিন, একদম সামনে খোলা ডেক, যেখানে বসলে নদীর সামগ্রিক দৃশ্য, আশেপাশের গ্রাম, গাছপালা, ঘরবাড়ির শোভা, সুর্যদয় ও সুর্যাস্তের অপরুপ শোভা দেখার ব্যবস্থা । দোতলার পিছন দিকটায়, তৃতীয় শ্রেনীর ডেক, চারিদিকে খোলা বিস্তুৃন ফ্লোরে যে যার মতো করে বেডিং অথবা চাদর বিছিয়ে সিট করে নিয়েছে, বন্ধু বান্ধাব অথবা পরিবার নিয়ে যেন সাময়িক আবাসস্থল। স্টীমারের নিচেরতালা সম্পুর্নটায় মালামাল বহনের জন্য, সেখানেও মাঝে মাঝে যাত্রীরা থাকা ও শোয়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছে ।
মোটামুটি স্টীমার ঘুরে দেখে আসার পর মামার সাথে নাস্তা বসলাম, মা আসার সময় সঙ্গে দিযেছেন পরোটা ও ভুনা মুরগীর মাংস । বেলা ১০ টা দিকে মনে হলো, স্টীমার আবার থেমেছে স্বল্পক্ষনের জন্য, জানা গেল জায়গাটির নাম লোহজং। আরো প্রায় দেড় ঘন্টা মতো স্টীমার চলার পর সাড়ে এগারটার দিকে স্টীমার, নারায়নগঞ্জে পৌছল, তড়িঘড়ি করে মালামাল নিয়ে স্টীমার থেকে নামার পর, বেশ কিছুটা হেটে রেল স্টেশনে পৌছালাম, সেখানে আগে থেকে দাড়িয়ে আছে সবুজ রঙ্গের ঊইজ লেখা ট্রেন। ঘন্টা খানেক এর ভিতরে ট্রেন ছাড়ল এবং ঢাকায় ফুলবাড়িয়া স্টেশনে পৌছল বেলা ১টা দিকে, সেখান থেকে রিকসায় করে ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোড, বাড়ি নং ১৩২, বড় খালার বাড়িতে পৌছানো । অনেকদিন পর বড় খালা,তার একমাত্র ভাইকে পেয়ে খুশিতে ডকমগ, সঙ্গে আমাকে পেয়েও খুশি । দুপুুের খাওয়ার পর বিশ্রাম, তারপর বিকালে সবার সঙ্গে পরিচয়, এরআগে আমার খালাতো ভাই, ফারুক ভাইকে একবার মাত্র দেখেছি, উনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে তৃতীয় বর্ষে পড়েন, খালাতো বোন নীনা বুবু আমার থেকে ৩ বছরের বড়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক অইতিহাস বিভাগে এম এ পড়েন, বড় খালার সবচেয়ে ছোট মেয়ে সন্তু আপা আমার থেকে অল্প বড়, মানসিক প্রতিবন্ধি। হঠাৎ করে বড় খালু মারা যাওয়ার পর,খালাদের মুল বসত বাড়ি ভাড়া দিয়ে পাশে স্বল্প পরিসর জায়গায় নির্মান করে নিজেদের বসবাসের ব্যবস্থা করে নিয়েছেন । একটা বড় ঘর, মাঝখানে কাঠের আলমারি দিয়ে পার্টিশন দিয়ে দুভাগ করা হয়েছে, সামনের দিকে একটা খাট, যেখানে ফারুক ভাই শোয়, আর খানিকটা বসবার জায়গা । পিছনের দিকে ঘরটায় দুটো খাট একটায় নীনা বুবু, অন্যটায় সন্তু বুবু ও খালা শোয়। উত্তরদিকের বারান্দায়, খাবার জায়গা, তারপাশে বুড়ি খালার ঘর, খাবার ঘরের একটু নিচের লেভেলে রান্না ঘর ও সিড়ির তলায় গোসলখানা ও টয়লেট, এই খালা বাড়ির অবস্থান । এখানে সামনের কিছুদিন আমাকে থাকতে হবে, আমার সাময়িক আবাসস্থল।

দশম অধ্যায়
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি ও ঢাকার জীবন শুরু
ঢাকায় পৌঁছাবার পরদিনই, ফারুক ভাই আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিয়ে গেলেন, সেখানে পলাশী হোস্টেলে হিন্দু ছাত্ররা থাকত । উনার বন্ধু তৃতীয় বর্ষের ছাত্র অসীম হাজরার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলো এবং ড্রয়িং পরীক্ষার প্রস্তুুতির জন্য সর্বাত্বক সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করল। ফেরার সময় ফারুক ভাই ঢাকার রাস্তাঘাট, কোন বাস উঠতে হবে, কোন জায়গা থেকে উঠতে হবে, কোন জায়গায় নামতে হবে ইত্যাদি বিশদ ভাবে আমাকে বোঝালেন । তখন ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোডের কাছে ২ নম্বর রোডের মাঝামাঝি জায়গায় নিপা অফিসের কাছে ৩ নম্বর রুটের বাস স্টপিজ ছিল, তখন বাস বলতে একমাত্র ই পি আর টি সির বাসই ছিল। ৩ নম্বর রুটের বাসটি মোহাম্মদপুর থেকে আসত, সাত মসজিদ রোড হয়ে নিউমার্কেট হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গুলিস্তান পর্যন্ত যেত। এই রুটের বাস আমার জন্য সহজ ছিলো, কিন্তু এই বাসের সংখ্যা ছিলো কম, অনেকক্ষন পর পর আসত । আর একটি বাসের রুট ছিলো, রুট নম্বর ২ ও ৫, এই বাস গুলো আসত মিরপুর হতে, ১০ থেকে ১৫ মিনিট দাড়ালে একটা না একটা বাস পাওয়া যেত। আমার জন্য দুটোয় সমান, যখন দেখতাম ৩ নম্বর রুটের বাস দেরি হচ্ছে, তখন একটু হেঁটে যেয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি বাস স্টপিজ থেকে ২ অথবা ৫ নং রুটের বাসে চেপে বসতাম, এস এম হল স্টপেজে নামতাম, একটু হেঁটে, অসীমদার হোস্টেল রুম নং ৫ এ পৌছাতাম। উনি নানান ভাবে আমাকে ড্রয়িংয়ে সাহায্য করতেন এবং নানা ভাবে ড্রয়িং সর্ম্পকে উপদেশ দিতেন, হাতে ধরে দেখিয়ে দিতেন । সেই অসীম হাজরা, ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার কিছুদিন পরেই ভারতে চলে যান , উনার বাবা মা থাকতেন নারায়নগঞ্জে, কি জানি কি অসুবিধা হওয়ায় ১৯৬৩ সালে উনারা দেশ ত্যাগ করেন ।
আর একজন ফারুক ভাইয়ের বন্ধু ছিলো হাদী ভাই, উনি ফোরথ ইয়ার মেকানিক্যালে পড়তেন, উনাদের বাসা ছিলো শান্তিনগরে, এখন যেখানে কর্নকর্ড টুইন টাওয়ার অবস্থিত, ঐ জায়গাটা উনাদের ছিলো। ফারুক ভাই পরিচয় করিয়ে দেবার পর কত যে, ঐ বাসায় গিয়েছি তা হিসাব নাই । গাছপালা ও বাগান ঘেরা ইটের দেয়াল ও টিনের চাল বিশিষ্ট সুন্দর ছিমছাম ছিলো হাদী ভাইদের বাড়ি । হাদী ভাইয়ের আর এক নাম ছিলো আহমেদুল আমিন, আমি উনাকে আমিন ভাই বলে ডাকতাম, উনিও আমাকে হাতে ধরে জিওমেট্রিক্যাল ড্রয়িংয়ের বিস্তারিত শিখিয়েছেন, কি ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে, তার বিশদ ভাবে বর্ণনা ও অনুুশীলনী করিয়েছেন । এমনকি আমার পরীক্ষা দেওয়ার সুবিধার জন্য উনার নিজের দামি “ফেবার লোবা” কোম্পনি ইনস্টুমেন্ট বক্স আমাকে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন । উনি ঐ বছরই ১৯৬২ সালে ফাস্ট ক্লাস পেয়ে পাস করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মেক্যানিকাল বিভাগের লেকচারার নিযুক্ত হন । আমার ড্রয়িংয়ে কৃতকার্যতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পেছনে আর একজনের দান ছিলো অপরিসীম, তিনি ফজলুল হক ভাই । আমরা যখন পাবনা দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোসোলজি বিভাগ হতে শিক্ষা সফরে পাবনা গিয়েছিলেন এবং আমাদের হোস্টেলে দুই রাত ছিলেন, আমাদের ঘরে, সেদিন উনার শোবার জন্য আমার সিটটি ছেড়ে দিয়েছিলাম । দুদিনের আলপে উনি আমাকে খুব কাছে টেনে নিয়েছিলেন, ঢাকায় ফিরে ইংরেজিতে চিঠি লিখতেন এবং আমাকে ইংরেজিতে জবাব দিতে বলতেন । আমার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা জেনে বলেছিলেন, ঢাকায় আসলে উনি আমাকে সাহায্য করবেন, কারন উনার কয়েকজন ভালো ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু আছেন । তাই ঢাকায় আসার পর উনার সাথে দেখা করি এস. এম. হলের, রুম নং ৯৫ তে, পরবর্তী উনি আমাকে নিয়ে যান ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যচলর শিক্ষকদের মেসে । সেখানে আলাপ হয়.কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হেবাবউদ্দিন ভাইয়ের সাথে, যিনি পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালের জাদরেল প্রফেসর, কেমিক্যাল বিভাগের ড. হেবাবউদ্দিন । আর একজনের সাথে আলাপ হয়, উনি মেকানিক্যাল বিভাগের লেকাচারর আনোয়ার হোসেন ভাইয়ের সাথে, তিনি পরবর্তী কালে মেকানিক্যাল বিভাগের জাদরেল প্রফেসর ড.আনোয়ার হোসেন হয়েছিলেন এবং পরবর্তী কালে আই. আই. টির ডায়রেক্টর পদে ও অনেকদিন কাজ করেছেন । এই সকল বিশিষ্টি ব্যাক্তিত্বের সাহচর্য, আমার ড্রয়িং পরীক্ষার ও পরবর্তীতে ভাইভা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ভালো এগুচ্ছিলো।
বাসে করে যাতায়াত ছাড়াও ফারুক ভাইয়ের একটা সাইকেল ছিলো, যেটা ব্যবহারের অনুমতি ফারুক ভাই আমাকে দিয়েছিলেন, তাই যখনই সময় পেতাম বিশেষ করে বিকালের দিকে, সাইকেল চালিয়ে, নিউমার্কেট আজিমপুর হয়ে পলাশি চলে যেতাম, আবার কোনদিন যেতাম শান্তিনগরের আমিন ভাইয়ের বাসায় । প্রায় মাস খানেক ড্রয়িংয়ের প্রস্তুতির পর আমার বিশ্ববিদ্যলয়ের এ্যাডমিশন টেস্ট শুরু হয়, ১৯৬২ সালে আগস্টের ১২ তারিখ। প্রায় এক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রম, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যা আহরন করেছিলাম তার যাচাই বাচাই হবে ঐ তারিখে, আমার স্বপ্নের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার চুড়ান্ত ফলাফল । আগের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশবোর্ডে সিট বন্টন দেখে আসলাম, আমার ভর্তি পরীক্ষার রোল নং ছিল ১৩, নিদিষ্ট দিনে সঠিক সময়ে দুরদুর বক্ষে হাজির হলাম পরীক্ষার হলে, পুরা ক্যাম্পস ভর্তি নতুন পুরাতন ছাত্রদের অসম্ভব ভীড়, কোন রকমে ভীড় ঠেলে নিজের সিটে বসতে পারলাম। পরীক্ষার হলে আসার আগে, বড় খালা অনেক করে দোয়া করলেন, বাবা মার সঙ্গে দেখা হলো না, তখন তাদের সাথে যোগাযোগ ছিলো শুধু চিঠিতে, মা বাবা পরীক্ষার তারিখটি জানতেন, তারাও নিশ্চয়ই নিঃশব্দে আমার কৃতকার্যতার জন্য দোয়া করে চলেছেন ।
প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে দেখলাম, আমার জন্য সহজ হয়েছে, আমিন ভাই ও অসীম দার নির্দেশ মোতাবেক জিওমেট্রিক্যাল ড্রয়িং আগে শেষ করলাম, লেটারিং এর নিয়মে লিখতে হবে UNIVERSTY, আর ইটালিকসে লিখতে হবে man is mortal, এগুলো সহজেই শেষ করলাম, ফ্রি হ্যান্ড ড্রয়িংয়ের আকতে দিয়েছে,কুর্নি, হাতুড়ি ও ভ্যালচা, কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে প্রশ্ন, কিছু অঙ্কের সমাধান এই নিয়ে ড্রয়িং পরীক্ষার প্রশ্নাবলি। সিলেকশন হবে আই.এস. সি পরীক্ষার ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, অঙ্ক পরীক্ষার মার্কের যোগফল ও ড্রয়িং পরীক্ষার ফলাফল, এই দুইয়ে মিলিয়ে লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে, ভাইভা পরীক্ষায় ডাক পড়বে। পরীক্ষা হলে পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে একটু সময় পায়নি এদিক ওদিক তাকবার, কোন রকমে প্রশ্নের উত্তরগুলো শেষ করতে পেরেছি । আমার পাশের রোল নম্বর ১৪ দেখলাম, সে বেশি কিছু লিখতে পারলো না, পরবর্তীতে সে ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি হতে পারে নাই, তবে পরে সে আর্কিটেকচারে ভর্তি হয়েছিল, আরো পরে সে বিখ্যাত স্থপতি হয়েছিলো নাম আসাদুজ্জামান আজও মনে আছে । মনে হলো ঘোরের মধ্যে তিনটা ঘন্টা পার হয়ে গেলো, পরীক্ষার হল থেকে যখন বেরুলাম তখন মনে হলো যে ঘাড়ের উপর থেকে একটা বোজা নেমে গেছে । পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করেছিলো প্রায় ১১০০ ছাত্র , সিলেকশন করা হবে ২৪০ জনকে, আর তার সাথে বিদেশি ছাত্র যথা আজাদ কাশ্মির, নেপাল ও পশ্চিম পাকিস্তুানের ছাত্র মিলে মোট ২৫৫ জন ছাত্রকে ১ম বর্ষে ভর্তি করানো হবে ।
বাসায় ফিরে সস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারলাম না, দুঃশচিন্তা জগদ্দল পাথরের মতো বুকের উপর চেপে বসল, কি জানি কি হয় ভেবে কিছুতেই সমাধান করতে পারছিলাম না, কারন যেখানে নটেরডেম কলেজ , ঢাকা কলেজ, কুমিল্লা ভিকটোরিয়া কলেজ, বিভিন্ন ক্যাডেট কলেজ এর ছাত্ররা পরীক্ষা দিয়েছে সেখানে অখ্যাত পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্রের কতখানি মুল্যায়ন করা হবে । এই ভাবে দুই দিন কেটে গেলো, ফলাফলের দিন, সকাল থেকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে জটলা করছি, সময় আর কাটে না, অবশেষে সবকিছুর অবসান করে, ডেপুটি রেজিস্টার সাহেব কয়েকজন লোককে সঙ্গে করে এসে নোর্টিশ বোর্ডে ফলাফলের শীট টাানিয়ে দিলেন, আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়লাম, সে এক বিস্রি ব্যাপার, ঠেলাঠেলি, গাদাগাদি, কার আগে কে ফলাফল দেখবে, বিভিন্ন কলেজের ছেলেরা দলবদ্ধভাবে এসেছে, তারা নিজের রেজাল্ট ছাড়াও বন্ধুবান্ধাববের রেজাল্ট বলে দিচ্ছে, কিন্তু আমার তো কোন বন্ধু নাই কে আমার রেজাল্ট বলে দিবে, যাহোক অনেক কস্টে আমার রেজাল্ট জানা গেলো রোল নম্বর, তালিকায় আছে, আমার রোলের আগে মাত্র ২জন সিলেক্ট হয়েছে । ২৪০ জনেরই ফলাফল দিয়েছে, আগামী কাল থেকে মেডিক্যাল পরীক্ষা । বিশাল এক আনন্দ অনুভুতি নিয়ে বাসায় ফিরলাম, আতœীয় স্বজন সবাই জানল, রাতারাতি আমি যেন বিখ্যাত হয়ে গেলাম, সবার চোখে কেমন যেন আমার জন্য প্রশংসা বানি, বাবাকে টেলিগ্রাম করে জানালাম খবরটি । পরদিন মেডিক্যাল পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় ডাক্তার নানাভাবে বিব্রতকর অবস্থায়, হারনিয়া, হাইড্রসিল ও চোখের পাওয়ারের পরীক্ষা একান্তু গোপনীয়ভাবে করলেন, দু থেকে তিন দিন ধরে মেডিক্যাল পরীক্ষা চলল, অবশেষে পঞ্চম দিনে চুড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হলো । আল্লাহর অশেষ রহমতে, পুর্ব পাকিস্তানের একমাত্র প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১ম বর্ষে ভর্তি হওয়ার চুড়ান্ত সিন্ধান্ত পেলাম । এটা আমার জন্য, আমার পরিবারের জন্য এমনকি আমার শহরের জন্য এক চুড়ান্ত পাওয়া । বাঘা বাঘা সব কলেজের ছাত্রদের সাথে ভর্তি যুদ্ধে জয়ী হওয়া, এক অসাধারন, অপ্রত্যাশিত পাওয়া । বাবাকে টেলিগ্রাম করা হলো ভর্তি জন্য টাকা পাঠানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হবে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সাল, প্রায় ২০ দিনের মতো ছুটি পাওয়া গেলো, আমি আবার চুয়াডাঙ্গায় ফিরে গেলাম ।
দীর্ঘ ক্লান্তির পর বাড়িতে ফিরে বেশ কিছুটা প্রশান্তির সঙ্গে সময় কাটালাম, খোঁজ খবর করতে লাগলাম, বন্ধু বান্ধবের কে কোথায় ভর্তি হয়েছে, ফিল সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছিলো বলে ও পাবনা কলেজে বি. এস. সি তে পাস কোর্সে ভর্তি হলো, হামিদুল অঙ্কে অর্নাস নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হলো, আনিস ও গফুর কেমিস্ট্রিতে অনার্স নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হলো । স্কুল জীবনের বন্ধু. ওবায়দুল ও রিয়াজুল যশোর কলেজে বি. এস. সি পড়তে লাগলো । স্কুল জীবনে ছিলাম বড় পরিসরের ছাত্র বন্ধুদের সাথে, কলেজ জীবনে পেয়েছিলাম তার থেকে এক বড় গন্ডির বিশাল এক ছাত্র সমাহারের । প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এসে এখানে মিলিত হবো সারা পুর্ব পাকিস্তুানের প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে হরেক রকম চরিত্রের বন্ধুদের সাথে, যেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, বিভিন্ন মেজাজের, বিভিন্ন গোষ্টির, অপুর্ব এক সমন্বয় । পাবনা কলেজ থেকে কেউ সুযোগ পেয়েছে কিনা এখন পর্যন্ত জানতে পারি নাই, বিশ্ববিদ্যালয় খুললে হয়তো জানতে পারবো।
ঢাকায় এসে আমার সুযোগ হলো আমার মেজে খালার ছেলে আমার সমবয়সি আমার বন্ধু পিলুর সঙ্গে দেখা হওয়ার, কথা বলার এবং একে অপরকে বোঝার, সে ও আমার সাথে এবার আই. এস . সি পরীক্ষা উত্তীর্ন হয়েছে, কিন্তু সে কোনো ভালো কলেজে তখনও ভর্তি হতে পারে নাই। ওর সাথে মিশে দেখলাম, ওর পড়াশুনা, ওর চিন্তাভাবনা, বিশেস করে ওর ইংরেজির উপর জ্ঞান অবিশ্বাস্য আমি ওর ধারের কাছে যেতে পারি না, সে তখন নিয়মিত রির্ডাস ডাইজেস্ট পড়ে, রির্ডাস ডাইজেস্টের সব সাপ্লিমেন্টরি বই গুলো সব কেনে এবং পড়ে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সর্ম্পকে তার অসাধারন জ্ঞান, যার কাছের ধারেও আমি যেতে পারি নাই। ভাবতেও অবাক লাগে ওর মতো এতো জ্ঞানের অধিকারী হয়েও কেন ওর রেজাল্ট খারাপ হলো, ওর সঙ্গে কথা বলে বুঝতাম ওর বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপন, যুক্তি তর্কের বাহার, মোট কথা আমার অবস্থান সেখানে একবারেই ম্লান । কিন্তু পরিবারের মধ্যে সবাই আমাকে ভালো ছাত্র হিসাবে এক বিশেষ দৃস্টিতে দেখতো, কিন্তু আমি ছিলাম একান্ত গোবেচারী মুখচোরা এবং আনস্মার্ট টাইপের মফস্বলের এক ছেলে। আমার খালাতো ভাই বোনদের ও অন্যান্যা প্রতিবেশি সমবয়সিদের সাথে যখন আমরা কথা বার্তা হতো তখন আমি একবারেই পাত্তা পেতাম না, ফারুক ভাই যা বলতো, যে কমিক বই পড়া নিয়ে আলোচনা করতো, তা পিলু, নিনা বুবু, নার্গিস সবাই বুঝত, আর আমি হা করে চেয়ে থাকতাম কিছুই বুঝতে পারতাম না, পরে অবশ্য পিলু আমাকে বুুঝিয়ে বলত ও আমাকে শেখাতো । এভাবে আমি আস্তে আস্তে ঢাকার সঙ্গে, ঢাকার পরিবেশের সঙ্গে, ঢাকার আতœীয় স্বজনের সাথে মোটামুটি খাপ খাওয়িয়ে নিতে পারলাম ।
চুয়াডাঙ্গা থেকে ক্লাস শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে ঢাকায় এসে পৌছালাম, তখনও একা একা ঢাকায় আসা যাওয়া রপ্ত করে উঠতে পারি নি, কারো সাথে করেই একবার চুয়াডাঙ্গায় গেলাম আবার ঢাকায় ফিরে আসলাম । প্রকৌশন বিশ্ববিদ্যালয় যেয়ে খবর নিয়ে জানলাম হোস্টেল ভর্তি শুরু হয়ে যাবে, সন্ধ্যায়, আমরা ১ম বর্ষে ভর্তি ইচ্ছুক ছাত্ররা লাইন করে দাড়ালাম পলাশী হোস্টেলে ভর্তি হওয়ার জন্য। সেই সময় পলাশী হোস্টেলই, ১ম বর্ষে ছাত্রদের জন্য নির্ধারিত ছিলো, উপরে টিন ও নিচে পাকা চার সিটের রুম, এমনি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ রুম মিলে পলাশি হোস্টেল, এখন অবশ্য সেই পলাশী হোস্টেলের কোন অস্তিত্ব নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ছয় মাসের মাথায়, আমাদের ওখান থেকে সরিয়ে নিউ হোস্টেল যা এখন আহসানুল্লাহ হল বলে পরিচিত ওখানে স্থান দেওয়া হলো এবং পলাশি হোস্টেল ভেঙ্গে পেলে, বহুতল বিশিষ্টি ছয়টি নতুন হল নির্মিত হলো, যা এখন তিতুমীর হল, শেরে বাংলা হল, সোরওয়ারর্দী হল, বলে খ্যাত । যা হোক হোস্টেলে ভর্তি জন্য দাড়িয়ে, কেউ কাউকে চিনি না, তখনি আলাপ পরিচয় শুরু হলো। অনেকে অবশ্য পুর্ব পরিচিত তারা মিলিত ভাবে পছন্দের ঘরে সিট নিল । আমরা চার জন, রুম নম্বর ৪৬ এ সিট পেলাম আমি,পাবনা কলেজ, মোজাম্মেল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কাশেম, ঢাকা কলেজ, ও রওসন ,যশোর কলেজ । এই চার জনেই প্রথম পরিচয় এবং প্রথম বারের মতো একসঙ্গে থাকার ব্যবস্থা হলো । আমরা যার যার মতো বেডিং বিছিয়ে নিজ নিজ সিট গুছিয়ে নিলাম। নতুন এক জীবন শুরু হলো ।
হোস্টেল জীবনের প্রথমে একটু পরিবর্তন আভাস পেলাম, পাবনা হোস্টেল জীবন থেকে ঢাকার পলাশী হোস্টেলের প্রারম্ভে বেশ নতুনত্বের স্বাদ পেলাম, রুমমেটরা সবাই অপরিচিত, নতুন করে পরিচয়ের পালা শেষ হলো, রুমমেট মোজ্জামেল ও কাসেম, ঢাকা কলেজের হোস্টেলে থাকার ছেলে তাই প্রগলভ । রুমের ভিতর ওরা সারাক্ষন মাতিয়ে রাখে, আমি ও রওশন চুপচাপ থাকি, আমরা মফস্বলের ছেলে, ঢাকাবাসিদের সঙ্গে এখনও তাল মিলিয়ে উঠতে পারি নাই। প্রত্যেক ঘরে এমনি একটা জমজমাট ভাব, সবাই নতুন করে পরিচিত হচ্ছে অথবা পুরনো পরিচয় ঝালাই করছে, ইঞ্জিনিয়রিংয়ে প্রথম ভর্তি, সবার মনে আনন্দ অনুভুতি । প্রথম কয়েকদিন পরিচয়ের উত্তাপ এবং আনন্দ করে কাটল, হোস্টেলে খাওয়ার মান ও ভালো, ভাত, ভাজি, একবেলা মাছ, একবেলা মাংস ও ডাল, রান্নাবাড়া মুখরোচক, বেশ একটা স্বাচ্ছন্দ্যর ভাব। আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ১৯৬১ সালে, ইস্ট পাকিস্তান ইউনির্ভাসিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড টেকনোলোজিতে পরিনত হয়েছে, তাই আমরা পুর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়া প্রথম ব্যাচের ছাত্র, সে এক আলদা অনুভুতি । বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটি রেল লাইনের উত্তর পাশে, আর আবাসিক হল / হোস্টেলগুলি রেল লাইনের দক্ষিন পাশে, রেল লাইন বলতে তখন ঢাকার রেল স্টেশন ছিলো ফুলবাড়িয়ায়, রেললাইনটি বকশিবাজার, পলাশী, নীলক্ষেত, কাটাবন, হাতিরপুল, পাকমোটর, কাওরানবাজার হয়ে, তেজগাঁও রেলস্টেশন পর্যন্ত ঢাকা থেকে যাওয়া এবং আসার জন্য সমস্ত ট্রেন এই পথে চলাচল করতো । সুতারং আমাদের ক্যাম্পাস ও হোস্টেল মাঝে রেললাইন ও রেলগেট ছিলো, দিনের মধ্যে যে কতবার রেলগেট বন্ধ হতো তার হিসাব নাই, একবার রেলগেট পড়লে ৫ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য উভয়ধারে আটকে পড়ে যেতাম, সে এক বিড়ম্বনা। পরবর্তীকালে ১৯৬৬ সালের দিকে এখনকার কমলাপুল রেলস্টেশন নতুন নির্মিত হলে, পুরাতন ফুলবাড়ি স্টেশনটি বন্ধ হয়ে যায় এবং রেললাইনটি তখন মতিঝিল, মালিবাগ, কাওরান বাজার হয়ে বর্তমানে যেমনটি আছে তেমনি নতুন ভাবে নির্মিত হয় এবং তেজগাঁও স্টেশন পর্যন্ত চলাচল করে । আরো পরে পুরাতন রেললাইনটি তুলে ফেলে, বর্তমান ফুলবাড়ি থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত রেললাইনের উপরে নতুন ভাবে রাস্তা তৈরী হয় ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর, প্রথম বষের্র ২৫৫ ছাত্রকে ৪ টি সেকশনে ভাগ করা হয়, যেহেতু ভর্তি পরীক্ষায় আমার রোল প্রথম দিকে ছিলো, তাই সিলেকসনের পর আমার স্থান হলো সেকশন এ এবং রোল নং ৩ । ১৭ ই সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরু হওয়ার পর প্রথম সেমেস্টারে আমাদের পড়ানো হতো ডিগ্রী কোর্সের ফিজিক্স, কেমিস্ট্র, অঙ্ক আর হিউমিটিজ গ্র“পের ইংরেজি ও সিভিক্স আর প্রকৌশল বিষয়ের মেকানিক্স, সিভিল ড্রয়িং এবং মেকানিকাল ড্রয়িং । ল্যাবের ভিতরে ছিলো ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রি ল্যাবের কাজ, তাছাড়াও ছিলো কার্পেনটরিসপ, ব্ল্যাকস্মিথ, ফাউন্ড্রিসপ ও ওয়েলডিং সপের সেশনাল ক্লাস । ফিজিক্স পড়াতেন কামীনি মোহন শাহা, পুরাতন ও জাদরেল প্রফেসর, সাউন্ড পড়াতেন আজগার আলী স্যার আর লাইট পড়াতেন টাই পড়ে আসা এক স্যার, টাই পড়ে আসার জন্য আমরা উনার নাম দিয়েছিলাম গামছা স্যার, কেমিস্ট্রি পড়াতেন শামসুজ্জমান স্যার আর অঙ্ক করাতেন জহুরুল হক স্যার ও প্রফেসর ইমান আলী, যারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে ছিলেন বিখ্যাত, পড়াতেন দরদ দিয়ে, আমরাও গ্রহন করতাম সর্ম্পুন অন্তঃকরন দিয়ে । ইংরেজি পড়াতেন একজন আত্মভোলা স্যার, উনার আসল নাম ভুলে গিয়ে আমরা ডাকতাম কাপ্পা স্যার বলে, কারন তিনি ইংরেজি ভাষার উৎপত্তি, ল্যাটিন ভাষার অক্ষর জ্ঞান দিয়ে শুরু করতেন যেমন আলফা, বিটা , গামা, থিটা, কাপ্পা ইত্যাদি ।
তখন প্রকৌশল পড়াশুনার জন্য কোনো বই বাজারে পাওয়া যেত না, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেন্টাল লাইব্রেরি থেকে প্রতি ২ থেকে ৩ জনের জন্য একটি বই ভাড়ায় ইস্যু করা হতো, পরবর্তী কালে ঐ কোর্স শেষে হলে ভাড়া সহ বই ফেরত দিতে হতো, আর হারালে বড় ধরনের জরিমানা দিতে হতো । ক্যালকুলেশনের জন্য তখন ক্যালকুলেটর ছিলো না, তাই প্রকৌশল ছাত্রদের জটিল হিসাবের জন্য ব্যবহৃত হতো একটি যন্ত্র, যার নাম স্লাইড রুল, ইহাও রেন্টাল লাইব্রেরি থেকে ২ থেকে ৩ জনের জন্য একটি স্লাইড রুল ভাড়া দেওয়া হতো । অবশ্য উন্নতমানের স্লাইডরুল তখন বাজারে পাওয়া যেত, একটি “ফেবার লোভা” কোম্পানির তৈরি স্লাইড রুল ১২০টাকা থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত, আমাদের অনেকেই যারা ধনীর দুলাল ছিলো তারা কিনেছিলো, আমরা মাঝে মাঝে স্লাইডরুলটি একটু নেড়ে চেড়ে দেখে আনন্দ পেতাম । এই স্লাইডরুল ব্যবহারের শিক্ষা দিতেন নওশের আলী স্যার, যিনি খুবই সরল প্রকৃতির, তাকে আমরা নশু মিয়া স্যার বলে ডাকতাম, উনার ক্লাসে বেশ মজা হতো, উনি কোন জটিল হিসাব স্লাইডরুলে করে উত্তর জানতে চাইলে আমাদের ভিতর কেই জবাব দিতো ১০, উনি বলতেন কারেক্ট, আবার আরেকজনের রেজাল্ট হতো ১০০০, উনি বলতেন Approximatly  correct । তাছাড়া মেকানিক্সেও ক্লাসটি খুব কঠিন মনে হতো, পড়াতেন আবু তাহের স্যার, সেই আই.এস. সি এর স্ট্যাটিক্স ও ডিনামিক্সের আরো উন্নততর সংস্করন, কোনো ট্রাসের লোড ডিসট্রিবিশন ও তার সমাধান এই মেকানিক্সের হিসাবের মাধ্যমে করতে হতো, আকঁতে হতো, ফ্রি বডি ডায়াগ্রাম, ফোরসের দিক নির্দেশনা ও জটিল হিসাব । এই একটি বিষয় ছাড়া অন্যান্য বিষয় পড়তে খুব মজা পেতাম ।
সিভিল এবং মেকানিকাল ড্রয়িংয়ের ক্লাসের জন্য প্রত্যেক ছাত্রকে অনেক সরঞ্জাম কিনতে হতো যেমন টি সহ ড্রয়িং বোর্ড, সেট স্কয়ার, ইনস্টুমেন্ট বক্স, ডায়গোনাল স্কেল, বিভিন্ন গ্রেডের পেন্সিল ও ইরেজার ইত্যাদি । সিভিল ড্রয়িংয়ের ক্লাস নিতেন, সাদা দাড়ি, বয়স্ক একজন স্যার, উনার আসল নাম ভুলে গিয়ে উনাকে আমরা নানা বলে ডাকতাম, সিভিল ড্রয়িংয়ের ক্লাসটি খুবেই আনন্দ দায়ক ছিলো । বিশাল হল ঘরে আমরা ড্রয়িং সামগ্রী বিছিয়ে নানার নির্দেশ মোতাবেক ড্রয়িং শুরু করতাম, তখন দুর থেকে দেখলে মনে হতো যে সত্যিই এটা প্রকৌশল শিক্ষার ক্লাস । সিভিল ড্রয়িংয়ের মত মেকানিকাল ড্রয়িংয়ের ক্লাসটি তেমন উপভোগ্য হতো না, মেকানিকাল ড্রয়িং করাতেন সদ্য পাস করে লেকাচারার হওয়া, মোকাদ্দাম স্যার, উনি ফারুক ভাইয়েল ক্লাসমেট ছিলেন কিন্তু কঠোর প্রকৃতির , টেরর । উনার প্রথম ক্লাসে ড্রয়িংয়ে, ১০এর মধ্যে ৭ পেলাম, পরেরটিতে ১০ এর মধ্যে ৩ ও তারপরেরটিতে ১০ এর ভিতরে ৫.৫ পেলাম, একটু ভয় পেয়ে গেলাম, ফারুক ভাইকে সঙ্গে নিয়ে উনার বাসায় গিয়ে উনার সঙ্গে দেখা করলাম, উনি কিছু উপদেশ দিলেন । কার্পেন্ট্রিশপের সেশনার ক্লাসে, আমাদেরকে সুতোর মিস্ত্রির মতো, কাঠ করাত দিয়ে চিরতে হতো, রানদা করতে হতো, বাটালি হাতুড়ি দিয়ে কাঠের ত্ক্তায় ছিদ্র করতে হতো । ক্লাসটি মজাদার ছিলো, কিন্তু সেশনালে ফেল করলে একবারে ফেল, কোন রেফার্ড ও পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকতো না। তাই সেশনাল ক্লাসগুলো যেমন আনন্দের ছিলো, তেমনি আতঙ্কের ভিতরেও কাটাতো হতো । ওয়েলডিংশপে তেমানি ওয়েলডিংয়ের নিয়মকানুন, কায়েদা কানুন, এমপেয়ার বাড়ানো কমানো, ইলেকট্রড সিলেকশন করা, পজেটিভ নেগেটিভ নিয়ন্ত্রন কর,া ও আর্থিং কানেকশন সঠিক করার দিকে খেয়াল রাখতো হতো। সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে হতো ওয়েলডিং গ্লাস ব্যবহার করার বিষয়ে। ওয়েলডিং গ্লাস ব্যবহার না করে, ওয়েলডিংয়ের কাজ করলে ওয়েলডিংয়ের সময় যে উজ্জল রশ্মি বের হতো তা চোখের জন্য সমুহ ক্ষতির কারন হতে পারত । ওয়েলডিং করতে যেয়ে বেখেয়ালের জন্য, ওয়েলডিং গ্লাস না ব্যবহার করে , ওয়েলডিং এর রে লেগে কতজনের যে চোখে অসুখ হয়েছে তা বলা মুশকিল । তবে বেশি ক্ষতি হতো না, চোখ লাল হয়ে ফুলে যেত এবং চোখ মেলে তাকাতে পারতাম না, তবে ডাক্তার এর কাছে গিয়ে কয়েকবার ড্রপ নিলে স্বাভাবিক হয়ে যেত। গ্যস ওয়েলডিংয়ের সময় আর এক বিপদ, অক্সিজেন ও এসিটিলিন সিলিনডারে রেগুলেটর লাগানো থাকত, ওই রেগুলেটর ভাল্ব কমিয়ে বাড়িয়ে অক্সিজেন ও এসিটিলিন এর পরিমান নির্দিস্ট করে ফ্লেম ঠিক করতে হতো । গ্যাস ওয়েলডিংয়ের সময় একরকম ফ্লেম নিয়ন্ত্রন আবার কাটিংয়ের সময় অক্সিজেনের পরিমান বাড়িয়ে দিয়ে লোহা কাটার জন্য যথেস্ট তাপ সৃস্টি করার মতো করে রেগুলেটর নিয়ন্ত্রন করতে হতো । এটা খুব দুরহ ব্যাপার নয়, শুধু অনুশীলনীর ব্যাপার, ইনস্ট্রাকক্টর স্যার সার্বক্ষনিক তদারকি করতেন যাতে কোন বিপদ না হয়, ভুল রেগুলেশন করলে এক্সপ্লোসন হতে পারত । যেমনটি একবার হয়েছিলো, অক্সিজেন সিলিনডার বার্ষ্ট করে ওয়েলডিংশপের ছাদ পর্যন্ত উঠে যেয়ে আবার নিচে পড়ে গিয়েছিলো ।
প্যাটার্ন মেকিং ও ফাউন্ড্রিশপের কাজ খুবই সুক্ষ, কাঠ দিয়ে প্যার্টান বানানো হতো, সেই প্যার্টানের সাহায্য ফাউন্ড্রি বালু দিয়ে ফ্লোরে একধরনের সাঁচ বানানো হতো । পরে লোহা গলানো চুল্লিতে যাকে ফার্নেস বলা হয়, একটা পাত্রের ভিতর কয়লা জ্বালানি দিয়ে প্রচুর তাপের সৃস্টি করা হতো , ৩ – ৪ ঘন্টা এভাবে রাখলে লোহা গলে তরল হয়ে যেত । তখন সেই তরল লোহা বিশেষ পদ্ধতিতে, ইনস্ট্রাকক্টার স্যারের নির্দেশে ফাউন্ড্রিং ম্যানরা আমাদের তৈরী সাঁচের ভিতর ঢেলত, ঘন্টা ২ পর ঐ সাঁচ কিছুটা ঠান্ডা হলে,চিমটি দিয়ে ধরে পানির ভিতরে চুপানো হতো । ঠান্ডা সাঁচটি ওয়ার্কিং টেবিলে এনে ফাইল দিয়ে ঘষে মেজে পরিস্কার করে কাঠের তৈরি প্যাটানের সঙ্গে মেলানো হতো, মাপ যোগ সঠিক হলে ভালো মার্ক পাওয়া যেত । ব্ল্যাকস্মিথ শপেও এমনি আগুন নিয়ে কারবার, হপারের সাহায্য বাতাস ব্লো করে কয়লা জ্বালানো হতো এবং লোহা গরম করে নরম করা হতো, তারপর ১০ পাউন্ডের হ্যামার দিয়ে পিঠিয়ে নির্ধারিত চাহিদা মোতাবেক চাওড়া, চিকন, হেকছাগনাল ইত্যাদি বিভিন্ন আকারের লোহার দন্ড রুপ দিতে হতো । বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারনত থিওরেটিক্যাল ক্লাসগুলি টিফিনের আগে হতো, টিফিনের পর সাধারনত সেশনাল ক্লাস বা ড্রয়িংয়ের ক্লাসগুলো থাকত, প্রতিদিনই তাই কালি ঝুলি মেখে হোস্টেলে ফিরতে হতো ।
তখনকার দিনে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমেস্টার সিস্টেম চালু ছিলো অর্থাৎ প্রকৌশল শিক্ষার ৪ বছরের কোর্সকে, ৮ সেমেস্টার ভাগ করা হয়েছিল, প্রত্যেক সেমেস্টারে, আলদা আলদা ভাবে পাস করে, পরবর্তী সেমেস্টারে উঠতে হতো । প্রতি সেমেস্টারে তিনটি করে পরীক্ষা হতো, ফাস্ট টারমিনাল, সেকেন্ড টারমিনাল ও সেমেস্টার ফাইনাল, প্রতিটা পরীক্ষার মার্কেই সেমেস্টার ফাইনালের মার্কের সাথে যোগ হতো এবং সেই অনুযায়ী ফল প্রকাশ হতো । কোন সেমেস্টারে ২ বিষয় পর্যন্ত ফেল করলে রেফার্ড পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকতো, দুই এর অধিক বিষয়ে ফেল করলে ঐ সেমেস্টারে ফেল ঘোষনা করা হতো, তখন ঐ ছাত্রকে ঐ সেমেস্টার রিপিট করতে হতো বা পুনরায় ঐ সেমেস্টার পাস করতে হতো । তখনকার দিনে ফাস্ট ইয়ারের ২ সেমেস্টার পর এক বছরের সমস্ত পড়াশুনার একটা ফাইনাল পরীক্ষা হতো, তাকে বলা হতো প্রিলিমিনারী বি .এস. সি ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষা, ঐ পরীক্ষা পাস করলে র্থাড সেমেস্টারে ওঠা যেত, তারপর সেমেস্টার পদ্ধত্তিতে সপ্তম সেমেস্টার পর্যন্ত পাস করে ফাইনাল পরীক্ষায় সপ্তম ও অস্টম সেমেস্টারের সমুদয় কোর্সের উপর ফাইনাল পরীক্ষা হতো, ঐ পরীক্ষাকে বলা হতো ফাইনাল বি .এস. সি ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষা। সেমেস্টার পরীক্ষায় প্রতি বিষয়ে ৪০ % মার্ক পেলে, পাস ঘোষনা করা হতো কিন্তু সেশনাল পরীক্ষার পাস মার্ক ছিলো ৫০ । ফাইনাল বি. এস. সি ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় ৬০% মার্ক.পেলে ফাস্ট ক্লাস, ৪৫% মার্ক পেলে সেকেন্ড ক্লাস এবং ৮০ % মার্ক পেলে অর্নাস বলে ঘোষনা করা হতো । তবে মহা বিপদ ছিলো প্রিলিমিনারী বি .এস .সি ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষা, এই পরীক্ষায় ফেল করলে অর্থাৎ ২ এর অধিক পরীক্ষায় ফেল করলে তাকে বলা হতো অটোমেশন । অটোমেশন অর্থাৎ চিরতরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার আশা শেষ, ঐ ছাত্রকে আর কোন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ দেওয়া হতো না।
যাহোক প্রথম সেমেস্টারে প্রকৌশল শিক্ষার যে কি চাপ বুঝতে পারলাম এবং সেই মোতাবেক এগুতে লাগলাম, বেশ ভালোই লাগতে লাগলো, মেকানিক্স বিষয়টি ছাড়া অন্য বিষয় গুলিতে প্রচুর আনন্দ পাওয়া যেত আর সেশনাল বিষয়গুলি হেসে খেলে কেটে যেত, দেখতে দেখতে, প্রথম বর্ষের ফাস্ট টারমিনাল, সেকেন্ড টারমিনাল ও সেমেস্টার ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেলো ।প্রথম থেকে পড়াশুনায় খুব মনোযোগী ছিলাম, তখন সাপ্তাহিক বন্ধ ছিলো শুক্রবার, বৃহস্পতিবার বিকালে আমি হোস্টেল ছেড়ে খালার বাসায় চলে আসতাম, সেখানে চা নাস্তা খেয়ে, খালাতো ভাই বোনের সাথে গল্প গুজব করে, সন্ধ্যার পর হোস্টেলে ফিরতাম । শীতকালে প্রতি বছরেরই খালার বাসায় সামনের দিকে ব্যাডমিন্টনের কোর্ট কাটা হতো, সেখানে বিকাল থেকে খেলা চলতো, খেলোয়ার ছিলো ফারুক ভাই, নিনা বুবু, নার্গিস ও আমি, তাছাড়া খালা বাড়ির ভাড়াটিয়া পি আই এর ইঞ্জিনিয়ার উর্দুভাষী শরিফ সাহেব তার ২ ছেলে আসলাম ও শওকত আর মেয়ে শাহীন। পিলু মাঝে মাঝে আমাদের সাথে খেলত, তবে সে মজা পেতো না । আমি আর ফারুক ভাই পার্টনার হয়ে খেললে আমাদের সাথে কেউ পারতো না, তাই মোটামোটি আমরা চাম্পিয়ান ছিলাম । শীতকালে পুরা ৩ / ৪ মাস ধরে খেলা হতো, এরমধ্যে মাঝে মাঝে বাহির থেকে আসত পি আই এর মোজাফ্ফর সাহেব, এয়ার হোস্টেস এ্যাংলো ইন্ডিয়ান মিস পেন, খেলা জমে উঠত শরিফ সাহেব ও মিস পেন র্পাটনার হলে এবং আমার আর ফারুক ভাইয়ের বিরুদ্ধে খেললে । প্রতিদিনেই হারত, আর হারলে মিস পেন কান্না শুরু করে দিতো, সেসময় শরিফ সাহেবের বাসা থেকে আসত নানা রকম মুখরোচক নাস্তা, যেমন পাকোড়া, দহি বড়া, ফালুদা ইত্যাদি পাকিস্তানি খাবার । মিস পেনের কান্না ইতিমধ্যে থেমে যেত, আমিও আস্তে আস্তে বিদায় নিয়ে হোস্টেলের পথ ধরতাম । সপ্তাহের ৬ দিন এক নাগাড়ে পড়াশুনার পর উইকএন্ডে ভালোই সময় কাটতো ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার প্রথম দিন থেকে একটা জিনিস খেয়াল করতাম সব ছেলেরা, ফাস্ট ইয়ার থেকে ফোরথ ইয়ার পর্যন্ত একসঙ্গে সকাল ৯ টায় ক্লাসে যেতে শুরু করতো, সেসময় রাস্তায় দেখলে মনে হতো যেন মিছিল যাচ্ছে, আবার বেলা ১টায় সময় যখন টিফিন পিরিয়ড শুরু হলে ৪ ইয়ারের প্রায় ১০০০ ছাত্র একই সময় যার যার হোস্টেল বা হলে যেত । আমি হল বা হোস্টেল বলছি এই কারনে যে হোস্টেল গুলি, আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হোস্টেল নামে পরিচিত ছিল, যেমন ১ম বর্ষের ছাত্রদের জন্য পলশী হোস্টেল ও মেইন হোস্টেল নির্ধারিত, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের ছাত্রদের জন্য নির্ধারিত ছিল নিউ হোস্টেল আর চতুর্থ বর্ষের ছাত্রদের জন্য নির্ধারিত ছিল সাউথ হোস্টেল, তার ভিতর পলাশী হোস্টেলের এক অংশে হিন্দু ছাত্ররা থাকতো। এই ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার ও আসার সময়, রাস্তায় রীতিমত ভীড় পড়ে যেত, তারপরে যদি আবার রেলগেট বন্ধ হয় । ট্রেন চলে যাওয়ার পর রেলগেট খুললে দুপাশের ছেলেদের একবিশাল চাপ পড়ে যেত। ঐ সময় একটা মজার ব্যাপার হলো, তখন সুভাষদত্ত, সুতারং সিনেমাটি সুটিং করছে, সুটিং এর এক পর্যায়ে এমন একটি সিকোয়েন্স ছিল যে, ট্রেন চলে যাবে, গেট খুলার পর ভিষন একটা ভীড়ের দৃশ্য হবে, সেই সময় নায়িকা সুচন্দা, রিকসা করে রেলগেট পার হবে । একদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার সময় দেখলাম সুটিং এর প্রস্তুতি চলছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক বার ট্রেন চলার পর গেট খোলা বন্ধ হলো, প্রতি বারেই শট টেক করা হলো আবার কাট করা হলো । আমরা যখন টিফিন পিরিয়ডে হোস্টেলে ফিরছি এমনি সময় রেলগেট বন্ধ, সুটিং এর জন্য কর্মীরা প্রস্তুত, নায়িকা পোজ নিচ্ছে, আমরাও হোস্টেলে ফিরছি, প্রচন্ড ভীড়, নায়িকা রোদে ঘামছে, যাহোক পরিচালকের মনমোত দৃশ্যটি টেক করা হলো, আমরাও নায়িকাকে খুব কাছে থেকে দেখে নিতে পারলাম। [চলবে]

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

<