বটবৃক্ষের সালতামামি: পার্ট-৭,৮

বটবৃক্ষের সালতামামি: পার্ট-৭,৮ নভেম্বর ৯, ২০১৭ ০ comments

প্রকৌশলী এম. এ. মান্নান
সময়কাল ১৯৬০ -১৯৬২

সপ্তম অধ্যায়
কলেজ জীবন
এতদিন ছিলো স্কুলের পড়াশুনা, মেট্রিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ব্যস্তুতা । রেজাল্ট বের হওয়ার পর নতুন করে চিন্তার পরিধি বাড়ল, কি পড়ব, কোন কলেজে পড়ব, কি আমার ভবিষ্যত । ক্লাস টেন পর্যন্ত বাবা মা ভাবত, আমাকে ডাক্তারি পড়াবেন । কিন্তু ক্লাস টেনে উঠে ইসমাইল স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যেয়ে, উনি বুঝালেন, তোমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে হবে, দেশে ইঞ্জিনিয়ারের কত প্রয়োজন, ইঞ্জিনিয়ারের কত দাম। ঐ সময় ফিলের বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তো, তাই আমার নিজের কাছেও মনে হলো, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াই উত্তম । এর আগে ভাবতাম, ফারুক ভাই ডাক্তারি পড়ছে, বড় খালু ডাক্তার, তাই আমি জীবনে একজন ডাক্তার হবো। আসলে অল্প বয়সের চিন্তার কোন মাথামুন্ডু থাকে না । আমার শুভাকাঙ্খি, আত্মীয় স্বজন এবং স্কুলের শিক্ষকরা মিলে, ঠিক করা হলো যে, আমি আই এস সি তে ভর্তি হবো । কিন্তু কোন কলেজে, তখন চুয়াডাঙ্গায় কোন কলেজ ছিলো না, সবচেয়ে কাছের কলেজ,কুস্টিয়া কলেজ, সেখানে বিজ্ঞানের খুব ভালো শিক্ষক ছিলো না । শুধুমাত্র অঙ্কের শিক্ষক, জাকারিয়া স্যার এর নামে কুস্টিয়া কলেজ চলত। আই এস সি তে ভর্তি হওয়ার জন্য নিঃসন্দেহে, রাজশাহী গভর্নমেন্টে কলেজ শ্রেষ্ঠ, তবে চুয়াডাঙ্গা থেকে অনেক দুরে । এর আগে আমি তো বাড়ির বাহির কখনও তো হই নাই, তাই কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগলো । কাছাকাছি পাবনা এডওর্য়াড কলেজ, বিজ্ঞানের জন্য খুবেই ভালো, বসন্ত বাবু, মাখন বাবু ও,গোবিন্দলালের মতো, বিখ্যাত শিক্ষকের সমাহার ছিলো সেখানে, তাবে ওটা গর্ভনমেন্ট কলেজ নয়, এই যা । আমার বন্ধু ফিল, পাবনা কলেজে ভর্তি হওয়ার সিন্ধান্ত নিলো, তার প্রথম কারন ওর সেকেন্ড ডিভিশন ছিলো বলে সে রাজশাহীতে ভর্তি হতে পারবে না । আর দ্বিতীয় কারন ওর মেজ ভাই, দুলু ভাই, পাবনা কলেজেই পড়ে ।
প্রথমত ভয়ে ভয়ে, একা থাকার অনভিজ্ঞতার জন্য ও পরে ফিল ভর্তি হচ্ছে জেনে, সে আনন্দে দুজন একসাথে থাকতে পারবো ভেবে, পাবনা কলেজে ভর্তি হওয়ার সিন্ধান্ত নিলাম । বাবা এ ব্যাপারে কোন আগ্রহ বা মতামত দিলেন না, হয়ত কোন কলেজ ভালো হবে সেটা তিনি বুঝতে পারেন নি অথবা রাজশাহী বড় শহর গেলে খরচ বেশি হবে, এ চিন্তা করে উনি কোন সিন্ধান্ত দেন নাই । পরবর্তীতে বুঝতে পেরেছি যে, পাবনা কলেজে ভর্তি হওয়া ছিল, আমার এক চরম ভুল সিন্ধান্ত । কারন রাজশাহী বা পাবনার উভয়ই কলেজেই আমাকে হোস্টলে থাকতে হবে, সুতারং খরচের দিকটা উভায় জায়গায় সমান। পরে বুঝতে পেরেছি যে, রাজশাহী বড় গর্ভনমেন্ট কলেজ, সব ভালো ছাত্ররা সেখানে যায় পড়তে, সেখানে গেলে ভালো ছাত্রদের সাথে মিশে একটা কম্পটিশনের ভাব জাগত। যাহোক যে ভুল হয়ে গেছে তা তো শোধরাবার নয় । দিন ক্ষন দেখে কোন এক শুভ দিনে, বাবা ও মা আমাকে মধু মামার সঙ্গে, পাবনা কলেজে ভর্তির জন্য পাঠালেন । যাওয়ার সময় আমার,বেডিংয়ে, তোষক, লেপ ও চাদর দেওয়া হলো, আমার ট্রাঙ্কে ব্যবহারের জন্য দুটো লুঙ্গি, তিন সেট পাজামা ও ফুল শার্ট, গেঞ্জি গামছা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং নাস্তার জন্য, চিড়া পাঠালি সব বেধে দেওয়া হলো। এমনকি অসুখ বিসুখ হলে ঔষধ আনার জন্য একটি খালি বোতল ও দেওযা হলো । আর আমার সঙ্গে থাকল, বসু-চ্যার্টারজির ফিজিক্স বই, ললিত মোহন মিত্রের কেমিস্ট্রি বই, বোটানি ও জুওলজি বইয়ের ভান্ডার । বলা বহুল্য এসব বই, ফারুক ভাই, জুনি খালা ও হিল্লু আপার কাছ থেকে পাওয়া।
পাবনার ডেপুটি ম্যাজিস্টেট, তখন আমার এক মামা, উনার সরকারি বাসা তখন বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও মহানায়িকা ,সুচিত্রা সেনের বাড়ি বা তার বাবার বাড়িতে অবস্থিত, সরকার কতৃক রিকুজিসনকৃত। ঐতিহাসিক এই বাড়িটির কথা জানতে পেরে নিজেকে খুব ভাগ্যাবান মনে হলো, যে বাড়িতে সুচিত্রা সেনের মতো অভিনেত্রী জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে, তার জীবনের অনেকটা বছর এখানে কেটেছে, সেই বাড়িটি এখন পাকিস্তানি সরকারের নিয়ন্ত্রিত, সরকারি কর্মকর্তার সরকারি বাসভবন। আসলে মধু মামার বড় বোন ছকিনা খালার সাথে, মায়ের এক চাচাতো ভাই, মনসুর মামার বিয়ে হয়েছিল, এবং মনসুর মামা, নানা এবং নানার জ্ঞাতিদের মধ্যে জেষ্ঠ্য সন্তান, তাই পরিবারের সবাই উনাকে মিয়া ভাই বলে ডাকে। মনসুর মামার ওখানে আমি সাদরে আপ্যায়িত হলাম, পরের দিন মনসুর মামা নিজেই আমাকে কলেজে ভর্তি করতে নিয়ে গেলেন। ডেপুটি ম্যাজিস্টেট হিসেবে ক্ষমতাবান, আমার মামা সরাসরি প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করলেন এবং আমার ভর্তির সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করলেন। আমি কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম, কিন্তু ক্লাস শুরু হবে এক মাস পর। কলেজ জীবন সমন্ধে সকল ছাত্রেরই একটা স্বপ্ন থাকে, আমি সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে কলেজ ক্যাম্পাসটি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। বিশাল কলেজ ক্যাম্পাস, বিট্রিশ সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড এর নামে কলেজটির নামকরন ও স্থাপিত ১৮৯৮ । পুরাতন একতলা ভবন, ফিজিক্স ভবন, ফিজিক্স গ্যালারি ও ল্যবরেটরি, কলেজের পশ্চিম দিকে, তার পাশে বোটানি, জুওলজি গ্যালারি ও ল্যাবরেটরি। কেমিস্ট্র ল্যব ও গ্যালারি কলেজের উত্তর ব্লকে অবস্থিত, তারপাশের অফিস ও প্রিন্সিপালের কামরা। অফিসের পুুর্ব পাশে কলা ভবন । প্রধান রাস্তা থেকে কলেজে ঢোকার সময় মধ্যম গোছের কলেজ তোরন, তারপর লাল কাকঁর বিছানো রাস্তা, দুই পাশে পাম গাছের সারি, তারপর কলেজের সিংহতোরন, তোরনটি পার হলে কলেজ, অফিস ইত্যাদি। কলেজের সামনেই, দক্ষিন দিকে বিশাল খেলার মাঠ, খেলার মাঠ পার হলেই ”এল” আকৃতির মেইন হোস্টল ভবন । স্বপ্নের কলেজ ভবনের সঙ্গে বাস্তবের মিল না থাকলেও বাস্তবে এখন বর্তমান । যাহোক দুইদিন পাবনায় মামার বাড়ি বেড়িয়ে, চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসলাম ।
অব্যশই চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসার আগেই হোস্টলে ভর্তি হলাম, আমার সিট এ- ব্লকে, ৫ নম্বর রুম। কলেজের ও হোস্টেলের পাওনা মিটাতে প্রায় ২০০ টাকার মতো খরচ হলে,া তখন কলেজের বেতন ছিলো ১১টাকা, তাছাড়া ভর্তি ফি, লাইব্রেরি ফি, জামানতের টাকা, হোস্টল ফি. হোস্টেলের জামানতের টাকা ইত্যাদি মিলে প্রায় ২০০ টাকা, ঐ মাসে বাবার জন্য একটু বাড়তি খরচ হলো । আমার বাবার ছিলো হিসাবের সংসার, উনি সৎ মানুষ, তাই বেতনের টাকা দিয়েই উনাকে চারটি ছেলেমেয়ের পড়াশুনা, ভরন পোষন এবং সংসারের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হতো । মাসের খাবার চাল, ডাল ইত্যাদি গ্রামের জমি থেকে আয় হতো. অন্যান্যা কেনা কাটায়, বাবার বেতনের সম্পন্ন খরচ হয়ে যেত । চুয়াডাঙ্গায় ফিরে এসে আমি আবার ঘোরাফেরা, গল্প গুজব ও পাবলিক লাইব্রেরি থেকে আনা উপন্যাস ও বই পড়ে সময় কাটাতে লাগলাম, আর কলেজ খোলার দিন গুনতে লাগলাম। কিন্তু বাবাকে, একজন কলেজ পড়ুয়া ছেলের খরচ চালাতে, যথেস্ট হিসেবি হতে হলো, কারন প্রতি মাসে আমার হোস্টলের খাবার খরচ ৩০ টাকা, সিট ভাড়া ৫টাকা, কলেজের বেতন ১১ টাকা ও বিবিধ খরচের জন্য ৯ টাকা সহ মোট ৫৫ টাকা করে মাসে মাসে পাঠাতে হতো । এই বাড়তি খরচ বাবার মাসের বেতন থেকে ব্যবস্থা করতে, বাবাকে যথেষ্টে হিমসিম খেতে হতো ।
দেখতে দেখতে কলেজ খোলার সময় ঘনিয়ে আসল, তখন পাবনায় কোন রেল লাইন ছিলো না, আমাদের চুয়াডাঙ্গা থেকে ট্রেনে চেপে ইশ্বরদি যেতে হতো, ট্রেন থেকে নেমে ওভার ব্রিজ পার হয়ে এসে বাসে করে পাবনা যেতে হতো । পাবনা বাসস্ট্য›ড শহরের ভিতর হলেও আমরা তার আগেই কলেজ গেটেই নেমে যেতাম । যাহোক কলেজ খোলার নির্দিস্ট দিনের একদিন আগেই পাবনায় পৌছলাম, মামা বাড়ি রেখে আসা ট্রাঙ্কটি নিয়ে হোস্টলে যখন পৌছলাম সূর্য ডুবুডুবু। আমার জন্য বারদ্দকৃত ঘর এ-৫, চার সিটের ঘর । আমি আসার আগেই আমার রুমমেটরা ভালো দেখে জানলার পাশে তিনটি সিট দখল করে নিয়েছে, আমার সিটটি, ঘরে ঢোকার দরজার পাশে। আমার রুমমেট, হামিদ সাহেব র্থাড ইয়ার আর্টস এর ছাত্র, জামসেদ ভাই সেকেন্ড ইয়ার আই. এস. সি এর ছাত্র, ফিল ও আমি ১ম বর্ষে আই. এস. সি ছাত্র । হোস্টলের ডাইনিং রুমটি এল প্যাটান ভবনের এ ব্লক ও বি ব্লক এর সংযোগ স্থলে অবস্থিত, আর কমন রুমটি ডাইনিং রুমের সঙ্গে স্থাপিত । আজকাল কার মতো টয়লেট ও গোসলখানা ঘরের সঙ্গে লাগোয়া ছিল না, হোস্টলের পেসাবখানা হোস্টল থেকে প্রায় ৫০ গজ দুরে খোলা আকাশের নিচে, খোপ খোপ পার্টিশন করা অবস্থায় ছিল আর টয়লেটটি প্রায় ১৫০ দুরে অবস্থিত ছিলো। সুতরাং পেসাব পায়খানায় যেতে হলে রীতিমত প্রোগাম করে যেতে হতো। ৩০ টাকা খাবার খরচের বদলে, হোস্টলে দুবেলা খাওয়ানো হতো একবেলা মাছ, একবেলা মাংস, সঙ্গে ডাল, সপ্তাহে একবেলা শুধু সবজি । নাস্তার জন্য নিজ নিজ খরচের ব্যবস্থা করতে হতো, বেশির ভাগ ছেলেরাই চিড়া, মুড়ি ও গুড় দিয়ে নাস্তা সারতো, কেউ কেউ আবার তেলে ভাজা পুরি ও ডাল দিয়ে নাস্তা সারতো, তবে সেটা আনতে হলে কলেজ ক্যাম্পাসের বাহিরে রাস্তা পার হয়ে কলেজ ক্যান্টিন থেকে আনতে হতো, দুরত্ব আসা যাওয়া প্রায় আধা কিলোমিটার । হোস্টলের ঘরের সামনে দিয়ে টানা বারন্দা ছিলো, সেখানে ছেলেরা লুঙ্গি গামছা শুকাতে দিত । হোস্টলের বারন্দা থেকে ৫০ ফিট দুরে খেলার মাঠের সীমানা শুরু, লম্বালম্বি পার হলে কলেজ ক্যাম্পাস । হোস্টলের কোন আলদা গোসল খানা ছিলো না, টিউবওলের পাড়ে সবাই খোলা জায়গায় গোসল করতো, ফলে গোসলের সময় কল পাড়ে সব সময় একটা ভীড় লেগেই থাকতো । হোস্টলের বাসিন্দা, এ ব্লক ও বি ব্লক মিলে ২০ টি ঘরে মোট ৮০ জন আর কারো কারো সাথে ডাবলিং করে মোট ১০০ জনের বেশি হতো না ।
কলেজ খোলার প্রথম দিন ১৭ই আগস্ট, ১৯৬০ সাল । সকাল থেকে প্রস্তুত নিয়ে, একটা খাতা ও কলম সহ দলে দলে ছাত্রছাত্রীরা আসতে লাগলো, বলা বহুল্য আমাদের কলেজটিতে কোএডুকেশন ছিল, ছেলেমেয়েরা একই সাথে পড়াশুনা করতো। প্রথম ক্লাস ছিলো কলা ভবনে ১০১ নম্বর রুমে ইংরেজি ক্লাস, বিরাট হল ঘর, প্রায় ২৫০ ছাত্রছাত্রী বসতে পারতো। প্রথম দিন ক্লাস রুমে ঢুকে মাঝামাঝি জায়গায় সিট পেলাম, ক্লাসের প্রথম সারিটি ছিল মেয়েদের জন্য রিজার্ভ, তবে পিছনে যারা বসতো তারা ছেলেমেয়েদের গুঞ্জনের শব্দে, স্যারের কোন কথা শুনতে পেত না, বোর্ডের লেখাও দেখতে পেতে না। তাই পরবর্তীকালে যারা ভালো ছাত্র হিসাবে নিজেদেরকে মনে করতো তারা, প্রথম সারির বেঞ্চে বসার চেস্টা করতো এবং এর জন্য কে আগে বসবে তার প্রতিযোগীতা লেগে যেতো। আমাদের প্রথম বর্ষ আই.এস. সি তে ছাত্রছাত্রীরা সংখ্যা ছিলো ২৪৭, তার ভিতর ছাত্রী ছিল ৪ জন । প্রথম দিকে ভর্তি হওয়ার সুবাদে আমার রোল নম্বর ছিলো ৬। প্রথম ক্লাসটি ইংরাজির, মজিবর রহমান স্যরের, উনি রোল কল করার পরেই, কারা কারা ফাস্ট ডিভিশনে পাস করেছে তাদেরকে দাড়াতে বললেন,সর্বসাকুল্যে ১০ জন ফাস্ট ডিভিশন পাওয়া গেল । রোল ১-৫০ জনের মধ্যে আমি প্রথম ফাস্ট ডিভিশন,তাই সকল স্যারের নজরে পড়ে গেলাম। সহপাঠিদের সবাই তখন আমার কাছে অপরিচিত, একমাত্র ফিল ছাড়া, আমরা সহপাঠিদের সঙ্গে আপনি বলতে অভ্যস্ত ছিলাম । আজকের দিনের মতো বন্ধুদের সাথে তুই, তুমি সম্পর্কে কদাচিত হতো । কলেজে এসে একটা জিনিস দেখলাম, স্কুলের মতো এখানে এক ক্লাসে বসে সারাদিন ক্লাস করতে হয় না, এক এক ক্লাস এক এক হল ঘরে অথবা গ্যালারিতে হয়। তাই এক ক্লাস শেষে, অন্য ক্লাস করতে গেলে এবং প্রথম সারিতে বসতে হলে, রীতিমতো ছুটতে হতো । ২৫০ জন ছাত্রের ক্লাস যখন, অন্য ক্লাস ধরতে ছুটতো তখন একটা মিছিলে পরিনত হতো, আবার বিপরীত দিক থেকে আর এক ক্লাসের ছাত্ররা ক্লাস ঘর পরিবর্তন করতে আসলে তখন দুই মিছিলের সামনা সামনি হলে যেমন বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয় তেমনি ঘটতো।
প্রথম ক্লাস ইংরাজি সেরে, দ্বিতীয় ফিজিক্স ক্লাস করতে কেমিস্ট্র গ্যালারিতে গেলাম, সে এক ছুটাছুটি অবস্থা, কার আগে কে যায়, প্রবশ পথে রীতিমতো ধস্তাধস্তি । প্রথম দিনের কলেজের স্মৃতিটা খুব একটা সুখময় হলো না, মনে মনে ভাবলাম এ আবার কোথায় এসে পড়লাম । সবচেয়ে অস্বস্তি, যখন প্রথম বর্ষ বিজ্ঞান ও প্রথম বর্ষ কলা এর ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস ঘর পরিবর্তনের জন্য মুখোমুখি হতো । পরবর্তীতে অবশ্য এ অস্বস্তি কেটে যায়, সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে । কলেজ জীবন এসে, আবার আমি বাবা, মা, ভাই, বোন হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম, আত্মীয় পরিজন বর্জিত নতুন এক স্বাধীন জীবন । চুয়াডাঙ্গা স্কুলে এসে, প্রথম দিকে যেমনটি হয়েছিল, পাবনা কলেজে এসে ঠিক তেমনি অবস্থায় পড়লাম। তবে পার্থক্য এই যে চুয়াডাঙ্গা স্কুলে, আমি নিতান্তাই সুবোধ বালক ছিলাম আর এখন ১৬ বছরের কিশোর । অনেককিছু জেনেছি ও বুঝতে শিখেছি। তবে নতুন পরিবেশে, হোস্টল জীবন আর আমার আনাড়িপানায় প্রথম দিকে বেশ কিছু বিব্রত অবস্থায় পড়লাম । হোস্টলের মেসিং ব্যবস্থার জন্য হোস্টলে বাসিন্দাদের মধ্যে দুজন ম্যানেজার মনোনিত হতো এক মাসের জন্য । আমাদের হোস্টল সুপার, অঙ্কের শিক্ষক সুলতান মাহামুদ স্যার প্রথম মাসে আমাদের ঘর থেকে হামিদ সাহেবকে ম্যানেজার ও আমাকে কাপ ম্যানেজার মনোনিত করলো । ম্যানেজারের দায়িত্ব, বাজার করার ব্যবস্থা করা, হিসাব রাখা ও এক মাসের জন্য খাবারের ব্যবস্থার সর্বময় দায়িত্ব ও কতৃত্ব। আর কাপ ম্যানেজারের দায়িত্ব ছিলো, হিসাব করে কয়েকজন,বোর্ডার খাবে, তাদের জন্য তরকারির কাপের পরিমান, সমপরিমান করে বিতরনের তদারকি করা। হোস্টলে প্রথমে এসে এমনি একটি নতুন দায়িত্ব পাওয়া রীতিমতো রোমাঞ্চকর, প্রথমদিকে ভালো লাগলেও পরবর্তীতে বিরক্তিকর লাগতে লাগলো, নানান ধরনের সমস্যর সৃষ্টি হতে লাগলো। মাঝে মাঝেই কাপ কম পড়ার ঘটনা ঘটতে লাগলো, যেমন একজন যদি চুরি করে ডাবল কাপ খেয়ে নেয় তবে গুনতি করা বোর্ডারের কাপ তো কম পড়বেই । কলেজের আসার সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম, নতুন পরিবেশে আমার জ্বর হলো । জ্বরের দ্বিতীয় দিন, আমি ক্লাসে যেতে পারিনি, ঘরে শুয়ে আছি, হঠাৎ ডাইনিং রুম থেকে আমার তলব পড়ল, ৪র্থ বর্ষ কলার ছাত্র, মইনুল হোসেন দুপুরে খেতে যেয়ে কাপ কম পড়েছে । আমার উপর ভীষন হম্বিতম্বি, এখন উনার খাবারের জন্য এক কাপ তরকারির ব্যবস্থা করতে হবে, কিন্তু কোথায় তরকারি পাব। যাহোক বাবুর্চি সাহেব একটা ডিম ভাজা করে এনে সে সম্যসার আপাতত সমাধান করলেন। তবে মাসব্যাপি আমার কাপ ম্যানেজারের অভিজ্ঞতা আরো করুন, ”আমার কাপ ছোট”, ”আমার কাপে পেটির মাছ নাই”, ”গিলা কলিজার কাপ চাই”, ইত্যাদি নানা ধরনের দাবির সন্মুখিন হতে হলো এবং সমাধান করতে হলো । আমার তখন, ”ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচির মতো অবস্থা”।

অষ্টম অধ্যায়
কলেজ জীবনের একমাস পার হয়ে গেল, নানা ধরনের অভিজ্ঞতায় আমি এখন অভিজ্ঞ । ইতিমধ্যে আমার কয়েকজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে, আমাদের একজনের সাথে আর এক জনের পরিচয় রোল নম্বর ধরে, ফিল আর আমি তো পুর্ব পরিচিত ছিলামই, তার সাথে যুক্ত হলো পাবনার লোকাল ছেলে হাসান ও ভেড়ামারার ছেলে নুরুল হুদা। হাসান প্রায় ছয়ফুট লম্বা এবং শক্তসার্মথ, নরুল হুদাও প্রায় পাঁচফিট সাত ইঞ্চি হবে, আর ফিল প্রায় পাঁচ ফিট আট ইঞ্চি, আর আমি সবার থেকে বেটে পাঁচ ফিট চার ইঞ্চি লম্বা, রোগা ও দুর্বল । নতুন বন্ধুদের পাওয়ার পর থেকে আমাকে আর ক্লাস রুম পরিবর্তনের সময়, ভালো সিট পাওয়ার জন্য দৌড়াতে হয় না, হাসান ও নুরুল হুদা আমার জন্য সিট রেখে দেয় । ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গে সহপাঠি চার জন ছাত্রীর রোল নম্বর ও আমাদের মুখস্ত, কিন্তু কেউ কারো সাথে পরিচিত নই, এমনি কি দুই বছর কলেজ জীবনেও কারো সাথে পরিচিতি হতে পারি নি । আসলে তখন কার সামাজিক অবস্থাই ছিল ও রকম, বন্ধুদেরকে আমরা ”আপনি, আপনি” করতাম, মেয়েদেরকে সম্মান করতাম আর নিজদের পড়াশুনা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারতাম না । দুই বছর পাবনা কলেজে কোন রাজনীতি বা ছাত্র সংগঠন দেখি নাই, একটাই শুধু বিভেদ ছিল, পাবনার লোকাল ছাত্র আর বহিরাগত ছাত্র, তাও সব সময় সৌর্হাদ্য পরিবেশ বজায় থাকত ।
কলেজে যেয়েও শিক্ষকরা যে শুধু লেকচার দিতেন তা নয়, তারা মাঝে মাঝে পড়া ধরতেন। একদিন ফিজিক্সের হেড, মফিজ স্যার ফিজিক্স বইয়ের প্রথম দিকের, নিউটনের সুত্র বলতে বললেন, আমি জবাব দিতে পারলাম না । যেহেতু ফাস্ট ডিভিশন প্রাপ্ত ছাত্রদের মধ্যে আমার রোল নম্বর প্রথম, তাই সব স্যারেরা প্রথমে আমাকেই প্রশ্ন করতেন । মফিজ স্যারের প্রশ্নের জবাব না পারাতে, মফিজ স্যার যারপরনাই রুস্ট হলেন এবং সারা ক্লাসের সামনে, বিশেষ করে মেয়েদের সামনে আমাকে দাড় করিয়ে রেখে বকাবকি করলেন, যেমন ”ভালো রেজাল্ট করে এসেছো”, ”বাবা, মা মানুষ করবে বলে পাঠিয়েছে”, ”কলেজে আড্ডা মেরে পড়াশুনা না করলে তার কি খারাপ পরিনতি হবে” ইত্যাদি অনেক উপদেশমুলক ভাষায় বকা দিলেন এবং সর্তক করলেন । আমি লজ্জায় পাথর হয়ে গেলাম, সারা ক্লাসের সামনে আমি অপমানিত বোধ করলাম এবং আমি একটা ভালো শিক্ষা পেলাম ।এর পর মফিজ স্যারের আর কোন ক্লাসে আমি পড়া না করে যাই নাই । আসলে কলেজে গিয়ে প্রথমে যে অসুবিধা গুলো হচ্ছিল তা মুলত সবকিছু ইংরেজিতে পড়তে হতো, ফিজিক্স, কেমিস্ট্র, বোটানি, জুওলজি, এমনকি অঙ্ক ও ইংরেজিতে পড়তে হতো । স্কুলে থাকা অবস্থায় সবকিছু বাংলার মাধ্যমে পড়েছি, হঠাৎ করে মাধ্যম ইংরেজি হওয়ায় এই সম্যসার সৃস্টি, যা অচিরেই কাটিয়ে উঠতে পারলাম।
অনেক ঘটনা, প্রতি ঘটনার ভিতর দিয়ে ফাস্ট ইয়ার পার হতে লাগল, ইতিমধ্যে আমার পড়াশুনা একই গতিতে চলতে লাগল । ফিজিক্সের, মফিজ স্যার, আজিজ স্যার ও নুরুল হুদা স্যার সমান গতিতে পড়িয়ে ফাস্ট ইয়ারের কোর্স প্রায় শেষ পর্যায়ে এনে ফেলেছে, ল্যবোরেটরি, এক্সপেরিমেন্ট রুটিন অনুযায়ী চলছে, কেমিস্ট্রতে হামিদ স্যার ও প্রফুল্ল স্যার বিষয়টিকে সহজবোধ্য এবং ছাত্রদের পছন্দের বিষয় রুপে পরিচিত করে ফেলছেন। অঙ্ক বিষয়টি, আমার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় বলেই কিনা জানি না, অঙ্কের কাশেম স্যার তুফান মেইলের মতো পড়িয়ে, চার মাসের মধ্যে ত্রিকোণোমিতি ও পরের তিন মাসে এ্যালজেব্রা শেষ করে ফেললেন। উনার পড়াবার পদ্ধত্তি খুবই আকর্ষনীয় বিধায় আমরা মজা পেতে লাগলাম। জিওমেট্রি পড়াতেন, সুলতান মাহামুদ স্যার, উনার নিজের লেখা বই থেকে পড়াতেন, তাছাড়া আমাদের হোস্টেল সুপার হওয়াই, আমরা উনার খুব কাছে আসতে সক্ষম হয়েছিলাম। মোট কথা, প্রথম বর্ষে সব স্যারদেরই কম বেশি নজরে ছিলাম বলে প্রাথমিকভাবে অসুবিধা হলেও পরবর্তীতে ভালো ভাবে এগুতে লাগলাম । ইংরেজি গদ্য পড়াতেন মজিবর রহমান- ২ স্যার ,পদ্য পড়াতেন মজিবর রহামান-১ স্যার , উনি ইংরেজি বিভাগের প্রধান ছিলেন । উনার শেলী, কীটস, বায়রন এবং শেক্সপিয়ার ইত্যাদি ইংরেজ কবিদের পরিচিতি ও ” দি রাইম অব দি এ্যানসিয়েন্ট মেরিনার ” কবিতাটি পড়াতে ছয় মাস কেটে গেল । ইংরেজির ”রেটরিক ও প্রোসোডি” পড়াতেন আওরঙ্গজেব স্যার, উনার ক্লাসে খুব গন্ডগোল হতো আবার মজাও হতো, যেমন পিছন থেকে কেউ একজন ম্যাও – উু- উু- উু ডেকে উঠলে, সারা ক্লাস সহ তার ঢেউ উঠত সঙ্গে সঙ্গে হাসির রোল পড়তো । বাংলা গদ্য পড়াতেন আনসার স্যার, ৬ ফিট লম্বা, বিশাল দেহ, কলেজের গেম টিচার ছিলেন, বঙ্কিমের বিড়াল গল্পোটি পড়াবার সময় আবার সেই ম্যাও ধ্বনি, অনেক তিক্ত ও মজার অভিজ্ঞতা, পরবর্তী কালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বদলি হয়ে যান। বাংলা কবিতা পড়াতেন আতাউর রহমান স্যার, গতানুগতিক পড়ানো । অল্প কিছু দিনের জন্য পেয়েছিলাম আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যারের মতো প্রতিভাবানের সাহচর্য। তবে সেকেন্ড ইয়ারের পুরা সময়টা পেয়েছিলাম আনোয়ার পাশা স্যারের মতো বিশিস্ট ব্যক্তিত্ব, তিনি আমাদের ”বিলাতে সাড়ে সাতশ দিন” বইটি পড়াতেন। জীবনের স্বল্প পরিসর এই দুই বছর অনেক প্রতিভাবান স্যারের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।
কলেজের ভর্তি হওয়ার সময় মনে করেছিলাম ফাস্ট ডিভিশন পেয়েছি, ভালো ছাত্র হিসাবে ভালো স্কলারশিপ পাব, কিন্তু কোন ডি.পি.আই বা সরকারি স্কলারশিপ পেলাম না। শুধু ডেপুটি ম্যাজিস্টেট মামার, সুপারিশে প্রিন্সিপাল সাহেব, দুবছরের জন্য আমার কলেজের বেতন হাফ ফ্রি মঞ্জুর করলেন। গোনা ৫৫ টাকায় মাস চালানো, অল্প বয়সের নানা কিছু পছন্দের খাওয়ার প্রবল ইচ্ছা ও মাঝে মাঝে শহরের অবস্থিত বানী সিনেমা ও রুপকথা সিনেমায় ছবি দেখার প্রবল ইচ্ছা, ঐ টাকার ভিতরেই ম্যানেজ করতে হতো । এমনি অসচ্ছল অবস্থায় মন খারাপ হলে, মাঝে মাঝে বিকালে মামার বাড়িতে বেড়াতে যেতাম । তাছাড়া বছর ব্যাপি কলেজে একটা না একটা অনুষ্ঠান লেগেই থাকত, কোন দিন গানের অনুষ্ঠান, কোন দিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,কোনদিন জিমন্যাস্টিক প্রর্দশনী, আর বছর ব্যাপি হোস্টেলের সামনে খেলার মাঠের অনুষ্ঠানতো ছিলোই। বার্ষিক স্পোর্টস এলে মাস খানেক ধরে আমোদ প্রমোদে সময় কেটে য়েত। ইতিমধ্যে কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন এসে গেলো , আমাদের হোস্টলের ৪র্থ বর্ষের আর্টসের ছাত্র, নুর মোহাম্মদ ভাই ভি পি পদে দাড়ালেন, শুরু হলো মাস ব্যাপি ক্যানভাস, প্রচারের পালা । কত না প্রত্যান্ত অঞ্চলে যেতে হয়েছে, দলে দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন ছাত্রদের মেসে, বিভিন্ন ছাত্রছাত্রীদের বাসায়। হোস্টেল থেকে দাড়িয়েছে, আমাদের সম্মানের বিষয়, তাই উৎসাহ করে মাসব্যাপী প্রচারনা চালানো হলো। পড়াশুনায় কিছু ভাটা পড়লও বটে তবে আমাদের বিরোধী প্রার্থী রশিদ সাহেব পাবনার লোকাল ছাত্র, তাই প্রতিযোগীতাটা আরো প্রকট । আবার সেই লোকাল, বহিরাগতের যুদ্ধ, তবে শেষ হাসি আমরায় হাসলাম । বিশাল জয়, আনন্দে মুখর হোস্টেলবাসী, এই উপলক্ষে হোস্টেলে একটা নাটক মঞ্চস্থ করার ব্যবস্থা হলো । হোস্টেলের ছাদের উপর স্টেজ বানিয়ে, তারপলিন টানিয়ে, বসার ব্যবস্থা হলো, অভিনীত হবে নুর মোহাম্মদ ভাইয়ের লেখা ”নবযুগ” নাটকটি । অভিনয় করবে শুধুমাত্র হোস্টেলের ছাত্ররা, তখনকার দিনে নারী চরিত্রে অভিনয় করার মতো পাত্রী পাওয়া দুস্কর ছিলো, ছাত্রীরা তো নয়ই, পেশাদার অভিনেত্রী পাওয়াও সমস্যা ছিলো । আবার সেই নারী চরিত্রে অভিনয়ের পালা, আমি দেখতে শুস্রি ছিলাম, দাড়িগোপ অল্প অল্প উঠেছে, তাই কামিয়ে, শাড়ি পড়ে, মেকাপ লাগিয়ে, নারী চরিত্রে অভিনয় করতে হলো। কেমন অভিনয় হলো জানি না তবে, প্রচুর হাত তালি পড়ল, কলেজের স্যারের বাহবা দিলো, মেইন হোস্টেলের সম্মান বাড়ল । সেদিনের কথা মনে হলে আজও হাসি পায় ।
যথাসময়ে প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ হলো, ভালো ভাবে উতরে গেলাম। বিদেশ বিভুইয়ে, স্বজন ছাড়া, বাবা মার শাসন হারা, বন্ধু বান্ধাব এর সাহচার্যে, স্বাধীন ভাবে পড়াশুনা করে পরীক্ষায় ভালোই ফল করলাম। ইংরেজি,অঙ্ক ও কেমিস্ট্রতে খুব ভালো মার্ক জুটল তবে ফিজিক্সে আশানুরুপ হয়নি বলে কিছুটা অস্বস্তি লাগতে লাগলো। আবার নতুন উদ্যামে দ্বিতীয় বর্ষের পড়াশুনা শুরু হলো, ইতিমধ্যে আরো কিছু নতুন বন্ধু জুটেছে, হামিদুল, গফুর ও আনিস । ইতিমধ্যে ঈশ্বরদি গ্র“পের ছাত্রদের সাথে আমার ভালো সর্ম্পক ও বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। ঐ গ্র“পের নেতা হাবিব, আমাকে সাদরে গ্রহন করলো এবং তাদের সাথে আমার দহরম মহরম শুরু হলো। ঐ সময়ে ঈশ্বরদি গ্র“পের, কলেজে আধিপত্য ছিলো, তাই পাবনার লোকাল গ্র“প এটাকে ভালো চোখে দেখতো না। আমি ঈশ্বরদি গ্র“পের সাথে মিশে যাওয়াতে অনেকের হিংসার পাত্র হলাম। হাবিব অনেকবার আমার চুয়াডাঙ্গার বাড়িতে বেড়াতে গেছে, আর আমিও পাবনা যাওয়ার পথে ঈশ্বরদি স্টেশনে নেমে অনেকদিনই ওদের বাসায় রাত কাটিয়েছি। ইতিমধ্যে পাবনার লোকাল ছাত্র বেনু ও জামির সাথেও আমার হৃদতা হয়েছে, যাহোক এভাবে বিভিন্ন গ্র“পের সাথে তাল মিলিয়ে আমার পড়াশুনা স্বাভাবিক গতিতে এগুতে লাগল । আবার সেই চুয়াডাঙ্গা স্কুলের পুনরাবৃত্তি, বিভাগীয় শিক্ষকরা মনে করলেন যে আমাদের কে একটু খেয়াল করে পড়াশুনা করালেই, আমরা হয়তো আই.এস. সি পরীক্ষায় স্থান পাব। তখন আই.এস. সি পরীক্ষা হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে, তাই আমাদের পরীক্ষায় হবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। স্যারেরা সেভাবে আমার, হামিদুলের ও আনিসের উপর নজর রাখতে লাগল, বিভিন্ন ল্যাবরোটরিতে আমাদের প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় বিশেষ খেয়াল রাখা হলো । দেখতে দেখতে টেস্ট পরীক্ষা এসে গেল এবং একদিন টেস্ট পরীক্ষা হয়েও গেলো। স্বাভাবিক ভাবেই পরীক্ষা ভালো করলাম, ভালো মার্ক পেলাম। এখন স্যারদের বড় আশা যে আই.এস. সি পরীক্ষায় আমরা স্ট্যান্ড করবো।
১৯৬২ সাল, দেশ তখন পাকিস্তানের মার্শাল ল কাটিয়ে উঠে বুনিযাদি গনতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত, পুর্ব ও পশ্চিম উভয়ে পাকিস্তানের ৮০ হাজার করে ১ লক্ষ ৬০ হাজার বুনিয়াদি গনতন্ত্রের সদস্য দ্বারা শাসিত। তাদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত, ফিল মার্শাল আইয়ুব খাঁন তখন পাকিস্তানের পেসিডেন্ট। দেখে বিরোধীদল বলে কিছু নেই, নেই কোন রাজনীতি, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ, চলছে এক পাটি, এক দল, একনায়কতন্ত্র। উভয় পাকিস্তানে একজন করে গর্ভনর, তার অধীনে মন্ত্রিসভা, এভাবেই দেশ পারিচালিত হচ্ছে। মাঝে মাঝে ছাত্ররা ফুঁসে উঠে বিরোধিতা করলেও, কোন ছাত্র মিছিল, মিটিং, নিষিদ্ধ। মোট কথা শান্তিপুর্ন ভাবে দেশ চলছে, তবে ভিতরে ভিতরে মাঝে মাঝে ফেঁপে ফুঁসে উঠছে রাজনীতি। সেই সময়কার শিক্ষা কমিশনের রির্পোট অনুয়ায়ী, ডিগ্রী পাস কোর্স, তিন বছর মেয়াদী চালু হয়েছে, এ নিয়ে তীব্র ছাত্র অসন্তোষ হলেও, কারো টু শব্দ করার উপায় নেই । আমার মনে পড়ে ১৯৬২ সালের মে মাস পর্যন্ত আমার পাবনা কলেজ থাকা অবস্থায় কোন ছাত্র মিছিল, মিটিং বা হরতাল হয় নাই ।
মে মাসে ১৯ তারিখে ১৯৬২ সাল, আমার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হলো । প্রশ্ন বেশ কঠিন হলো, যা ভেবে ছিলাম, সহজে পার পেয়ে যাব কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তা বোধ হয় হবে না । অঙ্ক পরীক্ষাটা মনোপুত হলো না, হয়তো লেটার মার্ক থাকবে না, কেমিস্ট্র পরীক্ষা খুব ভালো হলো, অব্যশই লেটার মার্ক থাকবে, ফিজিক্সে লেটার না থাকলেও কাছাকাছি যাবে। কলেজে ও হোস্টলে ভালো ছাত্রদের কাতারে, হামিদুলকে এবং আনিসকে ভাবতাম, কিন্তু তাদের পরীক্ষায় তথইবচঃ । সামনে প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা, বিভাগীয় স্যাররা, আমাদের জন্য বিশেষ করে আমার জন্য, উচ্চাভিলাষী, তারা ভাবছেন আমি একটা কিছু করব । প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার আগেই আমাকে ডেকে নানান ধরনের উপদেশ, নানান ধরনের উৎসাহ, ভাইভা পরীক্ষায় এক্সটারনাল পরীক্ষককের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পন্থা আমাকে শেখানো হলো। নানা ভাবে তাঁরা কলেজের জন্য তারা আশাবাদী। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বোটানি ও জুওলজি প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার জন্য নিদিষ্ট দিনে এবং বিভিন্ন গ্র“পে ভাগ করা হতো । প্রত্যেক প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার জন্য আগে ভাগে এক্সপেরিমেন্টর টোকেন লেখা থাকত, প্রত্যেক ছাত্রকে লটারী টিকিটের মতো টোকেন টানতে হতো, যার ভাগ্য যে এক্সপেরিমেন্ট পড়ে। সব বিষয়েরই কিছু এক্সপেরিমেন্ট সহজ থাকত আবার কিছু কঠিন থাকত,যার ভাগ্যে যা পড়ে। ফিজিক্স প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় আমি টোকেন টানলে, আমার ভাগ্য পড়ল ম্যাগনেটিজম পেপারের ম্যাগনেটের পোল নির্ধারন করা, ম্যাগনেট বার ও কিছু লোহার কনা দিয়ে পরীক্ষা শুরু করে, নিয়ম মোতাবেক খুব সহজেই পোল বাহির হয়ে গেলো। এক্সপেরিমেন্ট এর ফলাফল শুদ্ধ হওয়ায়, ডাক পড়ল ভাইভা পরীক্ষা জন্য, সেখানেও ভালোভাবেই উত্তরে গেলাম।
কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায়,আননোন সল্ট এনালাইসিস পরীক্ষার নিয়ম মোতাবেক, টোকেন টানতে হলো । সল্টের গ্র“প টেস্ট করতে ড্রাই টেস্টে কোন সঠিক ফলাফল পাওয়া গেলো না, কিন্তু ওয়েট টেস্টে যেয়ে থার্ড গ্র“পে যেয়ে পরিস্কার কার্বনেটের রিং পাওয়া গেল, সুতারং কার্বনেটই কনফার্ম রেজাল্ট। কিন্তু সল্টের বেজ মিলাতে পারছিলাম না, একে একে ফিফত্ গ্র“প পর্যন্ত টেস্ট করেও সঠিক ভাবে ধরা যাচ্ছিল না কোন সল্ট, একবার মনে হচ্ছিল ম্যাগনেসিয়াম, কিন্তু ম্যাগনেসিয়াম এর কোন কনফার্মেটোরি টেস্ট নাই, একমাত্র ড্রাই টেস্ট দ্বারাই সল্ট নিধারন করতে হয় । মাথার ভিতরে তখন দুশ্চিন্তা এসে গেছে, এদিকে স্যারদের কাছে খবর চলে গেছে যে মাান্নান এর সল্ট এনালাইসিস মিলছে না। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আধঘন্টা আগে কেমিস্ট্রি ল্যাবের বেয়ারার সুভাষদার আগমন, চোখে চোখে কথা হলো, সুভাষ দার কাছে প্রত্যেক সল্টের টোকেন মোতাবেক কোড নম্বর থাকে। সুভাষ দার আগমন দেখে বুঝেছিলাম, নিশ্চয়ই স্যারের নির্দেশ, আমি শুধু আস্তে করে বললাম ম্যাগনেশিয়াম কার্বনেট নাকি, সুভাষ দা নিঃশব্দে সায় দিয়ে কেটে পড়ল, বুঝলাম আমার এনালাইসস সঠিক হয়েছে । তারপর ভাইভা পরীক্ষা, সেখানে হামিদ স্যার, সরাসরি বলেই ফেলল এক্সটারনালকে যে, ভালো ছাত্র, প্লেস পেতে পারে। পরীক্ষার পর মনে হলো হয়ত ভালোই মার্ক দিয়েছে।
জুওলজি আমার ফোরথ্ সাবজেক্ট ছিলো, অর্থাৎ ২০০ মার্কের পরীক্ষার মধ্যে যা মার্ক পাব তা থেকে ৮০ মার্ক বাদ দিয়ে আমার মুল মার্ক শিটের সঙ্গে যোগ হবে, এবং তাতেই ডিভিশন এবং প্লেস নির্ধারন হবে । বোটানি প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায়, জবা ফুলের ডিসেকশন আসল, বেয়ারার আমজাদ ভাইয়ের সহায়তায় মোটামুটি ভাবে ডিসেশন শেষ করলাম, এরপর জুওলজি পরীক্ষায় আসল ককরসের এলিমেন্টরী সিস্টেম ডিসেকসন, এটাও বেয়ারা আজমল ভাইয়ের সাহায্য মোটামুটি করে ফেললাম। আসলে ফোরথ্ সাবজেক্ট হিসাবে বায়োলজির উপর কখনই জোর দেই নাই, কারন ডাক্তারী পড়ার কোন ইচ্ছাই ছিলো না, তাই খুবই হালকাভাবে নিয়ে ছিলাম । থিওরোটিকাল পরীক্ষা যে খুব ভালো হয়েছে তা বলা যায় না, টার্গেট ছিলো ৮০ মার্ক বাদ দিলে ৫০-৬০ মার্ক যোগ হলেই চলবে । কিন্তু বোটানির হাম্মাদ স্যার বিষয়টিকে জটিল করে ফেলল, এক্সটারনালকে, ভালো ছাত্র হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিতে বিপত্তি বাধল, আমি ভাইভা তে এক্সটারনালের অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে পারলাম না, ফলে স্যার খুব লজ্জিত হলেন, পরে অবশ্য আমাকে খেদ করে বলায় আমি ও আমার অপারগতার জন্য লজ্জা পেলাম। যা হোক প্র্যকটিকাল পরীক্ষা ভালোভাবে শেষ হলো এবং শুনতে পেলাম ভালো মার্ক পাওয়া গেছে, শতকরা ৯০ থেকে ৯৪ পার্সেন্টের মতো । এবার বিদায়ের পালা, পাবনায় আমার দুই বছরের বাস শেষের দিকে, এরপরের গন্তব্য অচেনা, অজানা । কোন পথে পাড়ি জমাব, কতটা বদ্ধুর সে পথ, বাধা বিপত্তিই বা কেমন, ভবিষ্যতই তা বলে দিবে।
পাবনার বাস, শেষ করার আগে পাবনার কিছু ঐতিহাসিক স্থান বা প্রসিদ্ধ স্থান দেখার বড় সাধ হলো। সেই সময় দেশের একমাত্র পাগলাগারদ পাবনা শহর থেকে তিন চার মাইল দুরে হেমায়েতপুরে অবস্থিত ছিলো । আমরা চার বন্ধু, আমি, ফিল, হাসান ও নুরুল হুদা একদিন এক ঘোড়ার গাড়ি বা স্থানীয় ভাষায় টম টম বলে অভিহিত গাড়িতে করে, হেমায়েতপুর গেলাম, দিনভর পাগলা গারদ ও হাসপাতাল বিভিন্ন অংশ ঘুরে বেড়ালাম, দিন শেষে নতুন এক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলাম । দুই এক দিন পর গেলাম পাবনার বিখ্যাত জমিদার বাড়ি যা তখন এডরুক ল্যাবোরেটরি বলে খ্যাত ছিলো, চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখলাম, ঔষধের কারখানা, ল্যাবোরেটরি ইত্যাদি । কয়েকদিন বিরতি দিয়ে আবার ছুটলাম সাড়াঁর ব্রীজ বা পাকশি হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখতে, তাৎকালিন সময়ে, ষোলটি পিলারের উপর অবস্থিত, লোহার তৈরী এই ব্রীজটি, পুর্ব পাকিস্তানের দীর্ঘতম ব্রীজ ছিলো। সারাদিন ধরে ঘুরলাম, অনেক ছবি তুললাম, পায়ে হেটে ব্রীজের উপর দিয়ে পদ্মা নদী পার হলাম ইত্যাদি নানা স্মৃতি এখনও মনের খোরাগ জোগায়। কয়েকদিনের ভিতরে আমাদেরকে চলে যেতে হবে পাবনা শহর ছেড়ে, পাবনা কলেজের মেইন হোস্টেলের রুম নং এ – ৫ ছেড়ে, বিশাল কলেজ ক্যাম্পাস, বিভিন্ন ভবন, কলেজের পুকুরঘাট, মাঠে বসে বন্ধু বান্ধাবের সাথে বসে একান্তে গল্প করার স্থান ইত্যাদি । যে চারটি মেয়ে আমাদের সাথে পড়তো তার ভিতর রোল নম্বর ২৪, নাম না জানা, শাড়ি পরে মাথাায় ঘোমটা দিয়ে আসত, যাকে আমরা পিছনে চাচী বলে খ্যাপাতাম, তার সাথে আর কোন দিন দেখা হবে না পরিচয় হবে না । মনে পড়ে রোল নম্বর ১৪৪, নাম নুরুননাহার, কোন এক সময় চুয়াডাঙ্গায়, নুরুন্নাহারের বাবা সরকারি ডাক্তার ছিলো, আমার সাথে কয়েকবার কথা হয়েছিলো, প্র্যাকটিকাল খাতা আদান প্রদানের ভিতরের যা সীমাবদ্ধ ছিলো, তার সঙ্গেও হয়ত আর কোনদিন দেখা হবে না, কথা হবে না। রোল নম্বর ২১২, যে পাবনা শহরের লোকাল মেয়ে ছিলো, তার নামও আজও অজানা, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাড়ি পড়ে আসত, শাড়ির রঙ্গের সাথে রং মিলিয়ে মাথায় ফুল পড়ত, সেও কোন দিন জানবে না আমার বা আমাদের মতো সহপাঠিদের নাম বা বৃতান্ত। সবশেষে যে মেয়েটি আমাদের ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলো তার রোল নম্বর ২৪৫, একটু বেশি র্স্মাট, সদ্য ঢাকা ইডেন কলেজ থেকে ফেল করে পাবনা এর্ডওয়াড কলেজে ভর্তি হয়েছিল, মেয়েটি একটু চঞ্চল ছিলো কিন্তু শালীনতা রেখে শাড়ি পড়ত এবং চলাফেরা করতো, সেও কোনদিন জানবে না তার ২৪৭ জন সহপাঠির পরিচয় । কলেজ জীবনে এমনি নানান স্মৃতি আজও একা থাকলে মনে পড়ে, পীড়া দেয়, আনন্দ বেদনার নানা কাহিনীর জন্ম দেয়, আফসোস হয় ঐদিনগুলো কথা ভেবে।[চলবে]

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

<