বটবৃক্ষের সালতামামি: পার্ট-০৬

বটবৃক্ষের সালতামামি: পার্ট-০৬ নভেম্বর ২, ২০১৭ ০ comments

।প্রকৌশলী এম. এ. মান্নান।

।সময়কাল ১৯৫৬ – ১৯৬০।
-৬ষ্ট অধ্যায়-

:হাইস্কুল জীবন:
সময় ১৯৫৬ সাল,জানুয়ারি মাস । আমার মিয়া ভাই আমাকে চুয়াডাঙ্গায় স্কুলে ভর্তি করার জন্য সাইকেলের পিছনে চড়িয়ে চুয়াডাঙ্গা নিয়ে আসলেন। চুয়াডাঙ্গার স্কুলের নাম, চুয়াডাঙ্গা ভি .জে . এইচ .ই ,যথা ভিক্টরীয়া জুবিলী হাই ইংলিশ স্কুল। প্রতিষ্টিত সন ১৮৮০-১৯২৮ । ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী মহারানী ভিক্টরীয়ার নাম অনুসারে স্কুলের নাম করন। মিয়া ভাই স্কুলের অফিসে কার কার সঙ্গে যেন আলোচনা করলেন, শেষে কেরানি সাহেব জানালেন টি,সি ছাড়া ভর্তি করা যাবে না। সুতারং মিয়া ভাই আবার আমাকে গ্রামে ফেরত নিয়ে আসলেন । এক সপ্তাহ পর আবার আমাকে চুয়াডাঙ্গায় স্কুলে ভর্তি করার জন্য আনলেন, ইতিমধ্যে টি সি যোগাড় হয়েছে । আমাকে ভর্তি করা হলো ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে, সেকশন এ, আমার রোল নম্বর ৩৬। স্কুল খুলবে বিশে জানুয়ারি হতে, তাই আমাকে নানা বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলো, কারন এখন থেকে নানা বাড়িতেই থাকতে হবে।
নানা বাড়িতে আমার স্থান হলো নানীর ঘরে, শুতে হবে নানীর কাছে, পাশাপাশি একটা খাট ও একটা চৌকি, খাটের উপর আমার শোয়ার জায়গা নির্ধারিত হলো । নানী বাড়ির পরিবেশ সম্পুর্ন ভিন্ন ধরনের, আমার বয়সের কেউ নেই, পরিবারের সদস্য, নানী, আমার একমাত্র মামা, কোথায় থাকেন তার কোন ঠিক নাই,পাশের ঘরে থাকে মেজো মামা ও মেজো মামি। সর্বসাকুল্যে এই ছিল নানীর সংসার, নানা অনেকদিন আগেই ইন্তেকাল করেছেন, খালাদের সব বিয়ে হয়ে গেছে, মামা তখনও অবিবাহিত। নানী আমাকে পেয়ে মহাখুশি, নানা ভাবে আমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে শহরের উপযোগী করে তুলতে চাইলেন। আমি বাবা মার শাসন মুক্ত হয়ে, মোটামুটিভাবে একটা স্বাধীন সত্বা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলাম। এর আগে চুয়াডাঙ্গায় যে কয়েকবার এসেছি মায়ের সাথে এসেছি, বিভিন্ন বিয়ে শাদীতে ও মৃত্যু বাড়ির খানায় । নানীর বাড়িতে একাকী আসার অভিজ্ঞতা আরো একবার হয়েছিল,যখন ভারতের মাদ্রাস থেকে কমলা সার্কাস পাটি বলে একটি সার্কাস দল চুয়াডাঙ্গায় এসেছিল। বাবা চেয়েছিলেন আমরা যেমন আমি ও আমার ছোট বোন বিথী ঐ বিখ্যাত সার্কাস দেখি। সেবারও মিয়া ভাইয়ের সঙ্গে সাইকেলে চড়ে চুয়াডাঙ্গায় আসি এবং রাতে সার্কাস দেখি। পরদিন সকালে ফিরে যাওয়ার সময়, মিয়া ভাই আমাকে নানীর সাথে দেখা করার জন্য নানী বাড়ি এনেছিলেন। নানী বাড়িতে এসে আমার ভীষন জ্বর, সুতারং আমার আর গ্রামের ফেরত যাওয়া হলো না, নানীর বাড়িতে থেকে যেতে হলো। সাতদিন জ্বর ভোগার পর সুস্থ হয়ে দেখলাম ঐ সময় সেজে খালার মেয়েরা, নীলু,মারু ও কেয়া নানী বাড়িতে আছে। ওদের সাথে খুব ভাব হয়ে গেল আমি প্রায় একমাস আনন্দের সঙ্গে নানী বাড়িতে কাটালাম। কিন্তু এবার কার নানীর বাড়ির পরিবেশ সম্পুর্ন ভিন্ন, এবার আমার সমবয়সী কেউ নাই।তবুও এই ব্যবস্থা মেনে নিয়ে, উচ্চ শিক্ষার জন্য নানী বাড়িতে থাকতে হলো ।
নির্দিষ্ট দিনে স্কুল খুলল, তখন নতুন বই কেনা হয় নাই বা বইয়ের লিস্টও দেওয়া হয়নি। প্রথম দিন আমি খালি হাতেই স্কুলে গেলাম, ৬ষ্ঠ শ্রেনীর সেকসন- এ, ঘরটি দেখে নিলাম, মুল ভবনে নয়, ভবনের উত্তর দিকে একাবারের রাস্তার ধারে, পুরাতন একতলা ভবনের একটা ঘর । দেখলাম চারদিকে ছেলেরা ঘুরাঘুরি করছে, বন্ধু বান্ধব সাথে গপপো করছে, আবার কেউ কেউ মার্বেল খেলছে। আমার তো কোন বন্ধু বান্ধব নাই, তাই ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। ঘন্টা বেজে গেলে সবাইকে এসেম্বলিতে দাড়াতে হলো, ক্লাস ফোর থেকে শুরু করে ক্লাস টেন পর্যন্ত সবাই লাইন করে দাড়ালো, কিছুক্ষণ পর হেড স্যার আসলেন সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য শিক্ষক বৃন্দ । ড্রিল স্যার রেফাতুল্লাহ সাহেব, সবাইকে সোজা হয়ে দাড়াতে বললেন, হেড স্যার, পাকিস্তানের পতাকা তুললেন, তারপর তিন ক্লাস থেকে তিনটা ছেলে যেয়ে সামনে দাড়লো । তারা জাতীয় সঙ্গীত গাইল এবং আমাদের কেও গাইতে হলো,”পাক ছার জমিন, শাদ বাদ, কিসওয়ারে জমিন, শাদ বাদ ”ইত্যাদি। এরপর এক এক করে ক্লাসের নাম ডাকলে লাইন করে যার যার ক্লাস রুমে যেয়ে বসতে হলো । প্রথম দিন কারো হাতে বই খাতা নাই, যে যেখানে পারল, বেঞ্চে বসে পড়ল। পাঁচ বেঞ্চের ক্লাসে তৃতীয় বেঞ্চে আমি বসলাম ।
যথাসময় ক্লাস টিচার ক্লাসে আসল, হায়বাতুল্লাহ স্যার, উনি ইংরেজি শিক্ষক । প্রথম দিন আলাপ পরিচয় হলো, স্যারকে খুব রাশভারি ও কঠোর প্রকৃতির মনে হলো । পরদিন থেকে খাতা ও পেন্সিল সঙ্গে আনতে বললেন । ঘন্টা বেজে যাওয়ার পর স্যার চলে গেলেন, নতুন বিষয়ের নতুন স্যার আসলেন। এভাবে টিফিনের আগে পর্যন্ত তিন ঘন্টা, তারপর আধঘন্টা টিফিন, টিফিন পর আবার তিন ঘন্টা ক্লাস । এই একাই নিয়ম, একাই ক্লাস, একাই এসেম্বিলিতে দাড়ানো, প্রতিদিন, প্রতিমাস, প্রতিবছর, চলতে থাকল ক্লাস টেন পর্যন্ত।
চুয়াডাঙ্গা স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর, আমার সবকিছু যেন উলটপালট হয়ে গেল । ছিলাম অঁজ পাড়াগায়ের শান্ত পরিবেশে, প্রকৃতির লীলাখেলায়, বিশুদ্ধ বাতাস বুক ভরে টেনে নেওয়ায়, সরল গ্রামবাসির সঙ্গে মিলে মিশে, সব মিলে এক অনাবিল শান্তি। চুয়াডাঙ্গা এসে পেলাম শহুরে জীবন, না আছে সখ্যতা না আছে বন্ধুত্ব, সবাই যার যার নিয়ে ব্যস্ত, পোষাকী আলাপ, সব কিছু যেন যান্ত্রিক। নানী বাড়ির পরিবেশ স¤র্ককে আগেই বলেছি, সেখানে আমি সর্ম্পুন একাকী, না আছে ভাই বোন, না আছে বাবা মার শাসন। কদিন স্কুল করেই আমি হাফিয়ে উঠলাম, খুঁজতে লাগলাম মনুস্বত্বের এবং সভ্যতার ক্রমবির্বতনের। নানা বাড়ির পাশে নানাদের জ্ঞাতী গোষ্ঠী। নানার এক জ্ঞাতী ভাই নজির মোক্তার সাহেব,উনার প্রথম পক্ষের অনেক গুলো ছেলেমেয়ে, ৩৫ বছর থেকে ১০ পর্যন্ত বয়সের। তার ভিতর সর্বকনিষ্ঠ কাওসার, আমার সাথে ৬ষ্ঠ শেনীতে পড়ে, আর তার বড় ভাই বাশার মামা ও বোন খালেদা খালা, ক্লাস সেভেন পড়ে। নজির নানার দ্বিতীয় পক্ষের মেয়ে রাবেয়া পড়ে ক্লাস ফাইভে। হাঁটি হাঁটি করে ওদের বাসায় একদিন দুইদিন যাতায়াতের পর, সখ্যতা হয়ে গেল, আরো আগে হতে পারত, কিন্তু আমি ছিলাম গ্রামের আনাড়ী ও মুখচোরা। কয়েকদিনের পরিচয়ে কাওসার, আমার ওস্তাদ বনে গেল, সে ছিল বাপের শাসন ছাড়া, মায়ের স্নেহ বর্জিত ডানপিঠে এক ছেলে, তাই আমাকে তার সাগরেদ বানাতে সময় লাগলো না। সদ্য গ্রাম থেকে আসা বন্ধু আতœীয় বর্জিত আমার শহরে জীবনে, ওটাই তখন অনেক পাওয়া । আপাততঃ গতানুগতিক জীবন থেকে মুক্তি পেলাম ।
প্রায় পনেরো দিন পর বইয়ের লিস্ট পাওয়া গেল, মিয়া ভাই একদিন এসে বিভিন্ন বইয়ের দোকান থেকে বই কিনে দিয়ে গেলেন । নতুন স্কুল, নতুন বই, নতুন ক্লাস, আমার নতুন জীবন শুরু হলো । ৬ষ্ঠ শ্রেনীর বাংলা ও অঙ্ক বই বোধযোগ্য, মনে করলাম এ দুটোতে পার পেয়ে যাব। কিন্তু ইংরেজি বই দেখে আমার কান্না পেল, কোন ভাবেই দাঁত বসাতে পারব না । প্রাইমারি স্কুল থেকে আমার ইংরেজি বইয়ের শুধু অক্ষর জ্ঞান হয়েছিল, আর সামান্য শব্দ জ্ঞান। কিন্তু ৬ষ্ঠ শ্রেনীর ইংরেজি বই পুরাপুরি টেক্সট বই, যার অর্ধাংস গদ্য, আর অর্ধাংস পদ্য, প্রথম থেকে আমার কাছে দুর্বোধ্য ও কঠিন মনে হতে লাগল। যাহোক নতুন বই পাওয়ার পর, পড়া শুনা শুরু করতে চাইলাম, প্রথমে হোঁচট খেলাম,কোন সাহায্য ছাড়া কোন ভাবেই এগুতো পারছিলম না । আমার দুর্বলতার কথা নানীকে না বলে, কাওসারদের সঙ্গে পড়ব বলে দুবেলা কাওসারদের বাসায় যাতায়াত শুরু করলাম। কাওসার অত্যন্ত ডানপিঠে টাইপের, দুষ্টু প্রকৃতির, শহরের ছেলে, ওখনে যেয়ে পড়ার সময়টা বাশার মামা, খালেদা খালা, কাওসার ও রাবেয়া, পড়াশুনার বদলে শুধু গল্প করতো আর তুমুল আড্ডা মারতো, যেখানে আমি নিরব শ্রোতা । এখানে নেতা বাশার মামা, কুটনীতি খালেদা খালা, মাস্তানি কাওসার আর এ সব মুখবুঝে শোনার দায়িত্ব ছিলা আমার আর রাবেয়ার । সকাল থেকে স্কুলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এবং সন্ধ্যায় পুরা পড়ার সময়টা আমরা পাঁচজন মিলে কতযে পরিকল্পনা, কতযে দুষ্টু বুদ্ধি, কতযে প্লান করা হতো তার হিসাব ছিল না ।
চুয়াডাঙ্গায় স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমার দৈনন্দিন রুটিন ছিল, সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়ার নামে কাওসারদের বাসায় যেয়ে গল্প করা, নয়টার ভিতরে নানীর বাড়ি এসে, কোন রকমে মাথায় দু মগ পানি ঢেলে, নানীর দেওয়া খাবার খেয়ে স্কুলে দৌড়াতাম। বই কেনার আগে পর্যন্ত স্কুলে ক্লাসটিচার হায়বাতুল্লাহ স্যার ক্লাসে এসে নানান ধরনের ইংরেজি ট্রান্সসিলেশন, বাক্য রচনা, শব্দ লেখা, গ্রামার পড়ানো ইত্যাদি নানান ধরনের ইংরেজি শিক্ষা দিতেন, যার কোনটিই আমার মাথায় ঢুকতো না । অন্যান্যা ক্লাসের মধ্যে অঙ্কে ক্লাস ছাড়া কোনটাই ভালো লাগতো না। কোন রকমে সময় কাটানো মাত্র । টিফিন পিরিয়ড হলে ছেলেরা যে যার মতো রাস্তার পাশে পাওয়া বিভিন্ন খাবার খেয়ে, মার্বেল খেলে, ছুটাছুটি, দৌড়াদোড়ি করে আধঘন্টা পার করতো। প্রথম প্রথম আমার কিছুই ভালো লাগত না, তবে রাস্তার ধারে বিক্রিত আইসক্রিম খেতে খুব মন চাইত। তখন একধরনের কাঠিতে লাগানো লাল আইসক্রিম যার দাম একআনা এবং দুধে মিশানো সাদা আইসক্রিম পাওয়া যেত যার দাম ছিল দুআনা। মাঝে মাঝে আমি একআনা দিয়ে লাল আইসক্রিম খেতাম, তবে লোভ লাগত সাদা আইসক্রিম খাবার, কিন্তু রোজ রোজ নানীর কাছে চেয়ে পয়সা পাওয়া যেত না । স্কুলে ভর্তি হতে আসার সময় মা আমাকে, কিছু খুচরা পয়সা দিয়েছিলেন, সেটাই আমি নানীর কাছে রেখে দিয়েছিলাম । কিন্তু নানী আমাকে বাইরের জিনিস না খাওয়ার জন্য পয়সা দিতে চাইতেন না । টিফিন পিরিয়ড শেষ হলে আবার ক্লাস, সাড়ে চারটায় ছুটি । ছুটি হলে দৌড়িয়ে বাড়িতে এসে,কোন রকমে খাওয়া, তারপর নাকে মুখে কোন রকমে গুজে কাওসারদের সাথে দল বেধে স্কুল মাঠে যাওয়া । যাওয়ার সময় আমের সময় আমের গুটি পেড়ে নেওয়া, কারো গাছ থেকে আমড়া পেড়ে নেওয়া অথবা পেয়ারা পেড়ে সঙ্গে নেওয়া । যে কোনে ফলই আমরা এনে নেতা বাশার মামাকে দিতাম, বাশার মামার একটা ছোট ছুরি ছিল, উনি রাস্তায় যেতে যেতে, খোসা ছিলে একটুকরো একটুকরো করে আমাদের দিতেন । আমরা সবাই একটুকরো আম, আমড়া, পেয়ারা পেয়ে আনন্দেও সাথে স্কুলের মাঠের পথে ছুটতাম ।
স্কুলের মাঠে তখন দুদল ভাগ করে ফুটবল খেলা হতো । রেফাতুল্লাহ স্যার বাশি বাজিয়ে, হাফ প্যান্ট পরে সবাই ফুটবল খেলা শেখাতেন । আমরা ঐ দলে জায়গা পেতাম না, আমরা মাঠের বাহিরে ছুটাছুটি বা অন্য কোন ফুটবল নিয়ে দৌড়ঝাপ করতাম । ফেরার পথে ফুটবল মাঠের পাশে তখন চাষের জমি ছিল, তা থেকে কাঁচা ছোলার গাছ তুলে নিতাম এবং কাঁচা ছোলা খেতে খেতে বাড়ি আসতাম, কোন কোন দিন অড়হর গাছের ডাল ও ভেঙ্গে নিতাম। কোন কোন দিন আবার সিনেমা হলের সামনের রাস্তা দিয়ে আসলে ভাজা বাদাম অথবা ঝাল মুড়ি কিনে খেতে খেতে বাসায় আসতাম। বাদাম ও ঝাল মুড়ি সব সময় খাওয়া হতো না কারন ওটা কিনতে পয়সা লাগত । বাসায় এসে হাতমুখ ধুয়ে আবার পড়ার ছুতো করে কাওসারদের বাসায় যেতাম । আবার সেই একই গল্প, একই আড্ডা, প্রতিদিন রাত নয়টা দশটা পর্যন্ত চলত, পড়াশুনার কিছুই হতো না । এটাই ছিল আমার প্রতিদিনের রোজ নামচা ।
কিন্তু পড়াশুনা শুরু হওয়ার পর আর এক মুশকিল দেখা গেল । হায়বাতুল্লাহ স্যার ক্লাসে এসে পড়া ধরতো। আমার সেকশন এ তে কোন বন্ধু ছিল না, কাওসার পড়তো বি সেকশনে, ওরা কালিপদ পন্ডিতের স্কুল থেকে পাস করে হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা স্কুল থেকে ক্লাস ফাইভে পাস করা, মনডা ছিল ফাস্ট বয়, আর আমার সর্ম্পকে ভাগনে, শান্তি ছিল সেকেন্ড বয় । মনডা ছিল ক্লাস মনিটর, ক্লাসে কোন গন্ডগোল বা বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে নাম লিখে রাখত এবং ক্লাস টিচার আসলে তার কাছে জমা দিত। ক্লাস টিচার ইচ্ছা অনুযায়ী বিচার করে শাস্তি দিত। স্কুলে ভর্তি হওয়ার মাস খানেক পর পড়াশুনা শুরু হয়ে গেছে, হায়বাতুল্লাহ স্যার কঠোর থেকে কঠোরতর হয়ে গেছেন । ইংরেজি গদ্য পড়ার সময় নানান ধরনের প্রশ্ন করতেন, রিডিং পড়তে বলতেন, না দেখে বানান ধরতেন এবং অর্থ করতে বলতো । প্রায় দিনেই আমি পড়া পারতাম না, ফলে শাস্তি স্বরুপ বেতের মার খেতে হতো, তা বাম হাতে তোলা যাবে না, ডান হাতের উপর প্রচন্ড শব্দে বেত পড়ত । সারা ক্লাসের সামনে, লজ্জায় অপমানে, ব্যাথা বেদনায়, চোখ ফেটে টপ টপ করে পানি পড়ত। কেউ ছিল না সমবেদনা জানাবার। এর মধ্যে রেল ষ্টেশনে কোর্য়াটার থেকে আগত, আবতার, এর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হলো। সেও পড়া পারত না, সেও শাস্তি পেত, দিন দিন শাস্তির মাত্রা বাড়তে লাগল। তখন মনে হলো পড়া না করে স্কুলে আসা যে কত বড় অপরাধ, কিন্তু আমকে সাহায্য করার মতো, ইংরেজি পড়ানোর মতো, নানী বাড়িতে কেউ ছিলা না । পরে অবশ্য আই .এ পাস মেজো মামীর কাছ থেকে ইংরেজির কিছু সাহায্য পেয়েছিলাম ।
৬ষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত আমি নানী বাড়িতে ছিলাম, দিন দিন আমার পড়াশুনা অবনতি হতো লাগল, এই ভাবে আর কিছু দিন থাকলে আমি একবারে বয়ে যেতাম । কিন্তু এ কথা আমি কাউকে বলতে পারছিলাম না, না মাকে, না কাউকে, বাবাকে বলার প্রশ্ন উঠে না । বাবার রক্ত চোখ কে এবং মার দেওয়াকে, বড়ই ভয় পেতাম । বাবা বলতেন “Spare the rod, spoil the child”, সন্তানকে শাসন করতে হবে, নচেৎ সে গোল্লায় যাবে, বাবা এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন । কিন্তু আমার এই অধপতনের কথা কেউ জানতে পারছে না বা আমি কাউকে বলতে পারছিনা। দুষ্টামি বা খারাপ কাজ করার চরম এক উদাহরন এখন বলছি । স্কুলে ভর্তি হওয়ার ছয়মাস কেটে গেছে, ওস্তাদ কাওসারের অধীনে, আমি পুরাপুরি এক শয়তান হয়ে উঠছি। একদিন বাহিরে ঝিম ঝিম বৃষ্টি, কাওসার বলল ”চল, লাহিড়ী ডাক্তারের গাছে থেকে নারিকেল চুরি করব, তোকে কিছু করতে হবে না তুই নিচে বসে থাকবি”।লাহিড়ী ডাক্তারের একটা বন্দুক ছিল, বৃষ্টিতে ভিজে আমার হাঁচি পেল । কাওসার তখন তর তর করে নারকেল গাছে উঠে, নারিকেলে পেড়ে ফেলেছে, দাঁতে নারিকেলে ধরে নেমে আসবে,তখন আমি বলে উঠলাম ,”ওস্তাদ সাবধান ”। গাছের উপর থেকে কাওসার জবাব দিল ”চুপ” । সঙ্গে সঙ্গে প্রচন্ড শব্দে নারিকেল মাটিতে পড়ে গেল। দেখি ঐ শব্দে লাহিড়ী ডাক্তার, বন্দুক নিয়ে বারন্দায় বের হয়েেেছ । আমি কোন কিছু ভাববার আগেই নারকেলটা কুড়িয়ে নিয়ে দে ছুট । কাওসারের কি অবস্থা তা দেখার মতো সময় নাই । কাওসার ও বিপদ বুঝতে পেরে, ত্রিশ ফুট উচু গাছ থেকে সড়াৎ করে, মুহুর্তের মধ্যে নেমে এসে, সেও দিল ভো দৌড়। বাসায় ফিরতে দুজনে বৃষ্টিতে ভিজে একদম চপচপ । গাছ থেকে তাড়াতাড়ি নামতে যেয়ে কাওসারের বুক উরু ছিলে গেছে , আমার উপর তার ভীষণ রাগ, আমাকে যা খুশি বলে বকাবকি করল ।
কাওসারের মাথা ঠান্ডা হলে আমাকে বলল,”নারকেল তো হলো এখন মুড়ির ব্যবস্থা কর ”। কিন্তু কি ভাবে করব, আট আনা পয়সা নানী কখনই আমাকে দিবে না। বৃষ্টি ঝরা এই পড়ন্ত দুপুরে কি করা যায়। অনেক সলা পরামর্শ করে ঠিক হলো যে আমি কিছু পুরানো বই খাতা নিয়ে বাজারে বিক্রি করব এবং তা দিয়ে মুড়ি কিনে নিয়ে আসব । যে কথা সেই কাজ, আমার খালাদের কিছু পুরানো বই খাতা, নানী বাড়ির বারন্দার সেলফে ছিল আমি জানতাম,ঐ বই খাতা থেকে কিছু নিয়ে আমি বাজারে গেলাম এবং বিক্রি করলাম। আটআনা পেলাম, তা দিয়ে একসের মুড়ি কিনে বাসায় আসলাম। ইতি মধ্যে কাওসার নারকেল ঝুড়ে নারকেলের টুকরা করে ফেলেছে । এর পর ডাকা হলো নেতা বাশার মামাকে, খালেদা খালাকে, কিছুক্ষন পরে দেখি রাবেয়াও গুটি গুটি পায়ে আসছে মহা আনন্দে আমরা একসের মুড়ি ও একটি নারিকেল সাবাড় করে দিলাম। এই ভাবে চলতে থাকলে আমার যে কি পরিনতি হতো তা বুঝতে পারিনি । আজ সেই বাশার মামা ও নেই, খালেদা খালা ও বেঁচে নেই ।
মেঘে মেঘে বেলা শেষ হয়ে এল । ৬ষ্ঠ শ্রেনীর বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেল । কিভাবে জানি না সে দিন পরীক্ষা দিয়েছিলাম। কাছে মা নেই, বাবা নেই, পড়াশুনা দেখার কেউ নেই, তবু পরীক্ষা দিলাম ।পরীক্ষার ফল বেরনোর দিন, সারা স্কুলে থমথম অবস্থা, সবাই ইয়া নফসি, ইয়া নফসি পড়ছে। ক্লাস টিচার হায়বাতুল্লাহ স্যার টিফিনের পর থেকে ক্লাসে এসে গেছেন, নানা ধরনের খোস গল্প করছেন, বিবরন দিচ্ছেন কয়জন পাস করেছে, কযকজন ইংরেজিতে ফেল করেছে, ইত্যাদি । তখন কার দিনে নিয়ম ছিল, হেড স্যার সকল সিনিয়র স্যারদের কে নিয়ে প্রতি ক্লাসে যেতেন, ফাস্ট, সেকেন্ড, থার্ড বয়ের নাম ঘোষনা করতেন, ফাস্ট কল অথবা যারা সব বিষয়ে পাস করছে তাদের নাম ঘোষনা করতেন । এইভাবে সেকেন্ড কল, যারা এক বিষয়ে ফেল করতো তাদের নাম ঘোষনা করতেন, তারপর থার্ড কল, দু বিষয়ে যারা ফেল করতো তাদের নাম ঘোষনা করতেন । এই ভাবে ফল ঘোষনা করার রীতি ছিল তখন । শেষ সময় আসল,হেড স্যার ক্লাসে ঢুকলেন, সবাই দুুরু দুরু বক্ষে অপেক্ষা করছে, পিনপতন নিস্তব্দতা । হেড স্যার ফাস্ট, সেকেন্ড, র্থাড বয়ের নাম ঘোষনা করলেন , তারপর প্রথম কলের নাম । ওহ , আমার নাম ফাস্ট কলে উচ্চারিত হয়েছে, সব বিষয়ে পাস করে সপ্তম শ্রেনীতে উঠেছি । কিন্তু কিভাবে পাস করলাম একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেহ জানে না সশ্রাদ্ধ মহান আল্লাহকে ধন্যবাদ।
আমার বাবা যেমন রাগী ও স্বল্পভাষী ছিলেন তেমন সরল এবং দায়িত্বপরায়ন ছিলেন। যেহেতু উনার বড় ভাই, উনাকে মানুষ করেছেন, তাই বড় ভাবীর প্রতি উনার অসীম শ্রদ্ধা ছিল । ভাবী ছাড়া উনার নিজের মতো করে ভাবতে পারতেন না, সব সময় নিজের সংসারের সাথে যৌথ পরিবারের ভাবীকে যুক্ত করতেন। তাই আমার পড়াশুনার জন্য আমার মাকে নিয়ে যে শহরে আলদা বাসা করবেন তা তিনি কল্পানাই করতেন না । তবে তিনি বুঝতে পারতেন যে, চুয়াডাঙ্গা শহরে একটা বাসস্থান দরকার । একবার আমার নানা, তার মেয়ের জন্য চুয়াডাঙ্গায় একটা বাড়ি করে দেওয়ার কথা মনস্থ করেন । সেই মোতাবেক র্কোট পাড়ায় এক খন্ড জমি ও নির্ধারন করা হয়, এমনকি বাড়ী তৈরীর সরঞ্জাম ও প্রস্তুত । হঠাৎ বাবা বলে বসলেন, এই বাড়ি আমার মা এবং আমার চাচীর নামে লিখে দিতে হবে। তাই কি কখনও হয়, আমার নানা তার মেয়ের নামে লিখে দিবেন, কিন্তু মেয়ের জায়ের নামে লিখে দেওয়ার প্রশ্ন উঠে না। তাই চুয়াডাঙ্গার বাড়ি বানানোর প্রকল্প ওখানে শেষ হয়ে গেল । পরবর্তীতে বাবা একটা জায়গা কিনলেন রূপছায়া সিনেমা হলের পাশে, সেখানে বাউন্ডারি ওয়ালও দেওয়া হয়ে গেল । পরে বাবার কি মনে হলো যে, সিনেমা হলের পাশে বাসা থাকলে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া হবে না । কিছুদিন পর ঐ জায়গাও বাবা, তার এক সহকর্মীর কাছ বিক্রি করে দিলেন । এরপর বাবা কিছুটা বুঝতে পারলেন যে, চুয়াডাঙ্গায় উনার একটা স্থায়ী আবাসন দরকারই। হঠাৎ করে কালীপদ পন্ডিত মশাইয়ের স্কুলের কাছে একটা পুরাতন বাড়ি কিনে ফেললেন। পরবর্তীতে আমার মায়ের পছন্দ না হওয়ায় উটাও বিক্রি করে দিলেন। এরপর ১৯৫৭ সালের শেষের দিকে র্কোট পাড়ায়, ভারতে চলে যাওয়া মহেন্দ্রবাবু বলে, এক উকিলের কাছ থেকে আমাদের বর্তমান চুয়াডাঙ্গার বাড়িটি ক্রয় করলেন।
তাৎকালীন বাড়িটির মূল্য ছিল মাত্র ৩৪০০ টাকা অর্থাৎ পাকিস্তানি টাকায় ৪৩০০ টাকা । বাড়িটি শত্র“ সম্পত্তি হিসাবে বিবেচনা করায়, সরকারী ভাবে রিকুইজিশন করা ছিল। সমস্যাপুর্ন এমনি একটা সম্পত্তি কিনতে, বাবা কোন চিন্তা করলেন না । সরকারী কর্মকর্তা হিসাবে বাবা জানতেন যে, সরকারী সম্পত্তি ডি-রিকুইজিশন করা অসম্ভব ব্যাপার নয় । আমরা বাড়ির তালা ভেঙ্গে বাড়ির দখল নিলাম । বাড়িটি এর আগে এস. ডি .পি. ও , মহাকুমা পুলিশ অফিসারের সরকারী বাসস্থান ছিল । ভদ্রলোক অসুেখ ভুগে মারা যান, তাই বাড়ি দখল নেওয়ার সময়, সারা বাড়ি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবে ঔষধের শিশি এবং ইনজেকশনের এম্পুল ইত্যাদি ছড়ানো ছিটানো ছিল। ফলে সপ্তাহব্যাপী এসমস্ত জঞ্জাল আমাদেরকে পরিস্কার করতে হয়। বলাইবাহুল্য যে এই বাড়িটিও কেনা হয় মা ও চাচীর নামে, চাচী অবশ্য বাড়ি কেনার জন্য বাবাকে ১৩০০ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। যাহোক বাড়ি দখল নেওয়ার জন্য চাচী চুয়াডাঙ্গায় আসলেন, আমরা পুর্ন উদ্যমে বাড়ি ঘর গোছাতে লাগলাম, হাজার হোক নিজেদের বাড়িতো ।
মাস কয়েক থাকার পর ও বাড়ি দখল হয়ে যাওয়ার পর চাচীকে আবার গ্রামে ফিরতে হলো । কারন মা তখন তার তিনটা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে গ্রামে একা, বাবা বদলি হয়ে কুষ্টিয়া সদরে চাকুরীরত, মিয়াভাই চুয়াডাঙ্গা-বালিয়াকান্দি প্রতিদিন যাতায়াত করতে ব্যস্ত । পরিবারের বড় ছেলে হিসাবে আমি তখন নানী বাড়ি অবস্থান করছি। সুতারং চুয়াডাঙ্গার বাড়িতে আমার এক ফুফাতো বোন এর পরিবার কে রেখে চাচীকে গ্রামে চলে যেতে হলো । আবার চুয়াডাঙ্গার বাড়ি রক্ষার জন্য ঐ বাড়িতে কাউকে না কাউকে থাকতে হবে । এমনি যখন নতুন বাড়ি ও গ্রামের বাড়ির অবস্থা, আমি তখন সপ্তম শ্রেনীর ছাত্র । ঢিলেঢেলাভাবে আমার পড়াশুনা, প্রতিদিনে ডানপিঠেপানা, কাওসার অধীনে যত রকমের খারাপ কাজ এই করে সময় এগুচ্ছে। বাবা মা জানতে পারছেন না যে তাদের জ্যেষ্ঠ সন্তান কোন পথে এগুচ্ছে । প্রচন্ডে শাসনে যখন গ্রামে তাকে কারো সাথে মিশতে দেওয়া হয়নি, খেলতে দেওয়া হয়নি, কথা বলতে দেওয়া হয়নি, চুয়াডাঙ্গায় এসে সে এখন মহা স্বাধীন। সেখানে না আছে বাবা মার শাসনের ভয়, না আছে পড়াশুনা করতে বলার কেউ। নানী বাড়ির আপাত্য স্নেহে নতুন সঙ্গিদের প্ররোচনায় আমার পরিনতি কোন দিকে এগুচ্ছে তা আমার নিজেরও জানা নেই ।
সপ্তম শ্রেনীতে উঠে, হায়বাতুল্লাহ স্যারের মারের হাত থেকে রক্ষা পেলাম বটে কিন্তু দারোগা স্যারের অঙ্কের ক্লাসে কান মলা ও,হেমবাবু স্যারের ভুগোলের ক্লাসে বেঞ্চের উপর দাড়ানো থেকে বাদ পড়তাম না । তার উপর ইতিহাসের ওহিদ স্যারের টিপ্পনি ও মৌলভী স্যারের, পেটের চামড়ায় চিমটি কাটা থেকে রক্ষা পেলাম না । ৬ষ্ঠ শ্রেনীর পরীক্ষায়, সাফায়েত প্রথম হয়েছে, শান্তি দ্বিতীয় এবং মন্ডা তৃতীয়। আমি তখন এ সেকশনের ছাত্র, খেলাধুলায় অপটু থাকলেও স্কাউটে নাম লেখালাম, ফলে স্কুলের পর বিকালটা স্কাউটিয়ে সময় কেটে যায় । মন্ডার বড় ভাই বাবলু ভাই তখন ক্লাশ টেনের ছাত্র । রেফাতুল্লাহ স্যারের তত্ত্বাবধায়নে বাবলু ভাই তখন চিপ স্কাউট । স্কাউটে যোগদানের পর ডানপিঠেপনায় কিছুটা ভাটা পড়ল, তবে জীবন গতানুগতিক ভাবে বয়ে চলল। সেই সকালে স্কুলে আসা, টিফিনে আইসক্রিম খাওয়া, বিকালে ছুটির পর স্কাউটিং ও সব শেষে খেলার মাঠে যাওয়া। মাঝে মাঝে ফুটবল কম্পিটিশন, ইন্টার ক্লাশ ও ইন্টার স্কুল, মাঠে যেয়ে হইচই করে সর্মথন দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন কাজ থাকতো না। এমনি করেই একদিন সপ্তম শ্রেনীর বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেল, সেবারও কোন রকমে ফাস্ট কলে প্রমোশন পেলাম । প্রগ্রেস রির্পোট দেখে বাবা কিছু বলেন না। কিন্তু নিশ্চয়ই কিছু ভাবলেন, ছুটিতে গ্রামে গেলে মা, বাবার হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়ার কথা বললেন, কিন্তুু আমার পড়াশুনার ব্যাপারের কিছু বললেন না । বাবা বোধ হয় আমার পড়াশুনার অবনতির কথা বুঝতে পেরেছেন, তাই মনে হয় আপ্রান চেষ্টায় করছেন বদলি হয়ে চুয়াডাঙ্গায় আসার জন্য।
১৯৫৮ সাল, ক্লাস এইটে উঠেছি । এবার প্রথম সাফায়েত, দ্বিতীয় হান্নান বলে নতুন একটা ছেলে, এবারও মন্ডা তৃতীয়। মন্ডার বাবা ছিলো সার্কেল অফিসার, বড় সরকারী কর্মকর্তা, কি জানি হয়তো বাবার ক্ষমতার কারনে মন্ডা তৃতীয় হতো। হেড স্যার থেকে সকল টিচারাই মন্ডার বাবাকে সমীহ করতো । ক্লাস এইটে উঠে, কামিস, ওবায়দুল ইত্যাদি কয়েকজন নতুন বন্ধুর সাহচর্যে আসলাম। তারা নিত্যন্তই ভালো বন্ধু, আগে ক্লাসে এসে আমার জন্য জায়গা রাখতো । টিফিন পিরিয়টে একসাথে ঘুরতাম, মনে করতে লাগলাম আমার বোধায় কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। ক্লাস এইটে হাফেইয়ারলি পরীক্ষা শেষ হলো, আমি উর্দুতে খুব কম মার্ক পেলাম, মাত্র ৩০ । নিয়ম মোতাবেক প্রগ্রেস রির্পোট অভিভাবক কে দেখিয়ে সই করায়ে স্কুলে জমা দিত হতো । আমি বাবার ভয়ে উর্দুতে পাওয়া ৩০কে ঘষে তুলে ৮০ করলাম,কিন্তু বিশ্রীভাবে অসৎ কাজটি প্রকট ভাবে দেখা দিতে লাগল। প্রগ্রেস রির্পোট দেখে বাবা সন্দেহ করলেন, আমি কোন সদউত্তর দিতে পারলাম না, বাবা কিছুই বললেন না, বাবা সই করে দিলেন। কিন্তু মায়ের কাছে বাবার রাগের বিস্তারিত কাহিনি শুনলাম, স্বল্পভাষী বাবা আমাকে কিছু বুঝতেই দিলেন না। কিন্তুু মা জানতেন বাবার যারপনাই চেষ্ঠা করছেন বদলি হয়ে আসার । বাবা আমার এই পরিনতিতে খুব কষ্ট পেয়েছেন, গ্রামের সহজ সরল সুবোধ ছেলেটি আজ কোন পর্যায়ে পৌঁছছে যে পরীক্ষায় পাওয়া মার্ককে পরিবর্তন করাতে শঠতার আশ্রয় নিয়েছে । যাহোক অল্প কিছুদিনের মধ্যে দেখলাম বাবা চুয়াডাঙ্গা বদলি হয়ে এসেছেন ।
বাবা চুয়াডাঙ্গায় আসলেও মাকে তখন চুয়াডাঙ্গার বাসায় আনা হয়নি । মা এবং চাচী উভয়ে গ্রামে থাকেন, চুয়াডাঙ্গা বাড়িতে ফুফাতো বোনের পরিবার, বাবা সেখানে থাকেন, বন্ধের দিন গ্রামে যান। আমার অবস্থান যথারীতি নানীর বাড়িতে, তবে বুঝতে পারছি কেমন যেন একটা থমথমে ভাব । বাবার নির্দেশে, প্রতিদিন সকালে, আমাদের নতুর বাড়িতে, পড়ার জন্য আমাকে আসতে হতো । এইভাবে খুব ভোরে উঠে নতুন বাড়িতে আসা, আবার দৌড়ে গিয়ে নানীর বাড়িতে খেয়ে স্কুলে যাওয়া, বিকালে স্কাউটিং করা, খেলার মাঠে যাওয়া ইত্যাদি খুব ব্যস্ততায় মাঝে আমার সময় কাটতে লাগল । স্কুল মাঠটি ছিল বাবার অফিসের কাছে, তাই বেশী সময় মাঠে না কাটিয়ে সন্ধ্যা লাগতে লাগতে বাড়ি ফেরা শুরু করলাম, পাছে বাবার নজরে না পড়ে যাই। সেপ্টেবর মাসে মাকে চুয়াডাঙ্গায় আনা হলো এবং আমারও নানীর বাড়ি পাঠ শেষ করে নতুন বাড়িতে একবারে চলে আসতে হলো । খুব ভালো লাগতে লাগলো অনেকদিন পর মাকে পেলাম, কিন্তু বাবার শাসন পুর্নদ্দমে চালু হলো । সন্ধ্যা হলে বাবার কাছে পড়তে বসতে হতো, বাবা ইংরেজি পড়াতেন, ট্রান্সস্লেশন করাতেন, গ্রামার বুঝাতেন। বাংলা, ভুগোল, ইতিহাসের সমস্ত বই মুখস্ত করতে বলতেন আর মাঝে মাঝে অঙ্ক দেখাতেন । অঙ্কতে আমার অসুবিধা হতো না, কারন আমি বরাবরই অঙ্কে ভালো । আমার সমস্য ছিল ইংরেজিতে ।
১৯৫৮ সাল,অক্টোবর মাস, হঠাৎ করে দেশে একটা পরিবর্তন এলো। তখনও খুব বেশী বুঝে উঠতে পারিনি, তবে দেশে যে একটা কিছু হচ্ছে, মাঝে মাঝে কানে যেত । ১৯৫৪ সালে জিতে আসা যুক্তফ্রন্টের সরকার বেশী দিন গদিতে থাকতে পারলো না । প্রাদেশিক সরকার ভেঙ্গে দেওয়া হলো, কেন্দ্রীয় শাসন চালু হলো । ইতিমধ্যে এসেম্বলিতে মারামারি হলো, স্পীকার শাহেদ আলি সাহেব খুন হলেন । আমি ঐ বয়সে দেশের এই অরাজকতা সম্মন্ধে জানতে পারতাম না । তখনকার সময় বহুল প্রচলিত ইত্তেফাক, আজাদ এবং পুর্বদেশ ইত্যাদি পত্রিকা বাবা রাখতেন না । বাবা রাখতেন ভারত থেকে প্রকাশিত “The Statesman” পত্রিকা, তাই কোন বাংলা পত্রিকা পড়তে পারতাম না । বাবার নির্দেশ ছিলো শুধুমাত্র ইংরেজি পত্রিকা পড়তে । যাহোক হঠাৎ করে একদিন জানতে পারলাম, পাকিস্তানে গর্ভনর জেনারেল, মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে, মেজর জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের শাসন ভার গ্রহন করেছেন। সারা দেশে মার্শাল ল, ভীতো সন্ত্রস্ত জনগন । রাতারাতি দেশে পরিবর্তন এল,সরকারী ডাকবাংলো ও রেস্টহাউস গুলোতে আর্মিদের আনাগোনা ও অবস্থান । ব্যবসায়ী সমিতির নাজেহাল অবস্থা, আর্মি যেয়ে তাদের সমস্ত মালামাল কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করাচ্ছে । চালের দর যে কত, তা সঠিক জানতাম না কারন আমাদের কখন চাল কিনে খেতে হতো না । একদিন দেখি মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী, মতিলাল বাবুর চালের গুদাম আর্মিরা খুলে দিয়েছে, মতিলাল বাবুকে প্রকাশ্য রাস্তায় এনে কান ধরে উঠবস করাচ্ছে। চালের গুদাম থেকে ৫ টাকা মন দরে চাল বিক্রি করা হচ্ছে । তখনি জানতে পারলাম চালের দাম ১০ টাকা মন। তখনকার দিনে গরুর মাংসের সের ছিল চার আনা, শরিষার তেলে সের ৩ টাকা, ডিমের হালি ১ আনা আর অন্যান্য তরকারি নাম মাত্র মূল্য।
কিছুদিন এই ব্যবস্থা চলার পর জনগন একটু সুস্থির হয়ে উঠেছে, চারিদিক একটু শান্তির আভাস, জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের পেসিডেন্ট হলেন, দেশে মার্শাল ল কিছুদিন চলার পর বুনিয়াদি গনতন্ত্র চালু করলেন। পুর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা চার কোটি একুশ লাখ লোকের মধ্যে হতে মাত্র আশি হাজার বেসিক ডেমোক্রাট নির্বাচন করা হবে, তারাই পরোক্ষ ভাবে দেশ শাসন করবে। আমি রাজনীতির মার প্যাচ বুঝি না । কিন্তু তখনকার সময় দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা ,অর্থনৈতিক অবস্থা ,আমি যা জানতে পেরেছি,বুঝতে পেরেছি তাই এখানে লিখে যাচ্ছি। দেশের এহেন অবস্থায় আমার পড়াশুনা, বাবার কঠিন শাসনে ও মায়ের স্নেহে এগুচ্ছে, ছোট ভাই দুটো মতিন ও জিল্লুকে প্রাইমারী পড়াশুনার জন্য চুয়াডাঙ্গা গার্লস স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ক্লাস এইটের বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেল । কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে চুয়াডাঙ্গা স্কুলে এসে, বাবার তত্ত্বাবধায়নে প্রথমবারের মত ফাইনাল পরীক্ষা দিলাম । ইতিমধ্যে আমি খারাপ ছেলের তালিকা হতে উন্নতি হয়েছে, তবে ভালো ছেলের তালিকায় এখনও স্থান হয়নি । আমাদের প্রতিবেশী কায়মুদ্দিন চাচার ছেলে, ইসরাফিল আমার সাথে এক শ্রেনীতে বি সেকশনে পড়ে। ওর সাথে আমার খেলাধুলা ও গল্পগুজবের সর্ম্পক।
র্কোট পাড়ার নতুন বাড়িতে এসে আমার বেশ পরিবর্তন হলো । কিন্তু ঐ বয়সের সাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী স্বাধীন ভাবে খেলাধুলা করতে পারতাম না। তার জন্য দায়ী, বাবার কঠিন শাসন । একবার এস. ডি .ও এর বাংলোর উত্তর দিকে খালি জায়গায় আমরা খেলার মাঠ নির্ধারন করে পরিস্কার পরিছ্ন্ন করে ফেললাম, তখন আমার খেলার সাথি ছিল ইসরাফিল বা সংক্ষেপে ফিল, নওয়াজেস উকিলের ছেলে আহসান ও মাহাবুব আরো অনেকে । ফিল দের একটা বড় পাঁচ নম্বর ফুটবল ছিল, একদিন বিকালে খেলছি, বাবা তখন চুয়াডাঙ্গার র্কোটের নাজির । আমাকে খেলতে দেখতে পেয়ে পিয়ন দিয়ে ডাকিয়ে গালমন্দ করলেন এবং খেলতে নিষেধ করে দিলেন । আমার খেলা বন্ধ হয়ে গেল । প্রচন্ড রাগে ও জিদে প্রতিদিন বাজার থেকে বাঁচানো এক আনা, দু আনা করে জমানো টাকা দিয়ে একটা তিন নম্বর ফুটবল কিনে আনলাম কিন্তু খেলব কার সাথে, একা তো আর খেলা যায় না। পরবর্তীতে বাবার নজর এড়িয়ে আমাদের বাড়ির পুর্ব দিকে খালি জায়গাতে আবার মাঠে গড়ে তুললাম । পাড়ার ছেলেদের নিয়ে আর আমার নিজের টাকায় কেনা ফুটবল দিয়ে নতুন করে খেলা শুরু করলাম । একদিন হঠাৎ খেলার সময়, বল একটা ড্রেনে পড়ে যাওয়াতে বল আনতে গেলাম । ড্রেনের ভিতর একটা ভাঙ্গা হ্যারিকেনের চিমনী পড়ে ছিল। পড়বি পর চিমনীর উপরের পা, পা কেটে ক্ষত বিক্ষত হলো । বাসায় ফিরলাম, বাবা একনজর দেখে, কঠিন চাহনি দিয়ে চলে গেলেন । ঐ অবস্থায় আমার মা কাদা মাখা পা পরিস্কার করে ক্ষতবিক্ষত পায়ের চামড়া ও মাংস কেটে ফেলে আয়োডিন দিয়ে ব্যান্ডেজ বেধে দিলেন। প্রচন্ড ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারলাম না, তারপর আবার স্কুল কামাই । তখনকার দিনে স্কুলে অনুপস্থিত থাকলে গার্জিয়ানের কাছ থেকে দরখাস্ত দিতে হতো, নচেৎ প্রতিদিনে জন্য এক আনা করে জরিমানা দিতে হতো। কিন্তু বাবা দরখাস্ত লিখে দিবেন না, তাহলে আমাকে জরিমানা দিতে হবে । যাহোক কয়েকদিন পর মা বাবার কাছ থেকে দরখাস্ত লিখিয়ে নিলেন। সে যাত্রা আমি মাফ পেলাম ।
কোন খেলাধুলাতে আমার বাবার সম্মতি ছিল না। তবু বাবার অগোচর সব খেলায় কিছু কিছু করতে চেষ্টা করতাম, যেমন কাচের মার্বেল খেলা, হাড়ের মার্বেল খেলা এবং হা-ডু-ডু খেলা। শীতের মৌসুমে ব্যটমিন্টন খেলা হতো, সবায় মিলে খেলতো, তবে আমি খেলতে পারতাম না, কারন বাবা খেলার চাঁদা দিতেন না । এইভাবে অনেক ক্ষেত্রে আমি বন্ধু বান্ধবের কাছে নাজেহাল হতাম অপমানিত হতাম। আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি, তখন আমাদের মাঠে আমি ক্রিকেট খেলা চালু করি, ব্যাট ছিল নারিকেলের গাছের পাতার আর বল ছিল বাতাবি লেবুর, এভাবে শুরু, তবে পরে কাঠের তক্তার তৈরী ব্যাট ও টেনিস বলের সাহায্যে, পাড়ার ছেলেদের কে নিয়ে ক্রিকেট টিম গঠন করি এবং সেকেন্ড অফিসার ছেলেদের টিমের সঙ্গে ম্যচ ও খেলি। তাই কোন দিনই আমার কোন খেলাধুলারই প্রতিভা দেখাতে পারি নি।
বাবার নিবিড় তত্ত্বাবধানে, কয়েক মাস মন দিয়ে পড়াশুনা করে, ক্লাস এইটের পরীক্ষার ফলাফল মনে হয় ভালো হলো। তা ছাড়া কিছুটা পরিবর্তন আমার ভিতরেও এসেছে। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় ক্লাস সেভেনের ছাত্র, কাসেম,মজনু ও বেলালের যে অসভাবিক দুষ্টুমি ও ক্লাসে সমস্যা সৃষ্টি করতে দেখেছি, আর কাওসারের নেতৃত্বে, যে সমস্ত খারাপ কাজ করার ও ডানপিটেনামা করেছি, তাতে এখন আমার লজ্জা হয়। অষ্টম শ্রেনীর বার্ষিক পরীক্ষার ফলে, আমার স্থান দশম স্থানে উন্নিত হয়েছে। তাছাড়া ক্লাস নাইনে উঠার পর, শিক্ষকরাও আমার একটু সুখ্যাতি করতে শুনেছেন, বিশেষ করে রেফাতুল্লাহ স্যার, আমার বাংলা পরীক্ষার লেখার প্রশংসাই করতেন । তাছাড়া অল্প কিছুদিনের জন্য হলেও বাবা, মা, ভাই ও বোন মিলে একসাথে থাকার এক পারিবারিক বন্ধনের ফলাফল ও বুঝতে পেরেছি। ঐ সময়কার অনেক স্মৃতি আজ মনকে নাড়া দেয়। যেহেতু আমার কোন ছোট বোন ছিল না, তাই সংসার ফেলে, মায়ের এখানে ওখানে বা বেড়াতে যাওয়ার কোন সুযোগ ছিলো না। তবু মা আমাদের কে নিয়ে নানী বাড়ি যেতেন, রাতে অন্ধকারে হ্যারিকেন ধরিয়ে, হেঁটে। তাছাড়াও দিনের বেলাও মা নানীর বাড়িতে গেলে রিকসার উপর দিয়ে শাড়ী কাপড় দিয়ে পর্দা বেঁধে যেতেন।
১৯৫৮ সালের মাঝামাঝি, মা তখন চুয়াডাঙ্গার বাসায় । হঠাৎ খবর এল, বড় খালু ঢাকায় র্হাটফেল করে মারা গেছেন। নানী ও মাকে তখনি ঢাকায় ছুটতে হলো, আমাকে বাসায় রেখে । ঐ কয়দিন মায়ের অনুপস্থিতে, বাসার রান্না বান্না সবকিছুই আমাকে সামলাতে হয়েছে। তাই ছোট বেলা থেকে রান্নার হাতেখড়ি, এইভাবে বিপদে পড়ে, বিপদের সময় । ঐ সময় ভাত, তরকারি,যেমন বেগুন অথবা পটল দিয়ে শিঙ্গি মাছ অথবা বেগুন ভাজি ইত্যাদি রান্না, মশঁলা, শিল পাটায় পিষে রান্না করতে হয়েছে, কারন তখন তো গুড়া মশঁলা পাওয়া যেত না । এইভাবে মাকে যখনি কোন কারনে বাড়ির বাহিরে যেতে হয়েছে, তখনি রান্না বান্না, ভাই বোনদের সামলানো এবং বাবার অফিসে যাওয়ার ব্যবস্থা করা, আমাকেই করতে হয়েছে। ঐ কয়েকটা দিন তখন স্কুুলে যেতে পারতাম না, মা ফিরে এলে বাবাকে দিয়ে দরখাস্ত লিখিয়ে দিতেন।
তখন কার দিনে গান বাজনা শোনার জন্য গ্রামোফোন, গ্রামের ভাষায় যাকে কলের গান বলা হতো, কোন কোন বাড়িতে থাকতো আর রেডিও এর প্রচলন ছিলো, তবে তাও হাতে গোনা । সারা চুয়াডাঙ্গা শহরে ১৯৫৫ সালে, মাত্র তিনটি ব্যাটারিসেট রেডিও ছিলো, একটা ইউসুফ আলী জোয়ারদার সাহেবের বাসায়, অন্যটি রেল পাড়ার খোকা মল্লিকের বাসায় । তৃতীয় রেডিও কিনলেন আমার বাবা, কারন তার মনে গান বাজনার প্রতি বেশ একটু শখ ছিলো । কারন এক সময় যৌবনে উনি দারুন বাঁশি বাজাতে পারতেন, আর জগন্ময় মিত্রের গান গেয়ে বেড়াতেন। যাহোক প্রথম যেদিন রেডিও,আমাদের গ্রামের বাড়িতে আসলো,তখন আমাদের যে কি উত্তেজনা, আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় । বড় বড় দুই বাক্সে, বাবা যখন রেডিও সেটটি বাসায় আনলেন, তখন আমরা, তথা সারা গ্রামের লোকেরা অবাক বিস্ময় দেখতে লাগল । পরদিন বাবা বড় বড় দুটো বাঁশ বেধে ছাদের উপরে লম্বালম্বি কি যেন একটা মোটা তার টানালেন, পরে জেনেছি ওটার নাম এন্টেনা । উপরে টানা তারের মাঝামাঝি থেকে সাদা রঙ্গের একটা তার সংযোগ করে নিচে রেডিওর কাছাকাছি আনলেন। বাবা আর একটি সবুজ রঙ্গের তার রেডিওর পাশের জানলা দিয়ে বের করে, মাটিতে পুঁতে রাখলেন । টেবিলের উপরে রেডিও এবং তার থেকে দেখতে বড় ব্যাটারি সেট। বাবা সন্ধ্যা থেকে রেডিও চালাতে চেষ্টা করলেন, রেডিও ও সঙ্গে পাওয়া বইটি গম্ভীর ভাবে অনেক পড়লেন । আমরা তখন শ্বাসরুধ্য করে বসে আছি, কিছু একটা দেখার জন্য, শোনার জন্য, কিন্তু কিছুতে কিছু হলো না । বাবার নিস্তব্দতা, চুপ হয়ে গেল, পরের দিন যথারীতি বাবা অফিসে গেলেন, অফিস থেকে ফিরে আবার ও রেডিও নিয়ে বসলেন। হঠাৎ করে কি থেকে কি হলো, ঐ রেডিও নামক বাক্স হতে গান বেরোতে লাগল, কথা বের হতে লাগলো। রেডিও সেটটি ছিলো আমেরিকার তৈরি জ ঈ অ ব্র্যান্ডের । বাবা আসলে ভুল করে এন্টেনার তার আর্থের সাথে লাগিয়ে ছিলেন আর আর্থের তার এন্টেনার সাথে সংযোগ করে ছিলেন। সে কি সুমিষ্ট আওয়াজ রেডিও থেকে বের হতো লাগলো, সারা গ্রামের লোক দল বেঁধে দেখতে এলো, শুনতে এলো, যেন পৃথিবীর এক অত্যার্শ্চয্যজনক বস্তু । প্রথম কয়েকদিন বাড়িতেই লোকের জায়গা দেওয়া দুস্কর হতে লাগলো, সারা বারন্দায় আত্মীয় স্বজন, জ্ঞাতি গোষ্ঠি, আর রোয়াকে ও উঠানে গ্রামের অন্যান্যরা ও চাষীরা । বেশ কয়েকদিন মহা আনন্দে এই রেডিও শোনার পালা চলল । আমি এতই মোহিত ছিলাম, যে আমি বসে থাকতাম রেডিও এর টেবিলের পাশের চেয়ারের উপর, অনেক ছোট হলেও গর্ব করে ভাবতাম, আমাদের একটি রেডিও আছে।
এই রেডিও টি বাবার অনেক শখের ছিলো, প্রথম দিকে বাবা শুধু এটা চালু করতেন ও বন্ধ করতেন, পরবর্তী চুয়াডাঙ্গা আসার পর মা ও রেডিও চালু, বন্ধ করতেন । তখন কার দিনে শুক্রবারে রাতে অল ইন্ডিয়া রেডিও, কলকাতা থেকে নাটক প্রচারিত হতো, ঐ নাটকটি শোনা জন্য আমরা সারা সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করে থাকতাম। শুক্রবার সন্ধ্যা হলে মা তাড়াতাড়ি রান্নার কাজ শেষ করতেন, আমরাও তাড়াতাড়ি আমাদের পড়াশুনা শেষ করে ফেলতাম, মা চিড়াভাজি করে আনত । পৌনে আট বাজলে আমরা পুরা পরিবার রেডিও ওর সামনে, বাবা চামচ করে চিড়া ভাজি খেতেন, আমরাও খেতাম আর সবাই মিলে নিঃশব্দে নাটক শুনতাম । এই পারিবারিক রুটিনটি আমি চুয়াডাঙ্গায় থাকার শেষ দিন পর্যন্ত চালু ছিল । তখন ঐ রেডিও বাজবার জন্য পাকিস্তানে ব্যাটারি পাওয়া যেত না, বাবা কলকাতা থেকে ব্যাটারি আনার ব্যবস্থা করতেন । আমার জীবনের এই সময়টি পরিবারের সঙ্গে এক সুখময় স্মৃতি।
নবম শ্রেনীতে উঠার পর আমার জীবনের রুটিন অনেকটাই পাল্টে গেল, সকালে উঠেই মুড়ি পাঠালি খেয়ে পড়তে বসা, তারপর দশটা সময় খেয়েদেয়ে স্কুলে যাওয়া, বিকালে এসে বাসার সামনের মাঠে খেলাধুলা করা ও রাতে বাবার কাছে পড়তে বসা। বাবা অবশ্য সকালে আমার পড়াশুনা দেখাতে পারতেন না, উনি বাড়ির সামনের জায়গায় ফুল বাগান করতেন ও সবজি বাগান করতেন। নতুন বাড়ি কেনা হয়েছে, বাড়ির সামনের খালি জায়গায় লাইন করে, নারিকেল গাছ লাগিয়েছেন। সেই নারিকেল গাছে, প্রতিদিন বিকালে রাস্তার কাছে টিউবওয়েল থেকে পানি বয়ে এনে দিতে হতো। প্রায় ১৮ টি গাছ, আঠারো বালতি পানি আনতে আমার ছোট ভাই, মতিন ও জিল্লু আমাকে সাহায্য করতো। তাছাড়াও সবজি বাগানের জন্য প্রতিদিন কিছুটা নির্ধারিত জায়গা আমাদের কোদাল দিয়ে কোপানোর নির্দেশ ছিলো, এরপর বাবা ওটাতে সার মিশিয়ে, বীজ বা চারা লাগাবার ব্যবস্থা করতেন । এই সবজি বাগানে বর্ষাকালে ডাটাশাক, মিষ্টিকুমড়ো, ভেন্ডি ও বেগুনের আবাদ হতো, আর শীতকালে বাধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, পিয়াজ, রসুন ও গোলআলুর চাষ করা হতো । এই বাগান টি হতে আমাদের প্রয়োজন মোতাবেক প্রায় সব সবজি যোগানো হতো । বাবার অবসর সময় বেশিরভাগ সময়টাই, বাগানে কাটাতেন, আর আমরা কোন রকমে নির্ধারিত কাজ শেষ হলেই, খেলার জন্য ছুটতাম। বাবার ফুলের বাগানে,যেমন ছিলো স্থায়ী ফুলের সমাহার, তেমন ছিলো মৌসুমী ফুলের বাহার। বর্ষাকালে দোপাটি,মোরগ,রজনিগন্ধা মর্নিংগ্লোরি, গ্রাসলিলি,স্পাইডার লিলি ও বেলী ফুল আর শীতকালে গাঁদা, চন্দ্রঁমল্লিকা, ডালিয়া, জিনিয়া, হলিহক ইত্যাদি বিভিন্ন জাতের ফুলের সমহার ছিলো। তাছাড়া সারা বছর ধরে বাগানে ফুটতো ব্লাকপ্রিন্স নামের লাল গোলাপ, সাদা গোলাপ, গোলাপ,জুঁই, হাছনাহেনা, করোবি এবং চাপাফুলের মৌ মৌ সুগন্ধ। বাবা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ফুলবাগানে শুশ্রষা করে গেছেন। আমরা বড় হওয়ার পর, সবজি বাগানে বাবা সময় দিতে পারেন নাই কারন তখন তিনি বয়সের ভারে কিছুটা দুর্বল হয়েছেন।
সময় বসে থাকে না, নবম শ্রেনীর বার্ষিক পরীক্ষা শেষ, ফলাফল দিয়েছে। ফলাফলে আমার স্থান দ্বিতীয়, প্রথম হয়েছে হান্নান ও তৃতীয় হয়েছে আতাউর । রাতারাতি আমি ভালো ছাত্র বনে গেলাম, আসলে কোনো আলউদ্দিনের আশ্চার্য্য প্রদীপ নয়, মায়ের একান্ত স্নেহ যত্ন আর বাবার ঐকান্তিক চেষ্টা ও শাসন, এর বলে আজ আমি ভালো ছাত্রের কাতারে । ভালো ছাত্র বলে যাদের কে জানতাম, যাদের কে সমিহ করতাম, সেই মন্ডা তার বাবার বদলির সঙ্গে সঙ্গে অন্যত্র চলে গেছে, বড়লোক ব্যবসায়ী পিতার সন্তান শান্তি সাধারন ছাত্র বনে গেছে, আর সাফায়েত ফুটবল খেলার দাপটে ক্লাসে অনেক নিচে নেমে গেছে। ক্লাসে টেনে উঠলাম, একটাই সেকশন, ফিল, তখন আমার সেকশনে পড়ে । অন্যন্যা বন্ধুরা কামিসউদ্দিন, ওবায়দুল, আলতাফ,শওকত ও রিয়াজুলরা এমনি কি ফিল ও তখন আমাকে সম্মানের চোখে দেখে। আমি বুঝতেও পারলাম কিভাবে আমার এতো পরিবর্তন হলো। যাহোক ভালো ছাত্রের খাতায় নাম লেখাবার পর আমার নিজেরই উপলব্ধি হলো যে, এটাকে ধরে রাখতে হবে। স্যারেরা আমাকে যথেষ্টে বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে দেখেন, আলদা যতœ নেন । বাবা হঠাৎ করে ঠিক করলেন যে আমাকে প্রাইভেট পড়তে হবে। বন্ধুরা তখন স্কুলের স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়েন, আমার জন্য ঠিক করা হলো, গোকুলখালি স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক, ইসমাইল স্যারকে, তিনি আমাদের পাড়াতেই বসবাস করেন। হাফইয়ারালি পরীক্ষা পর,প্রাইভেট পড়া শুরু করলাম। ইসমাইল স্যার খুব যত্ন করে পড়াতেন আর বাকীটা আমি আদায় করে নিতাম, মুলত উনার কাছে আমি অঙ্কটাই বেশি করতাম। তিন মাসের মধ্যে প্রিটেস্টের আগেই, অঙ্কের সিলেবাসের পাটিগনিত, বীজগনিত ও জ্যামিতির সবটাই শেষ করে ফেললাম। মনে আছে অনেক দিন রাত্র এগারোটা হয়ে গেছে, আমার অঙ্কের সামাধান হচ্ছে না, ইসমাইল স্যার ঘুমে ঢুলছেন, কিন্তু আমি অঙ্ক না শেষ করা পর্যন্ত বাড়ি আসতাম না । প্রিটেস্টের রেজাল্ট দিল, এবারও আমার স্থান দ্বিতীয়, প্রথম হয়েছেন হান্নান। আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেস জনাব ফজলুল কবির,উনি বি. এস সি. বি .টি পাস , অঙ্কে দারন উৎসাহি, আমরা তাকে কবির স্যার বলে ডাকতাম। উনার বিশেষ দৃষ্টি পড়ল আমার উপর, কারন আমি এবং ফিল অঙ্কে সর্বোচ্চ মার্ক পেয়েছিলাম। উনি আমাদেরকে কাছে ডেকে বললেন,” এখন থেকে প্রতিদিন স্কুলে ছুটির পর একঘন্টা করে আমার কাছে অঙ্ক করবা”। আমরা আহ্লাদিত, সম্মানিত। কবির স্যার, যার সামনে বাঘে গরুতে একঘাটে পানি খায়, যার ভয়ে ছাত্ররা সব সময় সেঁটিয়ে থাকে, তিনি আমাদেরকে পড়াবেন।
যাহোক স্কুল ছুটির পর প্রতিদিনই উনার কাছে যাওয়া শুরু করলাম, কিন্তু প্রতিদিনিই তিনি খুবই ব্যস্ত থাকেন, প্রায় আধঘন্টা অপেক্ষা করার পর উনি হয়ত দশমিনিট সময় দিতে পারতেন। কিন্তু আমাদের তখন সময়ের খুব দাম। দিন পনেরো চলার পর উনি বুঝলেন, অঙ্কে আমাদেরকে নতুন করে গাইড করার কিছু নাই। উনি বিশেষ করে নজর দিতেন জ্যামিতির উপপাদ্য এর সঙ্গে যে একটা অতিরিক্ত অঙ্ক থাকে তার উপর, আর সম্পাদ্য এর প্রমানের উপর । দেখতে দেখতে টেস্ট পরীক্ষা এসে গেল, পরীক্ষা খুব ভালো হলো । টেস্টে পরীক্ষার ফল, স্কুলের সাধারন বার্ষিক পরীক্ষার ফলের অনেক আগেই হয়ে গেল । আমার এই পরীক্ষার ফল এক অবিস্মরণীয়, অনভিপ্রেত ও কল্পানাতীত এক ফল । আমি ক্লাস টেনে প্রথম হয়েছি, চুয়াডাঙ্গা স্কুলে, এই প্রথম আমি প্রথম হলাম, প্রাইমারি স্কুলে থাকতে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় এর কথা ভাবতাম না, কিন্তু চুয়াডাঙ্গা স্কুলে এসে তা ছিল আমার স্বপ্নাতীত। যাহোক আমি এক অনাবিল আনন্দে, প্রসন্নতায়, নতুন এক স্বাদে উদ্বেলিত ।
১৯৬০ সাল । মেট্রিক পরীক্ষা , ১৫ই মার্চ থেকে শুরু হবে । নভেম্বর মাসে শেষে টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর হাতে একরকম সময় নাই। এই তিন মাস যেকোনে প্রার্থীর জন্য খুবই গুরত্বপুর্ন সময়, পড়াশুনা , লেখালেখি ছাড়া আর কোন কাজই দেখার সময় নাই। তখনকার দিনে যে কোন টেস্ট পরীক্ষার পর, সারা দেশের বিভিন্ন স্কুলের টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্নসম্বলিত একটা টেস্টপেপার বের হতো ,যা এককভাবে আদিল ব্রার্দাস বের করত । এই তিন মাস সময়ের মধ্যে প্রত্যেক পরীক্ষাথীর্, এই টেস্ট পেপার সমাধান করত। সুতারং আমার সামনে অনেক কাজ, যেমন ১৯৬০ সালের টেস্ট পেপার তো বটেই, তাছাড়া ১৯৫৮ ও ১৯৫৯ সালের টেস্ট পেপার ও সমাধান করা শুরু করলাম। অঙ্ক ছাড়া অন্য বিষয়গুলো নিজের মতো করে কখন পড়ে, কখন লিখে, অনুশীলন করে শেষ করতে লাগলাম। অঙ্কটা আমি আর ফিল একসাথে করতাম, সারা দুপুর বসে একটার পর একটা টেস্ট পেপারের সমস্ত অঙ্ক অনুশীলন করে ফেলতাম । আমি অঙ্কে খুবই ভালো ছিলাম,তবু মাঝে মনে হতো, ফিল, আমার থেকেও ভালো । হেড মাস্টার, কবির স্যার মাঝে মাঝে আমাদের খবর নিতেন, অঙ্কের ব্যাপারে সমস্যা হলে তার কাছে যেতে বলতেন। ঐ সময় চুয়াডাঙ্গা মহাকুমা প্রশাসক ছিলেন একজন সি এস পি অফিসার, অতিশয় অঙ্কানুরাগী । তিনি ঘোষনা দিলেন যে, চুয়াডাঙ্গা সেন্টার হতে সকল মেট্রিক পরীক্ষাথীর মধ্যে যে অঙ্কে সর্বোচ্চ মার্ক পাবে তাকে সরকারী ভাবে তিনি পুরস্কৃত করবেন । ঐ পুরস্কারটি পাওয়ার জন্য আমার লোভ ছিলো, তবে মাঝে মাঝে ভয় হতো, ফিল না জানি পেয়ে যায় । তাই ফিল ও আমার মধ্যে সব সময় অঙ্ক নিয়ে কম্পটিশন লেগেই থাকত ।
যাহোক এতদিনের প্রস্তুতি শেষ করে মেট্রিক পরীক্ষা শুরু হবে ১৫ ই মার্চ, সোমবার থেকে, প্রতিদিন পরীক্ষা, কোন বিরতি নাই । সোমবার ইংরেজি ১মপত্র দ্বিতীয় পত্র, মঙ্গলবার বাংলা ১মপত্র দ্বিতীয় পত্র,বুধবার অঙ্ক ও উর্দু এবং বৃহস্পতিবার ইতিহাস ও ভুগোল। শুক্রবার ছুটি, শনিবার ঐচ্ছিক বিষয়, বিজ্ঞান, অঙ্ক, সংস্কৃত ও আরবি । তখনকার দিনে পরীক্ষার রুটিন এমনিই হতো, সুতারং ও নিয়ে আমার কোন চিন্তা নাই । প্রস্তুতি খুবেই ভালো ছিল, এখন কেমন প্রশ্ন হবে, কেমন লিখতে পারব, সেটাই ভাববার বিষয়। যাহোক পরীক্ষা শুরু হলো, একটা কুংসস্কার ছিলো, ডিম ও মিস্টি খাওয়া যাবে না এবং বেগুন জাতীয় গোলাকার কোন খাবার খাওয়া যাবে না। মা তার সাধ্য মত গরম ভাত ও তরকারি দিয়ে খাওয়িয়ে, আমাকে পরীক্ষা দিতে পাঠাত, যাওয়ার সময় ছল ছল চোখে আমার মাথায় ফু দিয়ে দিতো । ১৭ ই মাচর্, অঙ্ক পরীক্ষা, পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১০ মিনিটে আগে প্রত্যেকে পরীক্ষাথীর সামনে প্লেটে করে দুটো বড় বড় রাজভোগ মিস্টি কে যেন রেখে গেল । অঙ্ক পরীক্ষার শেষ মুহুর্ত, কে কি রেখে গেল দেখার মতো সময় নাই । অঙ্কে নিশ্চিত ১০০ পাব আশা ছিলো,কিন্তু প্রশ্নে জ্যামিতির অংশে সম্পাদ্য কমন পড়ে নাই, উপপাদ্যের অতিরিক্ত অঙ্কটিও কঠিন ছিলো, সমাধান করতে পারছিলাম না । হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে, বুকের ভিতরে এক অদ্ভুত অনুভুতি, ৮৫ মার্কের উত্তর সঠিক করেছি নিশ্চিত, কিন্তু সম্পাদ্যে ১১ মার্ক এবং উপপাদ্যের ৪ মার্ক কোন ভাবে মিলাতে পারছিলাম না। খুবেই মন খারাপ হয়ে গেল, সারা স্কুলের আশা ভরসা, শিক্ষকদের চাহিদা ও অনুভুতি এবং আমার নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম, কি তাহলে বিফলে যাবে। সবাই আশা করতো এবার পরীক্ষায় আমি নিশ্চিত কিছু একটা করব, ফাস্ট ডিভিশন তো বটেই তাছাড়াও অন্ততপক্ষে দু তিন বিষয়ে লেটার মার্ক থাকবে, তার ভিতরে অব্যশই অঙ্ক । নিজেকে খুবই অপরাধী ও বিচলিত মনে হতে লাগল, এ আমি কি পরীক্ষা দিলাম । মনের সমস্ত আনন্দ উচ্ছাস উবে গেল । পরীক্ষার শেষ ঘন্টা বেজে গেলো, মনের ভিতরে খচ খচ করে শাণিত বিধতে লাগল।
মুখ তুলে দেখি সবাই আনন্দ করে সামনে রাখা বড় বড় রাজভোগ মজা করে খাচ্ছে। কিসের রাজভোগ, কেন এলো, পরে জানতে পারলাম যে পেসিডেন্ট আইয়ুব খান, সারা পাকিস্তানের স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশেষ ইসলামিক প্রজাতন্ত্র দিবস হিসাবে মিস্টি খাওয়াচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ ঐ বছরে সারা পাকিস্তানে ২৩ শে মার্চে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হয়েছিল, এবং সেই আনন্দে, এই মিস্টি মুখ।এই সময় মিস্টি খাওয়া তো নিষেধ, আমি দ্বিধাদন্দ করছি, খাব কি খাব না । কিন্তু সবার প্লেট প্রায় খালি, কোন কিছু চিন্তা না করে খেয়ে ফেলালাম। পরীক্ষা খারাপ হওয়ার জন্য মনে এক অব্যক্ত বেদনা, মিস্টি খেয়ে পেট ভরা, এমনি অবস্থায় সবাইকে কি জবাব দেবো, এ কথা ভাবতে ভাবতে পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে আসলাম। স্কুলের বাহিরের রাস্তার পাশে, সেজো মামার স্টেশনারী দোকান, দেখি সেখানে বাবা দাড়িয়ে আছেন । আমার মুখ দেখে বাবা কিছু আঁচ করলেন, কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না, শুধু বললেন ” ডাব টা খেয়ে নে”। আমার বাবা পরীক্ষার পর আমার সাথে দেখা করতে এসেছে, তাও ডাব হাতে নিয়ে, এযেনো অবিশ্বাস্য। বাবা কোন কিছু প্রশ্ন না করে পরের পরীক্ষার প্রস্ততি নিতে বলে চলে গেলেন । আমি বোবা হয়ে চেয়ে থাকলাম এও কি সম্ভব । যাহোক উর্দু পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথে ফিলের সাথে দেখা, অঙ্কের পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা, দেখা গেলো, ও সম্পাদ্যটা আঁকতে পারছে কিন্তু প্রমান করতে পারে নাই, আর উপপাদ্যেও অতিরিক্ত অঙ্কটা করতে পেরেছে। সেই মুহুর্তে ফিলের প্রতি আমার খুব হিংসা হলো, তাহলে কি ফিল, অঙ্কে সর্বোচ্চ মার্ক পাবে, আমার কি অঙ্কে লেটার মার্ক ছুটে যাবে ইত্যাদি। এমনি হাজারও খারাব চিন্তা, অজানা আশঙ্কা, মনের ভিতরে গুমরে গুমরে উঠতে লাগল।
মেট্রিক পরীক্ষা শেষ, অখন্ড অবসর, তিন মাস পর ফল প্রকাশ হবে । আপাতত পড়াশুনার কোন চিন্তা নাই, কিছুদিনের জন্য আমার সেই প্রিয় স্থান বালিয়াকান্দি গ্রামে বেড়াতে গেলাম । এখানে,দেখি আমুল পরিবর্তন ঘটে গেছে, মাছ ধরা সাথী আলিহিম, চাষাবাদের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে, সহপাঠি আপেল, খেজুরের রস সংগ্রহ করে, ক্লাস ফাইভের কোহিনুরের বিয়ে হয়ে গেছে, তোফাজ্জল, সাংসারিক কাজে ব্যস্ত এবং সোমা ও লাল্টু হঠাৎ করে বড় হয়ে গেছে। সাহ পাড়ায় গেলাম, দেখি আমার খেলার সাথী, বারেক পড়াশুনায় ইস্তফা দিয়ে চাষাবাদে নিযুক্ত হয়েছে, আকালে ভাই, টেংরা মামু বিয়ে করে ঘর সংসার করছে, ইসলাম, আওলাদ এবং আরশাদ মামু যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত । আমার ফুফাতো ভাই, বেলু ভাই, প্রথম স্ত্রী ত্যাগ করে দ্বিতীয় বার বিবাহ করেছে । প্রথম বউটির সাথে আমার একটু সখ্যতা ছিল, তাই খারাপ লাগলো। সারা গ্রামে মাঠে ঘাঠে, আমার প্রিয় নদী নবগঙ্গাতে পরিবর্তেনের আভাস শুরু হয়েছে, নদীটি আরো সরু ও ক্ষিনাঙ্গি হয়ে গেছে। গত পাঁচ বছরে সব বদলে গেছে, আমার সামনে কাটা, আমাদের পুকুরে অথই পানি, সেখানে মৃগেল, রুই, কাতলার, পোনা ছাড়া হয়েছে, সচ্ছ ও কাকের চোখের মতো নির্মল তার পানি, একদিন ক্ষ্যাপলা জ্বাল দিয়ে মাছ ধরার চেস্টা করলাম, কিন্তু মজা পেলাম না, আগের সেই সুর যেন আর বাজছে না । কয়েকদিন কাটাবার পর একটা অতৃপ্তি মন নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসলাম।
দেখি সব বন্ধু বান্ধাবরা, যার যার মতো হেসে খেলে সময় কাটাচ্ছে। হঠাৎ আলফা, প্রস্তাব করলো আমরা যারা পরীক্ষার্থী স্কুল ছেড়ে চলে যাব,আমরা নিজেদের মতো করে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করি। ফিল প্রস্তাব করলো, আমরা যারা স্কুলে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কিছু করার সুযোগ পাই নাই, তারা সবাই মিলে সবার অংশগ্রহনে অনুষ্ঠানটি হতে হবে। আমি ও ভাবলাম তাইতো গানতো গাইতে পারি না, কতবার আবৃত্তি করার জন্য নাম দিয়েছি কোন বারেই সুযোগ পায়নি, এবার আমাদের নিজস্ব অনুষ্ঠানে নিশ্চয়ই একটা কিছু করব। শুরু হলো পরিকল্পনা,জল্পনা কল্পনা, কে কি করবে। মোটামুটি অনুষ্ঠানের সুঁচি ঠিক করা হলো, হেড মাস্টার স্যারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বড় হলঘরে যেখানে পার্টিশন দিয়ে তিনটি শ্রেনীকক্ষ করা ছিলো সেখানে অনুষ্ঠান করার অনুমতি পাওয়া গেল। দিনক্ষন ঠিক, বসার বেঞ্চে দিয়ে তৈরী স্টেজ, পার্টিশনের অংশ দিয়ে তৈরী সাইডউইংস, সবার বাসার মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে আসা শাড়ি দিয়ে তৈরী করা হলো মুল স্টেজের সামনের পর্দা । সন্ধ্যার পর যথা সময়ে শুরু হলো অনুষ্ঠান, আমন্ত্রিত অতিতিরা, নিজেদের বাবা, মা, গার্জিয়ান আর শিক্ষকবৃন্দ, তাছাড়াও জুটে গেল স্কুলের বিভিন্ন শ্রেনীর ছাত্ররা । অনুষ্ঠানের মধ্যে আলফা ”নাদির শাহ” কবিতা, বাদল নজরুলের ”মানুস” কবিতা এবং আমি নজরুলের ”সিন্ধু” কবিতা আবৃত্তি করলাম। আতাউর, হারমোনিয়াম বাজিয়ে কয়েকটি আধুনিক ও নজরুল গীতি পেশ করলো, বাদল, কমিক গান শোনালো, নওসের ”পর্দার ঢেউরে” গানটি শোনালো। সবশেষে একাঙ্কিকা, নজরুলের ”শাহজাহান” অভিনীত হলো, সেখানে আলফা শাহজাহানের ভুমিকায় আর আমাকে সাদা মেয়ের ড্রেসে পরে জাহানারার ভুমিকায় অভিনয় করতে হলো । এই ভাবে শেষ হলো এক আনন্দ ঘন সন্ধ্যা।
কোথা থেকে সময় কেটে গেলো বুঝতে পারলাম না, মেট্রিক পরীক্ষার ফলাফল সমাগত । তখনকার দিনে মোবাইল ফোনের এস এম এস ছিলো না, ছিলো না সরাসরি ফোন ফ্যাক্স এর ব্যবস্থা। সারা পুর্ব পাকিস্তানে একটাই মাত্র শিক্ষা বোডর্, পুর্ব পাকিস্তান সেকেন্ডারি শিক্ষা র্বোড, ঢাকা। তখন কার দিনে রেজাল্ট বের হতো, খবর কাগজে এবং সেই খবরের কাগজ, মফস্বলে পৌছাতে একদিন পর, রেডিও টেলিভিশনের কোন বালাই ছিলো না। কয়েকদিন ধরে গুজব শোনা গেল যে রেজাল্ট বের হবে, আমার আবার কয়েকদিন ধরে জ্বর, বাসায় শুয়ে আছি। ঢাকায় বেজাল্ট বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তখন মফস্বলের ছেলেরা ও গার্জিয়ানরা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভীড় করতো, এক্সচেঞ্জে থেকে ঢাকায় টেলিফোন করে রেজাল্ট আনিয়ে নিতে পারত । সকাল নয় টা কি দশটা হবে, আমি জ্বরের জন্য বাসায় শুয়ে আছি, হঠাৎ আলতাফ ডাক দিলো ” মান্নান রেজাল্ট বের হয়েছে দেখবি না” । মুর্হুতে মধ্যে সারা শরীরে, বিদুতের ঝিলিক বয়ে গেল, না জানি কোন খবর আসে। মুহূর্তে মধ্যে বিছানা ছেড়ে দৌড়ে বের হয়ে আসলাম, কিসের জ্বর, কিসের অসুখ, আলতাফ কে সঙ্গে নিয়ে দৌড়ে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ গেলাম, দেখি সেখানে জনমানুষের ভীড়, সবার চোখেমুখে উদ্বেগের চিহ্ন। কে যেনো আমাকে জানালো চুয়াডাঙ্গা হাই স্কুল থেকে তিন জন ফাস্ট ডিভিশন পেয়েছে, একজন হান্নান, অপরজন আতাউর এবং তৃতীয় জন আমি, সঙ্গে অঙ্কে লেটার । নিজের কানকেও বিশ্বাস হচ্ছিল না এও কি সম্ভব । গত তিন বছর যাবৎ চুয়াডাঙ্গা স্কুল থেকে কেউ ফাস্ট ডিভিশন পাচ্ছিল না, এবার একবারে তিন জন। সর্বশেষ ১৯৫৭ সালে, রবিউল ভাই ফাস্ট ডিভিশন পেয়েছিলো, তারপর থেকে স্কুলে ফাস্ট ডিবিশনের খরা। ফিল, আলফা, বাদল, ওবায়দুল সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছে, আর যে আমাকে খবর দিতে গিয়েছিলো,আলতাফ, সে ফেল করছে । মনে এক আনন্দ অনুভুতি, পরিশ্রমের সফল পুরস্কার, বাবা ও মায়ের একান্ত দোয়া । দৌড় গিয়ে মাকে প্রথমে খবর দিলাম, মা জড়িয়ে ধরে আনন্দাশ্রু ফেলল, আর বাবাকে খবর দিতে বলল । বাবা অফিসে, খবরটি আগেই পেয়েছেন, আমার দেওয়া খবরে খুশি হলো, মনে হয় একটু হাসল, কিন্তু কোন উচ্ছাস দেখালো না ।
পরদিন সব পেপারের রেজাল্ট ছাপা হয়েছে, চুয়াডাঙ্গা কেন্দ্রের, চুয়াডাঙ্গা হাই স্কুলে, প্রথম বিভাগের বিপরীতে রোর নম্বর উঠছে ১,৮(এম),৯,আমার রোল নম্বর ছিল, চুয়া-৮ । সব পত্রিকাগুলোতে ঝলমল করে প্রথম বিভাগে, ৮(এম) শোভা পাচ্ছে, আমার মনের ভিতরে আনন্দের ঝিলিক ও একটু একটু গর্ববোধ হচ্ছে । সপ্তাহ খানেক পর স্কুলে সম্পুর্ন ফলাফল মার্কসিট সহ আসল । দেখা গেল আমার মোট মার্ক ৫৮৩, অঙ্কে ৮৫, আর ফিল পেয়েছে অঙ্কে ৯৭ । স্কুলের ফলাফল ও মার্কশিট দেখে সবাই স্তম্ভিত, ফিলের রোল নম্বরের বিপরীতে ৯৭ পেয়েও এম কেন উঠে নাই। কবির স্যার মহাখুশি, একে তো স্কুলের তিনটা ফাস্ট ডিভিশন, তারপর অঙ্কে সর্বোচ্চ মার্ক । এস ডি ও সাহেবের ঘোষনাকৃত পুরস্কার তাহলে এখন ফিল পাবে, আমার একটু হিংসা হতে লাগল, তবু ভাবলাম পাক না ফিল পুরস্কার, আমার তো ফাস্ট ডিভিশন আছে । [চলবে]

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

<