বটবৃক্ষের সালতামামি: পার্ট-১৯

বটবৃক্ষের সালতামামি: পার্ট-১৯ ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭ ০ comments

-প্রকৌশলী এম. এ. মান্নান-

:উনবিংশ অধ্যায়:
সময়কাল ১৯৮৫ সাল-
ঢাকায় পৌছে কিছুদিন, খুলনায় পরিবারের সঙ্গে ,কয়েকদিন চুয়াডাঙ্গাই বাবা মায়ের সাথে, আবার ঢাকায় মতিনের বাসায় কাটাতে লাগলাম, সারাদিন এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি করি, ভবিষতের দিনগুলি কিভাবে গড়ব তার পরিকল্পনা করি, কিন্তু কোন খেই পাই না, সমাধান পাই না । বন্ধু বান্ধাব, আত্মীয় স্বজন, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী দেওয়ার কথা বলে, ব্যবসা করার জন্য লোভ দেখায়, আবার মাঝে মাঝে ভাবি টেক্সাটাইল মিল কিনে শিল্পপতি হই, কোন কিছু নির্দিষ্ট না করতে পেরে দিক বিদিক ভাবে ঘোরাফেরা করি । এমনি সময় একদিন আমার পুরাতন বস আমার প্রথম এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার নিয়াজ আহমেদ সাহেব এর অফিসে দেখা করি, নিয়াজ সাহেব তখন ৩০৩ সরকারী নিশেধাজ্ঞায়, চাকুরী খুইয়ে কনর্সালটিং ফার্ম খুলে বসেছে, আমার সাথে দেখা হওয়ায়, বলল, মান্নান, তুমি চাকুরী করবা, আমি তো ভাবি মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি, উনি বললেন, যদি চাকুরী করতে চাও তবে জয়েন করে ফেলো, বেতন ৯০০০ টাকা । ভাবতে লাগলাম ৯০০০টাকা বেতন তখনকার দিনে অনেক, বাবা মায়ের সঙ্গে আলাপ করলাম, হাসির সাথে পরামর্শ করলাম, বন্ধু বান্ধাবের সাথে মত বিনিময় করলাম ,সবাই নিয়াজ এসোসিয়েটসে চাকুরী করার পরামর্শ দিলো । ওয়াপদা ভবনে গেলাম আমার আগের চাকুরীর পরিনতি দেখতে, আমার রেজিগনেশন গ্রহন করা চাকুরী, ফরমালিটি না মানায় আমাকে চাকুরী চ্যুত করা হয়েছে, ওখান কার কতৃপক্ষ, তখন আমাকে অফার দিলো ,আগের চাকুরীতে জয়েন করতে পারেন, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার পদে, তবে ছয় বছরের আগের অবস্থান থেকে শুরু হবে, এই ছয় বছরের চাকুরী না করায়, কোন সিনিযারিটি পাবেন না । ভেবে দেখলাম অনেক জুনিয়র হয়ে যাব, আমার জুনিয়ররা আমার বস হয়ে যাবে, আবার ভাবি সরকারী চাকুরী, আলদা মোহ, বেতন কম হলে কি হবে, ক্ষমতার দার্পোট আছে, আবার ভাবি সৎ ভাবে মাসে ৯০০০ টাকার চাকুরী এটাই বা কম কিসে ।
অবশেষে আমার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর মালিক হওয়া হলো না, মুন্সিগঞ্জ এর কাছে ধলেশ্বরির পাড়ে আদম টেক্সটাইল মিল বলে একটা মিল ছিলো ,১০ লুমের কাপড়েরর মিল, চালু অবস্থায়, সামনেই দেখছি থানকি থান কাপড় তৈরী হচ্ছে, মিলটি বিক্রি হবে দাম মাত্র ৯ লাখ টাকায়। মুহুর্তে স্বপ্ন দেখলাম মিলের মালিকানাও শিল্পপতি হবার , কিনে ফেললেই বা ক্ষতি কি । মিলটি দেখার সময় হাসি ও ফারসিম আমার সঙ্গে ছিলো, হাসি আমার ভাবসাব দেখে, আমি কি করতে যাচ্ছি বুঝে ফেললো, আমাকে শুধু বললো, মিল কিনো, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী দাও, যা খুশি করতে পারো ,কিন্তু আমাদের ৬ বছরের কষ্টার্জিত জমা ১১ লাখ টাকা দিয়ে আগে আমাদের পরিকল্পিত বাড়িটা বানিয়ে দেওয়ার পর। আমি বললাম তা কি করে হয়, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী, মিল মালিক হতে গেলো জমা টাকা সব চলে যাবে, বাড়ি বানাবো কোথা থেকে । হাসির শেষ কথা, বাড়ি বানানোর পরে তোমার অন্য যেকোন পরিকল্পনা কার্যকরী করো, হাসির কথার মর্মার্থ বুঝতে পারলাম, আাসলে আমাদের পুর্বের পরিকল্পনার কথা ভুলেই গেছিলাম, নগদ টাকা হাতে পেয়ে মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিলো । শেষ পর্যন্ত সবকিছূ বাদ দিয়ে, গার্মেন্টস মালিক ও শিল্পপতি হওয়া কথা ভুলে গিয়ে,জমা টাকা জমা রেখে, নিয়াজ এসোসিয়েটসে চাকুরী করার সিদ্ধান্ত নিলাম, কাজে যোগদান করলাম ১লা নভেম্বর ১৯৮৪ সাল ।
নতুন অফিস, নিয়াজ এন্ড এসোসিয়েটস এর অফিস জিগাতলাতে, থাকি মতিনের বাসায়, অফিস যাওয়া আসা শুরু করেছি, আমার চাকুরী আশুগঞ্জ ৩০০ মে.ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের, বিদেশী পরামর্শক লাহমেয়ার ইন্টারন্যাশনাল অধীনে, আমার পদবি প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার । নিয়াজ এন্ড এসোসিয়েটস লাহমেয়ার ইন্টারন্যাশনালের লোকাল এজেন্ট, প্রাথমিক ভাবে ভালোই লাগলো, ঢাকাতেই আমার অফিস, অফিসে যাতায়াত করি, টেন্ডার ডকুমেন্ট পড়ি, মাঝে মাঝে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শনে যাই । নতুন বছরের প্রথমেই যেহেতু ফারসিমকে ঢাকায় ভর্তি করা হবে, তাই এই এলাকায় বাসা খুজতে থাকি, খুব তাড়াতাড়ি একটা সুবিধাজনক স্থানে, ভালো আবাসিক এলাকায়, ভালো ভাড়ায় তিন তালায় একটা এর্পাটমেন্ট পেয়ে যাই, ভাড়া মাত্র মাসিক ২৫০০ টাকা, তবে বেশ কিছু টাকা অগ্রিম দিতে হবে । বাড়ির মালিক উকিল, তার নাতি ভারতে চিকিৎসারত, তাই তাঁর টাকার প্রয়োজনে, আমি ৪০০০০ টাকা অগ্রিম দিয়ে, নভেম্বর মাসে বাসায় উঠলাম, কথা ছিলো ফারসিমের পরীক্ষা শেষ হলেই, হাসি ঢাকায় এসে পড়বে । সব কিছু প্লান মাফিক চলল, নিদিষ্ট সময় হাসিরা ঢাকায় আসলো, বিবাহের পর জীবনে প্রথম বারের মতো ভাড়া বাড়িতে উঠলাম, খুলনা থেকে সমস্ত ফার্নিচার এসে গেলো, হাসি আস্তে আস্তে বাসাটা গুছিয়ে নিলো । এখন আামাদের সামনে প্রধান কাজ ফারসিমকে ঢাকার স্কুলে ভর্তি করা, ক্লাস সিক্সে নামিদামি কোন স্কুলে ভর্তি করা যায় না, তবু চেষ্টা করতে লাগলাম ল্যাবরোটরি স্কুলের জন্য, ঐ সময় বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির, সাধারন সম্পাদক শহিদুল­াহ সাহেবের পিছনে কিছুদিন ঘুরলাম, কিন্তু কোন লাভ হলো না, কোন ভাবেই ল্যাবরোটরি স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুয়োগ পাওয়া গেলো না, তবে ওরা কথা দিলো যে যদি সেকেন্ড শিফট চালু হয় তাহলে অবশ্যই সুযোগ পাবে । ইতিমধ্যে আমরা ধানমন্ডি বয়েজ হাই স্কুল, মোহাম্মদপুর বয়েজ হাই স্কুল, রেসিডেন্সসিয়াল মডেল হাই স্কুল, সেন্ট যোসেফ হাই স্কুলে ধরনা দিতে লাগলাম, এ্যাডমিশন টেস্টে ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর, দুই জায়গাতেই সে টিকলো, এবং সেন্ট যোসেফ স্কুল থেকে আশা দিলো, তবে শেষ পর্যন্ত আমরা ফারসিমকে ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলে ভর্তি করলাম। প্রথম অবস্থায় হাসি রিকসা করে ছেলেকে স্কুলে পৌছে দিতো, আবার নিয়ে আসতো, কিছুদিন পর আমাদের বাসার কাছাকাছি আবির বলে একটি ছেলে ধানমন্ডি স্কুলে পড়ত, পরবর্তীতে ওরা ২ জন একসাথে রিকসা করে স্কুলে যাওয়া আসা করতো । ধানমন্ডি স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রায় ৫ মাস পর, মে মাসে ল্যাবরোটরি স্কুল থেকে সেকেন্ড শিফটে ভর্তির জন্য আমন্ত্রন জানালো, কিন্তু ফারসিম শেষ পর্যন্ত ঐ স্কুলে যেতে রাজি হলো না, কারন ধানমন্ডি স্কুলে তার বন্ধু বান্ধাব জুটে গেছে, পড়ার একটা পরিবেশ পেয়ে গিয়েছে, তাই আমরা আর জোর করলাম না ।
লাহমেয়ার ইন্টারন্যাশনাল এর অধীনে আমার চাকুরী চলছে, এখন থেকে আমাকে আশুগঞ্জে সার্বক্ষনিক থাকতে হবে, আমাদের জন্য নতুন বাসা পাওয়া গেলো, কোম্পানী থেকে বাবুচির্, আসবাবপত্র ও রান্না সামগ্রী সরবরাহ করা হলো। সপ্তাহে ৬ দিন আশুগঞ্জে থাকি ,ছুটির দিনে ঢাকায় যাই, আপাতত আমাকে, আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বয়লার ও টারবাইনের সিভিল ফাউন্ডেশনের কাজ দেখাশুনা করা, আর আশুগঞ্জ-ঘোড়াশাল ২৩০ কে.ভি ট্রান্সমিশন লাইনের কাজ দেখা শুনা করতে হয় । প্রাথমিক ভাবে কাজটি আমার ভালো লাগছিলো না, সারা জীবন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালনা ও সংরক্ষনের কাজ দেখাশুনা করে এসেছি, তাই সিভিল কস্ট্রাকশন এর ঢালাইয়ের কাজ, আর ট্রান্সমিশন লাইনের সার্ভে করার কাজ ঠিক মনে প্রানে মেনে নিতে পারছিলাম না, তদপুির জার্মান কোম্পানী, বস ও খাস জার্মান, মেজাজ সব সময় তিরিক্ষে থাকে, মেনে নিতে পারছিলাম না । তবুও মাস গেলে ভালো একটা বেতন পাওয়া যায়, এই শাস্তনায় টিকে ছিলাম, আমার চাকুরী পি .ডি .বি এর সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক ম্যান মানথের বিপরীতে, নিয়াজ এন্ড এসোসিয়েটস আমার জন্য প্রতি মাসে পি. ডি. বি থেকে বিল করে পায় ১৩৪০০ টাকা, আমাকে দেয় ৯০০০টাকা, বাকি রাখে মাসে ২৫০০ করে সোশ্যাল সিকিউরটি হিসাবে । তাছাড়া পরিবার ঢাকায় রেখে, দীর্ঘদিন রেস্ট হাউজের জীবন, হাসি ও পছন্দ করছিলো না, তার উপর বেশ কয়েক মাস যাবদ আমার মাঝে মাঝে জ্বর ও গলায় ব্যাথা হতো, ঔষধ খেলে কমতো কিন্তু ঔষধ ছাড়লে বাড়তো, মোটের উপর মেঘনা পাড়ের স্যাতস্যাতে আবহাওয়া আমাকে সুট করছিলো না । বিশেষ করে গলার ইনফেকশনটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিলো, ফারুক ভাই বলেছিলো ক্রনিক থ্রোট ইনফেকশন, ভালো অসুখ না, ভবিষতে থ্রোট ক্যানসারে রুপ নিতে পারে, তাই চাকুরী পরিবর্তন করার চিন্তা মাথার ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছিলো, তাই বিভিন্ন স্থানে চাকুরীর আবেদন করা শুরু করেছিলাম । এই সুত্রে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা থেকে আমাকে প্রধান প্রকৌশলি হিসাবে নিয়োগ পত্র ও পাঠিয়েছিলো, কিন্তু সেই একই কথা, ঢাকার বাহিরে থাকতে হবে পরিবার ছাড়া । এমনি অবস্থায় যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম, তখন টি. এস. এল নামে একটা কনসালটিং ফার্ম থেকে ইন্টারভিউ এর ডাক আসলো, যেয়ে দেখি অফিস ধানমন্ডিতে কাজও ঢাকাতেই, ম্যানেজিং ডাইরক্টর আমার পুর্ব পরিচিত, আহসানউল­াহ হলের বাসিন্দা, আমার ১ বছরের সিনিয়ার, রেজাউল ভাই । কথাবার্তা হলো, রেজাউল ভাই জয়েন করতে বললেন, তবে বেতন ঠিক করবেন কোম্পানীর চেয়ারম্যান জামান স্যার । আমি ও এমনি একটা সুযোগ খুজছিলাম, লাহমেয়ার কে ছেড়ে আসতে, নিয়াজ সাহেবকে কথাটা বলতে উনি ক্ষেপে গেলেন আমার উপর, হাজারও প্রশ্ন,কি কারনে আমি ছেড়ে যাচ্ছি ইত্যাদি । আমি কথায় কথায় বোঝাতে চেষ্টা করলাম আামর শরীর টিকছে না ঐ আবহাওয়ায়, কিন্তু নিয়াজ সাহেব মনে করলেন আমি জার্মান বস রনি সাহেবের অত্যাচারে চাকুরী ছাড়ছি, উনি সরাসরি আমাকে বললেন, রনির সাথে যদি তোমার কোন সমস্যা হয়ে থাকে, তবে এক সপ্তাহের ভিতরে আমি রনিকে জার্মান ফেরত পাঠাবো, তবু তুমি থাকো । আমি তাঁর বদান্যতায় মুগ্ধ হয়ে মাফ চেয়ে বিদায় নিলাম ।
আবার আমার চাকুরী পরিবর্তন, টি .এস .এল এ জয়েন করার পর আমার বেতন নির্ধারন করলেন জামান স্যার, তার বেতন নির্ধারনের এক অভিনব উপায় দেখলাম, আমার কাছ থেকে প্রশ্ন করে বিভিন্ন তথ্য জেনে নিলেন, যেমন স্ত্রী কয়টা, সন্তান কয়টা, ও কতো বড়, ও কোন স্কুলে যায়, কোন ক্লাসে পড়ে, নিজের বাড়িতে থাকি না ভাড়া বাড়িতে থাকি, ভাড়া কতো, বাবা মা কে টাকা দিতে হয় কিনা, সিগারেট খাওয়ার নেশা, তাস খেলার নেশা, জুয়া খেলার নেশা, ও মদ খাওয়ার অভ্যাস আছে কিনা, যাতায়াত করি রিকসা না বেবি ট্যাক্সিতে । সবকিছু জেনে হিসাব করে আমার বেতন নির্ধারন করলেন ৭৫০০ টাকা, আমি বেতন নির্ধারনের অভিনব উপায় দেখে স্তম্ভিত হলাম, রেজাউল ভাইকে বললাম, উনি হেসে বললেন তুমি জয়েন করো, আমি তো আছি, দেখবো । সবকিছু ভেবে চিন্তে নিজেরা পরামর্শ করে টি.এস.এল এ জয়েন করবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম, কারন তখন আমার ঢাকায় থাকা দরকার, ছেলের পড়াশুনা দেখাশুনা করা, সর্বোপরি আমাদের স্বপ্নের বাড়ি বানানোর জন্য ঢাকায় থাকা ছাড়া আমার আর বিকল্প ছিলো না। ১৯৮৫ সাল,১লা সেপ্টেম্বর থেকে টি.এস.এল এ প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে জয়েন করলাম, আমার বেতন নিধারিত হলো ৮০০০ টাকা, আগের কোম্পানীর বেতন থেকে ১০০০ টাকা কম, তবুও তাই মেনে নিলাম, কারন ঢাকায় থাকার কথা চিšা—া করে । টি. এস.এল এর কাজ একটু ভিন্ন ধরনের, কনসালটিং ফামর্, তবে বেশির ভাগ প্রজেক্টই হাউস ওয়ারিয়েংর কাজ, কাজটি খুব সহজ, কিন্তু আমার এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা ছিলো না, দেখলাম এর ভিতরে বিশেষ ইঞ্জিনিয়ারিং আছে, ডিজাইনের জন্য বিশেষ ধরনের জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে, প্রত্যেকটা পয়েন্টর জন্য কতো কারেন্ট লাগবে, কি সাইজের তার লাগবে, একটা কনডুয়েট এর ভিতরে কয়টা তার দেওয়া যাবে,ভোল্টেজ ড্রপ কতো হবে, ডি.বি এবং এস ডি.বি তে কতো সাইজের সাক্রিট ব্রেকার ব্যবহার হবে ইত্যাদি হাজার রকমের হিসাব, নিকাশ, তথ্য নিয়ে কাজ করতে হয় । প্রাথমিকভাবে অসুবিধা হলেও অল্পদিনে মধ্যে রপ্ত করে ফেললাম, আমি জয়েন করার কিছুদিনের ভিতরে কোম্পানী পি, ডি ,বি এর ১৮- শহর বিদ্যুৎ প্রকল্পের বড় একটা কাজ পেলো।
ঢাকায় চাকুরী করার সময়, মোহাম্মদপুরের জায়গাতে মামলা মোকদ্দমা ইত্যাদি সমস্যা থাকায়, খুব নিকট ভবিষ্যতে, এখানে কিছু করতে পারবো বলে বিশ্বাস হলো না, মোহাম্মদপুরের বাসায় তখন বিক্রেতা বুড়ি তার পরিবার নিয়ে থাকে, আর আমার পক্ষে একজন ড্রাইভারকে পরিবার সহ থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। থানা থেকে এমনি অবস্থাই নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলো, কেস মিমাংসা না হওয়া পর্যন্ত এই ২ পরিবারই শুধু থাকতে পারবে, অন্য কেউ ঢুকতে পারবে না । মোহাম্মদপুর জাকির হোসেন রোডে, তখন দুই গ্র“প,এক গ্র“প আমার প্রতিপক্ষ খ্রিষ্টান কোস্টা সাহেবের পক্ষে কাজ করে, আর এক গ্র“প মান্নান সাহেব ও হাবিব সাহেবের নিয়োজিত হয়ে আমার পক্ষে কাজ করে, থানা পুলিশের নির্দেশ থাকায় কোন পক্ষই সুবিধা করতে পারছিলো না, এক বার আমার পক্ষে কাজ করতে যেয়ে মান্নান সাহেবের বড় জামাই, হারুন মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে, থানা পুলিশ হয়, পরে অবশ্য তাকে আমরা ছাড়িয়ে নিয়ে আসি । এমনি যখন যুদ্ধং দেহি ভাব, তখন আমি জাকির হোসেন রোডের প্রভাবশালি, কিন্তু ঐ দুই গ্র“প এর বাহিরের কয়েকজনের সাথে আপোশ রফা করার চেষ্টা করি, আমার পরিচিত এক ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাসায়, দফায় দফায় আলোচনা হয়,মিটিং হয় ,২ পক্ষের সঙ্গে শুনানি হয়, অবশেষে তারা একটা আপোশ মিমাংসার রায়ে নির্দিষ্ট করে । আপোশ মিমাংসার রায়ে ঠিক হয়, কোস্টা সাহেব জায়গাটি পাবে, আমাকে ১লাখ টাকা পরিশোধ করবে, জায়গার প্রতি আমার আর কোন দাবি থাকবে না। রায় শুনে ভাবলাম এ কোন ধরনের বিচার, আমার বায়না আগে, আমার দলিল করা জায়গা, আমার কোন দাবি থাকবে না এ কোন ষড়যন্ত্র । আমি বিচারকদেরকে বললাম, ঠিক আছে, জায়গাটি আমার ২লাখ ৪০হাজার দিয়ে কেনা, আামকে ২লাখ পরিশোধ করুন ,আমি দাবি ছেড়ে চলে যাব, কিন্তু দেখলাম বিচারকরা সব কোস্টা সাহেবের পক্ষে কাজ করছে, প্রতিটি আপোশ আলোচনায় মিটিংয়ে, হাসি সব সময় আমার সঙ্গে থাকতো, আমরা দুজন মিলে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরতাম, বিচারকদের রায় শুনে, হাসি ওদেরকে বলে আসলো, আমরা এ বিচার মানি না, জায়গা পাই না পাই শেষ পর্যন্ত দেখব, দরকার হলে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিবো,তবু এক বিধর্মিকে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে জায়গার দাবি ছেড়ে দেবো না ।
জাকির হোসেন রোডে যেহেতু কিছু করা সম্ভব হবে না, তাই মিরপুরের জায়গাতে বাড়ি বানানোর জন্য এক মত হলাম, জোরেশোরে তাৎকালিন ডি. আই .টি কাছে প্ল্যান জমা দিলাম, অল্পকিছূ খরচ করে , চেষ্টা তদবির করে, প্ল্যান ও পাস হলো, আমরা বাড়ি বানানো শুরু করলাম । ইতিমধ্যে টি.এস. এল এর চাকুরীতে ১৮- শহর বিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করার জন্য আামকে জোনাল ইঞ্জিনিয়ার করে ফরিদপুরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেহেতু চাকুরী করতে হবে এবং ঢাকায় থাকতে হবে এই চিন্তা করে কয়েক মাসের জন্য ফরিদপুর, বরিশালে অফিস গোছানো, ডাটা সংগ্রহ, এবং ডিজাইন করার জন্য মাস তিনেক অবস্থান করলাম, পরে কোম্পানী আবার আমাকে ঢাকায় বদলি করে নিয়ে আসলো। ১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে মিরপুরের বাড়ি বানানোর কাজে হাত দিলাম, প্রাথমিক ভাবে কোন অভিজ্ঞতা না থাকলে যা হয় সেইভাবে পদে পদে ঠকতে লাগলাম, ইট, বালু ,খোয়া, রড কেনা, মিস্ত্রী, যোগালি পরিচালনা করা, স্থানীয় মাস্তানদের ম্যানেজ করা ইত্যাদিতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হলো । খুব ভোরে বাসা থেকে বেরিয়ে মিরপুর যাই, কাজে লোকজন লাগিয়ে আবার অফিসে ফিরে আসি, আবার বিকালে গিয়ে লেবারদের পাওনা পরিশোধ করি, মালামাল কেনার জন্য কাটাশুর বালু ঘাটে যাই, ইত্যাদি সারাক্ষন ব্যস্ত থাকতে হয়। যাতায়াতে অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় হয় ,তাই সব দিক ভেবে চিন্তে একটা হোন্ডা ৮০ সিসি মোটরসাইকেল কিনলাম । এতে আমার যাতায়াত ও সময়ের সমস্যার সমাধান হলো, মিরপুরের বাড়ির কাজেও আস্তে আস্তে এগুতো লাগলো, আমরা প্ল্যান অনুযায়ি পুরা বাড়ির অর্ধেকটার কাজ শুরু করেছিলাম, আস্তে আস্তে ডিসেম্বর মাস নাগাদ বাড়ির দোতলা পর্যন্ত কাজ শেষ হতে চললো । মোটর সাইকেল চালানোতে আমার বিশেষ পারদর্শিতা না থাকায় এই সময়ের ভিতরে ২ বার এ্যাকসিডেন্ট করে ফেললাম, একবার তো ফারসিমকে নিয়ে শ্যামলির কাছে মোটামুটি বড় ধরনের এ্যাকসিডেন্ট করে প্রানে বেচে গেলাম, হাত পা ছিলে একাকার হয়ে গেলো, মোটর সাইকেল এর ও অল্প ক্ষতি হলো, তবুও প্রয়োজনের জন্য সবই মেনে নিতে হলো। দ্বিতীয় বার এ্যাকসিডেন্ট হলো ঐ একই জায়গা শ্যামলিতে, একটা রিকসাকে বাঁচাতে যেয়ে ।
ডিসেম্বর মাসের শেষ, স্বপ্নের বাড়ি, দোতলা পর্যন্ত শেষ হওয়ার পর আমরা জিগাতলার ভাড়া বাড়ি ছেড়ে মনিপুরের নিজেদের বাসায় শিফট করলাম, মনিপুরে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির ব্যবস্থা থাকলেও রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব খারাপ ছিলো ,তবুও নিজেদের বাসায় অবস্থান, সবকিছুই মেনে নিয়েছিলাম । ইতিমধ্যে ফারসিম ধানমন্ডি বয়েজ স্কুল থেকে পাস করে ক্লাস এইটে উঠেছে, আর হাসি তখন সিটি কলেজে বাংলার অধ্যাপিকা, তবুও সবকিছু ছেড়ে ফারসিমকে মনিপুর স্কুলে ভর্তি করানোর চেষ্টা করা হলো, প্রায় ১৫০ ছাত্রের মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে ক্লাস এইটে ৩ জন মধ্যে ১ জন হয়ে মনিপুরে স্কুলে ভর্তি হলো ,একটা সুবিধা হলো যে ফারসিমের স্কুল বাড়ির কাছে । মনিপুর থেকে সিটি কলেজ দুরে বলে, হাসি সিটি কলেজের চাকুরী ছেড়ে দিলো, বললো আর চাকুরী নয়, এখন ছেলে মানুষ করতে হবে, তাই সব কিছু ছেড়ে একমাত্র সন্তানকে মানুষ করার ব্রত নিলো । আমার টি. এস. এল আর চাকুরীর অবস্থা বেশি ভালো না, কোম্পানী ম্যনেজমেন্টর ভিতর দ্বন্দ হওয়ায় আমাদের মাসিক বেতন আস্তে আস্তে বাকী পড়তে লাগলো, ১ মাসে অর্ধেক বেতন পাই, আর এক মাস পাই না, সংসারের অবস্থা তখন খারাপ, হাতের জমানো সব টাকা বাড়ি বানাতে শেষ, এখন সংসার চালানেই মুশকিল । বাড়ি ভাড়া লাগে না, তবে সংসারে খাওয়ার পরার খরচ তো আছে, মিরপুরের বাসায়, নিচের তলা বড় ফ্ল্যাট হওয়ায় আশানুরুপ ভাড়াটে পাওয়া যাচ্ছিলো না, ফলে ঐ ফ্ল্যাটকে ২ ভাগে ভাগ ক,েমর অল্প ভাড়ায় ভাড়া দেওয়া হলো, বাড়ির সামনের দিকে হাসির কাছ থেকে টাকা নিয়ে ৪ টি দোকান বানানো হয়েছিলো, সেখান থেকে অল্প বিস্তার আয় হতো, এভাবে খোড়াতে খোড়াতে সংসার চলতে লাগলো ।
শেষ পর্যন্ত আর না পেরে, নয় মাসের বেতন বাকী রেখেই টি. এস. এল চাকুরী ছেড়ে, আর একটি বড় বিখ্যাত কনসালটিং ফার্ম শহিদুল্লাহ এন্ড এসেসিয়েটস এর চাকুরীতে জয়েন করলাম, অনেকদিন পর মনে হলো যেন একটা অন্ধকার জগত থেকে আলোর জগতে ফিরলাম । শহিদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটস এর চাকুরী, এখানেও হাউজ ওয়ারিংয়ের কাজ, কিন্তু আমি এখানে সর্বেসর্বা, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধান, আমার পদবি সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার,আমার বেতন ধার্য হলো মাসিক ৯০০০ টাকা, ভালোই কাটছিলো এখানে, মাস গেলে বেতন পাওয়া যায়, নিজের বাড়িতে থাকি, ভাড়া লাগে না, ছেলেটি বাড়ির কাছে স্কুলে পড়ে, হাসি নিজের সংসার সুচারু রুপে গুছিয়ে নিয়েছে, একটা শান্তির আবাস হিসাবে । কিন্তু যাতায়াত সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিলো, কারন দ্বিতীয় বার একসিডেন্ট করার পর, হাসি আমাকে আর মটর সাইকেল ধরতে দেয় নাই,অনেক অনুরোধ, উপরোধ, কাকুতি, মিনতি, তবু হাসির ঐ গো,বাড়িতে হয় মটর সাইকেল থাকবে, নয় আমি থাকবো , এত বড় দিব্যি দেওয়ার পর আর মটর সাইকেল চালাই কি করে, সুতারং মটর সাইকেল এর পাঠ এখানে শেষ । অফিসে যাতায়াত করি, রিকসায়, বাসে, টেম্পুতে করে, কষ্ট হয়, প্রচন্ড কষ্ট ,ঝড় ,বৃষ্টি, শীতে, চাকুরীতে ঢোকার পর থেকে গাড়ি ছাড়া তো অন্য কিছুতে চড়ি নি, সরকারী চাকুরীতে গাড়ি ছিলো, লিবিয়ার চাকুরীরতে, পুরনো হলেও গাড়ি ছিলো, বাড়ি বানানো পর্যন্ত মটরসাইকেল ছিলো, কিন্তু ১৯৮৭ সালের গোড়া থেকে, যাতায়াতের এই সমস্যা, হাসিকে কিছু বললে ও বলে, তোমার যোগ্যতা, সামর্থ যদি থাকে তো গাড়ি কিনে ফেলো । কিন্তু এই মুহুর্তে আমার তো সেই সামর্থ নেই, তাই মুখ বুঝে কষ্ট সহ্য করি, হাসির ও কষ্ট হয়, বাহিরে কোথায় যেতে হলে, রিকসায়, বেবি ট্যাক্সিতে যেতে হয়, সমস্যা অনেক, কিন্তু সমাধান নেই ।
শহিদুল্লাহ এন্ড এসেসিয়েটস এর চাকুরীতে মোটামুটি বেতন বেড়ে ১৯৯৪ সালে, ১৫০০০ টাকা হলো, ইতিমধ্যে আমাকে প্রমোশন দিয়ে ডাইরেক্টর করা হয়েছে, কোম্পানীর জন্য কাজ করি, নতুন নতুন কাজ আনি, কোম্পানির ভিতরে অন্তঃ দ্বন্দ থাকলেও বেশ চলে যাচ্ছিলো,আামর সম্মান, দিন কে দিন বাড়তে ছিলো । ইতিমধ্যে ১৯৮৯ সালে আমার শ্বশুর কেবলা, মৌলভী শেখ আব্দুস সোবাহান (রা:) হঠাৎ করে ইন্তেকাল করলেন, ১৯৭৫ সালে সেচ্ছা ইনভেলিড পেনশন নেওয়ার পর দীর্ঘদিন ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেছেন, তারপর খুলানায় ফরাজি পাড়ায় নিজস্ব বাসস্থান, মসজিদ, খানকাহ, মাজার শরিফ ইত্যাদি প্রতিষ্টা করেছেন । ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে আমার বাবা, হঠাৎ করে ডায়বেটিক কমে যাওয়াতে,, স্ট্রোক করে দেহের এক পাশ প্যারালাইজ হয়ে যায় এবং দীর্ঘ এক বছর প্রচন্ড কষ্ট পেয়ে, ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনিও ইন্তেকাল করেন। পর পর ১ বছরের ব্যবধানে, আমার দুই দুইজন মুরব্বি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়াতে, আমি স্বাভাবিক ভাবে হতবিহবল হয়ে পড়ি, কেমন যেন সবকিছুতেই নিজেকে অসহায় মনে হয়, কোন কাজে মনো নিবেশ করার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলি, নিজের উপর আস্থা রাখতে পারি না। ঠিক এই সময়ে ১৯৯০ সালের মে মাসে, ফারসিম স্টার মার্ক সহ ফাস্ট ডিবিশন পেয়ে এস.এস. সি পাস করলো, মনিপুর স্কুলে প্রথম এবং বোর্ডের ভিতর ২৫ তম প্লেস অধিকার করলো । আমার একান্ত আশা,হাসির প্রানান্ত পরিশ্রম, সন্তান মানুষ করার ব্রত, সবকিছু ছাপিয়ে ফারসিমের এস.এস.সি পাশ, আামাদেরকে নতুন করে বাচার ইন্ধন জোগালো, আমরা পুর্ন উদ্যাম নিয়ে ফারসিমকে সত্যিকার মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার প্রয়াস পেলাম।
শহীদুল­াহ এন্ড এসোসিয়েটসে দীর্ঘ সময় চাকুরী করায়, সমাজের অনেক নামিদামি লোকজনের সাথে পরিচিতি হই, অনেক গুনিজনের সংস্পর্শে আসি, এবং তাদের বাসস্থান অথবা ব্যবসা কেন্দ্র অথবা তাদের নানা বৈদ্যতিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ পাই । দীর্ঘ ১১ বছর ওখানে চাকুরী করার সুবাদে, ঢাকা এবং ঢাকার বাহিরের অনেক গুরত্বপুর্ন স্থাপনা ও ভবনের বৈদ্যতিক ডিজাইন ও নকশা করার সুযোগ হয়, নামিদামি, গুনিজনদের ভিতর উলে­খ্য,বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও লেখক আবদুল্লাহ আল মুতি শারফুদ্দিন, বিশিষ্ট গায়ক কলিম শারাফি, বুদ্ধিজীবি সারোয়ার জাহান, চিত্র নায়িকা শাবনুর, টিভি ব্যক্তিত্ব পীজুষ বন্দোপাধ্যায়, তাপোস পাল, সংসদ সদস্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি, ও আরো অনেক সরকারী আমলা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, এবং নাম না জানা বিশিষ্ট জন । টি.এস.এল থাকার সময় পরিচয় হয়েছিলো তার বাসার ডিজাইন এর ব্যাপারে বিশিষ্ট আনবিক বিজ্ঞানী ড.ওয়াজেদ মিয়া এর সঙ্গে । আমার বৈদ্যতিক ডিজাইন কৃত ভবন এর মধ্যে, দিলকুশায় ১১-তলা বি.এ.ডি. সি ভবন, নিকুঞ্জ এর পাশে আর.ই. বি এর প্রধান অফিস, ঢাকা ক্যান্টমমেন্ট এর সেনা সদর ভবন, বিমান বাহিনী হেড অফিস ভবন, মহাখালি তে ২২ তলা স্বাস্থ্য ও জন্ম নিয়ন্ত্রন ভবন (যা বাস্তব রুপ নেয় নাই), জাহাঙ্গীর নগর ইউনির্ভাসিটির একাডেমিক ভবন, চট্টগ্রাম ইউনিভার্সটির একাডেমিক ভবন ও প্রীতিকনা হল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন ইত্যাদি উলে­খযোগ্য । তাছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে ব্যাপি ১৬- পলিটেকনিক ইন্সটিউটিট ও ৪- ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রকল্পের সংস্কার কাজ, গার্লস গাইড ভবন, আকিজ ভবন এবং আকিজ গ্র“পের নওয়া পাড়া জুট মিল, ঢাকা টোবাকো ইত্যাদি গুরত্বপুর্ন ভবনের ডিজাইন নকশা ও কাজের তদারকি, দীর্ঘ সময় ব্যাপি করতে হয়েছে। শুধু লোকজনের সঙ্গে আলাপ আলোচনার অভিজ্ঞতা ছাড়াও, দীর্ঘদিন কোম্পানী সাথে জড়িত থাকার ফলে, বহু ধরনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার সমুখিন হতে হয়েছে, এমনিতেই কোম্পানীতে মেধা সম্পন্ন বিভিন্ন পেশাজীবির সমাহার ছিলো, তবুও শহিদুল্লাহ স্যারের মেধা ড. রশিদ স্যারের মতো স্পষ্টবাদি, বড় সোবহান সাহেবের মতো প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ছোট সোবাহান সাহেবের মতো তদারকি লোক সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব, লুৎফর রহমান সাহেবের মতো একনিষ্ট, বাক চার্তুয্য পুর্ন ব্যবহার, স্থাপত্য বিভাগের, রবিউল হুসাইন, হাদি ভাই এর মতো বহু গুনে গুনানিত স্থাপতিদের সমাহারে কোম্পানী ভরপুর ছিলো । তাই কোম্পানী যেমন একাগ্রতা নিষ্টা ও সৎ ভাবে প্রকল্প পরিচালনা করতো, তেমনি পুর্ত নির্মান কাজের জটিল সমাধান ও নির্মান কৌশল তদারকির সুক্ষ্য পর্যালোচনা দেশের ভিতর, অন্যতম প্রধান পরামর্শ দাতা কোম্পানী হিসাবে ব্যপক সুনাম অর্জন করেছিলো । সবাই এক নামে শহিদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েট কে চিনতো, এক কথায় কাজ দিতো, এমনি একটি কোম্পানীর সাথে নিজেকে জড়িত রাখায় এখনো আমি গর্বিত বোধ করি।
নামিদামি কোম্পানী হিসাবে যেমন খ্যাতি ছিলো, তেমনি অন্তঃদ্বন্দে ভরপুর ছিলো কোম্পানীটি, যেমন স্থাপত্য বিভাগের সাথে পুর্ত ডিজাইন বিভাগ, আবার পুর্ত ডিজাইন বিভাগের সাথে তদারকি বিভাগ, এমনি সব সময় খিটিমিটি লেগেই থাকতো । শহিদুল্লাহ স্যার যেমন সৎ ছিলেন তেমনি সৎ থেকে কোন বড় প্রকল্পের সরকারি কাজ পাওয়া সত্যি দুরুহ হতো, তাই বিভিন্ন পরিচালকের সাথে উনার মত বিরোধ ছিলো, কিন্ত উনাকে সবাই শ্রদ্ধা করতো, ভক্তি করতো, এবং ভয় করতো, কিন্তু তা দিয়ে তো এত বড় কোম্পানি চলে না, ফলে যা হওয়া তাই হলো, বিভিন্ন মতোনৈক্যর জন্য এক সময় কোম্পানীর প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়লো, আর্থিক দুরবস্থা শুরু হলো, কোম্পানী ভেঙ্গে শেষ হওয়ার উপক্রম হলো । শেষ অবধি শহিদুল্লাহ স্যারের এক মত, ঘুষ দিয়ে কাজ নেবো না তাতে কোম্পানী বন্ধ হয়ে যাক, কিন্তু অন্যান্য পরিচালকরা ভাবতো, এতো গুলো কর্মচারীর রুটি রুজি, হোক না কিছু পয়সা খরচ করে সরকারী বড় কোন প্রকল্প এর কাজ আনি । কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোম্পানি টিকলো না, ১৯৯৮ সালে আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য বেশির ভাগ কর্মচারীকে হয় চাকুরী চ্যুত করা হলো, অথবা বিনা বেতনে দীর্ঘ ছুটি দেওয়া হলো । এই অচল অবস্থার ভিতর শহিদুল্লাহ স্যার রিজাইন দিয়ে বসলেন, অন্যান্য পরিচালকরা ভাবলো এইতো সুযোগবলে শহিদুল্লাহ স্যারের খপ্পর হতে রাহু মুক্তির এই উপযুক্ত সময়। শহিদুল্লাহ স্যার তার কোম্পানীর গুড উইল ১কোটি ২০লাখ বিক্রি করে দিলেন এবং নিজে শহিদুল্লাহ এন্ড নিউ এসোসিয়েটস নামে নতুন কোম্পানী গঠন করলেন । অন্যান্য পরিচালকরা, পুরাতন শহিদুল্লাহ এসোসিয়েটস নিয়ে তৃপ্ত থাকতে চাইলেন, আর এই দুপক্ষের এই মন কষাকষির মাঝে বৈদ্যতিক বিভাগের, পরিচালক হিসাবে আমি নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রয়াসে, দীর্ঘ ছুটিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম ।
শহিদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটস এর যখন রমরমা অবস্থা, তখন সর্বসাকুল্য আমার বেতন মাসিক ১৫০০০ টাকা, ঐ টাকা থেকে সংসার খরচের পর কতই বা জমানো যায়, তবুও তিল তিল জল সমুদ্র অতল করে, আমার মিরপুর বাসার দোতলা বর্ধিত করার চেষ্টা করলাম। নিচতলার বাড়ি ভাড়া ও চারটি দোকান থেকে যা ভাড়া আসতো তাই, আর বেতনের টাকা থেকে কিছু কিছু করে সাশ্রয় করে, দোতলা নির্মানের দু বছর পর ১৯৮৯ সালে, তিন তলা, ১৯৯১ সালে বাকী অংশের এক তলা, ১৯৯৩ সালে তিনতলার উপর চার তলা, ১৯৯৫ সালে নতুন একতলার উপরে দোতলা, ও ১৯৯৭ সালে পুরা বাড়ীর চার তলা নির্মান কাজ শেষ হলো । ইতিমধ্যে আমার বেতন ১৯৯৪ সালে এক বার বেড়ে ১৮০০০ হয়েছিলো, এই বেতনের সাশ্রয় ও বাড়ি ভাড়ার টাকা থেকে, ধার দেনা করে বাড়িটার নির্মান কাজ শেষ পর্যন্ত শেষ হয়েছে, আমাদের বহু দিনের লালিত স্বপ্ন, বহু প্রতিক্ষার সম্পদ, বহু কষ্টের ধন, বহু ত্যাগ তিতিক্ষার পরিনাম, ঢাকায় নিজেদের মতো একটা আবাস স্থল, এই ভাবে তিলে তিলে গড়ে উঠেছিলো ।
১৯৯০ সালে ভালো ফল করে, ফারসিম এস এস সি পরীক্ষার পাস করার পর, তাকে আমরা ইচ্ছা করেই নটেরডেম কলেজে ভর্তি করালাম, বাসা থেকে অনেক দুর হলেও, যাতায়াতের অসুবিধা থাকলেও, যেখানে ছাত্র অসন্তোষ নাই, যেখানে দলাদলি রাজনীতি নাই, যেখানে সুশিক্ষার পরিবেশ আছে, ভালো ফলাফল করার সুযোগ আছে, ইত্যাদি ভেবে চিন্তে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম । হ্যাঁ ফারসিমের কষ্ট হতো, প্রতিদিন কাক ডাকা ভোরে উঠে মিরপুরের ১০ নম্বর হতে ডাবল ডেকার বাসে ঝুলতে ঝুলতে নটরডেম কলেজে যাওয়া, আবার প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা শেষ করে আবার বাসে করে ফিরতে ওর প্রতিদিনেই প্রায় সন্ধ্যা পার হয়ে যেতো ,আর তার মা ,সারাদিন একমাত্র সন্তানের মঙ্গল কামনা করে, গরম ভাত বেড়ে নিয়ে অপেক্ষা করতো । ফারসিম বাসায় ফিরে, খাওয়া দাওয়া সেরে, আবার অনেক রাত অবধি পড়াশুনা করতো, আর তার মা পাশে বসে কখনও বিনিদ্র রজনী যাপন করতো,কখনও বা ঘুমে ঢুলতো ,তবুও কখনও সন্তানকে শোয়ায়ে না দিয়ে নিজের ঘরে আসতো না। দুটি বছর এমনি প্রানান্ত পরিশ্রম, একাগ্রতা, নিয়মানুবর্তিতা, আর মায়ের আদর যত্ন, অনেক দুশ্চিন্তার অবসান ঘটিয়ে, ১৯৯২ সালে এইস এস সি পরীক্ষায় অবর্তীন হলো । তাছাড়াও এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে যাওয়া আসা, জামাল স্যারের কাছে অঙ্কের কোচিং, রেসিডেন্সসিয়াল মডেল স্কুলের রউফ স্যারের কাছে ফিজিক্সের কোচিং, আর তেজগাং কলেজের শহীদুল হক স্যারের কাছে কেমিস্ট্রি কোচিং, কখনও সোবাহান বাগ, কখন ও কলাবাগানে, আবার কখনও ইন্দিরা রোডে, কলেজের পড়াশুনা ফাকে ফাকে পরীক্ষার আগের দিন পর্যন্ত তাকে কোচিং করতে হয়েছে । যাতায়াত ব্যবস্থা, রিকসা, বাস,আর টেম্পু আর তো কোন গতি নাই। কারন তখনও আমি গাড়ি কিনতে পারি নাই, আমারও যাতায়াত চলছে ঐ একই পদ্ধতিতে ।
এরমধ্যে অল্প অল্প করে গাড়ি কেনার জন্য টাকা জমাচ্ছিলাম, গাড়ি কেনা, সে তো স্বপ্নের মতো ,তবুও স্বপ্ন দেখতে লাগলাম, ১৯৯২ সাল, সাধ আছে সাধ্য নাই, আশা আছে কিন্তু উপায় নাই, এই করে করে গাড়ি কেনার স্বপ্ন একদিন বাস্তব হলো । অনেক জায়গায় পুরাতন, সেকেন্ডহ্যান্ড বা রিকন্ডিশন ছোট গাড়ি খোঁজ করতে ছিলাম, টয়েটা স্কারলেট গাড়ির জন্য অনেক খোজাখুজি করেও ভালো গাড়ি ভালো দামের মধ্যে মেলাতে পারলাম না, মিতশুবিশু ল্যান্সার গাড়িও দেখলাম, পছন্দ হলো না। সবশেষে মতিনের খোজে থাকা বি.টি.সি এর ৫ বছরের পুরাতন, নিশান, সানি ১.০-এল.এক্স গাড়ির সন্ধান পেলাম । গাড়িগুলো ৫ বছর আগে নতুন কেনা, বি. টি. সি তাদের অফিসারদের ৫ বছর পর পর পুরাতন গাড়ির বদলে নতুন গাড়ি দেয়, ঐ সময় অফিসাররা ভালো কন্ডিশনে থাকা ৫ বছরের পুরাতন গাড়ি গুলো বিক্রি করে দেয়, মতিন খোঁজ খবর করে ৩টা গাড়ির সন্ধান দিলো, একটা সবুজ, লাল, এবং গ্রে কালার এর, অনেক পরীক্ষা নিরিক্ষা করে, দেখে শুনে , চিন্তা ভাবনা শেষে, গ্রে কালারের নিশান সানি ১.০-এল.এক্স গাড়িটি কিনে ফেললাম। রেজিস্ট্রেশন সহ দাম পড়লো, ২লাখ ৮৫ হাজার টাকা, গাড়িতে কিছু স্ক্রাচের দাগ থাকলেও, মনে হয় গাড়িটি ভালোই পেয়েছিলাম । ১২ই মার্চ গাড়িটি যখন কিনে, আমি আর ফারসিম যখন নিজে চালিয়ে বাসায় পৌছালাম, তখন হাসির চোখে আনন্দ অশ্র“,সে বিশ্বাসই করতে পারছিলো না, সত্যি আমরা ঢাকা শহরে একটি গাড়ির মালিক হতে পেরেছি, কিন্তু আমরা তিনটি প্রানী, প্রতেকেই জানি কত ত্যাগ তিতিক্ষার ফল এই গাড়িটি । গাড়ি কেনা হলেও ড্রাইভার রাখার সার্মথ্য ছিলো না, নিজেই চালাতাম, আমার অফিসে যাওয়া আসা, আর ছুটির দিনে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি বা শপিং যাওয়ার কাজটা চলতো, ফারসিমকে তখনও গাড়ি দেওয়া সম্ভব হয়নি ও আগের মতোই বাসে, টেম্পু ,রিকসায় চলাচল করতো ।
১৯৯২ সালের জুন মাস,ফারসিমের এর এইচ.এস. সি পরীক্ষা সিট পড়েছে, মগবাজারের সিদ্ধেশ্বরি ডিগ্রী কলেজে, পরীক্ষার কদিন, আমি গাড়িতে করে নিয়ে হাসি সহ ওকে পরীক্ষার হলে পৌছাঁতাম, পরীক্ষার শেষ না হওয়া পর্যন্ত হাসি বসে থাকতো, পরীক্ষা শেষ হলে আমি আবার গাড়িতে করে ওদের নিয়ে বাসায় পৌছাতাম । অনেক কষ্ট করে কেনা গাড়িতো, তাই খুবই যত্ন করতাম, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গাড়িটা নিজের হাতে মুছতাম, গাড়িতে একটু দাগ পড়লে মনে হতো বুকের ভিতর দাগটা পড়েছে । ফারসিমের এইচ.এস. সি পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট বের হওয়ার আগে পর্যন্ত ওকে আবার কোচিংএ ভর্তি হতে হলো, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার কোচিং, ফার্মগেটের ওমেকাতে, তিন মাস কঠোর কোচিং করলো, তারপর সানরাইজ কোচিং থেকে বেশ কয়েকটি মডেল টেষ্ট পরীক্ষা দিলো, মোটামুটি ভাবে সে ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষার জন্য এবং ঢাকা ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তির জন্য কঠোর প্রস্তুতি নিয়ে রাখলো । পাশাপাশি তাকে কম্পিউটার শেখার কোর্সেও ভর্তি করা হলো, তখন কার দিনে ওয়ার্ড প্রোগ্রাম, আর লোটাস ১ ২ ৩ শিখতে লাগলো। আগষ্ট মাসে এইচ. এস. সি এর ফল বের হওয়ার কথা, ফলাফলের দিন ফরসিম সকাল থেকেই ওর স্যার বোরহান সহ বোর্ড অফিসের সামনে উপস্থিত, বোরহান স্যার আর কেউ না, বুয়েটে আর্কিটেকচার পড়া একটি ছেলে, খুবেই অমায়িক, খুবে যত্ন করে ফারসিমকে এইচ.এস. সি পরীক্ষার আগে পর্যন্ত বাসায় এসে প্রাইভেট পড়াতো, পাশাপাশি ফারসিম কে খুব স্নেহ করতো, তাই তো ফলাফলের দিন, সে সহ বোর্ড অফিসে অপেক্ষায় আছে । আমরা বাসায় টেনশন করছি, দুপুরের দিকে টেলিফোন আসলো, জানা গেলো নটেরডেম কলেজ থেকে একজন পরীক্ষায় পঞ্চম হয়েছে,তার নামের প্রথম অক্ষর “ফ”, টেলিফোনটি করেছে নটেরডেম কলেজের ফয়সাল বলে একটি ছেলে, যে নিজেও খুব ভালো ছাত্র, সে মনে করেছে ফারসিম ৫ম হয়েছে, আমরা তো কিছুই জানি না, ফলে দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে গেলো, দুপুরের পর খবর আসলো ফারসিম স্টার মার্ক সহ প্রথম বিভাগে পাস করেছে, তবে প্রথম দশ জন এর ভিতরে তার নাম নাই । আসলে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিলো ফয়সাল নিজেই, পরে খোজ নিয়ে জানা গেলো ফারসিমের পজিশন ১৮ তম। যথা সময়ে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা এসে গেলো, যথারীতি যেদিন সে ভর্তি পরীক্ষা দিবে, সেদিন সকালে থেকে তার ভীষন জ্বর, খক খক করে কাশছে, এমনি অবস্থায় হাসি সহ তাকে নিয়ে বুয়েটে পরীক্ষার হলে পৌছালাম, ফারসিমকে পরীক্ষার হলে ঢুকিয়ে, হাসি অন্যান্যা মায়েদের মতো বুয়েট শহীদ মিনারের সামনে বসে রইলো, আর আমি চললাম আমার অফিস শহিদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটসর অফিস, জাহানারা গার্ডেন । পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমি আবার পরীক্ষার হল থেকে অসুস্থ ফারসিমকে বাসায় নিয়ে আসলাম, পরের তিন দিন আমাদের খুব টেনশনে কাটলো, ফারসিম বুয়েটে ভর্তি হতে পারবে তো ।
মুনিপুর স্কুলে পড়া পর্যন্ত ফারসিমের গতিবিধি বাসাএবং স্কুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো,আর এমনিতে ও খুব একটা বাহিরে যেতো না, কিন্তু এইচ.এস. সি পড়ার শুরু থেকে কলেজ, কোচিং, ইত্যাদি বাহিরে বাহিরে ওর সময় বেশি কাটতো, আস্তে আস্তে সে বাহিরের নতুন জগতকে দেখতে শিখল, এবং বই পড়ার ও বই কেনার প্রতি তার আগ্রহ ক্রমেই বেড়ে চলল, প্রথমদিকে ওর মা বই কিনে এনে দিলেও, পরের দিকে সে নিজেই বই কেনা কাটা শুরু করলো । এমনি করে বাহিরের নতুন জগত সর্ম্পকে জানতে জানতে সে বাংলাদেশ এস্ট্রনোমিকাল সোসাইটির সাথে জড়িত হয়ে পড়ল, এবং তাদের প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা মহাকাশের নিয়মিত গ্রাহক হয়ে গেলো এবং ঐ সোসাইটির মিলন ভাই বলে একজনের সাথে তার খুবই সখ্যতা হয়ে গেলো । মহাবিশ্ব এবং মহাকাশ সমন্ধে তার জানার কৌতহল বেড়ে গেলো, এবং আস্তে আস্তে সে নিজেকে ভবিষতের মহাকাশ বিজ্ঞানী হিসাবে ভাবতে শুরু করলো, এবং তার পড়াশুনার ক্ষেত্রেও তার মহাকাশ নিয়ে পড়াশুনার জন্য অদম্য ইচ্ছা পেয়ে বসলো, সবশেষে শেষে সে জানালো যে, সে ফিজিক্স নিয়ে পড়াশুনা করবে, এবং এস্ট্রনোমিকাল ফিজিক্স বা এস্ট্রো-ফিজিক্স তার একমাত্র আর্কষনীয় বিষয় হয়ে দাড়ালো । আমরা ওর পড়াশুনার বিষয় নিয়ে অন্য কিছু ভেবেছিলাম, যে ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশুনা করবে, ওর মা হাসি ভাবতো, ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিযারিং পড়বে, কিন্তু ওর ভাবসাব দেখে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়লাম, ওর মা ওকে বোঝাতে লাগলো, যে দেশে তো এস্ট্রো-ফিজিক্স বিষয় নাই, কিন্তু তার ইচ্ছা, সে দেশের বাহিরে থেকে এস্ট্রো ফিজিক্স পড়বে, এবং তা হতে হবে আমেরিকায়। আমরা ওকে বোঝাতে চাইলাম, যে আমেরিকার পড়াবার মতো সামর্থ্য আমাদের নাই, তার উপর আন্ডার গ্রাজুয়েট কোসের্, তোমার মত অল্প বয়সের ছেলেকে, একা একা আমরা বিদেশে পড়তে পাঠাবো না । কয়েকদিন পর সে আবার বাহনা নিয়ে আসলো যে, অল্প খরচে সাইপ্রাসে গিয়ে এস্ট্রো-ফিজিক্স পড়া যায়, তারপর আমেরিকায় কোর্স ট্রান্সফার করা যায়, এবার আমরা সত্যি প্রমাদ বুনলাম, ওর মা ওকে দিনে রাতে বোঝাতে লাগলো,দেশ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এ গ্রাজুয়েশন নেওয়ার পর বিদেশে যেকোন বিষয় নিয়ে পড়তে পারো, এমন কি এস্ট্রো-ফিজিক্সও । বহু চেষ্টার পর মনে হয় কাজ হলো, অবশেষে সে দেশে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে রাজি হলো, তখনকার সময় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর খুব চাহিদা ছিলো, আমি চেয়েছিলাম সে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুক, কিন্তু ফারসিম কিছুতেই রাজি হলো না, পরে জোর করার পরিবর্তে ওর মতামতকে প্রধান্য দিলাম যে, সে ইলেট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে ।
তাই বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় তার ফলাফল নিয়ে আমরা শঙ্কিত ছিলাম, তার উপরে আমাদের আস্থা ছিলো, যে সে বুয়েটে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে, কিন্তু কোন বিষয়ে পাবে এই নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিলো, অবশেষে ফল প্রকাশ পেয়ে গেলে দেখা গেলো, যে তার পজিশন ৫৭তম, এর মধ্যে প্রথম ৪০ জন অব্যশই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এ চলে যাবে, সুতারং তার ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে আর কোন বাধা রইলো না । যথাসময়ে মৌখিক পরীক্ষা ও মেডিকেল পরীক্ষা হয়ে গেলো, মেডিকেল পরীক্ষায় সামান্য অসুবিধা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সে বুয়েটে ভর্তি হলো । এতদিনে বুয়েটের ক্লাসও শুরু হয়ে গেলো, এখন সে যাতায়াত করে, বুয়েটের বাসে, সকাল ৮ টায়, মিরপুর ১নম্বর থেকে বুয়েটের বাসে উঠে, আর সুবিধা মতো সময়ে বুয়েটের বাসে ফিরে আসে, নিজেদের গাড়ি থাকলেও ড্রাইভারের অভাবে তাকে গাড়ি দেওয়া হতো না, মাঝে মাঝে বৃষ্টি, বাদল বা জরুরি সময়ে আমি তাকে গাড়ি করে বুয়েটে পৌছাতাম । সত্যিকার অর্থে আমি চেয়েছিলাম ও কষ্ট করতে শিখুক, একামাত্র সন্তান বলে, যা চাইতো তা আমরা কখন দিতাম না, সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম গ্রহন করেছে, এমন ধারনা তার যেনো না হয় । বুয়েটের প্রথম সেমেস্টার পরীক্ষায় সে অসাধারন ভালো ফল করলো, এক বারে সি.জি.পি.এ- ৩.৯৬, আমরা তো তাজ্জব বনে গেলাম, খুব আশাবাদি হলাম, কিন্ত পরের সেমেস্টারে, ম্যাথামেটিক্সে বি-প্লাস পেয়ে বসলো, ফলে তার সি.জি.পি.এ একাবারে কমে ৩.৬৪ হয়ে দাড়ালো, রীতিমতো চিন্তার বিষয়, বহু চেষ্টা করেও অঙ্কের শিক্ষককে পরীক্ষার খাতা পুনঃবিবেচনা করানো গেলো না, আসলে অঙ্কের স্যার, তার খাতা সঠিক ভাবে নিরীক্ষা করে ছিলো না, ফলে এই বিপত্তি । স্যারের সামান্য ভুলের জন্য, বা খামখেয়ালির জন্য, ছাত্রকে কতো কঠিন মুল্য দিতে হয় ,তার জাজ্জল্যমান প্রমান ফারসিম, পরের ৩ টি বছর ফারসিমকে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে, সি.জি.পি.এ বাড়ানোর জন্য, কারন সি.জি.পি.এ হঠাৎ করে বাড়ানো যায় না। প্রতি সেমেস্টাওে, প্রতি বছরে, বাড়াতে বাড়াতে শেষ পর্যন্ত ৮ম সেমেস্টারের তার সি.জি.পি.এ একটা সম্মান জনক অবস্থানে পৌছেছিলো। ১৯৯২ সালে বুয়েটে ভর্তি হয়েছে, পাস করে বেরানোর কথা ১৯৯৬ সালে, কিন্তু নানা ধরনের ছাত্র আন্দোলন, সেশন জট, অটো-ভ্যাকেশন নিতে নিতে তার কোর্স শেষ হলো ১৯৯৯ সালে । ফলাফল ভালোই হলো,ফাস্ট ক্লাস পাওয়া ৫০ জনের মধ্যে তার পজিশন ৮ম, সি.জি.পি.এ ৩.৮৯ এ দাড়ালো, আমাদের মন থেকে একটা চিন্তার বোঝা নেমে গেলো, কারন তখনকার সময়ে অব্যশই ফারসিম বিভাগীয় শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পাবে ।
মিরপুরের বাড়িতে উঠার কিছুদিন পরেই, কোন এক ঈদের ছুটিতে, আমরা চুয়াডাঙ্গায় গিয়েছিলাম, ফিরে এসে দেখি, মোহাম্মদপুরের বাড়িতে র্দুঘটনা ঘটে গেছে, ছুটিতে থাকার সময়ে আমার প্রতিপক্ষ, লুইস. এ .কোস্টা সাহেব, যিনি জি-৭ নম্বর বাসায় ভাড়াটিয়া হিসাবে থাকতেন, জি-৭ বাসার মালিক, জনাব আশরাফ সাহেব একজন মুসলমান, পেশায় স্কুটার ড্রাইভার, কি করে বাড়িটির মালিক হয়ে গিয়েছিলো জানি না । আপোশ মিমাংসার সময়, কয়েকবারই আশরাফ সাহেবের কাছে গেছি সাহায্যের জন্য, আমাকে সার্পোট করার জন্য, আমার অনুকুলে কথা বলার জন্য, জবাবে আশরাফ সাহেব বলেছেন, আপনি সরল মানুষ, খারাপ লোকের পাল­ায় পড়ে গোলযোগপুর্ন জায়গা কিনেছেন, তবুও আমার কাছে আগে আসলে সাহায্য করতাম, এখন কোস্টা সাহেব খ্রিস্টান হলেও আমার ভাড়াটিয়া, আমি তাকে কথা দিয়েছি যে, তাকে আমি সাহায্য করবো। দুঃখিত, বলে আমাকে বিদায় করলো । ঈদের ছুটির নিরিবিলিতে, সুযোগ পেয়ে, আশরাফ সাহেবের বাসার দেয়াল ভেঙ্গে, আমার কেনা জি-৬ বাসাটি দখল করেছে, আমার পাহারায় রাখা ড্রাইভার পরিবারকে বিতাড়িত করেছে, এবং বাড়িওয়ালি বুড়ির কাছ থেকে দলিল লিখিয়ে নিয়েছে । অনেকদিন ধরে কোস্টা সাহেব তক্কেতক্কে ছিলো, এবার সুবিধা পেয়ে, অল্প সময়ে, অনেকগুলো কাজ সমাধান করেছে, দৌড়ে গেলাম মোহাম্মদপুর থানায়, পুলিশ আসলো আমার পক্ষ হয়ে, ফেরার সময় গেলো ওদের পক্ষে সাফাই দিয়ে, পুলিশ আমাকে বললো, মামলার রায় নিয়ে আসুন, আমরা দখল দিয়ে দিবো । এখন ভাবতে লাগলাম কতো বড় বিপদে পড়ে গেছি আমি, ১৯৮০ সালে জায়গাটা কিনে এখন না জানি কোন মুল্য দিতে হয়, দৌড়ে গেলাম আমার ভাই খায়রুল হকের কাছে, ও কিছুদিন আগে লন্ডন থেকে ব্যারিষ্টারি পাস করে এসেছে, সব শুনে আমার উপর রাগ করলো, বোঝালো, বাড়ি ফিরে পেতে খুব কষ্ট হবে, এবং অনেক সময় লাগবে, তবুও বাড়ির দখল নিতে আমরা নতুন করে কোস্টা সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করলাম, সব রকম পরামর্শ, বুদ্ধি, দিয়ে সাহায্য করলেন খায়রুল হকের শ্বশুর সাহেব, সুবিখ্যাত এ্যাডভোকেট নুরুল হক সাহেব । নিম্ন আদালতে মামলা চলতে লাগলো দীর্ঘ ৭ বছর যাবত, মামলা মোকদ্দমা কাহাকে বলে, কতো প্রকার, হাড়ে হাড়ে টের পেলাম, এই ৭ বছরে মামলাটি অন্তত ৪ বার কোর্ট পরিবর্তন হয়েছে, শেষ পর্যন্ত শুনানি শুরু হয়েছে, আমার পক্ষে, মান্নান সাহেব, হাবিব সাহেব, আমার ছোট ভাইয়ের মতো জোহা সাহেব, আর এ্যাডভোকেট গোলাম আরশাদ, যে আমার অরিজিনাল দলিল, অর্থের বিনিময়ে আমার প্রতিপক্ষ লুইস এ কোস্টা সাহেবকে দিয়ে দিয়েছিলো । প্রতিপক্ষের পক্ষেও সাক্ষ্য দিলো, মহল­ার একজন প্রভাবশালি মুসলমান, একজন কসাই ও কোস্টারের স্ত্রী ।
১৯৯৪ সালে বিচারিক আদালতে প্রায় ৬ মাস ধরে শুনানির পর, বিজ্ঞ বিচারক জনাব ভি.পি সিংহ রায় দিলেন, আগে থেকে খায়রুল হককে বলেছিলাম, বিচারক সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের, কি করে বলা যায় না, প্রয়োজনে কিছু খরচ পাতি করতে হলো করো, খায়রুল হক হেসে বলল, না বিচারক সৎ আছে, মনে হয় কোন অসুবিধা হবে না, কিন্তু তা বাস্তবে হলো বিপরীত । সংখ্যালঘু স¤প্রদায় সব সময় সংখ্যালঘুদের পক্ষে কাজ করে, সত্য জিনিসটাকে, যুক্তি তর্কের বলে, মিথ্যা বলে প্রমানিত করে, এক্ষেত্রে হিন্দু বিচারক ভি.পি সিংহ, খ্রিষ্টান বিবাদি এর পক্ষে রায় দিয়ে দিলো, যা ছিলো সত্যর চরম অপলাপ, মিথ্যার বেশাতি, একজন মুসলমানের উপর বিধর্মিদের আক্রোশ । তবুও তারাই জীবনে প্রতিষ্টা পায়, বিচারক সাহেব জেলা জজ হিসাবে রিটায়ার করে, বর্তমানে হাইকোটের বিচারক হয়ে নিয়োগ পেয়েছেন, এবং সেটি আমার ভাই খায়রুল হকের হাত দিয়েই হয়েছে, কারন খায়রুল হক এখন, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি । নিম্ন আদালতে হেরে আমি প্রচন্ড ভাবে ভেঙ্গে পড়লাম, কিন্তু হাসি আমাকে শান্তনা দিয়ে, আমাকে বোঝাতে লাগলো, আমাদের শেষ ইচ্ছার কথা, জায়গাটি আল­াহর রাস্তায় দান করার কথা । খায়রুল হক, নিম্ন আদালতের মামলায় হেরে যেয়ে কেমন যেনো হোঁচট খেলো, মামলাটি হাইকোর্টে গড়ালো, অসম্ভব কম সময়ের ভিতরে সমস্ত ফরামালিটি শেষ করে, পেপার বুক বাইন্ডিং সেরে, ২ বছরের মাথায় মামলাটির শুনানির জন্য হাইকোর্টে নিদিষ্ট হলো। এবার হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে, বিচারক জাস্টিস রুহুল আমিন এবং জাস্টিস আমিনুল ইসলাম, আমার পক্ষে সিনিয়র এ্যাডভোকেট ডঃ জহির, আর প্রতিপক্ষের বিজ্ঞ এ্যাডভোকেট এ.সি পাল, যার প্রতিটি শব্দের জন্য অর্থ গুনতে হয়, যিনি হ্যাঁ করলেই তার ফি ২০ হাজার টাকা, খুবই বয়স্ক সামনের পাটির অনেক দাঁত নাই । যথাসময়ে উভয়পক্ষের শুনানি শেষ হলো, অল্প দিনের ভিতরেই রায় হয়ে গেলো, জাস্টিস সাহেব রায় দিলেন আমার পক্ষে, আর্থাৎ বাড়িটির মালিক মিসেস হোসনের আরা মান্নান, যুক্তি, আমার বায়নানামা আগে, আমার পক্ষের দলিল আগে করা, প্রতিপক্ষের বায়নানামা পরের তারিখের, এবং এ বায়নানামার প্রত্যেকটা পৃষ্ঠা জাল, বিভিন্ন রেজিস্ট্রিঅফিস থেকে বিভিন্ন সময়ে কেনা, দলিলের সাক্ষর জাল, জাস্টিস সাহেব উলে­খ করলেন, স্বাক্ষরের জায়গায় প্রথমে কাটা কম্পাস দিয়ে ট্রেসিং করে, পরে কালি দিয়ে স্বাক্ষর শেষ করা হয়েছে, প্রতিপক্ষের দলিল, আমার দলিলের ৭ বছর পর, কোনটিই বিচারের আমলে পড়ে না । অসাধ্য সাধন হয়ে গেলো, যা কিছু হলো, তা ব্যারিস্টার খায়রুল হকের একাগ্রতায়, ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং একান্ত জেদের ফলে ।
হাইকোর্টে হেরে যেয়েও, প্রতিপক্ষ ক্ষান্ত হলো না, কেস নিয়ে তুললো সুপ্রিম কোর্টে এ্যাফিলিয়েট ডিভিশনে, বছর খানেক এর মাথায়, আবার সুপ্রিমকোর্টের অধীনে শুনানি শুরু হলো এবার প্রধান বিচারপতি সহ ফুল বেঞ্চের উপস্থিতিতে, বিচারকগন যেমন প্রধান বিচারপতি এ টি এম আফজাল, বিচারপতি মোস্তফা কামাল, বিচারপতি আব্দুল রউফ, বিচারপতি বি বি রায় চৌধুরী, এবং বিচারপতি বিমলেন্দু রায় । ফুল কোর্টে শুনানিতে প্রতি পক্ষের বিজ্ঞ এ্যাডভোকেট ফজলুল করিম সাহেব উপস্থাপন করলেন, ব্যারিস্টার খায়রুল হক কি যেনো বলতো চাচ্চিলো, বিচারপতি মোস্তফা কামাল বলল, আমরা লীভ দিতে চাচ্ছি না, আপনি আবার কেন কথা বলতে চাচ্ছেন, সুপ্রিম কোর্টে মামলা খারিজ হয়ে গেলো । কিন্তু তারপরেও আমার প্রতিপক্ষ থেমে থাকলো না, রিভিউ পিটিশন করলো কিন্তু ৬ মাসের মাথায় রিভিউ পিটিশনও খারিজ হয়ে গেলো, অর্থাৎ দেশের সর্বোচ্চ আদালত হতে জি-৬, জাকির হোসন রোড, মোহাম্মদপুর এর জায়গাটির মালিকানা, সর্ম্পুনভাবে মিসেস হোসনেআরা মান্নানকে দেওয়া হলো । পরদিনই আমরা ছুটলাম নিম্ন আদালতে, দখলের মামলা রুজ্জু করতে, মামলা হলো, ৬ মাসের ধরে বিভিন্ন তারিখ পড়ে, আমার পক্ষে দখলের রায় দেওয়া হলো, আমি কোর্টের মারফত দখল চাইলাম, সমস্ত ব্যবস্থাপনা ঠিক হলো, পরের দিন দখল দেওয়া হবে, কোর্ট থেকে সেরস্তাদার ,নাজির ,পাইক ,পিয়াদা যাবে, দাঙ্গা পুলিশ বিভাগ হতে এক ট্রাক পুলিশের ব্যবস্থা করা হলো, মোহাম্মদপুর থানায় বেশ কিছু খরচপাতি করা হলো, রাতে জাকির হোসেন রোড এলাকা তেও লোকজন রাখার জন্য বলা হলো, সব কিছুর ব্যবস্থা সম্পন্ন । হঠাৎ রাত ৯টায়, এ্যাডভোকেট খসরু আমাকে জানালো, যে কোর্টের রায় স্থগিত হয়ে গেছে, সন্ধ্যা ৬ টায় হঠাৎ করে বিচারক সাহেব কেসের রায় স্থগিত করার নির্দেশ দেন, আমার সমস্ত ব্যবস্থা পন্ড হয়ে গেলো । আবার ছুটলাম নিম্ন আদালতে, খবর নিয়ে জানলাম কোস্টা সাহেব, অর্থের বিনিময়ে কাজটা করিয়েছে, বিভিন্ন ভাবে খবর নিয়ে, বিচারক সাহেবের নাম, ঠিকানা, যোগাড় করলাম মাস খানেক পর, বিচারক সাহেবের শহীদ বাগের বাসায়, আমি ও হাসি যেয়ে উপস্থিত হলাম, এইভাবে কোন বিচারকের বাসায়, কোন বাদি যায় কিনা, আমাদের জানা ছিলো না, তবুও মানবিক দিক বিবেচনা করে, বিচারককে সত্য উদঘাটন করার জন্য, আমাদের এছাড়া কোন উপায় ছিলো না । বিস্তারিত সব কিছু বিচারক সাহেবকে জানালাম উনি ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন এবং সত্যের সন্ধানে আমাদের আলোচনা উপলব্দি করলেন এবং ্আমাদেরকে আশ্বস্ত করলেন, এক মাসে পর আবার তারিখ পড়লো, এবারও কোস্টা সাহেবের দৌড় ঝাপ শুরু হয়ে গেলো, কিন্তু আমরা বিচারকের দৃষ্টির সামনে সব সময় উপস্থিত থাকাতে, কোস্টার সাহেবের সমস্ত চাল ভেস্তে গেলো রায় আবার আমাদের পক্ষে হলো, কোর্ট আমাদেরকে দখল দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলো। আমি আর জাহিদুল কোর্ট বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত পাহারায় থাকলাম, যেনো রাতের অন্ধকারে কোস্টা সাহেব আবার কিছু অঘটন করে না বসে ।
১৯৯৮ সাল, ২৮শে মে, আমার জীবনের স্মরনীয় দিন, ঐ দিন র্কোট থেকে জি-৬ জাকির হোসেন রোডের দখল দেওয়া হবে, আগের দিন বিকালে কোর্টের সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করে এসেছি, এবার আমাদের পক্ষের উকিল এ্যাডভোকেট হোসনে আরা, খায়রুল হক ততোদিনে হাইকোর্টের বিচারক হয়ে গেছে, সে সামনে থেকে কিছু না করতে পাললেও এ্যাডভোকেট সাহেবাকে পরামর্শ দিয়ে যা করার করছে । নির্দিষ্ট দিনে আবার ট্রাক ভর্তি দাঙ্গা পুলিশের ব্যবস্থা, মোহাম্মদপুর থানা থেকে সার্পোট পাওয়ার ব্যবস্থা, স্থানীয় সিরাজ মামা ও অন্যান্য দের সাথে কথা বলে নেওয়া, ভাঙ্গচুর করার কাজে নিয়োগ করার জন্য ১০জন লোকের ব্যবস্থা করা, মারামারি শুরু হলে তা ঠেকানোর জন্য প্রায় ১০ জনের মতো মাস্তান বাহিনী, জি-৬ এর চারপাশে মোতায়েন করা হয়েছে । যথা সময়ে মোহাম্মদপুর থানার এস আই মোটর সাইকেল নিয়ে, তার পিছে পিক-আপে আমি ও আমার সঙ্গবদ্ধ দল নিয়ে, তার পিছে এক ট্রাক দাঙ্গা পুলিশ সহ যেনো যুদ্ধ যাত্রা করছি এমন সারিবদ্ধ ভাবে জায়গা দখল করার বাহিনী, জি-৬ এর সামনে এসে দাড়ালো। চারিদিকে থমথমে ভাব, বাসার সামনে মাঠের চারিপাশের দালানগুলি থেকে হাজারও লোকের উৎসুক দৃষ্টি, আর আমাদের বাহিনীর সাজ সাজ রব, সব নিয়ে যেনো পরিবেশটা ভয়ংকর হয়ে উঠলো । কোর্টের সেরেস্তারদার, কোর্টের কাগজপত্র নিয়ে দখলের কথা ঘোষনা করতে গেলে, কোস্টা সাহেব বাধা দিলো, পুলিশ বাহিনীকে একশন নিতে বললে তারা আমার কাছে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে বসলো, আমার তখন সবকিছুতেই রাজি থাকা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না, ফলে পুলিশ রেডি হলো,কোস্টা পরিবার বাড়ির দরজা ভিতর থেকে বন্ধ কওে, দরজার পাশে টেবিলের উপরে দুটো বটি নিয়ে দাড়িয়ে আছে। কেউ এগুলেই কোপ দিবে এমনি অবস্থায়, পুলিশ এবং কোষ্টাপক্ষের ভিতরে মারামারি বেধে যাওয়ার উপক্রম হলো, পুলিশ ভয় পাচ্ছিলো মহিলাদেরকে নিয়ে, কারন কোন মহিলা পুলিশ ছিলো না । স্থানীয় ১০ নং প্লটের মালিক লিপটন সাহেব ব্যাপারটা বুঝতে চাইলে কোস্টার সাহেবের সাথে ঝগড়া বেধে যায়, এমনি অবস্থায় হঠাৎ করে ঝম ঝম করে তুমুল বৃষ্টি নেমে গেলো, যে যার মতো আশ্রয় নিলো, কোস্টা সাহেব কোর্টের লোকদেরকে নিয়ে, ৫ নম্বর প্লটের ড্রয়িংরুমে আশ্রায় নিলো, এবং কোর্টের লোকদেরকে ৫০হাজার টাকা নগদ দিয়ে বাড়ি দখলের কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য শেষ ছোবল দিলো এবং নানাভাবে তাদেরকে রাজি করানোর চেষ্টা করতে লাগলো । প্রায় ৩ ঘন্টা এক নাগাড়ে বৃষ্টির পর, বৃষ্টি থামলো, আমি জি-৯ বাসায় অপেক্ষারত হাসির সঙ্গের দেখা করতে গেলাম, দেখলাম হাসিও খুব উদ্বিগ্ন, অনাবরত দোয়া পড়ছে, আমাকে শান্তনা দিলো, আমি আবার জি-৬ এর সামনে ফিরে এসে দেখি, খ্রিষ্টান চার্চের ইটালিয়ান ফাদার এসেছে, আমাকে অনুরোধ করলো, সময় দেওয়ার জন্য, আমি কোর্টের লোকদেরকে দেখিয়ে দিলাম, কোর্টের লোকরা তখন অন্য বুদ্ধি করলো, তারা বললো আজকে একটা ঘরের দখল দেওয়ার জন্য, কি জানি কি হলো, কোস্টা রাজি হয়ে গেলো, আমরা বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়লাম, আমার লোকজন একটা ঘর খালি করার জন্য কোস্টাকে সাহায্য করতে লাগলো, আর আমি কয়েকজনকে নির্দেশ দিলাম, ঠেলাগাড়ি আনতে, আর সবাইকে নির্দেশ দিলাম, যে যেভাবে পারে বাড়ির জিনিমপত্র খালি করতে, কথাটায় একটু কাজ হলো, আমার আতœীয়, সাইফুল সহ লালমাটিয়ার কিছু ছেলে,ও আমার আনা লোকজন, সম্মিলিত ভাবে এক ঘন্টার ভিতরে সমস্ত মালামাল বাহিরে এনে রাখলো, কিছু ঠেলাগাড়িতে তুললো। আমি কোস্টা সাহেবকে বললাম, যা পারেন এখুনি খুলে নিয়ে যান, পরে আর এখানে ঢুকতে পারবেন না । বিকাল ৫টার ভিতর বাড়ির মালামাল খালি হয়ে গেলো, র্কোটের লোকজন আমাকে দখল দেওয়ার ঘোষনা দিলো, উপস্থিত জনগনের ভিতর হতে সাক্ষী হিসাবে কেউ কেউ স্বাক্ষর দিলো, পুলিশের সাক্ষ্যও নিলো, আমার সাক্ষ্য ও নিলো এবং আমাকে দখল দিয়ে কোর্টের লোকগুলো চলে গেলো। পুলিশ ও তাদের পাওনা বুঝে নিয়ে চলে গেলো, আমার লোকজনও আস্তে আস্তে বিদায় হলো,ড্রাইভার মুনির হোসেনকে পাঠালাম একটা চৌকি কেনার জন্য, রাততো কাটাতে হবে এখানে, হাসি তার সঙ্গে আনা দুজন মহিলাকে নিয়ে বাসায় প্রবেশ করলো, এতোদিনের বেদখল থাকা বাড়িটি এতোদিনে আমাদের দখলে আসলো, এই একদিনের মধ্যে আমার নগদ ৯৫০০০ টাকা খরচ হয়ে গেলো । এতোদিনে একটা অভিশাপ মোচন হলো, কত বিনিদ্র রজনি কেটেছে আমাদের, কতো ছুটাছুটি, কোর্ট কাচারি করতে হয়েছে আমাদের, অবশেষে সকল দুশ্চিন্তা, শত পেরেশানি, ১৮ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল আজকে পাওয়া গেলো, মনে হলো সামান্য একটা মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার জন্য আমাদের এই শাস্তি, তাই এখনও ভাবি এটা ছিলো আমার জীবনের প্রচন্ড বড় ভুলের এক নম্বর ভুল ।
এই সময় দেশের অবস্থা, আওয়ামীলীগ সরকার দেশ চালাচ্ছে ১৯৯৬ সাল হতে, এর আগে ১৫ বছর কেটেছে দেশের চরম অনিশ্চয়তা এবং অস্থিতিশীল অবস্থায়, প্রথম সামরিক শাসন ও পরে জাতীয় পার্টি গঠন করে, একনায়কতন্ত্র স্টাইলে দেশ চালিয়েছেন জেনারেল এরশাদ সেই ১৯৮২ সাল থেকে, দেশ হয়ে পড়েছে দুর্নীতির আখড়া, অরাজকতার আসর । ১৯৮৫ সাল থেকে দেশে আন্দোলন শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগ ও বি.এন. পি, একমত না হওয়া আন্দোলন দানা বেধে উঠতে পারে নাই, ১৯৮৮ সালের প্রলংকারী বন্যার পর, মানুষের মন বিষিয়ে উঠছে বর্তমান সরকারের উপর, প্রবল জন আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন হয় এবং তিনি কোনরকমের পালিয়ে বাঁচেন জনরোষের হাত থেকে । বিচারপতি শাহবুদ্দিন এর অধীনে শুরু হয় অস্থায়ী সরকার, নির্বাচন হয়, বি.এন. পি সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায়, সরকার গঠন করে, এর পরের পাঁচ বছর বি.এন. পি এর শাসন আমল, এখনও সেই একই অবস্থা বিরাজমান, সেই দুর্নীতি, সেই অস্থিরতা, সেই অচলঅবস্থা। আওয়ামী লীগ, বি.এন. পি এর ৫ বছরের শাসন আমলকে একদিনের জন্য শান্তিতে থাকতে দেয় নাই। আন্দোলনের পর আন্দোলন, একবারে মহা আন্দোলন করে, জনতার মঞ্চ স্থাপন করে, বি.এন. পি কে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে, বি.এন. পি ও কম যায় না, এত আন্দোলনের মুখেও একতরফা, একদলীয় নির্বাচন করে, সরকার গঠন এর প্রক্রিয়া পাকাপোক্ত করতে চায় । সুদীর্ঘ পাচঁ বছর এর অধিকাংস সময় সংসদ বর্জন করে, আওয়ামী লীগ দেখায় তাদেরও জনসমর্থন আছে । অবশেষে বি.এন. পি বাধ্য হয়, তত্তাবধায়ক সরকারের প্রচলন করতে, এবং নতুন করে নির্বাচন দিতে । রাজনীতির এই দাবা খেলায়, দেশের মানুষ শান্তিতে ছিলো না, চালের দর ১০ টাকা কেজি হলেও, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বেড়েই চলছিলো, দুর্নীতির অবস্থা তো রমরমা অবস্থা, এমনি অবস্থায় নতুন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করলো । চলল ২০০১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের আওয়ামী লীগের শাসন কাল, দেশ চলছে একই কায়দায়, মুদ্রার এপিঠ আর ও পিঠ, চললো আওয়ামী লীগের দুর্নীতি সমানতালে, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, সরকার পরিবর্তন হলেও দেশের লোক শান্তি পেলো না, চাঁদাবাজিতে পাড়া, মহল­া, দেশ ছেয়ে গেলো, দুর্নীতিতে, আওয়ামী লীগে বাংলাদেশকে বিশ্বের এক নম্বর স্থানে তুললো , চালের দর তখন দেশে ১২টাকা কেজি । ২০০১ সালে আবার তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলো, দেশের মানুষ এবার ও ভুল করলো না, বি.এন. পি কে ভোট দিয়ে জয়ী করলো, বি.এন. পি জামায়াত জোট সরকার গঠন করলো, কিন্তু দেশের যা অবস্থা তাই থাকলো, একই ভাবে আওয়ামীলীগ সংসদ বর্জন, হরতাল, আন্দোলন করে দেশকে মাতিয়ে রাখলো, সত্যিকার ভাবে দেশের কোন উন্নতি হলো না, দুর্নীতিতে আবার দেশ ছেয়ে গেলো, হাওয়া ভবন, আর অদৃশ্য ক্ষমতার চাপে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার চরম অবনতি হলো, এই ভাবে দেশ চললো ২০০৬ সাল পর্যš,— দেশে তখন চালের কেজি ১৬ টাকা ।
আমার চাকুরী, শহীদুল­াহ এন্ড এসোসিয়েটস থেকে ছুটিতে আছি, ভাবছি নিজে কিছু একটা করবো ,যেহেতু কাজ জানি, তাই ভাবছি নতুন কনসাল্টিং ফার্ম খুলে নিজেই স্বাধীন ভাবে ব্যবসা শুরু করবো, সঙ্গে ডেকে নিলাম আমার সহকারী ইকবাল সাহেবকে, পরিকল্পনা চলছে, নতুন অফিস নেবার, নতুন কাজ খোঁজার । এমনি সময় হঠাৎ করে আমার এক শুভাকাঙ্খি, কাজী আমিনুর রহমান সাহেব আমাকে টেলিফোন করে বললেন, মান্নান, চাকুরী করবেন, মিরপুর এলাকায় নতুন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ডেসকো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বেতন পাবেন ৩৫ হাজার টাকা, সঙ্গে সার্বক্ষনিক গাড়ি, মনের ,অগোচরে আমি বলে ফেললাম, হ্যাঁ, স্যার করবো, পরে ছুটলাম উনার অফিসে উত্তরায়। দেখা হলে উনি বললেন, উনার এক আতœীয় ডেসকো এর অধীনে পরিচালনা ও সংরক্ষনের কাজ পেয়েছে, ঠিকাদারী প্রতিষ্টান হিসাবে, আমি রাজি থাকলে, ঐ কোম্পানির সর্বোসর্বা হয়ে কাজ চালাতে হবে, অফিস আমার বাসার একদম কাছে, সন্ধ্যায় দেখা করলাম নতুন কোম্পানি ম্যাক্রোহান্টস এর হেড অফিস, নিউ এলিফ্যান্ট রোডে, মালিক, কাজী মাহাবুর রহমান, একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার । কাজী সাহেবের সাথে আলোচনা সফল হলো, আমি রাজি হয়ে গেলাম, এক সপ্তাহ সময় নিলাম কাজে যোগদানের জন্য । কোথা থেকে কি হয়ে গেলো, পড়ে রইলো আমার স্বাধীন ভাবে নিজের ব্যবসা করা, ঢেকিতে উঠল আমার নতুন কনসাল্টিং ফার্ম, পড়ে রইলো আমার নিজের কোম্পানীর মালিক হওয়ায়, সব কিছু কেমন জানি উলটপালট হয়ে গেলো, হাসি কোনভাবেই চাচ্ছিলো না আমি আবার চাকুরী করি, তার ইচ্ছা আমি স্বাধীন ভাবে নিজের কোম্পানিতে কাজ করি । আমি দেখলাম চরম অনিশ্চয়তা, নতুন কোম্পানি খুলে, নতুন কাজ পেয়ে তা সম্পুর্ন করে বিল পেতে পেতে এবং স্বাবলম্বি হতে সময় লাগবে প্রায় এক বছর, তাই রেডিমেড ভালো চাকুরীর হাতছানি, বিশেষ করে ভালো বেতনের লোভ, নিজস্ব সার্বক্ষনিক গাড়ি আমাকে আবার চাকুরী পথে নিয়ে এলো । গাড়ির কথা বলতে গেলে, আমাদের নিজস্ব গাড়ি তো ছিলো তারপর পাঁচ বছর হয়ে যাওয়ায়, পুরাতন নিশান সানি গাড়িটি বিক্রি করে, নতুন রিকন্ডিশন গাড়ির কেনার কথা চিন্তা ভাবনা চলছিলো, এরমধ্যে শহীদুল­াহ স্যার, কোম্পানী থেকে আমার ব্যাক্তিগত গাড়ির জন্য একজন ড্রাইভার দিয়ে ছিলো, সংসারে কিছুটা সচ্ছলতা এসেছিলো, তারপর শহীদুল­াহ স্যার, নতুন গাড়ি কেনার জন্য কিছু লোন দিতে চাইলো, তাই আর দেরি না করে ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় কেনা, নিশান সানি গাড়ি পাঁচ বছর ব্যবহারের পর, ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিলাম । কয়েকদিন ঘোরাঘোরি করার পর, ১৯৯৩ মডেলের টয়োটা এল .এক্স রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ৪ লাখ ৭০ হাজার দিয়ে এবং রেজিস্ট্রেশন সহ ৫ লাখ ৫ হাজার টাকায় কিনে ফেললাম, তাই ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য কোন অসুবিধা ছিলো না ।
আমার ম্যক্রহ্যান্টস এর চাকুরী ১৯৯৮ সালের ২৭শে সেপ্টম্বর হতে শুরু হলো, অফিস আমার বাসা থেকে মাত্র ৫০০গজ দুরে, আমার পদবি এক্সকিউটিভ ডাইরেক্টর, কাজ নব প্রতিষ্ঠিত ডেসকো এর আওতায়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংরক্ষন করা ও ট্রাবল শুট্যিং ও কমপ্লেন এটেনডিং এর জন্য গ্যাঙ এর ব্যবস্থা করা, আমার জন্য কাজটি খুবেই সহজ, লোকজনের ম্যানেজমেন্ট করা আর দুটি সাব স্টেশনের সংরক্ষনের কাজ দেখাশুনা করা, মোটামুটি নিশ্চিন্তে, নিরুপদ্রবে, তিনটি বছর এখানে ভালোভাবে কেটে গেলো, সকালে নাস্তা করে অফিসে আসতাম, কাজ ও লোকজন ম্যানেজ করে গাড়ি নিয়ে সাইট পরিদর্শন করতাম, দুপুরে বাসায় লাঞ্চ করতাম, আবার বিকাল ৪টায় অফিসে আসতাম, ৭ টা পর্যন্ত অফিস সেরে বাসা ফিরতাম, ঝামেলাহীন চাকুরী, মাস গেলে মাসিক কাজের বিল ডেসকোতে সাবমিট করে, ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকার চেক নিয়ে, হেড অফিসে পৌছিয়ে দিতাম । সারামাসে আমার ও লোকজনের বেতন, গাড়ির পেট্রোল খরচ, অফিস ভাড়া ,সর্বসাকুলে খরচ হতো ৭ লাখ টাকার মতো, প্রতি মাসের ৭ তারিখের ভিতরে আমার লোকজনের সমস্ত বেতন দেনা পাওনা পরিশোধ করতাম। আর ডেসকো অফিসেও আমার একটা সম্মান ছিলো, তাই সম্মান নিয়ে সাচ্ছলতায় তিনটা বছর, র্নিভাবনায় এখানে কাটাতে পেরেছিলাম । চাকুরীতে ভালো মাসিক বেতন থাকায়, বেশ কিছু টাকা সশ্রয় হচ্ছিল, তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম মোহাম্মদপুরের, জাকির হোসেন বাড়ির নির্মান কাজ শুরু করা, যথারীতি প্লান তৈরী করা হলো, রাজউক থেকে প্লান পাস করা হলো, এবং ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে নির্মান কাজ শুরু করলাম । প্রাথমিক ভাবে পুরাতন বাড়ি ভেঙ্গে ফেলে, নকশা অনুযায়ি নতুন বাড়ির কাজ শুরু করা হলো, আমার এই কাজের জন্য সার্বক্ষনিক ভাবে জাহিদুলকে আমার কাছে নিয়ে আসলাম, জাহিদুল, হাসির মামাতো ভাই,ঢাকাতে থাকে, মার্স্টাস শেষ করে বর্তমান বেকার, তাই আমার সাহায্যের জন্য তাকে পেয়ে আমার বেশ সুবিধা হলো ।
ছয় তলা বাড়ির ফাউন্ডশন দিয়ে কাজ শুরু হলো, প্রাথমিক ভাবে আমার অনেক বাধা বিপত্তি ও সমস্যার সমুখিন হতে হলো, তবুও সবকিছু কাটিয়ে ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে, বাড়ির ৩তলা পর্যন্ত শেষ করতে পারলাম, নির্মান সামগ্রী দাম দিন দিন বেড়েই চলছে, তাই কোন ব্যাংক লোন ছাড়া ,নিজের খরচে এবং কিছু নির্মান সামগ্রী লোনে কিনে বাড়িটার নির্মান আংশিক শেষ করতে পেরেছিলাম । প্রথমে আমাদের নিয়াত অনুযায়ি, নিচতলা আল­াহর ওয়াস্তে আল­ার কাজের জন্য নির্দিষ্ট করে, একটি ছোট মসজিদ, ও মেয়েদের জন্য একটি এবাদত খানা, তার সাথে দুটো টয়লেট, কেয়ারটেকার এর ঘর ,সামন্য পার্কিং ব্যবস্থা রেখে একতলার কাজ শেষ হলো এবং ১৯৯৯ সালের জুন মাস থেকে খানকাহশরিফের কার্যক্রম শুরু হলো । ৩ তলার ছাদে একটা টিনসেড করে বাড়ি দখল করার সময় যে লোকটি আমাকে সাহায্য করেছিলো, সিরাজ মামার আত্মীয় হান্নানকে তার পরিবার নিয়ে থাকার জন্য একটি ঘর ও জাহিদুলের থাকার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা রেখে আপাতত বাড়ির কাজ শেষ হলো। দোতলায় এবং তিনতলায় ভাড়া দেওয়া হলো, ভাড়া থেকে যা পাওয়া যায়, তাই দিয়ে খানকাহশরিফ ও এবাদত খানার খরচ চলে, আর নির্মানের সময় বিভিন্ন নির্মান সামগ্রী কেনার জন্য নেওয়া লোন, শোধ করা হয় । এভাবে আমাদের বহু দিনের স্বপ্ন, খানকাহশরিফ, এবাদত খানা, কোরআন শিখার স্থান, খানকাহ এ কামিসিয়া, হাসির একান্ত চিন্তার ফসল, স্বপ্নের বাস্তব পরিনতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হলো, এবং কেয়ামতের দিন পর্যন্ত আল­াহর এই ঘর সংরক্ষিত থাকবে, জারি থাকবে আল্লাহর কালাম, এই কামনায় আমরা স্বস্তি পেলাম।
খানকাহশরিফ প্রতিষ্ঠার পর, মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াবার জন্য, একজন হাফেজ সাহেব নিযুক্ত করা হলো, এবাদত খানা পরিচালনা করার জন্য হাসি, সাইদা আপা বলে একজন সংসার ত্যাগী ,আমল কারি, একজন মহিলাকে যোগাড় করে নিয়ে আসলো। প্রথম বছর খানকাহশরিফ এর কার্যক্রম এর ভিতর,ছোট ছোট বাচ্চাদের কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা হলো, প্রাথমিক ভাবে ১০জন ছোট ছেলেমেয়েকে খানকাহশরিফে রেখে, কোরআন শরিফ শেষ পর্যন্ত পড়িয়ে, খতম করিয়ে কার্যক্রম শেষ হলো, দ্বিতীয় ব্যাচ ও এই ভাবে শেষ করা গেলো, কিন্ত তারপর আর কোরআন শরিফ শেখানোর মতো আর কোন ছোট ছেলেমেয়ে পাওয়া গেলো না । তবুও মসজিদ, এবাদত, খানা নানা ঘাত প্রতিঘাত, প্রতিকুল অবস্থার ভিতর দিয়ে চলতে লাগলো, খানকাহ শরিফটি হয়ে পড়লো হাসির জান, প্রান, একান্ত প্রিয় স্থানে, সে মিরপুরে বাসায় থেকেও সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার খানকাহশরিফে সে সারা রাত কাটাতো রাত জেগে এবাদত করতো, এবং সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতো । শত বাধা বিপত্তি, প্রতিকুল পরিবেশ, ঝড়, বৃষ্টি ,হরতাল, স্ট্রাইক এর ভিতরেএ সোমবার এবং বৃহস্পতিবার হাসিকে খানকাহশরিফ যাওয়া থেকে বিরত করা যেত না, মনে প্রানে সে খানকাহশরিফকে ভালো বাসতো, একান্ত এবাদতে নিবিষ্ট হয়ে যাওয়ার নিরিবিলি স্থান হিসাবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে খানকাহশরিফের খেদমত করে গেছে । ২০০৩ সাল নাগাদ, জি-৬ ,জাকির হোসেন রোড এইভাবে চলার পর, আবার হাতে কিছু অর্থের সাশ্রয় হলো, তাই ২০০৩ সালে আবার জি-৬ এর নির্মান কাজ শুরু করলাম, এবং এক বছর সময়ের মধ্যে বাকি তিন তলা শেষ করে, ছয় তলার ছাদে জাহিদুলের পরিবার নিয়ে থাকার জন্য একটা আবাসনের ব্যবস্থা রেখে, জি-৬ ,ছয়তলা ভবনের কাজ শেষ হলো এবং পরের বছরের ভবনের ফিনিশিং এর কাজ শেষ করা গেলো, তারপর থেকে নিচতলা বাদে, বাকী সব ফ্লোর গুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে, ভাড়া থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে খানকাহশরিফ এর খরচ চলে, বাড়িটির রক্ষনাবেক্ষন এর খরচ চলে, আরও কিছু জনহিতকর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য খরচ নির্বাহ করা হয় । খানকাহশরিফ প্রতিষ্ঠার পর থেকে, আরবি মাসের শেষ শুক্রবারে, মাসিক মহফিল আয়োজন করা হয়ে থাকে, সেখানে, সেদিন এবাদত, বন্দেগী, মোরাকাবা, মোসাহেদা, ঝিকির, আসগর এর কাজ নিয়মিত ভাবে চলে এবং খানকাহশরিফের যারা ভক্ত তারা নিয়মিত অংশ গ্রহন করে ।
ফারসিমের বুয়েটে পড়াশুনার পাঠ ১৯৯৯ সালে শেষ হওয়ার পর সে, বুয়েটে লেকচারার হিসাবে শিক্ষতার চাকুরী নেয়, এবং পাশাপাশি এম.এস কোর্সে ভর্তি হয়. সাফালের সাথে সে শিক্ষকতা করে, এম.এস কোর্স শেষ করে ২০০১ সালের জানুয়ারিতে । এ সময়ে আমাদের পরিবারে একটা বড় ধরনের দুঘর্টনা ঘটল, বেশ কিছুদিন যাবত আমার শ্বাশুড়ি আম্মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন, নানান রকমের চিকিৎসা করার পরেও, উনাকে সুস্থ করা যাচ্ছিলো না, খুলনার সব ধরনের চিকিৎসা যখন ব্যর্থ হতে লাগলো, তখন আমি একটু চেষ্টা করতে লাগলাম, উনাকে কোনভাবেই ঢাকায় আনা সম্ভব হচ্ছিল না, উনি কিছুতেই রাজি নয় ঢাকায় আসতে, শেষের দিকে উনার খাওয়া দাওয়া ও প্রায় বন্ধ হয়ে গেলো, কোন কিছুই উনি খেতে পারতেন না, খেলেও বমি হয়ে যেতো । উনার এ অবস্থায় উনার দুই পুত্রবধু যারপরনাই,খেদমত করতো, বিশেষ করে বড়জন যাকে ১৯৯৬ সালে বড় ছেলে আব্দুস সালাম কে বিয়ে দিয়ে ঘরে এনেছিলেন, এবং উনার ছোট ছেলে আব্দুস সামী যাকে ও উনি ১৯৯৯ সালে বিবাহ দিয়ে সংসারি করেছিলেন । বড় ছেলের ঘরে প্রথম সন্তান রাজনের জন্ম হলেও তিনি তার সবটুকু স্নেহ, উজাড় করে দিয়ে রেখেছিলো তার প্রথম নাতি, ফারসিমকে ও ফারসিম ছিলো নানী বলতে অজ্ঞান, আর নানীও ছিলো বিটু বলতে দুনিয়ার সবকিছু । ২০০০ সালের প্রথম দিকে উনার চিকিৎসার সমস্ত কাগজ পত্র নিয়ে যখন ঢাকায় বড় ডাক্তার এর মতামত নিলাম, তখন তারা আমাকে দেখিয়ে দিলো, যে উনার পাকস্থলিতে বড় আকারে একটা টিউমার হয়েছে এবং সেই টিউমার পাকস্থলির সবটুকু জায়গা দখল করে নিয়েছে, তাই উনি খেতে পারেন না। এই বয়সে, এই টিউমার সরানোর জন্য একটা বড় অপরাশন এর ধকল উনি সহ্য করতে পারবে না, তাই চিকিৎসকরাও উদ্বিগ্ন এবং রোগী নিজেও এই চিকিৎসা নিতে কোনভাবেই রাজি হলেন না । আজন্ম যিনি পর্দার ভিতরে দিয়ে তিনি মানুষ, উনার স্বামীও ছিলেন কট্টর মুসলমান, ওলি আল্লাহ, তাই কোন ভাবেই উনার শরিরের উপর ডাক্তারের হাত পড়ুক, উনি চাইতেন না। হাসি মাঝে মাঝেই তার অসুস্থ মাকে দেখতে,খেদমত করতে খুলানায় যেতেন এবং মাসাধিক কাল থাকতেন, কিন্তু কোনকিছুতেই ঐ মহিয়সি, স্নেহশীল, পর্দানশীল, ধর্মপ্রান মহিলাকে, পার্থিব কোন টানে ধরা রাখা গেলো না, পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে, ২০০০ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর উনি চলে গেলেন, উনি পর্দা করলেন, উনি আল­াহর পিয়ারা হয়ে গেলেন ।
ফারসিম বুয়েটে লেকচারার হিসাবে যোগদান করার পর থেকে, সে বিদেশে উচ্চ শিক্ষার করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, এবং চেষ্টা করছিলো, তারই প্রাথমিক প্রচেষ্টা হিসাবে সে টোয়েফেল পরীক্ষা দিলো, এবং ভালো স্কোর করলো, পাশাপাশি আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যায়ে রির্সাস ফান্ড বা স্কলারশিপ পাবার জন্য চেষ্টা করতে লাগলো, কিছু দিনের ভিতরে বেশ কয়েকটা ইউনিভার্সিটি থেকে সাড়া পেলো, কিন্তু ভালো ইউনিভার্সিটি বা বিষয় ভালো না হওয়াতে, সে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছিলো । আমাদের কাছে সবচেয়ে উলে­খযোগ্য বিষয় যে, তার মাথা থেকে এস্ট্রোফিজিক্স পড়ার ইচ্ছা বেশ কমে গেছে, সে এখন ন্যনো টেকনলোজি নিয়ে পড়তে বেশি আগ্রহী, এর ভিতরে জি.এম. ই পরীক্ষা দিলো এবং তাতেও ভালো ফল পেলো, সঙ্গে সঙ্গে ভালো ইউনিভার্সিটি ও ভালো বিষয় পাওয়ার চেষ্টা করছিলো। বছর খানেক এর ভিতরে সে দুটো আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে ফান্ড সহ পি.এস.ডি কোর্সে ভর্তির অফার পেলো, তার ভিতরে এরিজিওনা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ন্যনো টেকনলেজি পড়ার জন্য, আর নর্থ ক্যারোলিনা ইউনিভার্সিটিতে যেকোন বিষয়ে পড়ার জন্য ফান্ড সহ অফার পেলো । সমস্ত কাগজ পত্র নিয়ে এবার তার আমেরিকান এ্যাম্বেসিতে ভিসার জন্য দাড়াবার পালা, এমনি একদিন ভোর রাতে, অন্ধকার থাকতে থাকতে আমেরিকান এ্যাম্বেসিতে, ভিসার জন্য লাইনে দাড়ালো, এ্যাম্বেসির অফিস খোলে বেলা ৯ টায়, ফারসিম এর ইন্টারভিউ হলো বেলা ১১ টায়, এ্যাম্বেসির ভিসা অফিসার আধ ঘন্টা ধরে ফারসিমকে ইন্টারভিউ নিয়ে শেষে তাকে জানালো, I am not convinced that will come back as you are only child of your parents.  ফারসিম শত চেষ্টা করেও তাকে বোঝাতে পারলো না যে, দেখো দেশে আমার দুটো বাড়ি আছে, অনেক সম্পদ আছে, আমি এখানকার একজন সম্মানিয় শিক্ষক, তবুও ভিসা অফিসারের ঐ একই কথা না তোমাকে ভিসা দিলে, তুমি দেশে ফিরবে না, আমেরিকাতে রয়ে যাবে । আমেরিকার এ্যাম্বেসি হতে ভিসা পেতে ব্যর্থ হয়ে, ফারসিম একটু থমকে গেলো, কারন ইউনিভার্সিটি টা ভালো ছিলো এবং বিষয়টি পছন্দের বিষয় ছিলো, তবুও সে আবারও চেষ্টা চালাতে লাগলো ।
ফারসিমের বিদেশ যাওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি আমরা ওর জন্য বিবাহের চেষ্টা করছিলাম, হাসি ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা শুরু করছিলো, দেখতে দেখতে অনেক মেয়ে দেখা হয়ে গেলো, কিন্তু পছন্দের পাত্রী মিললো না, পাত্রী পছন্দ হয় তো পরিবার পছন্দ হয় না, পরিবার পছন্দ হয় তো দেশের বাড়ি পছন্দ হয় না, এমনিভাবে খোজাঁখুজি করতে করতে, জানাশুনা, আত্মীয় স্বজন, পরিচিত বন্ধু বান্ধব, শেষ পর্যন্ত ঘটকের অফিসেও চেষ্টা চললো, কিন্তু হাসি কোনভাবে সফল হতে পারছিলো না । এ ব্যাপারে আমার উৎসাহ ছিলো, কিন্তু আমি তার সঙ্গি হতে পারতাম না, সঙ্গে যেতো জাহিদুল, অথবা রুমন, অবশেষে ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে, চট্টগ্রামে একটি পাত্রী পাওয়া গেলো, আমিই প্রথম দেখলাম, সঙ্গে ফারসিম ও ছিলো, আমার খুব একটা পছন্দ না হলেও মোটামুটি চলন সই ছিলো, মেয়েটি বেশ লম্বা, ইঞ্জিনিয়ার পরিবারের মেয়ে, দেশের বাড়িও আমাদের পছন্দের মধ্যে ছিলো । কিন্তু হঠাৎ করে ফারসিমের নানী মারা যাওয়াতে, সবকিছুতে ভাটা পড়লো, আমরা প্রায় ভুলেই গেছিলাম, কিন্তু পাত্রী পক্ষ খুব উৎসাহ দেখালো, একতরফাভাবে চেষ্টা চালাতে লাগলো, বার বার এসে আমাদেরকে বিব্রত করতে লাগলো, কিন্তু হাসি কোনভাবেই রাজি ছিলো না, সে বলতো পরিবারের একজন মুরব্বী মারা গেছেন, অন্তত একটা বছর আমাদের অপেক্ষা করা উচিত । আর আমি ভাবতাম যেহেতু ফারসিম খুব শীঘ্রই বিদেশে পড়াশুনা করতে চলে যাবে, তাই বিদেশ যাওয়ার আগে তাকে বিয়ে দিয়ে, বউ সহ তাকে বিদেশ পাঠাবো, কিন্তু আমার ইচ্ছার পরিনতি কত মর্মান্তিক হতে পারে, তা বুঝতে পারলাম বেশ কিছু পরে । ইতিমধ্যে ফারসিম এম.এস পাস করে, বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হয়ে প্রমোশন পেলো, আর আমি আরো উৎসাহী হয়ে উঠলাম ,তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার জন্য, আমার পীড়াপিড়িতে হাসি একবার চিটাগাং গিয়ে মেয়েটি দেখেও আসলো, তারপর খুব তাড়াহুড়া করে ১১ই মে ২০০১ সালে, চট্টগ্রাম এর পরিবারের সঙ্গে আমাদের আতœীয়তা হলো । এটা ছিলো আমার জীবনের প্রচন্ড ভুলের দুই নম্বর ভুল, স্বল্প পরিধির জীবনে ইতিমধ্যে দুটো ভুল করে ফেলেছি ,অনেক কষ্ট পেয়েছি অনেকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি,এখন ভাবি হয়তো আমার জীবনের তিন নম্বর ভুলে আমার শেষ পরনতি হবে । মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৩ দিনের ভিতরে মাত্র ৩৩ দিন ঐ মেয়েটি আমাদের বাসায় ছিলো, আর বাকী সময় টা তার কেটেছিলো চট্টগ্রামে, এই ৯৩ দিনের ভিতরে আমি বুঝে পেরেছিলাম, আমি কতো বড় ভুল করে ফেলেছি, লক্ষ্য করতাম ঐ পরিবারটি ,মেয়েকে চট্টগ্রাম রাখতে বেশি আগ্রহী, এবং তাঁরা চাইতো ফারসিম ও চট্টগ্রামে গিয়ে বেশি সময় কাটাক, এর ভিতরে কি মনস্তাত্বিক বিশ্লেশন ছিলো, তা জানি না তবে ফারসিম সেটা করতে পারে নি, সে ছিলো পিতামাতার এক মাত্র সন্তান, আর বুয়েটের মতো একটা সম্মান জনক প্রতিষ্টানের সহকারী অধ্যাপক । সেপ্টেম্বর মাসে মেয়েটি চট্টগ্রামে যাওয়ার পর আর ফিরে আসতে চাইলো না, বা তার পরিবার ও আসতে দিচ্ছিলো না, নভেম্বর মাসে এক রোজার সন্ধ্যায়, হাসি গেছে খানকাহ শরীফে, আমি তারাবিতে এর ভিতর হঠাৎ করে চট্টগ্রামের ঐ পরিবারের কিছু সদস্য বাসায় এসে, মেয়ের জন্য কিছু শীতের কাপড় নিবে বলে, ফারসিমকে একা বাসায় পেয়ে, তাদের দেওয়া সমস্ত কাপড় চোপড়, গয়না গাটি, দুই বড় সুটকেস ভর্তি করে নিয়ে, ডাকাতির মতো ট্রাক্সি করে চলে গেলো । আমি তারাবি থেকে ফিরে স্তম্ভিত, হাসিও ফিরে আসলো খানকাহ শরীফ থেকে, আমরা কোন কিছু মেলাতে পারলাম না, তার পরের কয়েকটা মাসে আমাদের অনেক চেষ্টা, পুরা পরিবার সহ চট্টগ্রামে গিয়ে অনুরোধ করা, আতœীয় স্বজন মারফত দেন দরবার করা, কোনটাতেই কোন লাভ হলো না, সর্ম্পকটি শেষ হয়ে গেলো, আমি এখনও এই বিষয়টি ভাবতে বসলে কোন কুল কিনারা পাই না, কেনো এমনটি হলো ,কোন ভাবেই কোন হিসাব মেলাতে পারি না ।
আমেরিকার ভিসা পেতে ব্যর্থ হওয়ায়, আরিজোয়ানা ইউনিভার্সিটি, ফারসিমের অফার পত্রটি আরো এক বছরের জন্য বর্ধিত করলো, অনেক কাঠ খড়ি পুড়িয়ে, অনেক প্রস্তুতি নিয়ে, অনেক দেন দরবার করে ,ফারসিম দ্বিতীয় বারের জন্য আমেরিকান এ্যাম্বেসিতে ভিসার জন্য দাড়ালো, সময়টি খুব খারাপ ছিলো, আমেরিকার ইতিহাসে ১১ই সেপ্টেম্বরের কালো দিনের পরে, কোন মুসলমান দেশ,থেকে ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলো, একবারেই যে ভিসা পেতো না তা নয়, তবে যারা পেতো তারা কোন ভাগ্যের অধিকারী তা আমাদের জানা ছিলো না । ভিসা অফিসার এবারও ফারসিমকে ভিসা দিলো না, দ্বিতীয় বারের জন্য ভিসা প্রত্যাক্ষিত হলো, আমরাও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না যে, আমাদের উপর একের পর এক কেন বিপদ আসছে, আমাদের পরিবারের মনোবল আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়ছিলো, কেমন যেনো মাথা উচু করে দাড়াতে ভুলে গেছিলাম আমরা । ফারসিম যখন আমেরিকার ভিসা পেলো না, তখন সে কানাডার ভিসার জন্য চেষ্টা করতে লাগলো, খুব তাড়াতাড়ি কানাডার, হ্যামিল্টনের ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি ফান্ড সহ পি.এইস. ডি কোর্সের ভর্তির অফার পেলো, ফান্ডের পরিমান কম বলে. হাসি, এখানে তার ছেলেকে পাঠাতে রাজি ছিলো না, আর আমি দেখছিলাম যত তাড়াতাড়ি ফারসিম বিদেশে যায় ততই তার জন্য মঙ্গল এবং পরিবার ও নিশ্চিন্ত । কারন তখন খাড়ার মতো মাথার উপরে ঝুলে আছে চট্টগ্রাম সর্ম্পকের শেষ পরিনতি, যেকোনে সময় যেকোনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, তাই খুব বেশি একটা চিন্তাভাবনা না করে, আমরা পারিবারিক ভাবে ফারসিমের কানডা যাওয়াকে ত্বরানিত করছিলাম, আর ফারসিম তার জীবনের এক মহা দুর্ঘটনায় অবসাদের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে, কোন ভাবে পালাবার পথ খুজঁছিলো । ২০০২ সালের ১২ই আগষ্টে, রাত ১১.৫৯ মিনিটে, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের কানাডার ফ্লাইট, অনেক অজানা আশঙ্খা, শত দুশ্চিন্তা, ও বাবা মায়ের মনের অব্যক্ত ব্যাথা, পিছনে ফেলে ফারসিম এক অজানা ভবিষতের দিকে পা বাড়ালো, পিছনে পড়ে রইলো তার ২৭ বছরের দেশের স্মৃতি, বুয়েটের হাজার হাজার গুনমুগ্ধ ছাত্রছাত্রীর মুখ, ঢাকায় তাদের দু খানা বাড়ির ঐশ্বর্য, ব্যবহারের জন্য দু খানা গাড়ির উপস্থিতি, অসংখ্য পরিবার পরিজনদের স্নেহ ভালোবাসা, সহস্র বন্ধু বান্ধব, পরিচিত জনের অকৃত্রিম শুভেচ্ছা আর চট্টগ্রামের অভিশপ্ত কালো স্মৃতি ।
একমাত্র সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে হাসিও কেমন যেনো চুপচুপ হয়ে গেলো, আমি সবাইকে সান্তনা দিতে দিতে আমার অব্যক্ত ব্যাথা ভুলতে নতুনভাবে জীবন শুরুর পথ খুজতে চেষ্টা করতে লাগলাম । ম্যাক্রহান্টস লিমিটেড এ ৩ বছর চাকুরীর পর, ডেসকো পুনঃ টেন্ডার হলে আহবান করলে ম্যাক্রহান্টস বড় কাজটি পেলো না, ছোট একটা কাজ পেলো, কিন্তু তা দিয়ে আমাকে ধরে রাখবার মতো তেমন ফান্ড ছিলো না, তারা আমাকে কিছু না বললেও,আমি সেচ্ছায় ম্যাক্রহান্টস ছেড়ে আসলাম । বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ভ্যান্টেজ গ্র“পের এম.ডি জিয়া সিদ্দিকি সাহেব আমাকে পাওয়ার জন্য টোপ দিয়ে রেখেছিলো, আমি বেশ কিছুদিন এড়িয়ে চলতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত ওদের ডাকে সাড়া দিলাম, আমি ভ্যান্টেজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন এর পরিচালক পদে যোগদান করলাম, তারিখটি ছিলো ১লা অক্টোবর ২০০১ সাল, ঐ একই তারিখে বি.এন. পি, দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতা গ্রহন করে । ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত ছিলো আওয়ামীলীগের শাসন কাল, অনেক ঘটনা অটনের সমাহার, অনেক অনাচার অত্যাচারের কাহিনী, আইন শৃঙ্খলার অবনতির শেষ পর্যায়, দুর্নিতির চরম উর্দ্ধগতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার । জনগন ছিলো অত্যাচারিত, লাঞ্চিত, নিপিড়িত, এবং চাদাঁবাজির মহা শিকার,তাই জনগন এবারও ভুল করে নাই, পছন্দের সরকারকে বেঁছে নিতে। নতুন কোম্পানিতে প্রতিষ্টিত হতে আমার সামান্য সময় লাগলো, নতুন পরিবেশ, নতুন সহকমীর্, নতুন ধরনের কাজ, একবারে যারে বলে ঠিকাদারি, কাজ তবে সৌভাগ্যের বিষয় আমাদের প্রিন্সিপাল ছিলো চাইনিজ কোম্পানি, ইরানিয়ান কোম্পানি, সব শেষে ভারতীয় কোম্পানি আর ক্লায়েন্ট ছিলো, বিদ্যুৎ মন্ত্রনালয়ের পি. ডি .বি এবং পি.জি সি. বি। প্রথম কাজ চট্টগ্রামে, মাদারবাড়িতে, ৩৩ কেভি জি. আই. এস সাবস্টেশন বসানো, পরবর্তীতে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার মিরপুরে, ১৩২ কেভি সাবস্টেশনেরর বর্ধিত করন, প্রথম কাজটি সাফাল্য জনক ভাবে শেষ হলেও পরবর্তী কাজ শেষ করার পুর্বমুহুর্তে বড় ধরনের একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ায, আমার কোম্পানী নাজুক অবস্থায় পড়ে যায়, পরে অবশ্য জিয়া সিদ্দিকি সাহেবের কারিশমাতে, ভালো ভাবে উতরে যায় । পরবর্তী কাজ আবার চট্টগ্রামে ইরানিয়ান কোম্পানীর অধীনে, রামপুর এবং মুরাদপুর এলাকায়, দুটি ৩৩ কেভি জি. আই.এস সাবস্টেশন বসানো, সবগুলি কাজে সফলতা আসে, কোম্পানীরও সচ্ছলতা আসে, একসময় আমার বেতনও ৩৫হাজার থেকে বেড়ে ৫০ হাজার হয়, কিন্তু কোথায় যেনো একটা ফাক থেকে যায়, থেকে থেকে মনে হয় কোম্পানী মনে হয় ঠিকমতো চলছে না, কেমন যেনো অদুরদর্শীতার অভাব, কেমন যেনো অব্যবস্থাপনায় ভরপুর । সময় ঠিকই কেটে যায়, ২০০৫ সালে ছাতকে লাফারজ সিমেন্ট কারখানার কাজ শেষ করেই, ২০০৬ সালে ঈশ্বরদিতে ভারতীয় কোম্পানীর অধীনে, ২৩০ কেভি সাবস্টেশনের বর্ধিতকরনের কাজ শুরু করতে হয় । আসলে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কোম্পানী ভালো চললেও, শেষে অপরিনামধর্শিতার জন্য, পর পর কয়েকটি কাজে ক্ষতি হয়, যে ক্ষতি আর জিয়া সিদ্দিকি সাহেব কাটিয়ে উঠে দাড়াতে পারেনি,কোম্পানীর পতন শুরু হয়ে যায়, হঠাৎ করে অনেক লোকের নিয়োগ ও পরে পুরাতন পরীক্ষিত লোকজনের বিদায়, কোম্পানীর খারাপ পরিনতি টেনে আনে । মে.জে .এম আই করিম সাহেবের প্রতিস্টিত ভ্যান্টেজ গ্র“প আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়ে, বার্ধক্য জনিত কারনে জেনারেল স্যার অফিসের যাওয়া আসা না করায়, তার অতি উচ্চভিলাসী জামাতা জিয়া সিদ্দিকি সাহেব লোক হিসাবে ভালো ছিলেন, সহমর্মীতা ছিলো, কিন্তু একনায়কত্বে ও সৈরাচারী মনোভাবের জন্য, ২০০৬ সালের পর থেকে আর নতুন কোন কাজেই পায় না। ফলে যা হবার তাই হয়, মাথা ভারি প্রশাসন, আয় থেকে ব্যয় বেশি, প্রচন্ড খরচের হাত, আর পাওনাদারদের পাওনা পরিশোধ না করার প্রবনতা, কর্মচারিদের বেতন বাকি রাখা, কোম্পনীর পতন ত্বরানিত করে ।
ফারসিম কানাডায় চলে যাওয়ার পর, ২০০২ সালে অভিশপ্ত চট্টগ্রামের সর্ম্পক শেষ করার জন্য তারা নানাভাবে তাগিদ দেয়, এবং পরবর্তীতে মামলা করে চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশনে, আমাদের নিশ্চুপ থাকার কারনে ,বার দুই শুনানির তারিখ পড়ার পর, আপনা আপনি সর্ম্পক ছিন্ন হয়ে যায়, একটা অভিশাপ মোচন হয় । চট্টগ্রামের সঙ্গে সর্ম্পক হওয়ার পর, আমাদের পুরা পরিবার যেভাবে নাজেহাল হয়ে পড়ে, সর্ম্পক শেষ হওয়ার পরেও তার রেশ কাটে নাই, একমাত্র সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে, হাসি সব সময় চিন্তাযুক্ত থাকে, এরপরের আঘাতটি আসে আমার পরিবারের বড় সবচেয়ে বড় আশ্রয় আমার মায়ের উপর । আমার মা চট্টগ্রাম সফরের পর কি জানি উনার মনের ভিতরে সন্দেহ দানা বেধে উঠেছিলো যে, আমাদের এই সর্ম্পক ছেদের জন্য উনিই দায়ী, ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস, আমি তখন চট্টগ্রামে, খবর আসলো আমার মা অসুস্থ ,হাসি আমাকে তাড়াতাড়ি ঢাকায় আসতে বললো, ঢাকায় পৌছেই মায়ের সাথে কথা বললাম, মা শুধু বললো “তুই বাড়ি আয়” আমি দেরি না করে পরের দিনেই চুয়াডাঙ্গায় পৌছালাম, মায়ের অবস্থা খারাপ দেখে পরের দিন উনাকে এম্বেুলেন্স করে ঢাকায় নিয়ে আসলাম, এবং সরাসরি বারডেম হাসপাতালে। ছোট ভাই মতিন আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলো, বারডেমে ভর্তি হওয়ার ব্যবস্থা, বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চলতে লাগলো, রাতে মাকে নিজের হাতে খাওয়াইয়ে, তার অনুমতি নিয়ে ,বাসায় আসলাম কিছুটা বিশ্রাম নিতে ,দুদিনের ভ্রমনের ধকল সামলাতে, হাসি ঐ রাতে মোহাম্মদপুরের খানকাহ শরীফে । রাত ১ টায় টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে জানলাম, মা হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে তাকে হৃদরোগ হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে, ছুটলাম শেরে বাংলা নগরে হৃদরোগ হাসপাতালে, ওখানে না পেয়ে পৌছলাম বারডেমে রাত দুটোর দিকে ,ততোক্ষনে সব শেষ, আমার মায়ের নিথর দেহটা পড়ে আছে লিফটের সামনে, মতিন উচ্চ স্বরে কাদঁছে ,আতœীয় স্বজনরা কেউ কেউ ইতিমধ্যে এসে পড়েছে । সে এক করুন পরিবেশ, আমার মা, আমার জন্মদাত্রী; আমার আজীনের আশ্রয়স্থল, আমার পরম মমতার স্থান, আমার পরম সম্পদ, আমার স্নেহময়ী মা আর নেই, কি নিধারুন পরিস্থিতি । কি করবো, কোথায় নিবো, সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না, ইতিমধ্যে হাসি চলে আসছে, সে এসে বললো, চিন্তা করছো কেনো, মাকে নিয়ে খানকাহ শরীফে চলো,আমাদেরতো খানকাহ শরীফ আছে, এম্বুলেন্স করে খানকাহ শরীফ পৌছঁলাম,রাত কাটলো হাফেজ সাহেবের কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যে, আর লাশ গোছল দেওয়ার প্রস্তুতিতে । ভোরে ফজরের নামাযের পর লাশ গোছল দেওয়া হলো, যারা পারলো আতœীয়স্বজন এসে পড়লো, বেলা ৯ টায় এম্বুসেন্সে চুয়াডাঙ্গায় রওয়ানা হলাম সাথে মাইক্রো বাসে চললো আমাদের পরিবার ও আতœীয় স্বজন, সন্ধ্যায় পৌছালাম চুয়াডাঙ্গায় সে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য, পুরা চুয়াডাঙ্গা বাসী ভেঙ্গে পড়েছে আমাদের বাসায়, চুয়াডাঙ্গার মেয়ে, চুয়াডাঙ্গার গৃহবধু ,বাড়ির কত্তৃী, লাইলি জোয়ারদার কে সবাই এসেছে এক নজর দেখতে, শেষ সম্মান জানাতে, রাত ৮ টার দিকে বাবার কবরের পাশে, আমার মাকে সমাহিত করা হলো, চিরনিদ্রার জন্য শায়িত করা হলো ।
আমার পরিবারের উপর যে দুর্যোগ একটার পর একটা আসতে লাগলো, তাতে আমরা সবাই আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়তে লাগালাম, কেউ কাউকে সান্তনা দিতে পারি না, সবাই যার যার ব্যাথা, কষ্ট চেপে রাখে, ফারসিমও দাদীর মৃত্যুতে খুবই কষ্ট পেলো, ২০০৩ সালে, সে এক মাসের ছুটিতে আসলো, শ্বাশুড়ির মৃত্যুর পর ছেলেকে কাছে পেয়ে হাসি কিছুটা শান্তি পেলো, কিন্তু ছেলের একাকিত্বতা দেখে খুব কষ্ট পেলো, আমরা আবার চেষ্টা করতে লাগলাম ফারসিমের বিয়ের জন্য, কিন্তু ফারসিম রাজি হচ্ছিল না, আর এই স্বল্প সময়ে ভালো পাত্রি পাওয়া দুস্কর । যে ভুল একবার করেছি সেই ভুলের যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, তাই হাসি খুব সাবধানে এগুতে লাগলো, আর আমি, আমার মুখে কোন জবাব নাই, পুরা ঘটনার জন্য আমি নিজেকেই দোষী মনে করি, মাঝে মাঝে হাসিও রাগের মাথায় বলে আমি তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে তার ছেলের জীবনকে নষ্ট করে দিয়েছি । কিন্তু আমি, আমার সান্তনা কোথায়, আমার দাড়াবার জায়গা কোথায়, আমাকে আশস্ত করার কে আছে,তাই সব দোষ মাথায় নিয়ে চুপ থাকি, ভবিষতে পরম ভালো কিছু পাওয়ার আশায় ।
পরিচিত, অপরিচিত, বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন, সবাইকে মোটামুটি বলা ছিলো, ভালো পাত্রী খোজ করার জন্য, কিন্তু কোনভাবেই ভালো পাত্রী যোগাড় হচ্ছিল না, বিশেষ করে চিটাগাং এর ঐ দুঘর্টনার পর, পাত্রের মর্যদা যে অনেকাংশে লাগব হয়েছে, এবং সবাই এটাকে যেনো একটা খুত বা দোষ আকারে ধরে নিচ্ছে, সেটা বুঝতে আমাদের একটু সময় লেগেছে। অবশেষে আমার স্বল্প পরিচিত এক ইঞ্জিনিয়ার, মোস্তাক সাহেব কয়েকটি পাত্রীর খোজ আনলেন, তার ভিতর একটি পাত্রী আমার পুর্ব পরিচিত এক ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এর মেয়ে , আমার মন এখানে সায় দিলো, হাসিও গেলো তাড়াতাড়ি মেয়েটাকে দেখার জন্য, সঙ্গে জাহিদুল ও রুমন, বিস্তারিত আলাপ আলোচনা হলো, বাসায় সবাই রির্পোট করলো, জাহিদুলের পছন্দ, রুমন একটু বিরুপ সমলাচোনা করলো, সব শেষে হাসি বলল, এই মেয়েকে আমি ঘরে আনবো, এর ভিতরে আমি প্রতিবাদি কন্ঠস্বর পেয়েছি । আমাদের হাতে আছে মাত্র ৭দিন সময়, ফারসিমের টিকিট কনফার্ম করা আছে, তবুও তড়িঘড়ি করে ৪দিনের ভিতর বিয়ের পর্ব সম্পুর্ন করা হলো, খুবই ব্যস্ততা গেলো, অসম্ভব খাটা খাটনি পড়লো, শেষতক কাজটা সম্পুর্ন হলো, মেয়েটি ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে সি.এস.ই বিভাগে, কেবল দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছে, বাবা একজন ইঞ্জিনিয়ার, দেশের বাড়ি বাগেরহাটের, মোল্লার হাটের, মোল্লার কুলের মোল্লার পরিবারের । স্বল্প সময়ে আত্মীয় স্বজন সবাই মোটামুটি আসলো, যারা আসতে পারলো না তাদেরকে আমরা ভুল বুঝলাম না, যা কিছু কেনা কাটা, হাসি জাহিদুলকে নিয়ে দুদিনের ভিতরে সারলো, গহনা পত্র যাকিছু আগেই প্রস্তুত ছিলো, সুতারং খুব একটা বেগ পেতো হলো না আমাদের । নতুন বউমা ঘরে আসলো, আমরা যথাসাধ্য আপ্যায়ন করলাম, বরন করে নিলাম, অল্প বয়সের মেয়ে তাকেও আস্তে আস্তে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সময় ও সুযোগ দেওয়া হলো । বিয়ের ৩ দিনের মাথায় ফারসিম কানাডা চলে গেলো, বউমা আমাদের বাসায় থাকলো, ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে দিয়ে, হাসি বউমাকে সে নিজের মতো গড়ে তুলতে লাগলো, তার পড়াশুনা চলতে লাগলো, প্রতিদিন আমি গাড়িতে করে ইউনিভার্সিটি পৌছিয়ে দেই, আবার বিকালে সঙ্গে করে ঘরে ফিরি, বউমা যখনি বাবার বাড়ি যেতে চায়, আমি পৌছিয়ে দিয়ে আসি, আবার নিয়ে আসি, এইভাবে কেটে গেলো প্রায় এক বছর । বউমা মাঝে মাঝে একা থাকলে কান্নাকাটি করে, ওকে সান্তনা দেওয়ার ভাষা আমরা খুজে পাইনা, দেখতে দেখতে বউমা থার্ড ইয়ার উঠল, পরের বছর ২০০৫ সালে ফ্রেবুয়ারি মাসে ফারসিম আবার দেশে আসলো, আসার সময় বউমার কানাডা যাওয়ার ভিসার সমস্ত ব্যবস্থা করে নিয়ে আসলো । মাস খানেক থেকে ফারসিম আবার ফিরে গেলো, এখন শুধু অপেক্ষার পালা, বউমার ফাইনাল পরীক্ষা হলে তাকে কানাডা পাঠিয়ে দেওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা ঠিক করা হয়েছে ।
২০০২ সালে, ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার পর হতেই, হাসি আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলো, একমাত্র সন্তান ছাড়া একা একা থাকা, তাছাড়া চট্টগ্রামের দুর্ঘটনা টা আমাদের পরিবারকে একবারেই বিপর্যস্ত করে ফেলেছিলো, এমনি কোন এক সময় রাতে, ঘুমের ভিতরে হাসির একটা নিরব হার্ট এটাক হয়, আমরা বুঝতে পারিনি, মাঝে মাঝে তার শ্বাস কষ্ট হতো, অল্প একটু কাজ করলে হাফিয়ে উঠতো, সিড়ি দিয়ে উঠানামা করলে ক্লান্ত হয়ে পড়তো, একাধিক ডাক্তরের পরামর্শ ও চেকআপ করার পর দেখা গেলো, তার হার্টের পাম্প ক্ষমতা প্রায় অর্ধেক কমে গেছে, যেখানে থাকার কথা ৫৮% সেখানে আছে ৩৮% ,তাই হার্ট যথারীতি রক্ত পাম্প করতে পারে না, ক্লান্ত হয়ে পড়ে, নানান রকমের ঔষধ প্রয়োগ চললো, চিকিৎসা চললো বিরামহীন ভাবে, কিন্তু দিন দিন ওর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ছিলো, ক্রমেই খারাপের দিক যাচ্ছিলো, বড় বড় প্রফেসর, ডাক্তারের চিকিৎসা দিয়েও তাকে সম্পুর্ন সুস্থ করা যাচ্ছিলো না, ডাক্তার রা আস্বস্ত করত, সময় লাগবে বলে । ইতিমধ্যে বউমার ফাইনাল পরীক্ষা প্রায় শেষ হয়ে আসলো, আমি কয়েকদিনের জন্য অফিসের কাজে দিল্লী গেলাম, সঙ্গে বউমাকে নিয়ে গেলাম, দিল্লীতে কাজ শেষে আজমীর শরীফ, জয়পুর ও আগ্রা ঘুরে দিল্লীতে ফিরে আসলাম, মোটামুটি দর্শনীয় স্থানগুলো বউমার দেখা হয়ে গেলো, আমার অফিসের কাজ ও আমার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ কাজ সম্পুর্ন হলো । দেশে ফিরে কিছুদিনের মধ্যে বউমার পরীক্ষা শেষ হলো, এখন তার কানাডার যাওয়ার প্রস্তুতির পালা, প্রস্তুতি চলতে লাগলো, এমনি সময় বউমার জীবনে একটি অনাকাঙ্খিত দুঘর্টনা ঘটে গেলো, এটার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না, বউমা নিজেও বুঝতে তার শারীরিক অসুস্থতার কথা, অনভিজ্ঞ, অল্প বয়সি মেয়ে, তারপর স্বামী কাছে থাকে না, এমন একটা পরিস্থিতি সব মিলিয়ে কেমন যেনো একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো । দুদিন যাবত বউমাকে নিয়ে যমে-মানুষে টানাটানি হতে লাগলো, অবশেষে বউমাকে ফিরে পাওয়া গেলো, কিন্তু অনাস্বাদিত এক মাতৃত্ব হতে সে বঞ্চিত হলো, সবকিছু নিয়ে আমাদের দুই পরিবারের ভিতর এক কালো আমানিশার ছায়া নেমে আসলো, আমরা স্তম্ভিত, আমরা আশাহত, আমরা এক দুর্নিবার বিপদের মধ্যে পতিত হলাম, যা সাভাবিক হতে অনেকটা সময় লেগেছিলো ।
২০০৬ সালের জুন মাসে বউমা কানাডা চলে গেলো, বউমা যাওয়ার পর থেকে হাসি আরো একাকি হয়ে পড়লো, একমাত্র সন্তানকে ছেড়ে, বউমাকে দুরে রেখে, নানারকম পারিবারিক দুর্যোগ মাথায় নিয়ে সে ধীরে ধীরে যে অকাল পরিনতির দিকে এগুচ্ছে তা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি । আমি নিজে আমার অফিস, আমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম, হাসি তার ঘর সংসার আর লোকজন নিয়ে ব্যস্ততায় সময় কাটাতো, এরমধ্যে সে খানকাহ শরীফকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লো, সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার দুদিন খানকাহ শরীফে কাটানো তার নিয়মে হয়ে দাড়ালো, হাজার ঝড়, বৃষ্টি, ঠান্ডা, হরতাল, কোনকিছুর বাধা সে মানতে চাইতো না, খানকাহ শরীফে যাওয়ার প্রোগাম থাকলে, এইভাবে সময় কেটে যাচ্ছিল, আর হাসিও এক নির্মম পরিনতির দিকে এগুছিলো ।
২০০৮ সাল, কোম্পানীর কোন কাজ নাই, আস্তে আস্তে কোম্পানী ক্ষতির দিকে এগুচ্ছে তা সত্বেও কোম্পানীর কর্নধার জিয়া সিদ্দিকী সাহেব মতিঝিলে দুটো অফিস এবং গুলশানে তিনটি অফিস নিয়ে অযথা ঠাটবাট বজায় রাখতে এবং অবিবেচকের মতো কোম্পানী কাযকলাপ চালিয়ে যেতে লাগলো, শুধু ঢাকাতেই ৫টি অফিস নয়, বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলিতেও অফিস, ব্যবস্থাপনা, ৫০০ এর অধিক কর্মচারীর বেতন ভাতা, ইত্যাদি সহ যখন মাসিক খরচ ৩৫ লাখ টাকা আসে, তখনও জিয়া সিদ্দিকী সাহেব বহাল তবিয়তে রাজত্ব চালাতে থাকেন । তাই হঠাৎ করে ২০০৮ সালের কোরবানীর ঈদের পর জানুয়ারি মাসে, হঠাৎ করে আমাকে ডেকে বসলেন এবং সরাসরি আমাকে ভ্যান্টেজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাশনের এম ডি হওয়ার প্রস্তাব দেন এবং দায়িত্ব নিতে বলেন, আমি তখনও বুঝিনি যে, ইতিমধ্যে কোম্পানীর তলা শুন্য । তাই খরচ সংকোচন এর জন্য গুলশানের তিনটি অফিস ছেড়ে দিলেন, মতিঝিলে একই ভবনে দুটো ফ্লোর নিয়ে অফিস জাকিয়ে বসলেন, ইতিমধ্যে উনার ডান হাত বলে বিখ্যাত, মুজাহিদ সুলতান সাহেব, একান্ত অনুগত শিবলি সাইদ, উদ্ধর্তন জেনারেল ম্যানাজার রুহুল কুদ্দুস সাহেব,ও আরো অনেকে আস্তে আস্তে কেটে পড়লেন, কারন কোম্পানীর কোন আয় নাই, ব্যয়ের পাল­া মাথা ভারি, কর্মচারীদের বেতন বাকী পড়তে লাগলো, গাড়ি সংরক্ষন এর খরচ দেওয়া হয় না, এমনি অবস্থায় তবুও ধুকে ধুকে কোম্পানী চলছিলো। তবুও উনি হাল ছাড়েননি, কোম্পানীকে আগের অবস্থায় ফেরানোর জন্য নানা ভাবে চেষ্টা করেছেন, শ্বশুর সাহেব, জেনারেল সাহেবের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছেন,কিন্তু সবাই বৃথা, উনার ব্যাংকে লোনের পরিমান দিন দিন পাহাড়সম বেড়ে চলেছে, কোন ব্যাংক থেকে লোন দেয় না, এল সি খোলার অনুমতি দেন না, মোটামুটি ভাবে সর্বশান্ত অবস্থা, তবুও উনি কোম্পানীকে টেনে নিয়ে চলেছেন অজানা এক গন্তব্যে। কোম্পানীর এই অবস্থা দেখে হাসি অনেকবারেই আমাকে কোম্পানী ছেড়ে চলে আসতে বলেছে, বলেছে নিজের মতো করে কিছু করতে, এ নিয়ে অনেক বার ঝগড়া ঝাটি হয়ে গেছে, কিন্তু আমি কান মুখ নাড়ি নি, চাকুরীর সোনার হরিনকে ধরে এগুতে চেয়েছি, চাকুরী ছেড়ে নিজের মতো ব্যবসা করতে গেলে অজানা আশংখা আমাকে বারবার পিছু টেনেছে , আমি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে নি, সবকিছু ছেড়ে ফেলে দিয়ে সামনে এগুতে পারি নি, এ আমার এক ধরনের দুর্বলতা, আমার অযোগ্যতা।
২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে যখন বি এন পি সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দিলো, তখন দেশ কোনভাবে চলছিলো, তেমন কোন উন্নতির লক্ষ্য নেই, নেই কোন ভবিষতের দুরাশা, দুর্নীতি চরম আকার ধারন করেছে, দেশে নতুন কোনো দেশি, বৈদেশিক উদোক্তা নাই, শিল্প কারখানায় অচল অবস্থা, শ্রমিক অসন্তোস, ছাত্রদলের অসাভাবিক কার্যকলাপ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মোটামুটি দেশে চরম অব্যবস্থা, অচলাবস্থা, ফলে ভ্যান্টেজ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাশনের দীর্ঘদিন কোন কাজের সন্ধান নাই। তবুও এ সময় বাজারে চালের দর ছিলো ১৮ টাকা কেজি, আটা ১২টাকা কেজি, ভোজ্য তেল ৪০টাকা লিটার মোটামুটি দেশের লোক অসচ্ছলভাবে খেয়ে পড়ে বাঁচছিলো। বি এন পি সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর পরই দেশে শুরু হলো অরাজকতা, ২৮শে নভেম্বর, লগি বৈঠার আন্দোলনে ঢাকার প্রকাশ্য রাজপথে, ৯জনকে পিটিয়ে মারা হলো, দেশ ব্যাপি এক গনআন্দোলন শুরু হয়ে গেলো, তত্ত¡াবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়ে চললো দু দলের চরম মত বিরোধ, প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে অচল অবস্থা, প্রান্তন প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা, দেশের রাস্ট্রপতি নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হওয়া এবং তার অধিনে ৯জন উপদেষ্টা নিয়োগ পাওয়া, সবকিছুই কেমন যেন অযোক্তিক ভাবে, তুমুল বাধাবিপত্তির মাঝে, চলতে লাগলো । এক মাসের মধ্যে ৪জন উপদেষ্টা মন্ডলির পদত্যাগ, সমস্যাকে আরো ঘনিভুতো করে তুলতো, বি. এন. পি ও জামায়াত মোটামুটি এক ঘরে হয়ে রইলো, দেশে অন্যান্য সব দল মিলে আন্দোলন তুললো তুঙ্গে, চরম অব্যবস্থার মধ্যে রাস্ট্রপতি দেশে জরুরী আইন ঘোষনা করলো, এই পর্যায়ে মনে হতো লাগলো দেশে আবার মার্শাল ল আসন্ন । যা ভাবার তাই হলো, কয়েকদিনের মধ্যে তিন বাহিনীর প্রধান, রাস্ট্রপতির সাথে দেখা করলো, টেবিলে পিস্তল রেখে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে প্রধান উপদেস্টার পদ থেকে জোর করে পদত্যাগ পত্র আদায় করলো, খুজে খুজে নতুন প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে ড.ফখরুদ্দিনকে দৃশ্যে তুলে আনলো, নতুন করে উপদেষ্টা মন্ডলী গঠিত হলো, এত স্বল্প সময়ে এত দ্রুত প্রশাসনিক পরিবর্তন হলো যে, দেশবাসির বুঝে উঠতে বেগ পেতে হলো ।
দেশ এখন ঘোর বিপদের মাঝে, তত্ত¡বধয়াক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও আসল ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে, সেনা প্রধান, মঈন ইউ চৌধুরী নানা ধরনের বিধি নিষেধ জারি করতে লাগলো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষনা করতে লাগলো, দুর্নীতির দায়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী,আমলা ,বিভিন্ন বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, একের পর এক বন্দি হতে লাগলো, দেশ পরিনত হলো বিশাল কারাগারে, জনমানুষের বাক স্বাধীনতা হলো রোধ, প্রতিবাদের ভাষা হয়ে গেলোও বন্ধ, প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া যে যার মতো করে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে উপস্থাপন করতে শুরু করলো, দেশবাসি সত্য মিথ্যার বাচ বিচার করতে ভুলে গেলো । দেশে জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে চললো, চালের দর কেজি, প্রথমে ২০ টাকা, ২২ টাকা, ২৫ টাকা, ৩০ টাকা, ৩৫ টাকা, ৪০ টাকা এবং ৪৫ টাকা পর্যন্ত লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগলো, আটার দর কেজি ১২ টাকা থেকে বেড়ে ৩০টাকা পর্যন্ত পৌছাঁলো, ডালের কেজি ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা পর্যন্ত উঠলো, আর ভোজ্য তেলের দাম লিটার ৪৮টাকা থেকে বেড়ে ১১২ টাকা পর্যন্ত উঠলো । সাধারন লোকের খাওয়া পরা চালাতে নাভিশ্বাস মতো অবস্থা, দেশের জনগন সব সময় বন্দি আতঙ্কে ভুগছে, দুই দলের দুই নেত্রী বন্দি, তাদের দেশ থেকে বের করে দেবার পায়তারা, মাইনাস টু ফর্মুলা কার্যকরী করতে সেনাবাহিনীর ই›্ধনে একটি বিশেষ মহলের অপচেষ্টা অব্যাহত থাকলো, সবকিছু ছাপিয়ে চরম আকার ধারন করলো, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সেনাসদস্যদের সাথে ছাত্রদের সংঘর্ষ বাধল । সেই সময়ে দেশের অবস্থা অবর্ননীয় আকার ধারন করলো, মিটিং, মিছিল, গাড়ি ভাঙ্গচুর, দোকার পোড়ানো ,ধ্বংসাত্বক কার্যকলাপ, তারপর তার অবশ্যম্ভাবিক পরিনতি, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষনা, দেশব্যাপি কারফিউ, চারিদিকে চরম অসন্তোষ শুরু হলো দেশে । অবশ্য সেনাবাহিনীর প্রতোক্ষ হস্তক্ষেপে, তত্ত¡বধায়ক সরকার সবকিছু আয়ত্বে আনতে সপ্তাহ খানেক সময় নিলো, তারপর সব শান্ত, তবে সরকার এবং সেনাবাহিনী ধাক্কা খেলো । জনগনের কাছে দ্রব্যমুল্যর উর্দ্বগতি মানিয়ে নেওয়ার জন্য, মহল­ায় মহল­ায় ন্যায্য মুল্যর দোকান, বি.ডি. আর শপ ইত্যাদি চালু হলো, যেখান থেকে জনগন বিশাল লাইন ধরে, মোটামুটি সহনশীল মুল্যে চাল, আটা, ডাল,পিয়াজ,তেল ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে লাগলো । তত্ত¡বধায়ক সরকার নিত্য দিন দেশ পরিচালনার জন্য নতুন নতুন অধ্যাদেশ জারি করতে লাগলো, আর সুযোগ বুঝে সেনাবাহিনীর দায়িত্ববান কর্মকর্তারা যাকে খুশি তার কাছ থেকে দুর্নীতিতে ফাঁসিয়ে দিবে ভয় দেখিয়ে প্রচুর টাকা আয় করতে লাগলো, সেটাকে গুনে শেষ করা যায় না, লক্ষ কোটি ছাড়িয়ে তা দাড়ালো বস্তা ভর্তি টাকায়, গাড়ির শো রুমে গাড়ির বিক্রির হার এতো বেড়ে গেলো যে আমদানীকারকরা নতুন করে গাড়ির অর্ডার দিতে লাগলো, আর বাড়ির ডেভলোপারদের দীর্ঘদিনের অবিক্রিত ফ্ল্যাট সমুহ বিক্রি হয়ে গেলো এবং নতুন করে অসংখ্যা ফ্ল্যাটের বুকিং পেয়ে গেলো ।
ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে, হাসি তার একাকিত্বতা, কিছুটা ভুলতে চেয়েছিলো বউমাকে নিয়ে, কিন্তু যখন বউমা কানাডা চলে গেলো, তখন হাসির শরীর আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়ছিলো, কতটা খারাপ হয়ে পড়েছিলো তা আমরা কেই বুঝতে পারিনি, ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে যখন আমি বাবা মা ও শ্বাশুর শ্বাশুরির জন্য দোয়া করার জন্য চুয়াডাঙ্গায় খুলনা সফরে গিয়েছিলাম, তখন একদিন রাতে টেলিফোন করে শুনি, হাসির শরীর খুব খারাপ, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তাড়াতাড়ি ডাক্তার এর দোকান থেকে, ইনহেলার পাঠিয়ে অবস্থা নিয়ন্ত্রন করা গিয়েছিলো । যে ডাক্তারের কাছে তার চিকিৎসা চলছিলো তিনি একজন কার্ডিওলজিস্ট, পিজি হাসপাতালের প্রফেসর, প্রতি মাসে একবার তার কাছে ফলোআপ চিকিৎসা নেওয়া হতো, তার কাছে গেলে তিনি রক্তচাপ মাপতেন, ওজন দেখতেন, আর জিজ্ঞাসা করে ঔষধ মোটামুটি নিয়ন্ত্রন করে, একমাস পরে আবার যেতে বলতো, এভাবে বছরের পর বছর, হাসির চিকিৎসা চলে আসছিলো, ডাক্তার কখনও খারাপ কিছু বলেনি, আমিও শেষের দিকে তার সঙ্গে যেতাম না, হাসি একাই ডাক্তারের কাছে যেতো । এবারের সমস্যা আমার কাছে গুরুত্বপুর্ন হওয়ায় আমারই ডাক্তারের কাছে হাসিকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু ঐ দিন হরতাল থাকায়, আমি গুলশান অফিস থেকে বাসায় পৌছাতে দেরী হওয়ায়, হাসি একা একাই ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলো, এবং সবকিছু অবস্থা খুলে বলেছিলো, তারপরও ডাক্তার কোন গুরত্ব দেয়নি বা আমাদেরকে কোন সাবধানতা বাণীও শোনায় নাই, হাসি বার বার ব্যাপারটার উপর জোর দেওয়াতে ডাক্তার তার মোবাইল নাম্বার দিয়ে বলেছিলো, তখন অসুবিধা হবে তখন আমাকে টেলিফোন করবেন । তারপর থেকে সবকিছুই এক নিয়মে চলছিলো, এরপর আসলো ৩রা ফ্রেবুয়ারি, ২০০৭ সাল, শুক্রবার, আমি খানকাহ শরীফ যাব বলে বিকালে প্রস্তুত, ড্রাইভারের জন্য দেরী করছি, হাসি সম্পুর্ন সাভাবিক, আমি খানকাহ শরীফে, মাগরিব ও এশার নামায শেষ করে রাত ৮ টায় যখন বাসায় ফিরছি তখন বাসা থেকে সুলতানার টেলিফোন পেলাম, ও জানালো,আন্টির শরীর খুব খারাপ তাড়াতাড়ি বাসায় আসুন, আমি অসুবিধার বিষয় জানতে চাইলে, সে জানালো, আন্টির শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তাড়াতাড়ি সুলতানাকে বললাম, ডেসিং টেবিলের উপরে ইনহেলার আছে, ইনহেলার দিতে বললাম । তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরার পথে কাজি পাড়া দিয়ে ঢুকতে পারলাম না একটা ট্রাক ভেঙ্গে পড়ে আছে ,অনেক ঘুরে যখন গ্রামীন ব্যাংকের রাস্তা ধরে বাসায় পৌছালাম, দেখি হাসি চেয়ারের উপর বসে আছে, চোখ বন্ধ, কাজের দুজন লোক হাত পায়ে তেল মাখাচ্ছে, হাসি খুব কষ্ট পাচ্ছে, তাড়াতাড়ি ইনহেলার দেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোন লাভ হলো না, হাসি ইনহেলার টানতে পারছিলো না, তাড়াতাড়ি তিনতলার ফাহাদকে ডাকলাম, রক্তচাপ মাপার জন্য, রক্তচাপ মেপে দেখা গেলো ১২০/৭০, সারা শরীর অনাবরত ঘামছে এবং ঠান্ডা । তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, হাসিকে, হাসপাতালে নিতে হবে, বললাম ,তুমি, একটু রেডি নেও, হাসপাতালে যাব, কিন্তু তখন হাসির রেডি হওয়ার মতো অবস্থা ছিলো না, সমস্ত শরীর ছেড়ে দিয়েছে ,মাঝে মাঝে দোয়া কালাম পড়ছে, আমাকে বললো, হাসপাতালে না, বাসায় ডাক্তার ডাকো, আরো বলতে লাগলো, আমার এতো খারাপ লাগছে কেনো, আল­াহ কি আমাকে নিয়ে যাবে । আমি কয়েকবার এম্বুলেন্স আনার জন্য টেলিফোনে চেষ্টা করলাম, কিন্তু ব্যর্থ হলাম, পরে গাড়িতে করে নিবো ঠিক করে, হাসি কে নিচে নামানোর ব্যবস্থা করলাম, ইকবাল সাহেব, ফাহাদ, এবং একজন ভাড়াটিয়া তিনজন মিলে চেয়ারে বসা অবস্থায় হাসিকে ধরাধরি করে নিচে নামানো হলো, কোন রকমে গাড়ির ভিতরে শোয়ানো হলো, সঙ্গে সুলতানা থাকলো, হাসির মাথাটা থাকলো সুলতানা বুুকের উপর, ইকবাল সাহেব, ফাহাদকে রিকাসায় করে আল হেলাল হাসপাতালে যেতে বললাম । রওয়ানা হয়ে দেখি, গ্রামীন ব্যাংকের রাস্তা বন্ধ, ট্রাক ঢুকেছে, চেষ্টা করলাম শাহ আলি বাগের রাস্তা দিয়ে, সেখানে ট্রাক মাল আনলোড করছে, সব জায়গায় অপারগ হয়ে শেষ পর্যন্ত পাইকপাড়া রোড দিয়ে, মিরপুর এক নম্বর ঘুরে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, এতক্ষন হাসি গাড়ি ভিতরে উুহ, আহ, করে আর্তনাদ করছিলো, হঠাৎ এক নম্বর গোল চক্করের কাছে মনে হলো, হাসি শান্ত হয়ে আছে । সুলতানাকে বললাম ,তোমার আন্টি চুপ করে আছে কেন, সুলতানা জানালো, বোধ হয়, আন্টি, একটু ঘুমাচ্ছে ,কিন্তু আমার মন ভালো বললো না, তবুও এক নম্বর ঘুরে হার্ট ফাউন্ডেশন এর কাছে দেখি বিরাট জটলা, তাই দেরী না করে ছুটলাম আল হেলাল হাসপাতালের দিকে, আল হেলাল এর ডাক্তার জরুরী চিকিৎসাকেন্দ্র, অনেক্ষন ধরে পরীক্ষা করতে লাগলো , আমি উদ্বিগ্ন হয়ে ডাক্তারকে বললাম, উনি হার্টের রোগী, শ্বাস কষ্ট হচ্ছে, উনাকে অক্সিজেন দিন । ডাক্তার বিরক্ত হয়ে বললো, অক্সিজেন দেওয়ার মতো অবস্থা আছে কিনা দেখতে হবে তো, আর হার্টের রোগী এখানে এনেছেন কেন, হার্ট ফাউন্ডেশনে নিলেই তো পারতেন, আসলে ডাক্তার বুঝে গিয়েছিলো যে সব শেষ । আল হেলাল থেকেই রুমনকে, ও মতিনকে হাসির খারাপ অবস্থার কথা জানিয়ে তাড়াতাড়ি আসতে বললাম, আবার এম্বুলেন্স করে আল হেলাল থেকে হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়া হলো, তারাও জরুরী চিকিৎসার সব রকম ব্যবস্থা নিলো, কিন্তু মনিটরে দেখা গেলো পালস নেই, রক্তচাপ নেই, হার্ট বিট ফ্ল্যাট, একটা সরল রেখায় প্রবাহিত হচ্ছে, ওরা জানালো যে, এখানে আসার আগেই উনার মৃত্যু হয়েছে, ওরা ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা নিলো । আসলে এক নম্বর গোল চক্করের কাছে, যখন হাসি হঠাৎ করে শান্ত হয়ে গিয়েছিলো তখনই তার শেষ নিঃশ্বাস বের হয়ে গেছে, আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলাম, শুধু খুলনায় আব্দুস সালামকে জানালাম, খুলনার মাজার শরীফে দাফন করা যাবে না, হাসির লাশ এম্বুলেন্স করে বাসায় ফিরলাম।
এর পরের কি করনীয়, তা আপন গতিতে হতে চললো, আতœীয় স্বজন আসলো, ঢাকার খানকাহ শরীফ থেকে জাহিদুল হাফেজ সাহেবকে নিয়ে আসলো, সায়েদা আপা আসলো, লাশ ধোয়ানোর ব্যবস্থা চলতে লাগলো, সবকিছু যেনো ছক বাধা নিয়মে, একের পর এক হতে লাগলো, ফারসিম এর কাছে খবর গেলো, ও কিছুক্ষনের ভিতরে জানালো ওর জন্য অপেক্ষা না করে দাফন করে ফেলতে, ও সপ্তাহ খানেক এর ভিতরে আসবে, এ সিদ্ধান্ত আতœীয় স্বজন মানতে চাইলো না, তারা পুনরায় যোগাযোগ করলো, একমাত্র সন্তান মাকে দেখতে আসা উচিত, কিন্তু বিপদ তো কখন একা আসে না, বউমা তখন কানাডাতে অসুস্থ, বিদেশ বিভুইয়ে তাকে একা ফেলে আসা, আবার দুজন আসলে খরচের কথা সব কিছু ভেবে ফারসিম মতামত দিয়েছিলো । কিন্তু আত্মীয় স্বজন বিশেষ করে খায়রুল হক, ফারসিমকে দেশে আসার জন্য বারবার তাগিদ দিতে লাগলো শেষ পর্যন্ত ফারসিমের আসার সিদ্ধান্ত হলো, বউমা এ কয়েকদিন কানাডায় আমার খালাতো ভাই, হাবুর ওখানে থাকবে, হাবু টিকিট বুকিং দিয়ে ফেললো, বাংলাদেশের আমরা লাশ বারডেম এর মরচুয়ারিতে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম । কালরাত কেটে গেলো, ভোরে ফজরের আযান শোনা গেলো, ফজরের নামায শেষে, পাশের মসজিদে হাসির প্রথম জানযা সম্পুর্ন হলো, যে মসজিদের পাঁচ ওয়াক্তের আযান হাসি দিবারাত্র শুনতো, যে মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়, আরো বেশি করে পর্দা করতো সেখানে তার জীবনের শেষকৃত্ব সম্পুর্ন হলো, আমরা লাশ নিয়ে বারডেমের মরচুয়ারে পৌঁছালাম।
হাসি চলে গেলো, আমার ৩৮ বছরের সাথি, আমার সুখ দুখের সঙ্গি, আমার সব কাজের প্রেরনা, আমার বিপদ আপদের সমব্যাথি, আমার জীবন থেকে নিঃশব্দে চলে গেলো, ছিলাম একা, হলো দুজনের সংসার, তা থেকে তিন জন ও পরে একজন বেড়ে ৪জন, এর ভিতর থেকে পরিবারের একজনের পরিসমাপ্তি ঘটলো। পরিবারের অপর দুজন সদস্য বিদেশে, আমি একবারে একা হয়ে গেলাম, যে সংসার এতোদিন হাসি দোর্দন্তপ্রতাপে চালিয়েছে, লোকজনকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছে, সব খানে যার ছিলো একক আধিপত্য, আজ সে ছাড়া সব কিছু শুন্য, মহাশুন্য, একবারে হাহাকার, সারা বাড়িতে আমি একা, রাতে ঘুমাতে গেলে নিস্বব্দতা, অন্ধকার আমার একাকিত্বতা আরো প্রকট করে তোলে, ২৭০০ এস.এফ.টি বাড়িতে আমি এক কোনে পড়ে থাকি, বাকিটা একান্ত ভাবে খালি, যেখানে জনমানুষের দেখা নাই, যেখানে প্রানের স্পন্দন নাই, আছে শুধু নিশব্দ বাতাসের আর্তনাদ। হাসি এভাবে চলে যাবে, আমরা দুজনের কেউই ভাবতে পারি নাই, মাঝে মাঝে কথা হতো আমাদের ভিতর, কে আগে যাবে তা নিয়ে, হাসি সব সময় বলতো, সে যেন আমার আগে যেতে পারে, আমি বলতাম অলুক্ষনে কথা, শেষে ঠিক হতো, ঠিক আছে আমরা একসাথেই যাব, কিন্তু হাসি কথা রাখে নাই । বাড়ির প্রতিটা ধুলিকনার সাথে হাসির স্মৃতি বিজড়িত, সবখানে তার কোমল স্পর্শ, কিন্তু এখন সবই অতীত, একটাই সত্য, হাসি নেই এবং কোনদিন ফিরবে না এটাই মহাসত্য । হাসি মারা যাওয়ার ৪ দিনের মাথায়, ফারসিম আসলো, সবাই ভেবেছিলো একটা আবেগময় দৃশ্যের অবতারনা হবে, হয়ে উঠবে হৃদয়বিদারক ঘটনা, কিন্তু তা হলো না, আমি হতে দিলাম না,যথেষ্ট নিজেকে সামলে রাখলাম, দেখলাম ফারসিমও অনেক কঠিন । পরদিন বারডেম মরচুয়ারি থেকে লাশ নিয়ে প্রথমে খানকাহ শরীফ যাওয়া হলো, সেখানে তার দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হলো, খানকাহ শরীফের এবাদত কারিগন, হাসির একান্ত ভক্ত, গুনগ্রাহি, পরিচিত, বাসায় বসবাসকারী, এমনকি মহল্লার অসংখ্য নারী পুরুষ শেষ বারের মতো হাসিকে বিদায় জানাতে এসেছে, হাসি ও হাসিমুখে সবাইকে বিদায় জানিয়ে চললো আপন গন্তব্যস্থানে পরপারে । খুলনায় পৌছানো গেলো বিকাল ৪টার দিকে, সেখানে তার আত্মীয় স্বজন, তার জন্মস্থান, তার শোকাকুল পরিবার পরিজন অপেক্ষায় ছিলো, শেষ বারের মতো হাসিকে দেখে নিতে, সে এক মর্মান্তিক দৃশ্য, আবেগ তাড়িত ঘটনা, পরম সংবেদনশীল মুহুর্ত, সন্ধ্যা ৬টার আগে দাফন হয়ে গেলো, খুলনা খানকাহ শরীফের মসজিদের পাশে, মাজার শরীফের উত্তর পশ্চিম কোনে, চির নিদ্রায়, চির শান্তিতে, সবাইকে শেষ বারের মতো কাঁদিয়ে, হাসি হাসতে হাসতে বিদায় নিলো, তৃতীয় জানযা পড়ালো তার ছোট ভাই আব্দুস সালাম । তিনদিনের মাথায় খুলনাতে কুলকানি সম্পুর্ন হলো, তারপর ফারসিম সহ আমরা ঢাকায় ফিরে আসলাম।
ফারসিম ১৫দিন দেশে ছিলো, এ কয়েকদিন খাবার টেবিলে, ড্রয়িংরুমে, বিভিন্নভাবে কথা বার্তায় কাজে কর্মে সময় কেটে যাচ্ছিলো, সপ্তাহখানেক বাসায় থাকার পর, অফিস করা শুরু করলাম, ফারসিম কয়েকদিন নিজের প্রয়োজনীয় কাজ কাম সারলো, তারপর একসময় চলে গেলো, কারন তার পড়াশুনা এখনো শেষ হয় নাই, আর বউমাকেও শারীরিক অসুস্থতা অবস্থায় রেখে এসেছে । ফারসিম চলে যাওয়ার পর আমি আরো একা হয়ে পড়লাম, আমার জগৎ শুন্য থেকে শুন্যতর হতে লাগলো, যতক্ষন বাহিরে থাকি লোকজনের সাথে কথা বলে সময় চলে যায়,যখনি বাসায় আসি তখন বাসা শুন্য পরিবেশে, আমার চরম একাকিত্বের চাপে দম বন্ধ হয়ে আসে, বাসায় কাজের কোন লোক এই মুহুর্তে নাই, তাই চেষ্টা চরিত্রি করে পুরাতন কাজের লোক জেবাকে তার পরিবার সহ আসতে বললাম, এছাড়া সংসার চালিয়ে নেওয়ার আর কোন উপায় ছিলো না । একদিকে হাসি চলে যাওয়ার এক অনুভুতি, তারপর দেশের নতুন তত্ত¡বধায়ক সরকারের ব্যবস্থাপনায় নতুন এক অনুভুতি, দুই মিলে আমার জীবনে চলছে এক অস্বভাবিক পরিস্থিতি, অসংলগ্ন এক বন্ধুর পথে, অবাধ গতিতে, পুরা ২০০৭ সাল এবং ২০০৮ সাল, দেশের জন্য এক চরম অস্বস্তিকর পরিবেশ আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আমার অশান্তিময় ব্যক্তিগত জীবন । দেশে চলছে নতুন নতুন ঘটনাবহুল কার্যকলাপ, দুই নেত্রী জেলখানায় আটক, বিশেষ আদালতে বিচারকার্য চলছে, অসংখ্য রাজনীতিবিদ, নেতা, গন্যমান্য ব্যাক্তিত্ব, বিভিন্ন দোষে, বিভিন্ন অপরাধে, বন্ধিদশায় আছেন একদিকে সেনাশাসনের অত্যাচার, অপরদিকে দুদকের সাড়াশি অভিযান, কথায় কথায় হয়রানি, নির্বিচারে আটকাদেশ, নিরপারধ লোকদের জন্য চলছে অপবাধের ফুলঝরি । দেশে আইন থেকেও যেন আইন নাই, চলছে নতুন আইন প্রনয়ন, ভোটার আইডি কার্ড তৈরীর প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশন পুর্নগঠন, পুরাতন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ, সবমিলে সর্বত্র চলছে এক তুলকালাম কান্ড তুঘলকি কারবার । সেনাবাহিনীর পরিচালনায় সারা দেশের লোকজন নতুন ভোটার আইডি কার্ড পেলো, দেশে নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে, নতুন নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হচ্ছে, পুরাতন রাজনৈতিক দলের সংস্কার করা হচ্ছে, বড় দল আওয়ামী লীগ ও বি.এন.পি তে সংস্কারের বাতাস বইছে, নেত্রীদের বিচারের প্রক্রিয়াও চলছে, উভয় দলের বড় বড় নেতা নেত্রীদের আটকাদেশ চলছে, বিচারের প্রহসনে বিভিন্ন মেয়াদে কারাবাসের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, কোটি কোটি টাকা জরিমানা করা হচ্ছে । নতুন কমিশন, যেমন ট্রুথ কমিশন, আইন কমিশন, অর্থ কমিশন গঠিত হচ্ছে, বিভিন্ন সেবামুলক প্রতিষ্টানের দুর্নীতির মুলোৎপাঠনের জন্য চলছে টাস্কফোর্সের তদন্ত, চলছে বিভিন্ন শাস্তির অপব্যবহার । মোটকথা দেশের মানুষ শান্তিতে নেই, সবাই একধরনের আতঙ্কে, এক ধরনের অবিশ্বাসে, ভয়ভীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অবশেষে কিছুদিনের ব্যবধানে দুই নেত্রী জামিনে মুক্তি পেলেন, বেশ কিছু বড় বড় নেতা, রাজনীতিবিদরা জামিন পেলেন, চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পেলেন, দেশে তখন নির্বাচনের হাওয়া বইছে, নতুন ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ি অবশেষে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে, উৎসাহ উদ্দিপনার মাঝে, সন্ত্রাসীর কার্যকলাপের ভিতর, ব্যালেট বক্স ছিনতাই, কেন্দ্র দখল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে, মারামারি, হত্যা ,লুন্ঠনের ভিতরে দিয়ে এক অশান্তিময় শান্তির ভিতর নির্বাচনের কাজ শেষ হলো ।
২০০৮ সালের জুন মাসে, ফারসিমের রির্সাস শেষ হলো, জুলাই মাসের শেষের দিকে থিসিস সাবমিট করতে পারলো, আগষ্টে মাসের মাঝামাঝি পি.এস.ডি থিসিস প্রেজেন্টেশন ও ডিফেন্স এর ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেলো, দুজন বিভাগীয় প্রফেসর, তিনজন ম্যাক-মাষ্টার ইউনিভার্সিটির অন্য বিভাগীয় প্রফেসর, ও দুই জন এক্সটারনাল প্রফেসারের রির্পোটের ভিত্তিতে ফারসিমের পি.এস.ডি ডিগ্রী কনফার্ম হয়ে গেলো । দীর্ঘ ৬ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, দীর্ঘ প্রাতিষ্টানিক প্রক্রিয়া ও ইউনিভার্সিটির কঠোর নিয়ম কানুন মেনে চলে, অনেক ঘাত প্রতিঘাত, এরপর বহু আকাঙ্কিত সেই পি.এস.ডি ডিগ্রীটি ফারসিমের ভাগ্যে জুটল, স্বাভাবিক ভাবেই সবার মনে আনন্দের জোয়ার, খুশির বন্যা, শান্তির নিঃশ্বাস বইতে লাগলো, কিন্তু যে জানলে, যে দেখলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতো, যার হৃদয় জুড়াতো, যার প্রানের ধনের এই স্বীকৃতি, এই অসামান্য সম্মানের ভাগ, সে দেখে যেতে পারলো না, সে ফারসিমের মা, ফারসিমে জন্মদাত্রী, হাসি। এর ভিতর ওদের জীবনে আর একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, যা তাদের শান্তিময় জীবনের এক করুন ঘটনা, ফেব্রুয়ারি মাসে হাসি চলে যাওয়ার পর, মে মাসে ওদের জীবনে এই চরম বিপর্যয় আঘাত হানে, দ্বিতীয় বারের মতো বউমা আবার এক গৌরবময় মাতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হলো, বিদেশ বিভুইয়ে সে এক দুর্যোগ, দুভাবনা সংকটময় মুহুর্ত, একদিকে হাসপাতালে বউমা, নিশ্চল, নিঃস্তব্দ, হয়ে বোবার মতো শুয়ে আছে, অপরদিকে ফারসিম তাদের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটাকে নিয়ে ধর্মীয় উপায়ে দাফন করার প্রস্তুতি নিতে এক সংকটময় মুহুর্ত কাটাচ্ছে। সবকিছুই একসময় সমাধান হয়েছে, সম্পুর্ন হয়েছে, কিন্তু যে প্রক্রিয়ার ভিতর, বিদেশে ফারসিমকে পার হতে হয়েছে, তা সত্যিই এক অবর্ননীয় দুর্দশা, অব্যক্ত এক কান্নার ইতিহাস, চরম এক দুঃস্বপ্নের পরিসমাপ্তি । তারপরেও তারা জীবনে স্বাভাবিক হয়েছে, স্বাভাবিক হতে হয়েছে, আবার জীবন সংগ্রামে উঠে দাড়াতে পেরেছে, সফল হয়েছে তাদের কৃতকর্মের, দেখাতে পেরেছে সমস্ত পৃথিবীকে তাদের অসম্ভব ধৈর্য্যর ইতিহাস, কঠিন অধ্যাবসায়ের অনুশীলনি, আর সৃষ্টিকর্তার উপর অসীম আস্থা । ওরা দেশে ফিরলো, ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে, আমি এয়ারর্পোটে রিসিভ করলাম, বাসা পর্যন্ত এসে বউমার সে এক করুন আর্তনাদ, শুন্য বাড়িতে কান্নার রোল, কি যেনো হারানোর বেদনা, এক অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাস, সবকিছু ছাপিয়ে পারিবারিক এক দুর্যোগের মহোৎসব, কদিন শোকে দুঃখে কাতর বউমা, আচ্ছন্নের মতো কাটিয়ে, আবার উঠে দাড়ালো, সবকিছু ভুলতে চেষ্টা করলো, হারানোর বেদনাকে কাটিয়ে উঠতে চাইলো,বাসার পরিবেশকে শান্ত করতে উদযোগী হলো, কিন্তু তার মনের ভাষা, মুখের অভিব্যাক্তি আমি না বুঝে থাকি কি করে । ফারসিম বুয়েটে জয়েন করলো সহকারী অধ্যাপক হিসাবে, বউমা কদিন ঘোরাঘুরি করে মাস্টার মাইন্ড ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ স্কুলে, সি.এস.ই বিভাগের শিক্ষিকা হিসাবে জয়েন করলো, চললো যার যার কর্মস্থানে নিজ নিজ প্রফেশনে ব্যস্ততার পালা, সময় তো কারো জন্য থেমে থাকে না, ওরা ওদের জগতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো, আমিও আমার পতনোন্মুখ কোম্পানীতে আলোসভাবে সময় কাটাতে লাগলাম।
আমার অফিস থেকে পাওয়া গাড়িটি দিয়ে, আমাদের তিন জনের ডিউটি করা দুষ্কর হওয়া পড়ছিলো তাই ২০০৮ সালে অক্টোবরে আমরা, পরিবারের জন্য নতুন একটা টয়েটা এলিয়ন গাড়িটি কেনা হলো, কিছুদিন পর নতুন ড্রাইভার রাখা হলো, সবকিছুই কেমন আপন গতিতে, গোছালো কিন্তু অবিন্নস্তভাবে চলতে লাগলো । দেশে নির্বাচন পরবর্তী সময়টি আরো অন্ধকার, চারিদিকে বিশৃঙ্খলা, অসংযত আচারন, তত্ত¡বধায়ক সরকারের শেষের দিনগুলি বড়ই অপতৎপরতার ভিতর কাটছিলো, ভোট যুদ্ধে আওয়ামী লীগ জোট দুই তৃতীয়াংশে ভোটে সংখ্যাগরিষ্টতা লাভ করলো, আর অবিশ্বাস্যভাবে বি. এন.পি মাত্র ৩২টি আসন পেয়ে বিরোধিদল হিসাবে সংসদে স্থান পেলো । তত্ত¡বধায়ক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করলো ৯ই জানুয়ারি ২০০৯, তারপর থেকে চলছে আওয়ামি লীগের সরকার, চলছে আজ পর্যন্ত, সংসদ বসলো, আওয়ামী লীগের জয় জয়াকার, জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের আসন দাড়ালো তিন চতুথাংশ, সুতারং সংসদের একক কতৃত্ব আওয়ামী লীগের, বি.এন. পি কখনো সংসদে যায়, কখনো দীর্ঘ অনুপস্থিতি, আসন রক্ষার জন্য আবার যায়, কথা বলার সুযোগ পায় না, বার বার ওয়াক আউট করে, সংসদের বাহিরে নানা রকম বক্তব্য দেয়, কিন্তু গঠনতান্ত্রিক বা উপযুক্ত কোনো বক্তব্য দেয় না, কাজ ও করে না, ফাঁকা বুলি দিয়ে সময় কাটায় । দেশে জিনিসপত্রের দাম গগনচুম্বি, ২০০৭ সালে যে চালের দাম ছিলো ২৫টাকা, তা এখন ৩৫টাকা কেজি, ১৮ টাকার আটা এখন ২২ টাকা কেজি, আর মসুরের ডাল ৮০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা, তবুও মানুষ খেয়ে পড়ে বেঁচে আছে, প্রচন্ড আর্থিক কষ্ট, মনোকষ্ট থাকলেও মানুষের ভিতর কোন উচ্ছাস নেই, কোন শান্তি নাই, কোন প্রতিবাদ নাই, কোন কিছুই বলার ভাষা যেন তারা হারিয়ে ফেলেছে।
২০০৯ সাল, গতানুগতিকভাবে কেটে গেলো, তেমন কোন উলে­খযোগ্য ঘটনা এ বছরে আমাদের পরিবারে আসে নাই, ফারসিম দেশে ফিরে আসায়, সে ও বউমা মিলে বাসায় থাকাতে, বাসাটাতে একটু মানুষের সমাহার বেড়েছে, বউমা তার পছন্দ মতো ড্রয়িং রুম, ডাইনিং রুম, তাদের পড়ার ঘর, তাদের শোবার ঘর, রান্না ঘর, আস্তে আস্তে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত,পুরাতন আসবাবপত্রের বেশির ভাগেই বাতিল হয়ে যাচ্ছে, হাসির সাজানো ঘর, সাজানো সংসার, সব কেমন যেনো বদলে যাচ্ছে, এটাই হয়তো জাগতিক নিয়ম, পুরাতন বদলে যাবে, স্থান নিবে নতুনের স্পশে, তাই আমি কোন কিছুইতেই বাধা দেই না, চেয়ে চেয়ে দেখি, ওরা ওদের মতো করতে থাকুক। আমার জীবন তো শেষ, হাসি চলে যাওয়ার পর থেকে, সবকিছুতে কেমন যেন আস্থা হারিয়ে ফেলেছি, ফারসিম বুয়েটে তার ক্লাস, তার লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত নিয়ে থাকে, বউমা তার মাস্টার মাইন্ড স্কুল, তার ঘর গোছানো, তার সাজ সজ্জা নিয়ে সময় কাটায়, আর আমি আমার পুরাতন কোম্পানীর অধঃপতন বসে বসে দেখি, রাতে খাবার টেবিলে আমাদের দেখা হয়, কোনদিন হয়তো দেখা হয়, কোনদিন হয় না, সারাদিন যে যার মতো নিজের জগতে ব্যস্ত থাকে, পারিবারিক নিমন্ত্রনে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমরা একসাথে যাই ও একসাথে থাকি । ২০১০ সালের প্রথম দিকে ফারসিম ও বউমা কক্সবাজার যাওয়ার প্রোগ্রাম করলো, আমাকেও জোর করে সঙ্গে নিলো আমার শত আপত্তি সত্বেও, আজকাল আমার চলাচলের বেশ অসুবিধা হয়, আগের মতো হাঁটতে পারি না, পায়ের হাটুর আর্থাইটিস এই সময় খুবই বেড়েছে, তবুও বউমা টেনে হেচড়ে আমাকে কক্সবাজার নিয়ে ছাড়লো। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত, আমার পুরাতন পরিচিত জায়গা নিরিবিলি হোটেল, হোটেল সায়মন, আরো নতুন নতুন বেড়াবার জায়গা ঘোরা হলো, মেরিন ড্রাইভ রাস্তা ধরে ইনানি সি বীস যাওয়া হলো, হিমছড়ির পানির ঝরনা দেখা হলো, আরো দুরে টেকনাফ পর্যন্ত যাওয়া পড়লো, সেখানে থেকে জাহাজে করে নিযুম দ্বীপ ঘুরে আসা হলো, ৩/৪ দিন বেশ কাটলো, কিন্তু সবখানে আমি হাসির স্মৃতি অনুভব করতে লাগলাম, স্মৃতির মনিকোঠায়, ৩২বছর আগে, হাসিকে নিয়ে প্রথম কক্সবাজার আসার স্মৃতি ঝলঝল করতে লাগলো, তখন ফারসিমের বয়স ছিলো মাত্র ৪বছর । কক্সবাজারে বেড়াবার সমস্ত পরিকল্পনা বউমার, ওরা দুজনেই গেলেই পারতো, আসলে সেটাই হতো স্বাভাবিক, কিন্তু বউমা আমাকে বাসায় একা রেখে গেলো না, এটা বউমার বদান্যতা, আজকাল কার আধুনিক ছেলেমেয়েদের আচরন থেকে ভিন্ন, আসলেই বউমার পারিবারিক সৌহার্দ্য রাখার এক অদম্য স্পৃহা ।
এরপর আসলো ২০১০ সাল আমার ও আমার পরিবারের জন্য এক অভিশপ্ত বছর, অনেক ঘটনাবহুল ঘটনার সমাহার, তার ভিতরে সুখস্মৃতি থেকে দুঃখের স্মৃতিই বেশি, আসলে সুখের পর দুঃখ, দুঃখের পর সুখ, এটাই বিধির বিধান, ওরা, পর পর আসে, একের পর এক আসে, কেউ কাউকে ছেড়ে থাকে না, তাই আমাদের জীবনেও নিরবছিন্ন সুখ ও সব সময় থাকে না, আবার নিরবচ্ছিন্ন দুঃখও সব সময় থাকে না । মে মাসে ফারসিম ও বউমা আমাকে একটা আনন্দের খবর দিলো, আমিও মুহুর্তেই উদ্বেলিত হয়ে উঠলাম, পরম আশায় বুক বাধলাম, ভবিষ্যতের মহা সম্ভবানর দিন গুনতে লাগলাম, সাবধানতার উপর সাবধানতা মানতে লাগলাম, কোনকিছুতেই যেন ভুল না হয়, তার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা হলো, জুলাই মাস থেকে বউমা খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লো, প্রথম থেকেই দেশের সুবিখ্যাত হাসপাতালের, সুবিখ্যাত ডাক্তারের পরামশের্, দিনের পর দিন সময় কাটতে লাগলো, ফারসিম অর্থের দিকে চাইলো না, যখন, যেভাবে, যতটুকু প্রয়োজন মুক্ত হস্তে খরচ করতে লাগলো, কোনকিছুতেই একটু কমতি রইলো না । জুলাই মাস থেকে বউমাকে শয্যাশায়ি হয়ে থাকতে হলো, উঠাবসা নিষেধ, চলাফেরা নিষেধ, উচ্চস্বরে কথা বলা নিষেধ, নড়াচড়া করা নিষেধ, এ এক অসস্তিকর পরিস্থিতি, অস্বাভাবিক পরিবেশ, আমার বাসায় যতেœর অভাব হবে বলে, বউমাকে তার মায়ের বাসায় পাঠানো হলো, পরবর্তী ৪ মাস মায়ের যতেœ সময় কাটতে লাগলো, ফারসিম প্রতিদিনেই কিছুটা সময় বউমার পাশে কাটাতো আর আমি সময় পেলেই সপ্তাহে ২/৩ বার অব্যশই যেতে থাকলাম, আর পরম অপেক্ষায় ভবিষতের দিকে চেয়ে রইলাম । কিন্তু আমাদের জীবনে, “অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়া যায়” এই উক্তিটি কঠোর সত্য হিসাবে সব সময় ফলেছে, তাই আশার আলো আমরা দেখতে ভুলে গেছি, আশা নিরাশার দৌদুল্যমান অবস্থায় আমাদের দিন কাটে, সময় কাটে, অপেক্ষার পালা শেষ হয় না ।
ভ্যান্টেজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনষ্ট্রাটকশনের এম.ডি হিসাবে আমার বিশ মাসের বেতন সমান ১০ লাখ টাকা বাকি পড়েছে, তারপর গাড়ি মেরামত ও জ্বালানি খরচ বাবদ ৭৫ হাজার টাকা পাওনা, প্রতি মাসে ড্রাইভারের বেতন পরিশোধ করা বাবদ আরো ৫০ হাজার টাকা মোট প্রায় ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বিরাট অংক কোম্পানীর কাছে আমার পাওনা, আর ধৈর্য্য ধারন করা সম্ভব হলো না, জানি কোনদিন এই টাকা পাবো না, তবুও সবকিছুর মায়া ছেড়ে এপ্রিল মাসের ১ তারিখ থেকে দীর্ঘ ছুটির আবেদন করলাম, তারপর তিনমাস পর জুলাই মাস থেকে চাকুরীতে ইস্তফা দিলাম, দীর্ঘ নয় বছর চাকুরীর জোর করে পরিসমাপ্তি টানলাম । জানি এখন থেকে আমার জীবন হবে চরম অনিশ্চয়তাময়, আর উদ্দেশ্য বিহিন ভবিষ্যৎ, তবুও নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলাম, কাজ ছাড়া বসে থাকার মানুষ আমি না, তাই সপ্তাহখানেক বাসায় বসে থেকে হাফিয়ে উঠলাম, শুরু করলাম আইনুল হক সাহেবের অনুমতি নিয়ে, তার অফিসে যাওয়া আসা, কথা বার্তা ও বসে থেকে সময় কেটে যায়, হক সাহেবের কোম্পানী কোন কাজে লাগতে পারিনা, ঠিক আমার জন্য যুতসই কোন কাজও ঐ মুহুর্তে হক সাহেবের কোম্পানীতে ছিলো না । তাই নতুন এক ধরনের কাজে ব্যস্ত থাকতে চাইলাম, কাজটি বই লেখা, ফারসিম অনেক দিন ধরে আমাকে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপর আমার আজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বই লিখতে বলে আসছিলো, এতদিন সুযোগ পেয়ে সময়ের সদ্ধব্যবহার শুরু করলাম, আমি লেখক হয়ে গেলাম, আমার লেখা প্রথম বই, বাংলা ভাষায় লেখা ,তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, আমার আজীবনের কর্মবহুল সময়, আমার সহস্তে নাড়াচাড়া যন্ত্রপাতি, আর আমার ৪৩ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বইটি এখনও লিখে চলেছি, জানি না আমার জীবদশায় শেষ করে যেতে পারবো কিনা ।
১২ই অক্টোবর ২০১০ সাল, আমাদের পরিবারের জন্য কালরাত্রি, সবচেয়ে বিপদসঙ্কুল সময়, রাত প্রায় ১২টা আমি তাহাজ্বতের নামাযের অপেক্ষায় জেগে আছি,হঠাৎ আমার টেলিফোন টা বেজে উঠল, অপর প্রান্তে বউমার গলা, আসন্ন বিপদের ঘনঘটার আভাস টের পেলাম, ফারসিমকে চাইলো, ও তখন নামাযে ছিলো, কি কথা হলো শুনলাম না, দেখলাম ফারসিম হতদন্ত হয়ে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো, শুধু বলে গেলো, এখনি হাসপাতাল যেতে হবে, চরম বিপদের আশঙ্কা বুঝতে পারলাম, এখন শুধু কষ্টদায়ক অপেক্ষার পালা । ও প্রান্তে মোল্লা সাহেবের উৎকণ্ঠার গলা, এম্বুলেন্স ডাকা হয়েছে, বউমাকে নিয়ে এপোলো হাসপাতালে এম্বুলেন্স পৌছলো রাত দেড়টায়, চরম দুুঃসময় আমাদের জন্য, ওদিকে হাসপাতালে নানাবিদ আধুনিক চিকিৎসার কলাকৌশল, আমি বিছানায় শুয়ে বিনিদ্র রজনি দুশ্চিন্তায় কাটাচ্ছি, ফলাফল কি হবে জানি না, একদিকে বুক ভরা আশা, অপরদিকে না পাওয়ার বেদনা, আর মনের ভিতর একটাই চিন্তা, আশার ছলনে কি ফল লোভিনু । এভাবে রাত কেটে গেলো, কাউকে টেলিফোন করে খবর জানতে ভয় পাই,কি জানি কোন দুঃসংবাদ শুনতে হয় কিনা, অচিরেই শোনা গেলো ফজরের আযানের ধ্বনি, একটা চাপা বেদনা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায়, কিছুটা শান্তির নিঃশ্বাস নেবার অপেক্ষায়, আগেভাগেই মসজিদের পথে পা বাড়ালাম, নামায শেষে বাসায় ফিরতেই দেখি, ড্রাইভার চাঁন মিয়া এসেছে, গাড়ি বের করার ব্যবস্থা চলছে, ফারসিম প্রস্তুত, আমাকে বললো, চলো হাসপাতালে যেতে হবে, ওর মুখের দিকে চেয়ে আমার বুঝতে বাকী রইলো না, এখন আমরা কোন ঘটনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি । “নিরাশ হইও না বান্দা, মোমেন যদি হও”, এই কথায় বিশ্বাস রেখে এপোলো হাসপাতালে পৌছালাম, তিন তলায় জরুরী বিভাগ, মোল­া সাহেব চরম দুঃসংবাদটি অকপটে জানালো, এপোলো হাসপাতালের তিনজন অভিজ্ঞ ডাক্তার, ডজন খানেক প্রশিক্ষন প্রাপ্ত নার্স, আর সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি, আমাদেরকে চরম পরিনতি হতে রক্ষা করতে পারে নাই, বুঝলাম সব শেষ হয়ে গেছে, দেখলাম বউমা অপলক দৃষ্টিতে, বোবার মতো ছাদের দিকে চেয়ে আছে, তার কোন অভিব্যাক্তি নাই, নেই কোন বঞ্চনার কষ্ট, ফ্যালফ্যাল করা, শুকনো চোখের চাহনিতে সবকিছু হারানোর বেদনা ,আর দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ার শারীরিক কষ্টের এক অশান্ত অস্বাভাবিক পরিনতি । বউমার মা আড়ালে মুখে কাপড় দিয়ে কাঁদছে, ফারসিমের অভিব্যাক্তি বোঝা ভার ও যেনো আরো কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে, ঝড় থেমে যাওয়ার পর প্রকৃতির যে এক অস্বাভাবিক, অশান্ত, নির্বিকার মুর্তি হয় তা তার সারা মুখে লেপন হয়ে আছে, আমরা কেউ কাউকে কোন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি । কিছুক্ষন পর কড়িডরে গিয়ে বসলাম, অপেক্ষায় রইলাম প্রধান ডাক্তার আসার, সকাল ৮টার দিকে ডাক্তার আসলো ভাবগম্ভীর পরিবেশ, ডাক্তারের চোখে মুখে উবিগ্নতার ভাব, কিছুটা অপরাধবোধ, কিছুটা ব্যর্থতার অস্পস্ট ছায়া, আমাদেরকে সঠিক ভাবে বোঝাতে পারলো না যে, সঠিকভাবে কি ঘটছে, তবে নিজেকে অপরাধি ভেবে স্পস্ট করে কথা না বলতে পারার দৃশ্য দেখে, আমরা যা বোঝার বুঝে নিলাম, মোল­া সাহেব শুধু প্রশ্ন করলেন, এই ঘটনা থেকে আমাদের কতটুকু পাওনা, কতটুকু শিক্ষা, কতটুকু প্রাপ্তি, সবকিছুর সমিকরন করে, ভবিষ্যতে কি করনীয়, তার জন্য আরো অভিজ্ঞ ডাক্তার, আরো বড় হাসপাতালের পরামর্শ, ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য বোর্ড বসানোর অনুরোধ জানিয়ে, ডাক্তারের সামনে থেকে আমরা চলে আসলাম । এরপর আসলো আমাদের জন্য সবচেয়ে কষ্টকর মুহুর্ত অপরিনত দুটি শিশুর ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া, ও দাফনের ব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত উপকরনে সজ্জিত করা, আমাদেরকে ভিতরে নিয়ে নিস্পাপ দুটি শিশুকে দেখানো হলো পুর্ন অবয়ব বিশিষ্ট, দুটি মানব শিশু, আকারে ছোট, কিন্তু সব অঙ্গপ্রতঙ্গ বিদ্যমান, এমনকি মাথার চুলও তারা পৃথিবীর আলো দেখা থেকে বঞ্চিত হলো, বিধাতার এক অমোঘ নির্দেশে । জাহিদুলকে টেলিফোনে বুদ্বিজীবি গোরস্থানে দাফন করার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়ে, আমি আর মোল্লা সাহেব সাদা কাপড়ে মোড়ানো, একটি ছেলে একটি মেয়ে শিশুর লাশ নিয়ে, আমরা বেসমেন্ট রক্ষিত গাড়ির দিকে এগুচ্ছি, আমাদের পিছে পিছে মানব শিশু দুটির অধম পিতা ফারসিম, বেলা ১২টার ভিতর ছোট ছোট দুটো কবরে ছোট দুটো শিশুর লাশ দাফন করে আমরা বাসায় ফিরলাম, হাসপাতালে পড়ে রইলো ভাবলেশহীন চোখে চেয়ে থাকা, বার বার মাতৃত্ব বঞ্চিত, আমার প্রিয় বউমা যার তো কোন দোষ নেই, যার কষ্টের সীমা নেই, এমন এক অবুঝ মায়ের ব্যাথা কি বুঝবে, কোন মানব হৃদয়, না কেঁদে পারবে কি কোন সমাজ, একবারও কি কেপে উঠবে না সৃষ্টিকর্তার আরশ ।
বউমার সামনে গিয়ে দাড়ানোর ভাষা আমার নাই, একদিন পর যখন আমি গেলাম, বউমার সেকি কান্না, ডুকরে ডুকরে কাঁদছে এক বঞ্চিত মা ,যার চোখে কান্নার সাগর, যার মনে হারানোর বেদনা যার মুখে দৃঢ়তার ছাপ, জীবন সংগ্রামে আবার উঠে দাড়ানোর প্রয়াস, সবমিলে চারিদিকে হাহাকার । এরপর কতো রজনি যে আমাদের যে বিনিদ্র কেটেছে, কত সময় যে আমরা চিন্তায় কাটিয়েছি ,কতো প্রহর যে আমরা ব্যর্থতার ইতিহাস পর্যালোচনা করেছি, তার সীমা নেই ,তার শেষ নেই, পরের কয়েকটি মাস পুরা পরিবারের উপর যে বিষাদের ছায়া এসে পড়েছে, তা থেকে শত চেষ্টা করেও পরিত্রান আমরা পাই নাই, হয়তো কোনদিন পাবোও না, সেই দিক দিয়ে হাসি কত ভাগ্যবতি, সে এইসব পার্থিব দুঃখ বেদনার অনেক উর্দ্বে, সে অন্য জগতের বাসিন্দা হয়ে গেছে । পরের কয়েকটি মাস আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হলো, বউমা শারীরিক সুস্থতার জন্য, মানসিক পরিচর্যার জন্য, আর সামাজিক শান্তনার জন্য, আস্তে আস্তে সবই সয়ে আসবে, হয়তো একদিন আমরা এ শোক ভুলে যাব, কিন্তু বউমার অন্তরের ক্ষত, কি কোনদিন শুকাবে কোনদিনকি এর পরের তার জীবনের পরিনতি কোন দিকে যাবে, কেউ কি বলতে পারবে, তাই সবাই ভবিষ্যতের শেষ পরিনতির, শেষ শুভতম আশা, লালন করে আমরা পরিবারের তিনটা প্রাণী বুক বেঁধে অপেক্ষায় আছি।
২০১০ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, হক সাহেবের শান্তিনগরের অফিসে যাতায়াত করে চলেছি, আর তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বইটি লিখে সময় কাটাচ্ছি, কিন্তু গত ছয় মাসেও, হক সাহেবের, শাহ ইলেকট্রিক কোম্পানীতে কোন বড় কাজ পাওয়া গেলো না, কয়েকটি বড় বড় কাজ আসবে আসবে করে,নেগোসিএশনের প্রায় শেষ পর্যায় এসোও পাওয়া গেলো না । এই সময়টিতে, হক সাহেবের অফিসের উপর আমি বোঝার মতো হয়ে রয়েছি, কিন্তু হক সাহেব তা আমাকে বুঝতে দেয় নি, আমাকে অনেক সম্মান করে, তার নিজের ব্যবহৃত ঘর, নিজের চেয়ার, নিজের টেবিল, এমনকি টেবিলের একটি ড্রয়ার আমার জন্য আলদা করে ব্যবহার করতে দিয়েছে, সত্যিই আমি তার জন্য কৃতজ্ঞ, আজকাল কার দুনিয়ায় কয়জন এমন পাওয়া যায়, আমার নিজের উপর যথেষ্ট আস্থা আছে, আমার যে ফেস ভ্যালু আছে, একটা কোম্পানীর জন্য তা বড় কাজ পেতে সাহায্য করবে, কিন্তু বাস্তবে তা হলো না । অবশেষে অনেকদিন ধরে আলোচনার পর আমিনবাজার থেকে মেঘনাঘাট পর্যন্ত ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইনের কাজটি পাওয়া গেলো, এবং তার কিছুদিন পরেই সিদ্ধিরগঞ্জ ২৩০ কেভি সাবস্টেশনের কাজটিও পাওয়া গেলো, পর পর দুটি বড় কাজ পাওয়াতে কাজ করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে বিধায়, অর্থের যোগানদার হিসাবে বড় পার্টি বা পাটনার খোজা শুরু করলো, অবশেষে জেনারেল গোলাম মাওলা ও ক্যাপ্টেন জলিল প্রমুখদের সাথে আলোচনা করে ৭ জন মিলে একটা লিমিটেড কোম্পানী তৈরী করা হলো, নাম শাহ এন্ড এসোসিয়েটস লিঃ ঠিকানাঃ বাড়ি নং:৫৫, রোড নং:৬, বনানী, এই অফিসটি আগে থেকেই ক্যাপ্টেন জলিল ব্যবহার করতো, ওটা এখন শাহ এন্ড এসেসিয়েটস লিঃ এর অফিস হিসাবে পরিচিত হলো । শুরু হলো অফিস ডেকেরশনের কাজ, ৭ জন পরিচালকের বসার ব্যবস্থা, কর্মচারী স্টাফদের বসার ব্যবস্থা, ইত্যাদি সব মিলে মোটামুটি গুছিয়ে নেওয়া হলো। কোম্পানীতে আমার অংশীদারীত্ব ১০% , এতদিনে মনটা কিছুটা হালকা হলো, ১০% শেয়ার হলে কি হবে তবুও নিজের কোম্পানী, এটাতে আনন্দ, এটাতে সন্তুষ্টি। কোম্পানী রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স, ইনকাম ট্রাক্স, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, জয়েন ষ্টক কোম্পানীতে লিপিবদ্ধ করতে মাসাধিক কাল সময় লেগে গেলো, এবং ১২ই অক্টোবর ২০১০ সাল থেকে কোম্পানীর কার্যক্রম চলতে লাগলো। কোম্পানীর প্রথম কাজ সিদ্ধিরগঞ্জ ২৩০ কেভি সাব ষ্টেশনের কাজ, শাহ এন্ড এসোসিয়েটস লিঃ এর নামে কোরিয়ান কোম্পানি জি.এস. ই এন্ড. সি এর সঙ্গে চুক্তি সাক্ষরিত হলো, এবং কাজটির দেখাশুনার ভার পড়লো আমার উপর । আমার নিজের চলাচলের অসুবিধা হলেও আমি নিয়মিত ১০ থেকে ৫ টা অফিস করতে লাগলাম, সাইট ইঞ্জিনিয়ার, সাইট সুপারভাইজার ইত্যাদি লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হলো, এবং সুচারু রুপেই কাজ তার আপন গতিতে চলতে লাগলো, অনেকদিন পর নিজেকে আরো দায়িত্ববান, আরো কর্মচঞ্চল হিসাবে নিজেকে ভাবতে শুরু করলাম । সবচেয়ে উলে­খ করার বিষয়, ভ্যান্টেজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশনের মতো একটা অভিশ্প্ত কোম্পানী হতে থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলাম, জানি, জিয়া সিদ্দিকি সাহেব কখনই আমাকে আমার পাওনা ১১ লাখ টাকা ফেরত দিবে না, তবুও মনের শান্তি ছিলো যে আমি পাওনাদার আর জিয়া সিদ্দিকি সাহেব দেনাদার, অফিস থেকে আমার ব্যবহৃত গাড়িটা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম, ওটার মালিকানার নাম পরিবর্তন করতে গিয়ে আর এক বার বুঝলাম জিয়া সিদ্দিকি সাহেব কত বড় ধুরন্দর । কত লোকের টাকা মেরেছে, কতো কর্মচারীর মাসের পর মাস পাওনা বেতনের টাকা দেয় নাই, কত ঠিকাদারের কাজের বিল উনি পরিশোধ করেন নাই, উনি মেরে দিয়েছেন, দেওয়ার মতো সামর্থ্য ও উনার নাই, এই অবস্থাতেও উনি আমার সাথে শেষ খেলাটি খেললো, গাড়ির কাগজ পত্র সই করাতে গেলে, উনি আমার কাছ থেকে, কোন পাওনা নাই এই মর্মে একটা সার্টিফিকেট চেয়ে বসল । ১৯৯৯ মডেলের গাড়ি, ২০০৩ সালে রেজিস্ট্রেশনকৃত, আট বছরের পুরাতন গাড়ি, যার বাজারদর ৪ লাখ টাকার উপরে হবে না, তার পরির্বতে জিয়া সিদ্দিকি সাহেব আমার কাছে ১১লাখ টাকার, কোন পাওনা নাই সার্টিফিকেট চেয়ে বসলো, কি অভিনব প্রতারনা, সুন্দর চেহেরার আড়ালে, মিস্টি কথার ছলনায় কি অসম্ভব ফটকাবাজি, কত নিচ মনের পরিচয়, তা জিয়া সিদ্দিকি সাহেব আর এক বার প্রমান করলো । আমি কোন বাক্য ব্যয় করলাম না, এমনকি জিয়া সাহেবকে জিজ্ঞাসা ও করলাম না, আমি আপোষে না দাবি পত্রে স্বাক্ষর করে দিলাম, আমার ২০ মাসের কষ্টার্জিত বেতনের টাকা, আমার রক্ত পানি করা পরিশ্্রমের মজুরী, আমার দিনের পর দিনের ঘাম না শুকানোর মূল্য, জিয়া সাহেব এভাবে দিলো, কিন্তু তাতে আমার বিন্দু মাত্র আক্ষেপ নাই, আমার একটাই শান্তনা যে আমার সৃষ্টিকর্তা আমাকে অনেক দিয়েছে, এবং আমাকে খারাপ রাখেনি, এমনকি জিয়া সাহেবের তুলানায় শান্তিতে আছি ।
জীবনে এমন একটি সময়ে, আমি এসে পৌঁছেছি, যখন মাঝে মাঝে বসে থাকলেই জীবনের হিসাব নিকাশের খাতাটা সামনে এসে যায়, অবচেতন মনে হিসাব করতে বসে যায়, স্বল্প পরিসর এই জীবনে কতটুকু পেলাম, আর কতটুকু হারালাম। হাসি চলে যাওয়ার পর থেকে যে শুন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পুরন করতে আতœীয় স্বজন, শুভাকাঙ্খি, বন্ধুবান্ধাব, এক সময় উঠে পড়ে লেগেছিলো কিন্তু একটা অযাচিত সমস্যা, একটা অবর্ননীয় যন্ত্রনা, একটা অভিশপ্ত জীবন বেছে নেওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছি, পারিনি হাসির জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে, তাইতো এখন জীবন সায়হ্নে, আমি একা থেকে আরো একাকি পড়েছি, আশেপাশে কাউকেও আমি পাই বলে মনে হয় না, আমার কাছের কোন মানুষকে আর কাছের মানুষ মনে হয় না। একমাত্র সন্তান ফারসিম তার নিজের জীবন নিয়ে, তার সংসার নিয়ে, তার সন্তুষ্টি নিয়ে ,তার পরিবার নিয়ে, তার চিন্তায় সে ব্যস্ত, বউমা তার দুঃখ, কষ্ট ,না পাওয়ার বেদনা, জীবনের চাহিদা ও তার প্রাপ্তি এসব হিসাব নিকাশ মেলাতে ব্যস্ত ,আমার আপনজনের ভিতর একমাত্র ছোটবোন, তার নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত আর মাঝে মাঝে আমার খোজখবর করা এমন দায়সারা গোছের দায়িত্বপালন, একদম ছোট ভাইটি যে তার নিজের জগতে নিয়েই সারাক্ষন ব্যস্ত, তাকে নিয়েই আমার কোন আক্ষেপ নাই। আর আমার পরের ছোট ভাইটি, যার সাথে আমার নিত্যদিন চলতো সলাপরামর্শ, যার সঙ্গে করতাম সবধরনের আলোচনা, সব ধরনের পরামর্শ, প্রয়োজন, অপ্রয়োজনে যখন আমরা পারিবারিক সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম, তখন সে নিরব সমর্থকের মতো আমার পাশে থাকতো, যেকোন অবস্থায়, যেকোন সমস্যায়, তার সাথে মনের আদান প্রদান চলতো, যদিও সে ছিলো চাপা প্রকৃতির, তবু তার জগতে সে ছিলো সমুজ্জল, তার পরিবেশে সে ছিলো আকর্ষন, তার মহল­ায় সে ছিলো অনুকরন যোগ্য, তার পরিবারের কাছে সে ছিলো আদর্শ । বয়সে আমার থেকে সে ৭ বছরের ছোট, ছোট বেলায় শাসন করার জন্য, অনেক মারধর করেছি, তাকে কিন্তু পরিনত বয়সে সে ছিলো আমার বন্ধুর মতো, বিশেষ বিশেষ কতোগুলো অদ্ভুত খেয়াল তার মধ্যে ছিলো, আর পেশাতে সে ছিলো একজন আইটি বিশেষজ্ঞ, জীবনে সে যখন পরিপুর্নতা পেলো, তখন সে পরিবারসহ হজ্বে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো, এবং ২০১০ সালে ৭ই নভেম্বর সে পুন্য ভূমি মক্কা শরীফে পৌঁছালো, ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত হজ্বের সব আনুষ্ঠানিকতা সর্ম্পুন করলো । যখন সামান্য কিছু অনুষ্ঠানুকতা বাকি আছে, তখন সে যখন বিশ্রামে, তখন হঠাৎ করেই সে অসুস্থ পড়লো, তারপর আধঘন্টা সময়, তারপর সব শেষ, প্রচন্ডতম হার্ট এ্যাটাকে ভাইটি আমাদের ছেড়ে চলে গেলো, ঐ মুহুতে আমি এশার নামাযে, মসজিদ থেকে ফিরে আসতেই ফারসিম আমাকে হঠাৎ করে বসতে বললো, আস্বাভাবিক প্রশ্ন ,ফারসিম বুঝতে পেরে বললো ,একটা দুসংবাদ আছে, তারপর সেই চিরাচরিত শব্দ, চাচা আর নাই, থমকে যাওয়ার মতো খবর, অবিশ্বাস্য, তবুও চিরন্তন সত্য । রাতেই ছুটলাম ওর আত্মীয়ের বাসায় যেখানে ওর একমাত্র সন্তান আছে কোরবানীল ঈদের আগেরদিন, বাংলাদেশের রাত্রি চারিদিক জমজমাট, কোরবানীর পশুর কেনাবেচা চলছে, আর আমরা বসে আছি এক অলঙ্ঘনীয় খবরের সত্যতা যাচাই করতে, দুঃসংবাদ বেগে দায়, কথাটি যে কতো বড় সত্য, কিছুক্ষনের মধ্যে জানা গেলো, মিনার অদুরে এক রেস্টহাউজে সদ্য হজ্বব্রত শেষ করা আমার ছোট ভাইয়ের মতিনের নিথর দেহে পড়ে আছে, পাশেই রোরুদ্যমান, বিলাপরত তার স্ত্রী নাসিমা, আতœীয় পরিজন বিবর্জিত অবস্থায়, একমাত্র সন্তানকে বাংলাদেশে রেখে, স্বামীর দেহটি আগলে রেখেছে, সৌদি কতৃপক্ষের অনুমতির অপেক্ষায় । নানা রকমের ফর্মালিটি, ডাক্তারী পরীক্ষা,পুলিশি রির্পোট, দাফনোর অনুমতি, স্থান ,সময়, সবকিছু সিদ্ধান্ত দেবার অপেক্ষায় ,লাশ তারা নিজেদের তত্ত¡াবধায়নে মরচুয়ারিতে নিয়ে গেলো, কোথায় দাফন করা হবে এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে আতœীয় স্বজন, সব শেষে মক্কাশরিফে দাফনের অনুমতি পাওয়া গেলো, পরদিন বাদ জোহরে, হারেম শরীফে ১৪ লাখ হাজির উপস্থিতিতে জানযা হলো, এবং হেরা পর্বতের পাদদেশে জান্নাতুল-মাওয়া কবরস্থানে সমাহিত করা হলো, বড় পুন্যবান সে, পুন্য কাজে এসে, পুন্য স্থানে, কেয়ামত পর্যন্ত থাকার একাছত্র অনুমতি সে সৃষ্টিকর্তার কাজ থেকে আদায় করে নিলো । আর আমরা তার নিকটজন, শোক সন্তপ্ত আত্মীয় স্বজন,একমাত্র সন্তান, বন্ধু বান্ধাব, শুভাকাঙ্খি এক নিরব অসহ্য যন্ত্রনায়, বুক ভাঙ্গা আর্তনাদে, তার কবর থেকে সহস্র যোজন দুরে, বিলাপ করতে লাগলো, সিদ্ধান্ত হলো, ওর স্ত্রী নাসিমা বাকী কটা দিন মদিনা শরীফে, রওজা মোবারক জিয়ারত করে অন্যান্য হাজীদের সাথে দেশে ফিরবে।
কি নিদারুন পরিনতি, পরিবারে বাবা মা সহ ৬ জনের সংসার ছিলো, সময়ের বির্বতনে, তিন জন অদৃশ্য হয়ে গেলো, ঐ স্মৃতি নিয়ে বাকী তিন জন, কালের নিষ্টুর নিয়মে জগত সংসারে, কিছু স্মৃতি, কিছু চিহ্ন ,কিছু দুঃস্বপ্ন নিয়ে নিয়তির খেয়ালের উপর অপেক্ষায় রইলো। তাই বলি, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখনি বা বেশির ভাই সময় একাকী থাকি, এই সব দুঃসহ মুহুর্ত, অবুঝ মনকে আস্টেপৃষ্টে বেধে ফেলতে চায়, আর অনাগত ভবিষতে দিকে চরম বিষ্ময়ে অপেক্ষা করে, কার যাওয়ার সময় কখন হবে । যে জীবনকে ঠেলে ঠেলে ৬৭ বছর পর্যন্ত নিয়ে আসতে পেরেছি সে জীবন যেন আর চলতে চায় না, শারীরিক অসুস্থতা আস্তে আস্তে মনের সুস্থতাকে গ্রাস করতে চায় বেচে থাকার শত আশা, আস্তে আস্তে নিঃশেষ হতে চায়, ইদানিং পায়ের দুই হাটুর সমস্যা প্রকট আকার ধারন করছে, চলাচল করতে খুবই কষ্ট হয়, বিশেষ করে সিড়ি দিয়ে নামতে ও উঠতে, দাড়িয়ে থাকতে আরো অবর্ননীয় কষ্ট হয়, গাড়ি ছাড়া চলাচল আসাধ্য, রিকসায় উঠতে পারি না তবুও খুড়িয়ে খুড়িয়ে, প্রতিদিন ফজরের নামাযে মসজিদে যাই, এশাতে ও যাই, কোন রকমে পা ভাজ করে নামাযে বসি, কষ্ট হয় তবুও হাল ছাড়ি না। ২০০৬ সালে দিল্লীর ডাক্তার দু হাটুর অপরাশনের পরামর্শ দিয়েছিলো, তখন হাসি অপরাশন করাতে দেয় নাই,বলেছে, আল্লাহর দেওয়া দেহটা কেঁটে ছিড়ে কেন নষ্ট করবে, ডাক্তার ফারুক ভাই ও ডাক্তার আজিজুল কাহহার সবাই সে সময় মানা করছে, কিন্তু ৫ বছর পর এখন সবাই অপরাশন করাতে একমত, কষ্টে আবর্তিত আমি ভাবি, যা হয় একটা হয়ে যাক, বউমা কিছুটা আমার কষ্ট বোঝে, কিন্তু ফারসিম শুনতে চায় না, বুঝতে চায় না, ও মনে করে অপরশন করলে আরো খারাপ হবে, হয়তো পঙ্গু, স্থবির হয়ে পড়বো। নিজে খোজ খবর নিয়েই জেনেছি, আমেরিকায় দুই হাটুর অপরাশন এর খরচ ২৮ লাখ টাকা, সিঙ্গাপুরে এক হাটু ১২ লাখ, দুই হাটু ২১ লাখ টাকা আর, ঢাকায় দুই হাটু ৫ লাখ টাকা, ডাক্তার আজিজুর কাহহার বলেছে, দিল্লীতে অপরশন করাতে, দিল্লীর খরচ এখন জানতে পারি নাই অপেক্ষায় আছি, হয়ত একদিন জানবো, দিল্লীতে অপরাশন করার ইচ্ছা আমার নাই, বিদেশ বিভুঁইয়ে কে আমার সঙ্গে থাকবে ।
মানুষের জীবনের যে অবস্থা তা যদি মানব জানতে পারে, তাহলে আগে থেকে সে প্রস্তুত হয়ে, সব কাজ সমাপ্ত করে, মসজিদে গিয়ে পড়ে থাকতো, তেমনি করে আমিও বুঝি না আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত কত দিনের, তাই জীবনের এই সময়, শারীরিক এই অবস্থায়, অপেক্ষায় আছি জীবনের শেষ পরিণতির জন্য। আমার জীবনের চাওয়া পাওয়ার আর কিছু বাকি নাই, অনেক পেয়েছি, অনেক ভোগ করেছি, অনেক দুঃখ, অনেক যন্ত্রনা ভোগ করেছি, এখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, আমি জীবন সংগ্রাম অবস্বাদ গ্রস্ত, চেষ্টা করেছি জীবন ভর মানব জীবনের কর্তব্য পালন করতে, নিজের জীবনের প্রতিশ্র“ত লক্ষে পৌছাতে, নিজের পরিবারের অভিষ্ট ,লক্ষে পৌছাতে, ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য কিছু ছিটেফোটা রেখে যেতে, তার কতটুকু পেরেছি, আমি সে বিচারের ভার ভবিষ্যতের হাতে রেখে গেলাম। তবে নিজের জ্ঞাতস্বরে কোন অন্যায় করিনি বা করতে চাইনি, নিজের পিতামাতার প্রতি কর্তব্য নিজের সন্তুষ্টি মোতাবেক করতে পারেনি, নিজের বংশধর দের তাদের চলার পথের জন্য সুশিক্ষা দিতে চেষ্টা করেছি, কাউকে ঘৃনা করিনি, বরং ঘৃনিত হয়েছি, কাউকে ঠকাতে চাইনি, বরং ঠকেছি, তাই জীবনের শেষ দিন গুলিতে আক্ষেপ নাই, আমার কোন আশা নাই, আমার কোন চাহিদাও নাই, সৃষ্টিকর্তার কাছে শুধু একটায় চাওয়া, যে সুন্দরভাবে তিনি আমাকে ধরায় এনেছিলেন যে সুন্দর ভাবে জীবন সংসারে প্রতিপালন করছেন, তেমনি সুন্দর ভাবে, শান্তিতে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটান।

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

<