বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কঃ পার্ট-২

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কঃ পার্ট-২ আগস্ট ১৩, ২০১৭ ০ comments

সরদার জাহিদুল কবীর: গাজীপুরের শালবন ঐতিহাসিকভাবে ভাওয়াল রাজার জমিদারী অংশ হিসেবে খ্যাত ছিল। ১৯৫০ সালে জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাসত্ব আইন জারীর পর শালবনের ব্যবস্থাপনা বন বিভাগের নিকট হস্তান্তর করা হয়। শালবন ঢাকার অতি নিকটে হওয়ায় দ্রুত শিল্পায়ন, জবর দখল, গো-চারণ ও ভূমিদস্যুতার কারণে শালবনের জীববৈচিত্র্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। শিল্পকারখানা হতে নিঃসরিত বর্জের কারণে জীববৈচিত্র্য মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এ জন্যে এই এলাকায় বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

777777সাফারী পার্কের মূল উদ্দেশ্য
(১) শালবনের বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ।
(২) বাংলাদেশের বিরল ও বিলুপ্ত প্রায় বন্যপ্রাণীকে নিজ আবাসস্থলে এবং আবাসস্থলের বাইরের অবস্থায় সংরক্ষণ ও উন্নয়ন সাধন ।
(৩) ঢাকা মহানগরীর অতি নিকটে ইকো-ট্যুরিজমের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা ।
(৪) চিত্তবিনোদন, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা ।
(৫) বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী ফলজ, ফডার, ও মিশ্র প্রজাতির বাগান সৃজন ।
(৬) শালবনের বন্যপ্রাণী যেমন বানর, মায়া হরিণ, বেজী, বনরুই, বাঘদাস, বন বিড়াল, খরগোশ, শিয়াল, খেকশিয়াল ও অজগরসহ বিপন্ন বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সৃষ্টি ও সংরক্ষণ করা ।
(৭) বিরল ও বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন বাঘ, চিতাবাঘ, সাম্বার হরিণ, মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, প্যারা হরিণ এবং অন্যান্য তৃণভোজী বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা ।
(৮) গণ্ডার, এশীয় হাতী, পরিযায়ী পাখী, জলজ পাখী, বনছাগল, সিংহ, শ্লথ বীয়ার, কালো ভাল্লুক, মিঠা পানির কুমির, লোনা পানির কুমির, নীল গাই, জলহস্তী ইত্যাদি বিপন্ন ও বিলুপ্ত বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণকরণ ।
(৯) আহত ও উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণীর চিকিৎসার নিমিত্তে বন্যপ্রাণীর সেবাশ্রম ও হাসপাতাল স্থাপন ।
(১০) সারাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি।

কোর সাফারী পার্ক
কোর সাফারী পার্কে সাফারী গাড়ী ব্যতীত কোন পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন না, তবে তিনি বন্যপ্রাণী বেষ্টনীতে মুক্ত অবস্থায় প্রাকৃতিক পরিবেশে বিচরণরত বন্যপ্রাণী সমূহ গাড়ীতে চড়ে অবলোকন করতে পারবেন। কোর সাফারী পার্ক ১৩৩৫ একর এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হবে-যার মধ্যে ২০.০ একরে বাঘ, ২১.০ একরে সিংহ, ৮.৫০ একরে কালো ভালুক, ৮.০ একরে আফ্রিকান চিতা, ৮১.৫০ একর চিত্রা হরিণ, ৮০.০ একরে সাম্বাব ও গয়াল, ১০৫.০ একরে হাতী, ৩৫.০ একরে জলহস্তী, ২২.০ একরে মায়া ও প্যারা হরিণ, ২৫.০ একরে নীলগাই এবং বারো সিংগা, ১১৪.০ একরে পাখীদ্বীপ, ৪০৭.০ একরে বন্য মহিষ  থাকবে এবং আফ্রিকান সাফারী পার্কের জন্য বরাদ্দ ২৯০.০ একর এলাকাকে সুবিন্যাস্থ করা হবে।

bs2.2কোর সাফারী পার্কের দর্শনীয় স্হাপনাসমূহ

• ১. বাঘ সাফারী
• ২. সিংহ সাফারী
• ৩. চিতা/সাদা সিংহ সাফারী
• ৪. ভল্লুক সাফারী
• ৫. হরিন সাফারী
• ৬. আফ্রিকান সাফারী
• ৭. সাফারী জীপ ও মিনিবাস
• ৮. অভ্যন্তরীণ পাকা রাস্তা
• ৯. মাংসাশী ও ত্ণ ভোজী প্রাণী বেস্টনী
• ১০. বাঘের ঘর
• ১১. সিংহের ঘর
• ১২. চিতার ঘর
• ১৩. ভল্লুকের ঘর
• ১৪. মেকানাইজড গেট
• ১৫. বার্ড আইল্যান্ড
• ১৬. যাত্রী ছাউনী
• ১৭. খাদ্য সংরক্ষণাগার
• ১৮. কোয়ারেন্টইন শেড
• ১৯. বন্যপ্রাণী চিকিতসালয়

সাফারী কিংডম
সাফারী কিংডমে পর্যটকগণ পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে পারবে এবং প্রাণিকূলকে ছোট-খাট বেস্টনীর মধ্যে আবদ্ধ রাখা হবে। সাফারী কিংডমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে: বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর নৈপূণ্য ও খেলাধুলা প্রদশর্ণের মাধ্যমে পর্যটকদের চিত্তবিনোদন, বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা। সাফারী কিংডম ৫৭৫.০ একর এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র, জিরাফ ফিডিং স্পট, পেলিকেন আয়ল্যান্ড, বোটিং ও লেকজোন; বৃহৎ আকারের গাছপালা ঘেরা ক্রাউন্ট ফিজেন্ট এভিয়ারী, ধনেশ এভিয়ারী, প্যারট এভিয়ারীসহ দেশি-বিদেশী পাখির পাখীশালা, কুমির পার্ক, অর্কিড হাউজ, প্রজাপতি কর্ণার, শকুন ও পেঁচা কর্ণার, এগ ওয়ার্ল্ড, কচ্ছপ-কাছিম ব্রিডিং সেন্টার, লামচিতা হাউজ, ক্যাঙ্গারু বাগান, হাতী-শো গ্যালারী, ময়ুর/মেকাউ ওপেন ল্যান্ড, সর্প পার্ক, ফেন্সি কার্প গার্ডেন, ফেন্সি ডার্ক গার্ডেন, লিজার্ড পার্ক, ফুডকোটর্ , পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও জলাধার ইত্যাদি।bs2.5

সাফারী কিংডম এর দর্শনীয় স্হাপনাসমূহ

• ১. পাহার গেট
• ২. প্রকৃতি বীক্ষন কেন্দ্র
• ৩. প্যারট এভিয়ারী
• ৪. ক্রাউন ফিজেন্ট এভিয়ারী
• ৫. ধনেশ এভিয়ারী
• ৬. ম্যাকাউ ল্যান্ড
• ৭. ছোট পাখিশালা
• ৮. ফেন্সি ডাক গার্ডেন
• ৯. ফেন্সি কার্প গার্ডেন
• ১০. কুমির পার্ক
• ১১. ইমু/অস্ট্রিচ গার্ডেন
• ১২. লিজার্ড পার্ক
• ১৩. কচ্ছপ ও কাছিম প্রজনন কেন্দ্র
• ১৪. প্রাইমেট হাউজ
• ১৫. ভালচার হাউজ
• ১৬. লামচিতার ঘর
• ১৭. হাতী শালা
• ১৮. পর্যবেক্ষন টাওয়ার
• ১৯. বুটিং ও লেক জোন
• ২০. ফুডকোর্ট ও ওয়াশরুম
• ২১. গোল ঘর ও ছাতা
• ২২. পাবলিক টয়লেট
• ২৩. জিরাফ ফিডিং হাউজ
• ২৪. মেরিন একুরিয়াম
• ২৫. অর্কিড হাউজ
• ২৬. প্রজাপতি বাগান
• ২৭. অভ্যন্তরীণ পাকা রাস্তা
• ২৮. পেলিকেন আইল্যান্ড
• ২৯. ঝুলন্ত ব্রীজ
• ৩০. এইচ.বি.বি রোড
• ৩১. এগ ওয়ার্ল্ড
• ৩২. পেভড রোড

প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্র
এ কেন্দ্রে বাংলাদেশের প্রায় সকল ধরণের বনাঞ্চলের গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর মডেল, মুরাল ও ষ্টাফিং তৈরী করে আলো ও শব্দধ্বনি প্রবাহের মাধ্যমে বন্যপ্রাণী ও বনাঞ্চল সম্পর্কে দর্শকদেরকে সাম্যকে ধারণা প্রদান করা হয় । প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্রে প্রায় ৯৮০ ধরণের বন্যপ্রাণী ও অসংখ্য গাছ-পালার মডেল মুরাল তৈরী করা হযেছে । প্রায় ১২ মিনিটের দীর্ঘ একটি স্বব্যখ্যায়িত অডিও-ভিস্যুয়াল প্রোগ্রামের মাধ্যমে দর্শকগণ আনন্দ লাভ করতে পারবেন ।bs2.8

বায়োডাইভারসিটি পার্ক
এই পার্ক প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিরল, বিলুপ্তপ্রায়, দূলর্ভ ও বিপন্ন প্রজাতির গাছের জীন-পুল সংরক্ষণ করা। এছাড়া এ পার্কে শালবন এবং জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণের নিমিত্তে উপযোগী বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা হবে। এ পার্কটিকে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও বলধা গার্ডেনের রেপলিকা হিসাবে স্থাপন করা হবে। বায়োডাইভারসিটি পার্কের এলাকা নিধারণ করা হয়েছে ৯৬৫.০ একর।

এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারী পার্ক
এই পার্কে সকল এশীয় তৃনভোজী এবং ছোট মাংসাশী প্রাণী, পাখি, সরিসৃপ ও উভচর প্রাণী নিয়ে এক্সটেনসিভ সাফারী পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থালের জন্য উপযোগী চারণ ভূমি, বন বাগান, জলাধার, ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা ও বিদ্যমান প্রাকৃতিক বনভূমির উন্নয়ন করা হবে। এই পার্কের এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮২৪ একর।bs2.7

বঙ্গবন্ধু স্কয়ার এর দর্শনীয় স্হাপনাসমূহ

• ১. পার্ক অফিস
• ২. তথ্য কেন্দ্র
• ৩. ডিসপ্লে ম্যাপ
• ৪. গাইড ম্যাপ
• ৫. বাঘ পর্যবেক্ষণ রেস্তোরা
• ৬. সিংহ পর্যবেক্ষণ রেস্তোরা
• ৭. ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম
• ৮. ঐরাবতী বিশ্রমাগার
• ৯. প্রধান ফটক
• ১০. টিকেট কাউন্টার
• ১১. ফোয়ারা
• ১২. বন্যপ্রাণী মডেল কর্ণার
• ১৩. ফুলের বাগান
• ১৪. জলাধার
• ১৫. অফিসার্স ডরমেটরী
• ১৬. স্টাফ ডরমেটরী
• ১৭. পাবলিক টয়লেট
• ১৮. পর্যবেক্ষণ টাওয়ার
• ১৯. আরসিসি ছাতা
• ২০. যাত্রী ছাউনী
• ২১. সিটিং বেঞ্চ
• ২২. পার্কিং এরিয়া
• ২৩. ওভার হেড ট্যাস্কসহ পানি সরবরাহ
• ২৪. পাকা এপ্রোচ রোড
• ২৫. অভ্যন্তরীণ পাকা রাস্তা
• ২৬. ইকো-রিসোর্টbs2.3

ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম
এখানে প্রায় ২০০০ প্রজাতির মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী প্রাণীর দেহাবশেষ, স্পেসিমেন ও ষ্টাফিং সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য গাছপালা। প্রায় ৩০০ প্রজাতির গাছ-পালার হারবেরিয়াম সিট তৈরী করে মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে গণসচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সাফারী পার্কে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম নির্মাণ যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এতে পর্যটক, শিক্ষার্থী ও গবেষকবৃন্দ বিপদাপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করতে পারবেন। তাছাড়া ডাটাবেজ হতে শিক্ষার্থী ও গবেষকবৃন্দ বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের সকল প্রকার তথ্য পেতে সমর্থ হবেন।
-এএইচ/ ২/৩

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

<