ফুটবলার নওশেরুজ্জামানের অজানা ইতিহাস

ফুটবলার নওশেরুজ্জামানের অজানা ইতিহাস

ফুটবলার নওশেরুজ্জামানের অজানা ইতিহাস

সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০ ০ comments

Image may contain: 1 person, text that says "NOWSHERUZZAMAM A MEMBER OF THE SWADHIN BANGLA FOOTBALL TEAM AND FORMER PLAYER OF NATIONAL TEAM"চলে গেলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কিংবদন্তী ফুটবলার কে এন নওশেরুজ্জামান। এই অনুলিখনে চেষ্টা করেছি এই কিংবদন্তী নওশেরুজ্জামানের ক্যারিয়ার নিয়ে প্রাপ্ত তথ্যগুলো একত্রিত করতে। নতুন প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীরা যেনো এই মহান ফুটবলার সম্পর্কে জানতে পারে।

Image may contain: 2 people#স্বাধীন_বাংলা_ফুটবল_দলে_গর্বিত_সদস্য:
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশের একটি ফুটবল দল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত অর্জন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ফুটবল খেলায় অংশ নেয়। এই দলটি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নামে পরিচিত ।পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দল এটি।সে দলের গর্বিত সদস্য ছিলেন কে এন নওশেরুজ্জামান।
বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। তারুণ্যের ডাক উপেক্ষা করেন কীভাবে! তাই ছুটে গেছেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে খেলতে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে খেলতে খেলতে হয়ে গেছেন অবিস্মরণীয় এক ইতিহাসের অংশ। সেই ইতিহাসের বাঁকে দাঁড়িয়ে একেএম নওশেরুজ্জামান ফিরে গেলেন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ৪৭ বছর আগে কলকাতায় বসে প্রিয় জন্মভূমির স্বাধীন হওয়ার খবরে নেচে ওঠেন আনন্দে। সে এক অমর গল্প। সত্তর দশকে ঢাকার মোহামেডানের এই নামী স্ট্রাইকার নিজের প্রিয় হাত ঘড়িটি ১০০ টাকায় বিক্রি করে খেলতে যান স্বাধীন বাংলা দলে।এ স্মৃতি চির অম্লান।

ফুটবল_ক্যারিয়ার:
ফুটবলার নওশেরের পজিশন ছিলেন স্ট্রাইকার।
মেজর (অবঃ) হাফিজউদ্দীন, কাজী সালাউদ্দীন ও এনায়েতুর রহমানদের স্বর্ণ সময়ে ঢাকার ক্লাব ফুটবলে ঢাকা মোহামেডানের অন্যতম স্ট্রাইকার ছিলেন নওশেরউজ্জামান। স্বাধীনতার আগে খেলেছেন রেলওয়ে, ওয়ারী, ফায়ার সার্ভিস ও ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে। স্বাধীন বাংলা দলের হয়ে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় খেলেছেন তিনি।
স্বাধীন বাংলাদেশে ওয়াপদাতে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪, মোহামেডানে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ ও ওয়ান্ডারার্সে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত খেলেছেন। আর জাতীয় দলে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত খেলেছেন সুনামের সঙ্গে।
১৯৭৫ সালে ঢাকা লিগে ঢাকা মোহামেডানের হয়ে ২১ গোল দিয়ে সর্বাধিক গোলদাতাও হয়েছিলেন তিনি।

Image may contain: 3 people, people standing and outdoor#ক্রিকেট_ক্যারিয়ার:
ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটও খেলেছেন সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে। আর ক্রিকেটার নওশের ছিলেন ওপেনিং ব্যাটসম্যান।ঢাকা মোহামেডান ও কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের হয়ে প্রায় এক যুগ ঢাকা ক্রিকেট লীগও খেলেছেন কে এন নওশেরুজ্জামান। মোহামেডানের মতো দলে নিয়মিত খেলে গেছেন সাবেক এই ওপেনার। এছাড়া ভিক্টোরিয়াতে তিন ও কলাবাগানে খেলেছেন পাঁচ বছর। ১৯৭৮ সালের সর্বজয়ী মোহামেডান ক্রিকেট দলের অন্যতম সারথী ছিলেন নওশেরুজ্জামান।

খেলাধুলায় বিশেষ অবদানের জন্য ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্লু’ পাওয়া সাবেক এই স্ট্রাইকারকে একটা আক্ষেপ নিয়েই ছাড়তে হলো পৃথিবী। মৃত্যুর আগে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেখে যাওয়া হলো না তার।

দেশের একটি শীর্ষ দৈনিককে দেয়া এক সাক্ষাতকারে একেএম নওশেরুজ্জামান বলেছিলেন, ৭১ সালের সন্ধ্যার দিকে দেখলাম কলকাতা শহরে…বোমা, পটকা ইত্যাদি ফাটানো হচ্ছে। তখনো বুঝতে পারিনি আসলে ঘটনাটা কি? দেশ এত তাড়াতাড়ি স্বাধীন হয়ে যাবে আমার কল্পনারও বাইরে। তখনই ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে দৌড়ে গেলাম আমরা কয়েকজন, যেখানে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট ছিল। ওখানে গিয়ে অবশ্য আমাদের কাউকেই পেলাম না। সবাই আনন্দ করতে করতে ডিনার বা এদিক-ওদিক চলে গেছে। দেখলাম, ইন্ডিয়ান লোকেরা খুব ফুর্তি করছে। রাস্তাঘাটে নাচছে। কারণ, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে।  আনন্দের খবরটা জেনে আমাদের আর পায় কে! নাচানাচি শুরু। আমরা কিছু প্লেয়ার রাত ২-৩ টা পর্যন্ত কলকাতা শহরে ঘুরলাম, ফিরলাম, খেলাম। তবে আনন্দ করব কী, আমার মনের মধ্যে তখন কীভাবে দেশে যাব সেই আলোড়ন।

Image may contain: 3 people১৬ ডিসেম্বর আমাদের কোনো কর্মসূচি ছিল না। তাই আড্ডা, এটা-ওটা করে কাটিয়ে দিই। সন্ধ্যার সময়ই হঠাৎ খবর এল, বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তখনই কলকাতায় আমার ভগ্নিপতি মেজর জেনারেল শামসুল হকের, (এরশাদ সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রী। স্বাধীন বাংলা দলে মেডিকেলের ব্যাপারটা দেখতেন) সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পেলাম না। ওনারা চলে গেছেন ডিনারে।

তখন আমার সঙ্গে ছিলেন স্বাধীন বাংলা দলের প্রতাপ দা (প্রতাপ শংকর হাজরা), এনায়েত, খোকন, সালাউদ্দিন, স্বাধীন বাংলা দলের ক্যাম্প কমান্ডার বদিউজ্জামান খসরু, যিনি আমার বড় ভাইও ছিলেন…এই কজনের কথা এখনো মনে আছে। আজ মনে হাজারো স্মৃতির ভিড়। তবে সত্যি কথা বলতে পাকিস্তানিরা সারেন্ডার করেছে শোনার পর থেকে আমার মনে হচ্ছিল, যদি পাখা থাকত তাহলে আমি এখনই উড়ে চলে আসতাম দেশে। এবং খুব দ্রুত চলেও আসি এপারে। যদিও সতীর্থরা বলল, কদিন দেরি করতে। আমি বললাম, ‘‘না ভাই, ঢাকা কোন দিকে আমাকে দেখিয়ে দাও। দরকার হলে হেঁটে চলে আসব।’’ এমন অস্থির হয়ে উঠি।

ঢাকায় ফেরার গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, কলকাতা থেকে ট্রেনে বেনাপোল, তারপর বাসে যশোর, ঝিনাইদহ। মনে আছে, গোয়ালন্দে তখন চর। সেই চরের মধ্যে মাথায় সুটকেস নিয়ে হাঁটলাম। হাঁটতে হাঁটতে আরিচার ওপারে এসেছি। তখন আবার নৌকায় পার হয়েছি। বিরাট এক আরিচা। বাবা রে বাবা। এখন ভাবতেই ভয় লাগে। কী নৌকা দিয়ে আমরা পার হয়েছি আরিচা! আরিচায় এসে ভাত খেলাম। আইড় মাছ দিয়ে. এখনো স্পষ্ট মনে আছে। যাই হোক, ঝিনাইদহে এক রাত থেকে পরদিন সন্ধ্যায় ঢাকায়।

আমার মতোই সবাই কম বেশি উতলা হয়ে ওঠে প্রিয় জন্মভূমির মাটির গন্ধ শুঁকতে। যারা দেরি করে এসেছে, তারা কেউ প্লেনে। কেউ বাস-ট্রেনে এসেছে। ঢাকায় সন্ধ্যার সময় এসেই আমার বড় বোনের সায়েন্স ল্যাবরেটরির কোয়ার্টারে গেলাম। তাঁকে বাসায় পাইনি। ছিলেন বড় বোনের দেবর। তো ওই বাসা থেকে রিকশায় বের হয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে যাই। তখন স্টেডিয়ামে ইসলামিয়া রেস্টুরেন্টের বাচ্চুর সঙ্গে দেখা। সে আমার সব কথা শুনে খুশি হলো ভালোভাবে ফিরে আসতে পারায়।জড়িয়ে ধরে কাঁদলও। বাচ্চু বলল, ‘‘নওশের ভাই আপনি চলে যান। এখানে অবস্থা অত ভালো নয়। কে কখন কাকে কী করে! হাইজ্যাকিং-টাইজ্যাকিং হতে পারে।’’ আমি চলে এলাম সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে বোনের বাসায়। রাতে আর ঘুম হয়! ভোরে উঠেই মুন্সিগঞ্জের দিকে রওনা হই আমি আর আমার আমার বড় ভাই বদিউজ্জামান খসরু।

 মুন্সিগঞ্জ শহরে আমাদের বাসা ছিল ব্রিজের গোড়ায়। ব্রিজের ওপর থেকেই আমি আম্মা বলে হাঁক দেই। আম্মা তখন অসুস্থ। আমার ডাক শুনে আম্মাকে আব্বা বললেন, ‘‘ওই যে আইস্যা গেছে। আমার মেঝ ছেলের ডাক এটা।’’ তখন আমার বড় বোন ওখানেই ছিল। তো যাই হোক, যে আম্মা ৭ দিন ধরে বিছানায়, তিনি ছেলেদের ফিরে আসার আনন্দে সারা দিন রান্নাবান্না করলেন। সবাই মিলে খেলাম। মুন্সিগঞ্জের লোক যারাই শুনেছে আমাদের ফেরার কথা, দৌড়ে এল বাসায়। এ এক অবিস্মরণীয় এক গল্প।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আমারই বন্ধু বাবুল আখতারের (মারা গেছেন) কণ্ঠে প্রথম শুনি, ওপারে ফুটবল দল গড়ার ডাক দেওয়া হয়েছে। পরপরই মের শুরুর দিকে চলে যাই আগরতলা। কায়কোবাদ ভাইয়েরা এসে নিয়ে গেলেন। টাকা পাব কোথায়! আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি জীববিজ্ঞানে। তখন আমার বিখ্যাত ফেভার লুবা ব্র্যান্ডের একটা ঘড়ি ছিল, পাকিস্তান আমলে যেটির দাম ছিল ২০০/২৫০ টাকা। আমার আব্বার এক বন্ধু মানে কাকার কাছে সেটা ১০০ টাকায় বিক্রি করে স্বাধীন বাংলা দলে খেলতে চলে যাই। ফিরে এসে অবশ্য কাকাকে ১০০ টাকা দিয়ে দেই। কাকা বলেন, ‘‘নে তোর ঘড়ি নে ( হা হা)।’’

ভারতে ১৬টি ম্যাচ খেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৬ট খেলায় জয় ১২টিতে। এই যাত্রার প্রথম দিনে কৃঞ্চনগরে ২৪ জুলাই যে খেলাটা হলো, সেটির স্মৃতিই বেশি জ্বলজ্বলে। আমাদের জীবনে তা সত্যিই চির অম্লান থাকবে। আমরাই পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র ফুটবল দল, যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য এভাবে ফুটবল ম্যাচ খেলে খেলে লড়াই করেছি। ভারতের জাতীয় পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলেছে। দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বেজেছে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে। এটাই আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। আমরা মুম্বাই, বেনারশ, কলকাতা ( কলকাতার গোস্টপাল একাদশ) বর্ধমান, মালদহ, পুনে, দূর্গাপুরসহ অনেক জায়গায় খেলেছি। অনেক টাকা উঠেছিল ( সাড়ে তিন লাখ রুপি, ৫ লাখ টাকা)। এখান থেকে কিছু টাকা আমাদের ভরন পোষণে খরচ হয়েছে। বাকিটা মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে গেছে।

সূত্র : আনিসুর রহমান রাজুর ফেসবুক পেজ থেকে

No Comments so far

Jump into a conversation

No Comments Yet!

You can be the one to start a conversation.

<